ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচারঃ প্রেক্ষিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বিগত কয়েক শতকে সংঘটিত হয়েছে মানব ইতিহাসের জঘন্যতম ঘটনাসমূহ। গত কয়েক দশকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ২৫০ টির ও বেশী যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। এতে ০৬ মিলিয়নেরও বেশী মানুষ মৃত্যু বরণ করেছে। যার অধিকাংশ নারী ও শিশু। ১৭০ মিলিয়নের ও বেশী মানুষ তাদের সহায় সম্পত্তি ও মান সম্মান হারিয়েছে। যুদ্ধের ভয়াবহতার বেশিভাগ কথা আমরা ভুলে গেছি। যদিও গুটি কয়েক যুদ্ধাপরাধীকে আমরা বিচারের সম্মুখীন করতে পেরেছি তবে অধিকাংশ অপরাধী ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছে ।

যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ও গণগত্যাকে সংজ্ঞায়িত করে অনেক আইন ও নীতিমালা প্রনয়ণসহ নানারককম আন্তর্জাতিক চুক্তি ও প্রোটোকল প্রণীত হওয়া সত্ত্বেও তা বাস্তবে প্রয়োগে ব্যর্থ হয়। ভবিষ্যৎ স্বৈর শাসক, তাদের কর্মকর্তা, সেনাবাহিনী ও তাদের দোসরদের মানবাধিকার বিরোধী অপরাধ থেকে নিবৃত করার জন্য একটি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। তাই একটি অব্যর্থ প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৯৮ সালের ১৫ জুন থেকে ১৭ জুলাই পর্যন্ত ইতালির রোম নগরে সমগ্র বিশ্বের ১২০ টি দেশের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি কুটনীতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় এবং ১২০-৭ ভোটির বিপূল ব্যবধানে গৃহীত হয় রোম সংবিধি এবং প্রতিষ্ঠিত হয় আন্তজাতিক অপরাধ আদালত। পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক রাষ্ট্র কর্তৃক সংবিধিটি অনুমোদিত হওয়ায় ২০০২ সালের ১ জুলাই থেকে আন্তজাতিক অপরাধ আদালত কার্যকারিতা লাভ করে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত কোন রাষ্ট্র বা ব্যক্তির দ্বারা সংঘটিত জঘন্যতম অপরাধসূমহের বিচার করে থাকে। বিশেষতঃ গণহত্যা, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং যুদ্ধাপরাধ সংক্রান্ত অপরাধসূমহ এ আদালত সরাসরি আমলে নিয়ে বিচারকার্য সম্পন্ন করতে পারে। কোন প্রকার বিভ্রান্তি বা অস্পষ্টতা এড়ানোর জন্য রোম সংবিধিতে খুব সতর্কতার সাথে এই অপরাধগুলো সংজ্ঞায়িত ও সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে রোম সংবিধিতে আন্তজাতিক অপরাধসূমহের নতুন কোন সংজ্ঞা প্রনয়ণ করা হয় নি। বরঞ্চ প্রচলিত এবং প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে রাষ্ট্রসূমহ কর্তৃক ইতোমধ্যে গৃহীত ও স্বীকৃত অপরাধগুলোকে সংবিধিতে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে।

রোম সংবিধি মতে গণহত্যা বলতে বোঝায় সেইসব নিষিদ্ধ কাজসমূহ (যেমন-হত্যা, মারাত্মক আঘাত প্রদান ইত্যাদি) যা কোন নির্দিষ্ট দেশের, বর্নের, ধমের বা জাতির জনগণকে সম্পূর্ন বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার অভিপ্রায়ে সংঘটিত হয়। মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ বলতে সে সকল অপরাধসূমহকে বোঝায় যা সাধারণ নিরস্ত জনেগনের বিরুদ্ধে এবং সুবিস্তৃত ও পরিকল্পিত আক্রমনের অংশ হিসেবে ( খুন, হত্যা, ধর্ষণ, যৌন দাসত্ব, জোরপূর্বক গুম করা এবং বণৃ বৈষম্য করা) সংঘটিত হয়। যুদ্ধাপরাধ হলো ১৯৪৯ সালের জেনেভা কনভেনশনের মারাত্মক লংঘন অথবা যুদ্ধের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রীতিনীতির চরম লংঘণ। যুদ্ধাপরাদ আন্তর্জাতিক বা আভ্যন্তরীন যুদ্ধে সংঘটিত হতে পারে। গণহত্যা ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধসূমহ শান্তিকালীন অবস্থা বা যুদ্ধ চলাকালীন অবস্থা অর্থাৎ যখনি সংঘটিত হক না কেন তা প্রমানিত হলে দোষী ব্যক্তিকে অবশ্য শাস্তি পেতে হবে।

