ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

কাজ করতে এসে লাশ হলো শিশু কেয়া:১ দু’মুঠো ভাতের জন্য গৃহ পরিচারিকার কাজ করতে এসে খুন হয়েছে ৮ বছরের শিশু ফরমিন আক্তার কেয়া। গত ৫ জুন ২০১২ ইং তারিখে রাজধানীর দনিখানে মসজিদ রোডের রওশন ম্যানশনের সামনের রাস্তা থেকে কেয়ার লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তার মাথায় জখমের চিহ্ন। ওই ভবনের পাঁচতলার একটি ফাটে সে কাজ করত। এলাকাবাসীর ধারনা তাকে ধর্ষন করে হত্যা পর সেখান থেকে নিচে ফেলে দেওয়া হয়।

শুধু কেয়া নয়, গৃহকর্মে নিয়োজিত কেয়ার মত হাজার হাজার শ্রমিকের জীবনে বঞ্চনার পাশাপশি প্রতিনিয়ত অবর্ণনীয় অত্যাচার ও নির্যাতন সহ্য করতে হয়, যাদের দুর্ব্যবহার প্রাপ্তি, যৌন নিপিড়ন, হত্যা, নির্মম প্রহার, নখ তুলে ফেলা, বৈদুতিক শক, গরম কুন্তি বা ইস্ত্রি রা গরম পানি ঢেলে দিয়ে শরীরের বিভিন্ন অংগ পুড়িয়ে দেওয়া নিত্য নৈমত্তিক ব্যপার, যার অধিকাংশ পত্র পত্রিকায় আসে না বলে আড়ালেই থেকে যায়। দারিদ্রের চরম শিকার এই শ্রমিকরা সবচেয়ে সহজলভ্য এই কাজকে তাদের জীবিকার জন্য বেছে নেয়, যারা অধিকাংশ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বঞ্চিত নারী ও শিশু।

২০১১ সালের প্রকাশিত ১০ টি জাতীয় পত্রপত্রিকার প্রতিবেদন থেকে দেখা যায় যে, সারা দেশে ৮১ জন গৃহ শ্রমিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এসময় রহস্যজনক ও কথিত অসুস্থতার জন্য ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ছাদ থেকে ফেলে দিয়ে হত্যা করা হয়েছে বা নির্যাতন সহ্য না করতে পেরে ছাদ থেকে লাফ দিয়ে আত্বহত্যা করেছে ১৮ জন গৃহ শ্রমিক। তাছাড়া, বিদ্যুৎ স্পর্শ ও অগুনে পুড়িয়ে মারা হয়েছে ৪ জনকে এবং ২৭ জন নির্যাতনে শারীরিকভাবে আহত হয়েছে। একই সময় গৃহকর্তার অনৈতিক সম্পর্কে অন্তসত্ত্বা হয়েছে ৩ জন এবং গৃহকর্তা ও তার পরিবারের সদস্যদের দ্বারা ধর্ষন ও ধর্ষন চেষ্টার শিকার হয়েছে ৫ জন গৃহ শ্রমিক।

গৃহশ্রমিকদের অধিকার ও সুরার বিষয়টি অনেকবার আলোচনায় উঠে আসলেও তা বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক মানবাধিকার এমনকি শ্রমিক আন্দোলনেও যথাযথভাবে প্রাধান্য পায়নি। তাই বিষয়টি নীতিনির্ধারণী মহলে কার্যকর মনোযোগ আকর্ষন করতে সম হয়নি, ফলে তারা অধিকার বঞ্চিত হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। যদিও আমাদের সংবিধানের ১৪, ১৫, ১৭, ২৮, ৩৪ ও ৩৬ নং অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে গৃহ-শ্রমিকদের অধিকার সুরতি আছে। কিন্তু শুধু গৃহশ্রমিকদের জন্য নির্দিষ্ট কোন আইন বা নীতিমালা নেই। শ্রমিকদের অধিকার বিষয়ক শ্রম আইন, যা ২০০৬ সালে প্রনীত হযেছে, সেখানেও গৃহশ্রমিকদের অধিকার উপেতি হয়েছে। এমন কি গৃহশ্রমিকদের শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতিও দেওয়া হয়নি। ফলে তারা কর্মক্ষেত্রে নানা রকম অনিয়ম, নিপীড়ন, নির্যাতন ও বঞ্চনার শিকার হলেও তার কোন সঠিক প্রতিকার পায় না।

১৯৬১ সালে গৃহশ্রমিকদের রেজিষ্ট্রেশন সংক্রান্ত একটি অর্ডিন্যান্স প্রনীত হয়েছিল। কিন্তু সময়ের প্রয়োজনে এবং সরকারের উদ্যোগের অভাবে তার সুফল থেকে গৃহশ্রমিকেরা বঞ্চিত হয়েছে। তাছাড়া, সরকার ২০১০ সালে গৃহশ্রমিক সুরা ও কল্যান নীতিমালার খসড়া প্রনয়ন করলেও এখন তা চুড়ান্ত করেনি। গত ১৬ জুন ২০১১ ইং তারিখে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ১০০ তম সাধারন সম্মেলনের অধিবেশনে গৃহশ্রমিকের অধিকার সংক্রান্ত আইএলও কনভেনশন ১৮৯ গ্রহন করেছে। আইএলও-এর সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের এ কনভেনশন অনুমোদন করে গৃহশ্রমিকের সুরা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তাই সময়ের প্রেেিত ও আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিবেচনায় গৃহশ্রমিকদের অধিকার সুরায় নতুন আইন, নীতিমালা ও আচরন বিধি প্রনয়ন এখন সময়ের দাবী।

১. দৈনিক ইত্তেফাক, জুন ০৬, ২০১২ ইং।