ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অনুষ্ঠিত সর্বজনিন পর্যায়বৃত্ত পূনরীক্ষণ কার্যক্রমে ২০০৯ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক মানবাধিকার সংরক্ষণ ও উন্নয়নে কৃত অংগীকারসমুহ বাস্তবায়নে বর্তমান আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের সাফল্য প্রশ্নবিদ্ধ। তাই অংগীকারসমুহ বাস্তবায়নসহ বর্তমানে চলমান মানবাধিকার লংঘনসমুহ বন্ধে রাষ্ট্রকে অবশ্য দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

বিগত ইউপিআর অধিবেশনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স দেখাবে বলে সুস্পষ্টভাবে অংগীকার করলেও বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড তো বন্ধ হয়নি বরং তা নিয়মিত বেড়ে চলেছে। তাছাড়া সাথে যোগ হয়েছে গুমের মত ঘটনা। একটি গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড ও গুমের মত ঘটনা কোনভাবে মেনে নেওয়া যায় না, তাই বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড ও গুমের সংস্কৃতি অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।

সর্বজনিন পর্যায়বৃত্ত পুনরীক্ষণ অধিবেশন ২০০৯ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক পেশকৃত জাতীয় প্রতিবেদন, বিভিন্ন স্টেক হোল্ডার কর্তৃক পেশকৃত বিকল্প প্রতিবেদন, ইউপিআর ওয়ার্কিং গ্রুপ কর্তৃক সংকলিত জাতিসংঘ প্রতিবেদন এবং ওয়ার্কিং গ্রপ অধিবেশনে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক মানবাধিকার সংরক্ষণ ও উন্নয়নে কৃত অংগীকারসমুহের এখন পর্যন্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি অর্থাৎ তা বাস্তবায়নে সরকার কর্তৃক গৃহিত পদক্ষেপসমুহ সম্পর্কে পর্যালোচনা করে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক মানবাধিকার সংরক্ষণ ও উন্নয়নে কৃত অংগীকারসমুহের বাস্তবায়নের নিম্নোল্লেখিত হতাশাগ্রস্ত চিত্র ফুটে উঠেছে:

(১) আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ স্বাক্ষর সংক্রান্ত:

বাংলাদেশ সরকার ২২ মার্চ ২০১০ তারিখে রোম সংবিধি অনুস্বাক্ষর করেছে এবং অভিবাসী শ্রমিক অধিকার সংরক্ষণ সংক্রান্ত আর্ন্তজাতিক চুক্তি ১৯৯৮ স্বাক্ষর করলেও এখন পর্যন্ত তা অনুস্বাক্ষর (রেটিফাই) করার কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। তাছাড়া, নির্যাতনের বিরুদ্ধে আšতর্জাতিক চুক্তির ঐচ্ছিক প্রটোকল অনুমোদনের বিষয়টি সরকাররের বিবেচনাধীন আছে বলে জানালেও তা গ্রহণের বাস্তব কোন পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়।

(২) শরনার্থী ও আদিবাসী জনগোষ্ঠী সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদ:

বাংলাদেশ সরকার শরনার্থী বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি ১৯৫১ এবং আদিবাসী ও উপজাতি অধিকার সংকান্ত আন্তজার্তিক শ্রমিক সংগঠনের চুক্তি ১৫৯ স্বাক্ষরের কোন পদক্ষেপ এখন পর্যন্ত গ্রহণ করেনি। বরং সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে বাংলাদেশের নাগরিকদের বাঙ্গালী হিসেবে অভিহিত করে তাদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি অস্বীকার করা হয়েছে।

(৩) সংরক্ষণ ও প্রত্যাহার:

বাংলাদেশ সরকার ২৫ শে জানুয়ারী ২০১১ তারিখে জাতিসংঘের সিডও কমিটির পর্যালোচনা সভায় অংশগ্রহণ করলেও সিডও এর ২ এবং ১৬ (১)(গ) ধারা থেকে সংরক্ষণ প্রত্যাহারের কোন সুনির্দিষ্ট অংগীকার করেনি। তাছাড়া, এখন পর্যন্ত নির্যাতনের বিরুদ্ধে আšতর্জাতিক চুক্তির ১৪ নং ধারা থেকে সংরক্ষণ প্রত্যাহারের কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।