রোম সংবিধিতে যৌন নিপীড়ন মূলক অপরাধসমূহ যথাঃ ধর্ষণ, যৌন দাসত্ব, পতিতাবৃত্তি ও গর্ভধারনে বাধ্য করা ইত্যাদি অপরাধসূমহকে অন্তর্ভূক্ত করে শাস্তিযোগ্য বলে হন্য করা হয়েছে। এই কাজগুলোর কোন একটি বা একাধিক যখনই কোন স্থানে সুপরিকল্পিত ও সুবিস্তৃত ভাবে সাধারণ জনতার বিরুদ্ধে আক্রমনের অংশ হিসেবে সংঘটিত হয়, তা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ বলে গন্য করা হয়। তা আন্তর্জাতিক যুদ্ধ ও অভ্যন্তরীন যুদ্ধে সমানভাবে প্রযোজ্য হয়।

ভীত সন্ত্রস্ত ভিকটিম ও সাক্ষীদের সাহায্য করার জন্যে আন্তজাতিক অপরাধ আদালত একটি ভিকটিম ও সাক্ষী ইউনিট গঠন করে। এই ইউনিট ভিকটিম ও সাক্ষীদের নিরাপত্তার জন্যে প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থাসহ তাদের কাউন্সেলিং প্রদান ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে। তবে এক্ষেত্রে অবশ্য অভিযুক্তের সকল আইনগত অধিকারগুলো মাথায় রেখে এসব ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়ে থাকে। আদালত ভিক্টিম ও সাক্ষীদের গোপনীয়তা, মানসিক ও শারীরিক সুস্থতা এবং নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রাখে। বিশেষ করে যে সকল বিচারের বিষয়ে যৌন বা লিঙ্গ ভিত্তিক অপরাধের সংশ্লিষ্টতা থাকে সেসব ক্ষেত্রে কঠোর গোপনীয়তা অবলম্বন করা হয়ে থাকে।

আদালত নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে ভিকটিমের আর্থিক ক্ষতিপূরন প্রদান ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে পারে। অপরাধী ব্যক্তির নিকট থেকে আদায়কৃত জরিমানা ও সম্পত্তি বায়েজাপ্ত করে ট্রাস্ট গঠনের মাধ্যমে জমাকৃত অর্থ দ্বারা ভিক্টিমের আর্থিক ক্ষতিপূরন প্রদান ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে।

অভিযুক্ত ব্যক্তি যেই হক না কেন, সংঘটিত অপরাধের দায় সবার উপর সমভাবে বর্তাবে। এক্ষেত্রে তার সামাজিক অবস্থান, রাষ্ট্রীয়, ধর্মীয় বা সামাজিক পদ মর্যাদা কোন বাধা বলে গন্য হবে না। তা সে কোন রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান অথবা সংসদ সদস্য বা নির্বাচিত প্রতিনিধি বা সাধারন নাগরিক হক না কেন। আর কোন অভিযুক্ত ব্যক্তির পদমর্যাদার কারনে আদালত প্রদত্ত শাস্তির পরিমান কম বা বেশী করবে না। কোন ক্ষেত্রে যদি কোন ব্যক্তি তার উদ্ধতম কর্তৃপক্ষের নির্দেশে কোন অপরাধ করে থাকে তবে সে এ অপরাধের দায় থেকে মুক্ত হতে পারে। কিন্তু একজন কমান্ডার তার অধস্তন কর্তৃক সংঘটিত সকর অপরাধের দায় বহন করবে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে উচ্চ নৈতিক চরিত্র, পক্ষপাত হীনতা, সততা ও পেশাদারী যোগ্যতাসম্পন্ন, ১৮ জন বিচারকের সমন্ময়ে গঠিত হয়। তাছাড়া বিচারকদের অবশ্য তাদের নিজ দেশে উচ্চতম বিচার বিভাগীয় পদে নিয়োগ লাভের যোগ্যতা থাকা আবশ্যক। প্রত্যেক বিচারকের ফৌজদারি াাইন ও বিচার পদ্ধতি সম্পর্কে সম্মক ধারনা ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রাসঙ্গিক দিক বিশেষতঃ আন্তজাতিক মানবাধিকার বিষযে সম্মক জ্ঞানের অধিকারী হবেন। আদালতের সত্যিকার আন্তর্জাতিক ও সুষম গঠনের নিশ্চিত করার জন্য পৃথিবীর প্রধান প্রধান বিচার ব্যবস্থাগুলোর প্রতিনিধিত্ব, সমতার ভিত্তিতে ভৌগলিক প্রতিনিধিত্ব ও নারী – পুরুষ বিচারকের মধ্যে সমান প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হবে। পক্ষ রাষ্ট্রসমূহের দুই-তৃতীয়াংশের উপস্থিতিতে গোপন ব্যালটের ভিত্তিতে প্রতিটি রাষ্ট্র থেকে সর্বোচ্চ একজন বিচারক ৯ বছরের জন্য নির্বাচিত হবেন।

