ক্যাটেগরিঃ চারপাশে

তুই মুচির ছেলে, তোর চাকুরী হবে না !!!১ চাকুরী প্রার্থী এক যুবকের প্রতি এ ধরনের দম্ভোক্তি করেন সাতীরার কলারোয়া উপজেলার জালালাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান।

দু’নম্বর থালা বাসন নেই, খাবার দেওয়া যাবে না !!!২ রাজশাহীর তানোর উপজেলার মুন্ডুমালা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিকের সংগে ৭ জুন ২০১০ ইং তারিখ কানোর উপজেলা সদরে এক রেস্টুরেন্টে এ আচরন করা হয়। তাছাড়া, তানোর ডিগ্রি কলেজ ছাত্রাবাসে থালাবাসন আলাদা করে দেওয়ায় ১১ জন সাঁওতাল ছাত্র ছাত্রাবাস ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়।

তোরা ছোট জাতের লোক, বেরিয়ে যা …..!!!৩ গত ২৯ মার্চ ২০১০ ইং তারিখে যশোরের মনিরামপুর উপজেলার ভোজগাতি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও অন্যান্য শিক্ষকরা উক্ত স্কুলের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান থেকে দলিত সম্প্রদায়ের ৭০ জন শিক্ষার্থীকে বের করে দেন।

উল্লেখিত তিনটি ঘটনার মত অজস্র বৈষম্যমূলক নিষ্পেষণের ঘটনা এ সমাজে এখনো ঘটে চলেছে যা পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয় না বলে আমাদের দৃষ্টির অগোচরে থেকে যায়। মহান মুক্তি যুদ্ধের ৪০ বছর পরও আমরা এ সমাজ থেকে জাত-পাত ও পেশা ভিত্তিক বৈশম্য দুর করতে পারিনি। দেশের দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর ৫৫ ল মানুষ এ দেশের নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও এখনো প্রতিনিয়ত জাত-পাত ও পেশা ভিত্তিক বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। শুধুমাত্র জাত-পাত ভিত্তিক পরিচয়ের কারনে তারা সামাজিকভাবে বঞ্চনার শিকার হয় এবং সামাজিকভাবে অবহেলিত কতগুলো নির্দিষ্ট পেশা গ্রহনে তাদেরকে বাধ্য করা হয়। যদিও আমাদের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সকল নাগরিককে সমান, ২৮ অনুচ্ছেদে সকল প্রকার বৈষম্যকে নিষিদ্ধ করা এবং ২৯ অনুচ্ছেদে কর্মক্ষেত্রে সকলের সম-অধিকার ঘোষনা করা হয়েছে। তাছাড়া, সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষনা পত্রের ৭ নং ধারা, নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তির ২ নং ধারা এবং সকল প্রকার বৈষম্য বিরোধী আন্তর্জাতিক চুক্তির ১৯ নং ধারার জাত-পাত ভিত্তিক সকল বৈষম্য সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

মহান সংবিধান ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক অইন অনুযায়ী জাতি, ধর্ম, বর্ন ও জন্মগত পরিচয় নির্বিশেষে সকল মানুষকে সমান অধিকার ও মর্যাদা প্রদানের ঘোষনা থাকলেও এ দেশের দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জনগন এখনো হোটেল-রেস্টুরেন্ট, সেলুনসহ পাবলিক প্লেসসমূহে প্রবেশের সময় অলিখিত বাঁধার সম্মূখীন হয়ে থাকে।

এতদ্বসত্ত্বেও দলিতদের বিরুদ্ধে বৈষম্য নিরসন এবং তাদের সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করতে ও মানবাধিকার সুরায় সরকারের প থেকে কোনোরূপ কার্যকরী ব্যবস্থা বা পদক্ষেপ গ্রহনের উদ্যোগ দেখা যায়না। যদিও এবারের বাজেট বক্তৃতায় মাননীয় অর্থমন্ত্রী দলিত জনগোষ্ঠীর কথা উল্যে­খ করে তাদের সামাজিক সুরায় সামন্য পরিমান অর্থ বরাদ্ধ করেছে। দলিত নারীরা পুরুষের দ্বিগুন বৈষম্যের শিকার হয় এবং এখনো তাদের পে মতায়নের মাধ্যমে দেশ ও সম্প্রদায়ের সামাজিক-সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি সক্রিয় ভূমিকা রাখা সম্ভবপর হয়নি। এক্ষেত্রে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা বিদ্যমান, যা দলিত সম্প্রদায়ের মৌলিক মানবাধিকার রার অধিকার ও সমান সুযোগের অধিকারকে প্রভাবিত করে। বিশেষত শিা প্রাপ্তির সুযোগের অভাব একটি বড় বিষয়। এ ছাড়া রয়েছে দারিদ্র্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং বাসস্থান সমস্যা, কর্মক্ষেত্রে অসম সুযোগ, নারীদের প্রতি বৈষম্য, দাসশ্রম এবং শিশুশ্রম। দলিতদের তাদের নিজস্ব এলাকার বাইরে বসবাসের জন্য কোনো ঘর ভাড়া করতে বা গৃহ নির্মাণ করতে দেওয়া হয় না। দলিত নয় এমন কোনো সম্প্রদায়ের মন্দির বা ধর্মানুষ্ঠানেও তাদের যেতে দেয়া হয় না। এমনকি চায়ের বা খাবারের দোকানে, কারো বাড়িতে, খেলার মাঠে, সিনেমা হলে, মৃতদেহ সৎকারের জায়গায়, কোনো সামাজিক অনুষ্ঠান বা সঙ্গীতানুষ্ঠানে বা কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে দলিতদের প্রবেশ অলিখিতভাবে নিষিদ্ধ বলে গণ্য করা হয়। দলিতরা কখনও কখনও চরমভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়, যেমন অপহরণ, ধর্ষণ, অত্যাচার, বসতবাড়ি উচ্ছেদ ও ধ্বংস, জোরপূর্বক অবৈধভাবে জমির অধিকার হরণ, জমি হতে উচ্ছেদ, ভয়-ভীতি প্রদর্শন ।

দলিত জনগোষ্ঠির মানবাধিকার সুরায় সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে সরকারকে এখুনি কারিগরি সহযোগিতা ও সুনির্দিষ্ট আইনগত উদ্যোগ নিতে হবে। এজন্য অবিলম্বে দলিতসহ অন্যান্য বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর প্রতি বিদ্যমান সামাজিক বৈষম্য ও অস্পৃশ্যতা চর্চাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ ঘোষনা করে উপযুক্ত আইন প্রণয়ন করতে হবে।

১ দৈনিক সমকাল, নভেম্বর ১৫, ২০১১ ইং।
২ দৈনিক প্রথম আলো, জুলাই ০৪, ২০১১ ইং।
৩ দৈনিক প্রথম আলো, এপ্রিল ০৩, ২০১০ ইং