(৪) আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদন্ড কার্যকর রাখা:

জাতীয় আইনকে আন্তর্জাতিক মানদন্ডে উন্নীত করার জন্য সরকার কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনকে অনুসরণ করে না।

(৫) মানবাধিকার সংরক্ষণ ও উন্নয়নে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার:

মানবাধিকার সংরক্ষণ ও উন্নয়নে সরকার কিছু প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার করেছে। যেমন: ৯ জুলাই, ২০০৯ ইং তারিখে সংসদ জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০০৯ পাশ করেছে। যদিও কমিশন আইনে মানবাধিকার সংরক্ষণ ও উন্নয়নে কমিশনকে যতেষ্ট ক্ষমতা প্রদান করা হয়নি। ২৩ জুন ২০১০ ইং তারিখে সরকার কমিশনের একজন চেয়ারম্যান ও একজন সার্বক্ষনিক সদস্যসহ ছয়জন সদস্য নিয়োগ প্রদান করেছে। তবে উপযুক্ত জনশক্তি ও অন্যান্য সম্পদ বরাদ্ধ করে সরকার কমিশনকে এখনো কার্যকর করতে পারেনি। তাছাড়া, ন্যায়পাল গঠনের নির্বাচনী অংগীকার পুরনে সরকার তেমন কোন ভূমিকা রাখেনি। এমন কি সরকার কর ন্যায়পাল, যা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার আংশিক পুরন করত, তাও বিতর্কিত যুক্তিতে বাতিল করেছে।

(৬) জাতীয় মানবাধিকার কমিশন:

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন মানবাধিকার সংরক্ষণ ও উন্নয়নে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে গ্রহনযোগ্য ম্যানডেট প্রদান করেছে। কিন্তু মানবসম্পদের অভাবে কমিশন তাদের উপর অর্পিত আজ্ঞা সঠিকভাবে পালন করতে পারছে না। কমিশন বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের সাথে পরামর্শক্রমে তার পাঁচ বছরের একটি কর্মকৌশল প্রনয়ন করেছে এবং বিভিন্ন বিষয়ে কিছু সেমিনার ও কর্মশালার আয়োজন করেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোন তথ্যানুসন্ধান বা তদন্ত কার্য পরিচালনা করেনি। তাছাড়া, কমিশন মধ্যস্থতা বিষয়ক কর্মপদ্ধতি এখনো স্থির করতে পারেনি। ২২ ডিসেম্বর ২০০৯ তারিখে কমিশন ৬২ জন কর্মী অনুমোদনের জন্য সরকারের নিকট পাঠালেও প্রায় একবছর পর সরকার কমিশনে ২৮ জন কর্মী নিয়োগ অনুমোদন করেন।

(৭) জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা ও কার্যকারিতা:

যদিও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন কার্যকর করা সরকারের ভাল পদক্ষেপ। কিন্তু এই আইন কিছু বিষয় একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী মানবাধিকার কমিশন কার্যক্রমে বাধার সৃষ্টি করে। উদাহরণস্বরূপ: আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহীনি কর্তৃক মানবাধিকার লংঘনজনিত ঘটনার ক্ষেত্রে কমিশনের ক্ষমতা শুধুমাত্র সরকারি কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে প্রতিবেদন আহবানের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তাছাড়া, সরকারি কর্তৃপক্ষ প্রতিবেদন প্রদানে ব্যর্থ হলে কমিশনের সুনির্দিষ্ট এখতিয়ার উল্লেখ নেই। তাছাড়া, ন্যায়পাল আইন ১৯৮০ এখতিয়ারাধীন বিষয় অথবা প্রশাসনিক ট্রাইবুনালের এখতিয়ারাধীন বিষয়ে কমিশনের কোন ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কমিশনের চেয়ারম্যান যদিও নিয়মিত মিডিয়া ও বিভিন্ন কর্মসূচিতে দৃশ্যমান, কিন্তু এখন পর্যন্ত কমিশন তার কার্যকারিতা প্রমান করতে ব্যর্থ হয়েছে।

সরকার দুর্নীতি দমন কমিশনের জন্য ঢাকা ও ঢাকার বাহিরে প্যানেল আইনজীবী নিয়োগ করেছে এবং কমিশনের জন্য ৮০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের বিষয়টি চুড়ান্ত করেছে। কিন্তু প্রস্তাবিত দুর্নীতি দমন কমিশন সংশোধিত বিল সরকারের প্রতিশ্রুত একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কমিশন গঠনের বিষয়ে সংশয়ের সৃষ্টি করেছে। প্রস্তাবিত সংশোধন কমিশনের উপর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে। তাছাড়া, শুধুমাত্র দলীয় বিবেচনায় দূর্নীতির অভিযোগের হাজার হাজার মামলা প্রত্যাহার করা এই প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রচেষ্ঠাকে বাঁধাগ্রস্ত করেছে।

বিরোধী দলের অব্যাহত সংসদ বর্জনের ফলে জাতীয় সংসদ কার্যকরভাবে কাজ করতে ব্যর্থ হয়েছে। সংসদীয় স্থায়ী কমিটিসমুহ অপেক্ষাকৃত কার্যকর হলেও কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া অধিকাংশ কমিটি স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট সংসদ সদসস্যের অধিনস্ত। জন প্রশাসনে বদলী, প্রবর্তনা ও পোস্টিং এর ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করে। তাছাড়া, শুধুমাত্র রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেক সংখ্যক জেষ্ঠ কর্মকর্তাকে বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে অকার্যকর করে রাখা হয়েছে। প্রাইভেট সেক্টরে রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার আইন সংশোধন করে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশনকে অপেক্ষকৃত ক্ষমতাহীন করে সরকারের মন্ত্রনালয়কে ক্ষমতাশালী করেছে। সংসদ আইনের দ্বারা বিদ্যুৎ উৎপাদন, বিক্রয় ও বিতরন বিষয়ে দায়মুক্তি প্রদানের মাধ্যমে এই সেক্টরে স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতাকে অস্বীকার করা হয়েছে।

(৮) নারী ও শিশুর উন্নয়ন:

সরকার জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালা ২০১১ গ্রহন করেছে। এ নীতিমালায় ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের বিকেন্দ্রীকরন, জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেট প্রনয়ন ও প্রসবকালীন ছয়মাস ছুটি প্রদানের মত ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহন করলেও উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে সমান অধিকারের বিষয়ে এ নীতিমালা নিশ্চুপ। তাছাড়া, এ নীতিমালা বাস্তবায়নে সরকার তেমন কোন কার্যকর বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহন করেনি। ২০১১ সালে সরকার ৬ষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ২০০১১-২০১৬ প্রনয়ন করেছে, যাতে বিভিন্ন বিষয় ভিত্তিক নির্দিষ্ট জেন্ডার গোল অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে।

(০৯) জাতীয় মানবাধিকার কার্যক্রম গ্রহন:

মানবাধিকার উন্নয়নে জাতীয়ভাবে কোন কর্মসূচী এখন পর্যন্ত গ্রহন করা হয়নি। আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহীনিকে প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে তাদের ব্যবহার ও কাজে কোন পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে হয় না।

(১০) জাতিসংঘের বিশেষ পদ্ধতির সাথে সহযোগীতা বৃদ্ধি:

মানবাধিকারের বিশেষ পদ্ধতিসমুহের নিকট থেকে প্রাপ্ত অনুরোধের বিষয় অমিমাংশিত রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বে অন্যতম শীর্ষে অবস্থান করছে। স্বাধীনভাবে মতামত ধারন ও প্রকাশের অধিকার সংক্রান্ত বিশেষ প্রতিবেদক ( ২০০৩ সাল থেকে), সংখ্যালঘু বিষয়ক স্বাধীন বিশেষজ্ঞ ( ২০০৬ সালে অনুরোধ করে), বিচারবহির্ভূত, সংক্ষিপ্ত অথবা স্বেচ্ছাচারী মৃত্যু দন্ড প্রদান বিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক (অনুরোধ করে ২০০৬ সালে এবং ২০০৮ ও ২০০৯ সালে তাগাদা দেন), বিচারক ও আইনজীবীদের স্বাধীনতা সংক্রান্ত বিশেষ প্রতিবেদক (২০০৭ সালে অনুরোধ করে), সমকালীন দাসত্ব বিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক (২০০৮ সালে অনুরোধ করে) এবং বর্ণ-বৈশম্য বিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক (২০০৮ সালে অনুরোধ করে) এর মত বিশেষ পদ্ধতিসমুহের অনুরোধ বাংলাদেশ বছরের পর বছর অমিমাংসিত রেখেছে।

মানবাধিকার ও চরম দারিদ্র বিষয়ক জাতিসংঘের স্বাধীন বিশেষজ্ঞ এবং নিরাপদ খাবার পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন সহজলভ্যতা বিষয়ক স্বাধীন বিশেষজ্ঞ দল ২০০৯ সালে বাংলাদেশে একটি যৌথ মিশন পরিচালনা করে। পর্যাপ্ত আবাসন ও ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক বাংলাদেশ পরিদর্শনের জন্য নীতিগতভাবে রাজি হয়েছে, কিন্ত এখন পর্যন্ত পরিদর্শনের সময় নির্ধারিত হয়নি।

(১১) নারী ও শিশু অধিকার রক্ষায় আইনী সংস্কার:

পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০ সালের অক্টোবরে পাশ হয়েছে এবং ৩০ শে ডিসেম্বর ২০১০ ইং তারিখ থেকে কার্যকর হয়েছে। শিশু সংক্রান্ত সকল দাপ্তরিক দলিলে মায়ের নাম অন্তর্ভূক্ত করাকে ব্যাধ্যতামূলক করে ২০১০ সালে গেজেট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমে মায়েদের স্বীকৃতি নিশ্চিত করা হয়েছে। যদিও শিশুর পরিচয়ের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র মায়ের পরিচয় যথেষ্ট নয়।

২০০৯ সালের ১৪ মে সকল ক্ষেত্রে যৌন হয়রানী বন্ধে আইন প্রনয়ন করাসহ হাইকোর্ট কিছু সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা প্রদান করেন। কিন্তু সরকার হাইকোর্টের নির্দেশনা মোতাবেক সুনির্দিষ্ট আইন প্রনয়নসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে তেমন কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।

২০১১ সালের ১০ এপ্রিল, হাইকোর্ট ডিভিশন বাল্য বিবাহ প্রতিরোধে বিবাহ রেজিস্ট্রেশনের সময় জন্ম নিবন্ধন সার্টিফিকেট অথবা জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে বয়স নির্ধারনের জন্য মুসলিম বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন আইন ১৯৭৪ সংশোধনের জন্য নির্দেশনা প্রদান করেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত সরকার তা বাস্তবায়ন করেনি।

(১২) নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় ইতিবাচক পদক্ষেপ অব্যাহত রাখা:

নারীদের জন্য প্রসবকালীন ছুটি ৬ (ছয়) মাস করা হয়েছে। ৩০জুন ২০১১ ইং তারিখে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন ৪৫ থেকে বৃদ্ধি করে ৫০ টি করা হয়েছে। কিন্তু এখনো সংরক্ষিত মহিলা আসনে সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়নি।

নারীদের শিক্ষার হার বৃদ্ধি, স্বাক্ষরতা হারে বৈষম্য বিলোপ, মেয়েদের জন্য কারিগরি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে সরকার ২০১০ সালে শিক্ষা নীতি গ্রহণ করেছে।

(১৩) নারী অধিকার রক্ষায় প্রচলিত আইনের সংশোধন ও কার্যকর প্রয়োগ:

মজুরির ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মধ্যে কোন বৈষম্য নেই বলে যদিও সরকার উল্লেখ করেছে, কিন্তু বাস্তবে অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রম ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মধ্যে কোন কোন ক্ষেত্রে মজুরি বৈষম্য বিদ্যমান। তাছাড়া, পোশাক শিল্পে খুব অল্পসংখ্যক নারীকে তত্ত্বাবধায়কের পদে দেখা যায়।

(১৪) শিশু অধিকার:

২০১১ সালের ফেব্র“য়ারিতে মন্ত্রীসভা শিশু নীতিমালা অনুমোদন করে। সরকার শিশু আইন ১৯৭৪ সংশোধনের পদক্ষেপ নিয়েছে। উচ্চ আদালত শিক্ষা ক্ষেত্রে শিশুদের শারীরিক শাস্তি প্রদান বন্ধে নির্দেশনা প্রদান করেছে এবং সে অনুযায়ী প্রশাসন ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। তবে শিশু বিচার অর্থাৎ জুভেনাইল জাস্টিস প্রক্রিয়া উন্নয়নে সরকার এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনও পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।

(১৫) অর্পিত সম্পত্তি:

অর্পিত সম্পত্তি সংশোধিত আইন ২০১১ পাশ হলেও সরকার এখন পর্যন্ত সকল সম্পত্তির তালিকা প্রনয়ণ করতে পারেনি।

(১৬) প্রান্তিক জনগোষ্ঠী:

সরকার সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বরাদ্ধ বৃদ্ধি ও এর আওতায় সুবিধাভোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও তা বিতরনে ব্যাপক অনিয়ম ও রাজনৈতিক প্রভাব এর উদ্দেশ্যকে প্রশ্নবৃদ্ধ করেছে।

(১৭) মৃত্যুদনড বিলোপ:

সরকার মৃত্যুদ- বিলোপে অংগীকারাবদ্ধ নয় এবং এব্যাপারে কোন পদক্ষেপও গ্রহণ করেনি।

(১৮) বিচার বহির্ভূত হত্যাকানড-:

সরকার বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- সমর্থন করে না এবং এ ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে উল্লেখ করলেও বর্তমানে নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- বহাল রয়েছে। সাথে গুম, হত্যা, গণপিটুনিসহ নানাবিধ মানবাধিকার লংঘনের বিষয় যুক্ত হয়েছে।

(১৯) নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা:

নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা রোধে সরকার পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন কার্যকর করা এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বয়ে কিছু কর্মসূচি বাস্তবায়নের পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। হাইকোর্টের নির্দেশনার পর ফতোয়া প্রদানের মত মানবাধিকার লংঘনজনিত ঘটনা হ্রাস পেলেও এ বিষয়ে তথ্য ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রচার করা এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের নিকট নির্দেশনা প্রেরণের ব্যাপারে সরকারের উপযুক্ত উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়নি। তাছাড়া, সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ সত্বেও কন্যাশিশু উত্যক্তকরণ এখন বন্ধ হয়নি।

(২০) শিশুশ্রম নিরসননীতি:

সরকার যদিও জাতীয় শিশুশ্রম নীতিমালা গ্রহণের পদক্ষেপ নিয়েছে, কিন্তু সরকারের কার্যকর মনিটরিং এর অভাবে এখন শিশুশ্রম চলমান রয়েছে।

(২১) যৌন সহিংসতা, শিশু নির্যাতন ও পাচার বিরোধী জাতীয় কর্মপরিকল্পনা:

যদিও পূর্ববতী পাঁচ বছর মেয়াদী যৌন সহিংসতা, শিশু নির্যাতন ও পাচার বিরোধী জাতীয় কর্মপরিকল্পনা ২০০৭ সালে উত্তীর্ন হয়েছে, কিন্তু এখন পর্যন্ত নতুন কোন জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রনয়ন করা হয়নি। এমনকি প্রনয়নের কোন পদক্ষেপও নেওয়া হয়নি।

(২২) দুর্নীতি দমন:

যদিও তথ্য অধিকার আইন কার্যকর করা, তথ্য কমিশন গঠন, তথ্য প্রদানকারী সুরক্ষা আইন কার্যকর করার মাধ্যমে দুর্নীতি হ্রাসে সরকার কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রনে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। শুধুমাত্র রাজনৈতিক বিবেচনায় হাজার হাজার দুর্নীতির মামলা প্রতাহার দূর্নীতি দমনে সরকারের প্রতিশ্র“তির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিন বছর পার হলেও এখন পর্যন্ত শুধুমাত্র সরকারের মন্ত্রীরা তাদের সম্পদের বিবরন প্রধানমন্ত্রীর নিকট জমা দিয়েছে। কিন্তু প্রাপ্ত তথ্যসমুহ সবার জন্য উম্মুক্ত করার ব্যাপারে সরকার কোনো স্পষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেনি। তাছাড়া, সংসদ সদস্যের সম্পদের বিবরণ উন্মুক্ত করার ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ সরকার এখনো গ্রহণ করেনি।

(২৩) বিচার বিভাগের স্বাধীনতা:

নিম্ন আদালতে বিচারক নিয়োগের জন্য সরকার জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন প্রতিষ্ঠা করেছে এবং ইতোমধ্যে নিম্ন আদালত ও উচ্চ আদালতে কিছু সংখ্যক বিচারক নিয়োগ দিয়েছেন। উচ্চ আদালত দীর্ঘদিনের অমিমাংশিত মামলাসমুহ দ্রুত শুনানীর জন্য কিছু পদক্ষেপ গ্রহন করেছে। সাবেক প্রধান বিচারপতিসহ ১৭ জন বিচারপতির সম্পদের হিসেব প্রদান একটি স্বাগত পদক্ষেপ। কিন্তু, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এখনো সম্পূর্নরূপে কার্যকর নয়। নিম্ন আদালতের বিচারক নিয়োগ, বদলী, পদোন্নতি এখনো প্রশাসনের নিয়ন্ত্রনাধীন। তাছাড়া, রাজনৈতিক বিবেচনায় উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগ এবং জেষ্ঠতা লংঘন করে বিচারপতি নিয়োগ প্রদানের অপসংস্কৃতি এখনো বিদ্যমান রয়েছে। কোন প্রকার স্বচ্ছতা ছাড়া শুধুমাত্র রাজনৈতিক বিবেচনায় মামলা প্রত্যাহার নিয়মিত ব্যাপার। সর্বোপরি, শুধুমাত্র রাজনৈতিক বিবেচনায় রাষ্ট্রপতি কর্তৃক সাজাপ্রাপ্ত খুনের আসামীকে ক্ষমা প্রদর্শনের মাধ্যমে আইনের শাসনও প্রশ্নবিধ্য।

(২৪) বিচারহীনতা ও দায়হীনতার সংস্কৃতি:

যদিও বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন করে বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবর রহমানের স্বঘোষিত খুনিদের সাজা কার্যকরের মাধ্যমে বিচারহীনতা ও দায়হীনতার সংস্কৃতি থেকে রেরিয়ে আসার একটি প্রক্রিয়া দেখা যায়, কিন্তু নির্যাতন, বিনা বিচারে হত্যাকা-ও গুমের ঘটনাসমুহের কোন নিরপেক্ষও স্বাধীন তদন্ত হয়নি। বিভাগীয় তদন্ত হলেও তার ফাইন্ডিংসগুলো জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয়নি এবং এখন পর্যন্ত কাউকে সাজা প্রদান করা হয়নি।

(২৫) যৌন সম্পর্ক ও যৌন আচরণ সম্পর্কিত:

সরকার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের যৌন আচরণ সম্পর্কিত বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদানের অংগীকার করলেও সে সম্পর্কে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দৃশ্যমান হয়নি। হিজরাদের সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও সাংবিধানিকভাবে তাদের তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের বিষয়টি বরাবর উপেক্ষিত থেকে গেছে।

(২৬) মানবাধিকার কর্মীদের রক্ষা:

মানবাধিকার কর্মী ও সাংবাদিকের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার অংগীকার করলেও তাদের উপর আক্রমন, ভয় ভীতি প্রদর্শন, হুমকি, হয়রানী ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারি কর্তৃক অসহযোগীতার মনোভাব, আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা-কর্মী কর্তৃক আক্রমন, মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে হয়রানী একটি নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে। জাতিসংঘ মানবাধিকার কর্মী অধিকার ঘোষনাপত্র অনুযায়ী মানবাধিকার কর্মী অধিকার সুরক্ষায় আইন প্রনয়নের ব্যাপারে সরকার এখনো কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেনি।

(২৭) দারিদ্র বিমোচন:

দারিদ্র বিমোচনে সরকার নীতিগত পরিকল্পনা গ্রহন করলেও তা বাস্তবায়নের তেমন কোন কার্যকর অগ্রগতি চোখে পড়ে না।

(২৮) খাদ্যের অধিকার:

খাদ্য অধিকার নিশ্চিত করণে সরকার কৃষকবান্ধব কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও খাদ্যের লাগামহীন উচ্চমূল্য ও ভেজাল খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির সম্মুখীন করেছে।

(২৯) স্বাস্থ্যের অধিকার:

সারা দেশে কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করলেও সরকার এখন পর্যন্ত জাতীয় স্বাস্থ্য নীতি চুড়ান্ত করেনি।

(৩০) শিক্ষার অধিকার:

সরকার একটি অসাম্প্রদায়িক শিক্ষা নীতি গ্রহণ করেছে। সবার জন্য সমন্বিত অসাম্প্রদায়িক শিক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও মাদ্রাসা শিক্ষার মত সাম্প্রদায়িক শিক্ষা খাতে আর্থিক বরাদ্ধ চলমান রেখে অসামঞ্জস্যের সৃষ্টি করেছে।


(৩১) পার্বত্য শান্তি চুক্তির বাস্তবায়ন:

সরকারের প্রাথমিক পর্যায়ে পার্বত্য শান্তি চুক্তির বাস্তবায়নে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও ভুমি সমস্যা সমাধানে কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।

(৩২) বিভিন্ন সনদের অধীনে প্রতিবেদন প্রদান:

বাংলাদেশ সিডও কমিটির নিকট প্রতিবেদন প্রেরণ করেছে। কিন্তু সিডও তে সংরক্ষিত ধারাগুলো থেকে সংরক্ষণ প্রত্যাহারের কোন প্রতিশ্র“তি প্রদান করেনি। এমনকি সিডও কে জাতীয় আইনে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য কোনো উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপও গ্রহণ করেনি।

(৩৩) পরিবেশ বিপর্যয় মোকাবেলা:

কিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনায় ক্ষমতার অপব্যবহার করে পরিবেশ বিপর্যয় মোকাবেলা কার্যক্রম পরিচালনায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে অর্থ বরাদ্ধের ক্ষেত্রে অনিয়ম করায় ঝুকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী বঞ্চনার শিকার হয়েছে।

(৩৪) নাগরিক সমাজের সাথে সংলাপ:

কমনওয়েলথ সচিবালয়ের সহযোগিতায় সরকার ফেব্র“য়ারি ২০১১ তারিখে নাগরিক সমাজের সাথে ফলো-আপ সেমিনারের আয়োজন করে। কিছু ক্ষুদ্র পর্যায়ের পদক্ষেপ ছাড়া সরকার ইউপিআর ফলশ্র“ত শুপারিশসমুহ বাস্তবায়নে নাগরিক সমাজের সম্পৃক্ততার ব্যাপারে কোনো উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।