আন্তজাতিক অপরাধ আদালতে কোন অপরাধের বিচার করতে হলে অবশ্য সংশ্লিষ্ট দেশকে এ আদালতের পক্ষভুক্ত হতে হবে অথবা সাময়িকভাবে উক্ত দেশকে এ আদালতের এখতিয়ার মেনে নিতে হবে। তবে যদি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক মামলাটি প্রেরিত হয়ে থাকে সেক্ষেত্রে রোম সংবিধির পক্ষভুক্ত নয় এমন রাষ্ট্রের নাগরিকেরও এ আদালতে বিচার করা যাবে। তবে এ ক্ষেত্রে এরূপ অপরাধের বিচার রাষ্ট্রীয় আদালতে করা সম্ভব নয় বা রাষ্ট্রের বিচার বিভাগ তা নিষ্পত্তি করতে আগ্রহী নয় বলে প্রতীয়মান হতে হবে।

কোন অপরাধ সংঘটিত হয়েছে এ রকম পর্যাপ্ত প্রমান সাপেক্ষে একজন স্বাধীন প্রসিকিউটর ঘটনার তদন্ত শুরু করবে। তবে কোন দেশ যদি একটি ঘটনার বিচার করতে সমর্থ ও ইচ্ছুক বলে প্রতীয়মান হয়, তবে সেক্ষেত্রে সেদেশের নিজস্ব তদন্তকার্য শুরু করা পর্যন্ত প্রসিকিউটরকে অপেক্ষা করতে হবে। তদনত শুরু করার আগে প্রসিকিউটরকে অভিযোগ বিষয়ক সকল তথ্য ও সহায়ক প্রমানাদি জমা দিয়ে প্রি-ট্রয়াল চেম্বার (তিন সদস্য বিশিষ্ট আদালতের প্রথম স্তর) হতে অনুমতি যোগার করতে হয়। রাষ্ট্র পক্ষসূমহের সম্মলিত গোপন ব্যালটের মাধ্যমে প্রসিকিউটর নির্বাচন করতে হয়। প্রসিকিউটর হতে হলে তাকে অবশ্যই উন্নত নৈতিক চরিত্রের অধিকারী, ফৌজদারী মামলা চালানোর মত প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও অভিঞ্জতা থাকতে হয়।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত মানবাধিকারের মান সমুন্নত রেখে মৃত্যুদন্ড ব্যতীত অপরাধের মাত্রানুযায়ী ৩০ বছর পর্যন্ত কারাদন্ড প্রদান করতে পারে । এছাড়া এ আদালত জরিমানা ধার্য ও সংশ্লিষ্ট অপরাধের মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ বা সম্পত্তি বায়েযাপ্ত করার নির্দেশ প্রদান করতে পারে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের পক্ষভুক্ত কোন রাষ্ট্র পক্ষের সীমানার মধ্যে সংঘটিত অপরাধ, পক্ষরাষ্ট্রের অভিযুক্ত নাগরিক ও নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক প্রেরিত যে কোন অপরাধের বিষয়ে এ আদালত তার এখতিয়ার প্রয়োগের মাধ্যমে বিচার কার্য সম্পন্ন করতে পারে। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আইনজীবী নিয়োগসহ আত্বপক্ষ সমর্থনের যথাযথ সুযোগ প্রদান করা হয়ে থাকে। শাস্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে আদালতে হাজির করার জন্য আদালত সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রকে অনুরোধ করতে পারে এবং অনুরোধপ্রাপ্ত দেশ তা মেনে চলতে বাধ্য। অন্যথায় তা আন্তর্জাতিক আইনের লংঘন বলে গন্য হবে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত জাতীয় আদালতের উপর কোন হস্তক্ষেপ করতে পারে না। বরঞ্চ জাতীয বিচার ব্যবস্থাকে জোরদার করে থাকে। কেননা রোম সংবিধিতে উল্লেখিত সবগুলো অপরাধের ক্ষেত্রে বিচারের প্রথম প্রথম দায়িত্ব জাতীয় আদালতের এবং জাতীয় আদালত সে অপরাধের তদন্ত ও বিচার করবে। শুধুমাত্র যে সকল রাষ্ট্র উক্ত অপরাধের বিচার বিচার করতে অপারগ ও আগ্রহী নয় সেসকল অপরাধের বিচার করবে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত। এছাড়া, অভিযুক্ত ও মামলায় আগ্রহী রাষ্ট্র আদালতের এখতিয়ার বা মামলার গ্রহণযোগ্যতা চালেঞ্জ করতে পারবে এবং মামলার রায় যদি মনঃপুত না হয় তবে তারা রায়ের বিরুদ্ধে আপীল করতে পারবে।

মূলঃ এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট।