ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

গৃহশ্রমিক, যার দিন শুরু হয় ভোরের পাখি ডাকার সাথে সাথে আর দিন শেষ হয় পৃথিবীর সব কোলাহল স্তব্দ হলে। যে বাড়ীর সবার আগে ঘুম থেকে উঠে, আবার সবার পড়ে ঘুমাতে যায়। যে সবার জন্য খাবার ব্যবস্থা করে, কিন্তু সবার খাওয়া শেষে অবছিষ্ট খেয়ে ক্ষুধা নিবারন করে। তার পরও একটুতেই আছে গৃহকর্তৃর বকা-ঝকা, মারপিট এবং গৃহকর্তা ও তার আত্বীয় স্বজনের যৌন নির্যাতন। কিন্তু প্রতিকারের কেউ নেই, সবই যেন এদের নিয়তি। আইন, আদালত, সমাজ, রাষ্ট্র সব দেখে শোনে কিন্তু নিশ্চুপ।

প্রকৃতির নিয়মেই আজ গৃহশ্রমিকের জেগে উঠার সময় হয়েছে। বর্তমান আর্থ-সামাজিক বিবেচনায় গৃহশ্রমিকদের জন্য আইন, নীতিমালা, আচরণবিধি প্রণয়নের সময় হয়েছে। সারা বিশ্বের অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমখাতের এই বিপুল সংখ্যক শ্রমিকের কাজকে শোভনীয় করার লক্ষে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। গত ১৬ জুন ২০১১ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এর সাধারণ সম্মেলনের ১০০ তম অধিবেশনে গৃহশ্রমিকদের শোভন কাজ সংক্রান্ত কনভেনশন [কনভেনশন ১৮৯, গৃহশ্রমিক কনভেনশন ২০১১] গৃহীত হয়েছে।

আইএলও কভেনশন ১৮৯ এর অনুচ্ছেদ ৩ এ বলা হয়েছে-

১। প্রত্যেক সদস্য রাষ্ট্র এই কনভেনশনে বর্ণিত সকল গৃহশ্রমিকের মানবাধিকারের কার্যকর সুরক্ষা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
২। প্রত্যেক সদস্য রাষ্ট্র গৃহশ্রমিক সম্পর্কিত এই কনভেনশনে বর্ণিত কর্মেক্ষেত্রের মৌলিক নীতি ও অধিকারসমূহকে মেনে চলা, উন্নীত করা ও স্বীকৃতি দানের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করবে, যেমন-
–সংগঠনের স্বাধীনতা এবং যৌথ দর কষাকষির অধিকারের কার্যকর স্বীকৃতি;
–সকল প্রকার জবরদস্তিমূলক ও বাধ্যতামূলক শ্রম নির্মূল করা;
–শিশুশ্রমকে কার্যকরভাবে নিরসন করা;
–চাকরি ও পেশার সাথে সম্পর্কিত সকল প্রকার বৈষম্য দূর করা।
৩। গৃহশ্রমিক ও গৃহশ্রমিক নিয়োগকারীদের সংগঠনের স্বাধীনতা এবং যৌথ দর কষাকষির অধিকারের কার্যকর স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে, সদস্য রাষ্ট্রসমূহ গৃহশ্রমিক ও গৃহশ্রমিক নিয়োগকারী সংগঠন প্রতিষ্ঠা, এবং সংগঠনের বিধান অনুয়ায়ী সংগঠন, ফেডারেশন এবং কনভেনশনে নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী যোগদান করার অধিকার সুরক্ষিত করবে।

কভেনশনের অনুচ্ছেদ ৪ এ বলা হয়েছে-

১। প্রত্যেক সদস্য রাষ্ট্র ন্যূনতম বয়স সংক্রান্ত কনভেনশন, ১৯৭৩ (নং ১৩৮), এবং অত্যন্ত খারাপ ধরনের শিশু শ্রম সংক্রান্ত কনভেনশন, ১৯৯৯ (নং ১৮২) এর সাথে সঙ্গতি রেখে গৃহশ্রমিকদের জন্য একটি ন্যূনতম বয়সসীমা নির্ধারণ করবে; এবং এই ন্যূনতম বয়স সাধারণভাবে শ্রমিক সংক্রান্ত রাষ্ট্রীয় আইন ও বিধিবিধানে বর্ণিত বয়সের চেয়ে কম হবে না।

২। প্রত্যেক সদস্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা বিশ্চিত করবে যেন অনুর্ধ্ব ১৮ বছরের গৃহশ্রমিক এবং ন্যূনতম বয়সের চেয়ে বেশি বয়সি গৃহশ্রমিকদের বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, অথবা উচ্চশিক্ষা বা বৃত্তিমূলক (ভকেশনাল) প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়।

অনুচ্ছেদ ৫ এ রয়েছে-

প্রত্যেক সদস্য রাষ্ট্র গৃহশ্রমিকদের সকল প্রকার নিপীড়ন, হয়রানি ও সহিংসতা থেকে সুরক্ষিত রাখতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করবে।

অনুচ্ছেদ ৬ এ উল্লেখ করা হয়েছে-

প্রত্যেক সদস্য রাষ্ট্র অন্যান্য সাধারন শ্রমিকের ন্যায় গৃহশ্রমিকেরাও যেন চাকরির ন্যায়সঙ্গত শর্তাদি ও শোভন কার্মপরিবেশ ভোগ করতে পারে, এবং যদি তাদেরকে নিয়োগকারীর গৃহে বসবাস করেত হয় তবে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করে শোভন পরিবেশে থাকতে পারে সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে।

ইতোমধ্যেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গৃহশ্রমিকদের অধিকার রায় আইন প্রণীত হয়েছে এবং হচ্ছে। আমাদের পার্শবর্তী দেশ ভারত কেন্দ্রীয়ভাবে গৃহশ্রমিক অধিকার (সুরক্ষা) আইন ২০০৮ প্রণয়ন করেছে। সিঙ্গাপুরে আইন ছাড়াও সম্প্রতি গৃহশ্রমিকদের জন্য সপ্তাহে এক দিন ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।

গৃহশ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করতে এই কনভেনশন একটি আন্তর্জাতিক দলিল। কনভেনশনে স্বারকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সরকারের এটা অনুমোদন ও অনুসরণ করার বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। সুতরাং আমাদের প্রত্যাশা সরকার দ্রুত আইএলও কনভেনশন ১৮৯ অনুমোদন করবে। শুধু অনুমোদন নয়, এই কনভেনশনে গৃহশ্রমিকদের যে সকল অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে তা নিশ্চিত করতে সরকারকে অতি সত্ত্বর কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

আইএলও কনভেনশন ১৮৯ অনুসারে গৃহশ্রমিকদের সকল অধিকার নিশ্চিত করতে নীতিমালা ও আইন প্রণয়ন আবশ্যক। আমাদের দেশে একটি খসড়া নীতি মালা প্রণীত হয়েছে তাও প্রায় তিন বছর আগে। কিন্তু সেটি এখনো আলোর মুখ দেখেনি। আমরা দাবী জানাচ্ছি যত দ্রুত সম্ভব গৃহকর্মে নিয়োজিত কর্মীদের জন্য প্রণীত খসড়া নীতিমালার অনুমোদন এবং তা বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক। আধুনিক পৃথিবীতে আধুনিক শ্রমদাসত্বের শিকার এই গৃহশ্রমিকদের সকল প্রকার শোষণ নির্যাতন ও বঞ্চনা মুক্তির প্রধান দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে।