ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি, হুমায়ূন আহমেদ স্মরণে

তীব্র শীত, কুয়াচ্ছন্ন আকাশ, পূর্নিমা রাত। রাত ১১.০০ টায় মেসের গেট তালা বদ্ধ করে মালিকের হাতে চাবি কুক্ষিগত। এখন কি হবে? আজ যে জোস্না দেখতেই হবে নদীর বুকে ডিংগি নৌকায় শুয়ে। কি আর করা পাঁচ তলার বেলকনির গ্রীল একটু ফাক ছিল। সেই ফাঁককে আর একটু বড় করে উত্তর বঙ্গের তীব্র শীত উপেক্ষা করে প্রাণ নিজ হাতে নিয়ে চুপি চুপি পাইপ বেয়ে নিচে নামা এবং মেসের বাহির হওয়া। শরীরে পকেট বিহীন শুধু একটা হলুদ পাঞ্জাবী। শীতে থর থর করে কাপছি। পায়ে জুতো নেই বলে ঠান্ডায় সবকিছু জমিয়ে যাওয়ার উপক্রম।

সময়টা ১৯৯৯ সাল। গ্রামের একটি স্কুল থেকে সবে মাত্র এস এস সি পাশ করে ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হয়েছি নওগাঁ সরকারী কলেজে। থাকি কলেজ সংলগ্ন শান্ত ণীড় ছাত্রাবাসে। আর সে সময়েই পরিচয় হিমুর সাথে। প্রথম পরিচয় হিমুর হাতে কয়েকটি নীলপদ্ম। বইটি পড়ার পড় থেকেই হিমুর প্রেমে পড়া আর হিমু হওয়ার বাসনা। সংগ্রহ করতে শুরু করলাম হিমু সিরিজের শুরু ময়ূরাক্ষী থেকে সে পর্যন্ত প্রকাশিত অন্যান্য সকল উপন্যাস। ক্লাসের বই ক্রয়ের মিথ্যে কথা বলে বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে হুমায়ূন আহমেদের হিমু সিরিজের বই ক্রয় করা। সে বইগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বার বার পড়ে হিমু সাজার চেষ্টা। তারই অংশ হিসেবে শীতের পূর্নিমা রাত্রে ডিঙ্গিতে শুয়ে পূর্নিমা দেখা।

পাশেই ছোট যমুনা নদী। নদীর গভীরতা খুব বেশী নয় তবে ডিসেম্বর মাস হওয়ায় নদীর পানি প্রচন্ড ঠান্ডা। গেলাম ডিগ্রি কলেজের মোড়ে নদীর ধারে। রাত তখন ১.০০টা জন মানবহীন।শুধু মাত্র দু একজন মাস শিকারী নদীর ধারে হারিকেনের আলো জাগিয়ে বড়শী দিয়ে মাছ শিকারে ব্যস্ত। আমি একা, সতর্কভাবে পাশেই বেধে রাখা এক ডিংগি নৌকায় উঠে বাধন দিলাম খুল। নদীতে স্রোত নেই বললেই চলে , তবে একটু হিম শীতল বাতাস বইছিল। আমার ছিল না নৌকা চালানোর অভিজ্ঞতা। তাই কোনোরকমে নৌকাটি নদীর মাঝখানে নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে চিত্ত হয়ে শুয়ে শুয়ে জোত্স্না দেখতে লাগলাম। কুয়াসা ভেদ করে চাদের আলো বেরিয়ে আসছিল। দৃশ্যগুলো ছিল অসাধারন। রাত যতই গভীর হচ্ছিল, প্রকৃতির শোভাও যেন পরিবর্তন হচ্ছিল। একটা ঘোর লাগার মত অবস্থা। শীতে যে আমি বরফ হয়ে যাচ্ছিলাম, সে দিকে কোন ভ্রুক্ষেপ ছিল না। একসময় নৌকাটি ভাসতে ভাসতে গাজা গোলার ঘাটে পৌছালে আমি কোন রকমে নৌকাটিকে ঘাটে ভিড়িয়ে নেমে পড়লাম।

এখন মেসে ফিরব কেমনে রাত তখন ৪.০০টার মত। কোন রিক্সা নেই। অবশেষে হাঁটা দিলাম। কেডি স্কুলের গেটে আস্তে কি আস্তে দুজন টহল পুলিশের সামনে পড়ে গেলাম। তারা সাইকেলে চড়ে টহল দিচ্ছিল। আমাকে দেখে সাইকেল থামিয়ে সাইকেল থেকে না নামিয়ে আমাকে কাছে যাওয়ার জন্য ডাক দিল। আমি কাছে যাওয়াতে আমি কি করছি বা কোথায় গিয়েছিলাম জানতে চাইল। আমি উত্তর দিতে আমতা আমতা করছিলাম বলে পুলিশ ভাই চট করে একহাতে আমার কলার চেপে ধরল এবং একহাতে সাইকেলের হ্যান্ডেল। আমি অবস্থা সুবিধার না দেখতে পেয়ে সাইকেল দু’হাতে ধাক্কা দিয়ে ছো দৌড়।

পুরাতন জেলখানার পাশ দিয়ে পি এন স্কুলের পাশ দিয়ে আলি গলি দিয়ে যমুনা নদীর পাড় দিয়ে মেসে দিকে। পুলিশ দ্বয় সাইকেল ফেলে রেখে আমার পিছনে কিছুদূর দৌড়ে আমাকে না পেয়ে বিদায়। আর আমি নদীর পার দিয়ে হেটে হেটে আবারো্ ডিগ্রি কলেজের মোড়ে এসে সকাল হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা শেষে মেসের গেট খুললে রুমে প্রবেশ করে একটা দীর্ঘ গোছল শেষে দীর্ঘ ঘুম। এভাবে এইচ এইচ সি জীবনের পুরো দুবছর হিমু হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা। একের পর এক পাগলামী। লিখা পড়া বাদ। ফলে এইচ এসসিতে ফেল।

আজ ১২ বছর পর যখন হিমু সিরিজের এই বইগুলো পড়ার চেষ্টা করি, তখন কি হাস্যকরই মনে হয়। আজ হুমায়ূন আহমেদ নেই। কিন্তু তার অজস্র সাহিত্য কর্ম রয়েছে। জানি না তার লিখা গুলোর সাহিত্যমান কতটুকু। কিন্তু তিনি এক শ্রেনীর পাঠক সৃষ্টি করেছেন তা অনস্বীকার্য। আজকে তার জন্য অনেক কষ্ট হচ্ছে। হয়তোবা যদি তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা না যেতেন, তবে এতো খারাপ লাগত না। কিন্ত যেহেতু আমার বাবাও ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরণ করছে তাই হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যু আমাকে আমার বাবার কাছে ফিরে নিয়েছে। হুমায়ূন আহমেদসহ সকল মৃতের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। আমিন!!!!

বিঃদ্রঃ এখনো আমি যদি ৩ টি শার্ট বা গেঞ্জি ক্রয় করি, কেন জানি আমার অজান্তেই তার মধ্যে ২ টির কালার হয় হলুদ!!!