ক্যাটেগরিঃ নাগরিক সমস্যা, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার জীবনকে দুর্বিসহ করে তুলেছে

নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার আজ ভয়ানক চড়া। রমজানকে উপলক্ষ করে এই চড়া ভাব। অথচ রোজা প্রার্থনার মাস, এবাদতের মাস। মানুষকে জিম্মি করে মুনাফা করার মাস নয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের প্রতিশ্রুতি বা পদক্ষেপ কোন কাজে লাগছে না।বাজার চলছে গুটিকয়েক ব্যবসায়ীর খেয়ালখুশি মত। প্রতিদিনই বাড়ছে প্রতিটি পণ্যের দাম। অথচ সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল রমজান মাসে নিত্য পণ্যের দাম বাড়বে না। একদিকে লাগামছাড়া ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট, অন্যদিকে সরকারের অকার্যকর প্রশাসন সাধারণ মানুষ- বিশেষ করে নির্ধারিত আয়ের মানুষদের জীবন দুর্বিসহ করে তুলেছে।

সরকারের উদ্যোগ অপ্রতুল ও অকার্যকর

রমজানে নিত্যপণ্যের মুল্য স্থিতিশীল রাখতে ব্যবসায়ের বিভিন্ন পর্যায়ে মুনাফা করার সীমা বেধে দিয়েছে সরকার। আমদানিকারকেরা ১ শতাংশ ও খুচরা ব্যবসায়ীরা ১০ শতাংশের বেশি মুনাফা করতে পারবে না। এই সিদ্ধান্ত কেউ অমান্য করলে তার বিরুদ্ধে জরিমানাসহ কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছে। ২৬ জুন বানিজ্য মন্ত্রনালয়ে ব্যবসায়ীদের সাথে সরকারের বৈঠকে মুনাফার এই সীমা বেধে দেওয়া হয়। একই বৈঠকে রাজধানীর প্রতিটি দোকানে বাধ্যতামূলক দামের তালিকা টাঙ্গানো এবং দোকানে পণ্য ক্রয়ের পাকা রশিদ রাখার সিদ্ধান্ত হয়। টিসিবিকে সক্রিয় রাখার অংশ হিসেবে রমযান জুড়ে টিসিবি ভোজ্য তেল, চিনি, মসুর ডাল, ছোলা ও খেজুর বিক্রয় করার সিদ্ধান্ত হয়। প্রাথমিকভাবে রাজধানীতে ২৫ টি ট্রাকে করে ও চট্রগ্রাম মহানগরীতে ৫টি ট্রাকে এই পণ্য বিক্রয় করা হবে।সরকারের উল্লিখিত উদ্যোগসমূহ একদিকে যেমন অপ্রতুল, তেমনি বাজার নিয়ন্ত্রণে তা একেবারে অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।

মাঠ পর্যায়ে ব্যবসায়ীদের উপর নজরদারির কোন স্থায়ী ব্যবস্থা নেই

লক্ষ্য করা যাচ্ছে, সরকার যেসব পণ্যে ১০ শতাংশের বেশী মুনাফা করতে নিষেধ করেছে সেসব পণ্য এখনই ৬ শতাংশ থেকে সর্বোচচ ৬৩ শতাংশ পর্যন্ত বেশি দামে বিক্রয় হচ্ছে। অন্যদিকে মুল্য তালিকা টাঙ্গানো ও নির্ধারন নিয়ে খুচ্রা ব্যবসায়ীদের সাথে সিটি কর্পোরেশনের কর্মীদের সমন্বয়হীনতা দেখা যাচ্ছে। খুচ্রা ব্যবসায়ীরা বলছেন, তাদের সাথে কথা কথা না বলে সিটি কর্পোরেশনের কর্মীরা মূল্য টাঙ্গিয়ে যান। আবার নির্ধারিত মুল্য মানা হচ্ছে কিনা, ক্রেতারা এ থেকে সুফল পাচ্ছে কিনা তা যাচাই করার জন্য স্থায়ী কোন নজরদারির ব্যবস্থাও নেই। ভুক্ত ভুগি মানুষ এবং বাজার বিশ্লেষকরা মুনাফা নিয়ন্ত্রণে সরকারের গৃহিত কার্যক্রমের বাস্তব ফলাফল নিয়ে ইতিমধ্যে প্রশ্ন তুলেছেন এবং হতাশা ব্যক্ত করেছেন।

১৬ কোটি মানুষের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে গুটিকয়েক মানুষের সিন্ডিকেট

রমজানে আমাদানি হওয়া নিত্য পণ্য যেমন সয়াবিন, পামঅয়েল,ছোলা, মসুর, ডাল ও চিনি মজুদ আছে মাত্র ৫৯ জন ব্যবসায়ীর কাছে। এসব পণ্যের ৫৫-৮৮ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে মাত্র ১২টি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান, গত মে ও জুন মাসে চট্রগ্রাম বন্দর থেকে খালাস হওয়া পণ্য পর্যবেক্ষন করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। অনেক ছোট আমদানীকারক, ঋণপত্র খুলে পণ্য আমদানিতে ব্যাংকের সহযোগীতা পান না। লোকসানে পড়ে অনেক ছোট আমদানীকারক পণ্য আমদানি করছে না। আমদানী পর্যায়ে ব্যবসায়ীর সংখ্যা কমে যাওয়ার ফলে প্রতিযোগিতা কমছে। ফলে যৌতিক দরও নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। আবার পর্যাপ্ত পরিমানে এসব পণ্য আমদানী হওয়ায় পণ্যের কোন সরবরাহ সংকট নেই। কিন্তু স্থানীয় বাজারে দামের কোন নিয়ন্ত্রণ না থাকায় পর্যাপ্ত সরবরাহের ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে না। আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্য তেলের দাম দুই মাস আগে যথেষ্ঠ পরিমান কমলেও দেশীয় তার প্রভাব নেই বরং কিছুদিন ধরে নতুন করে খোলা সয়াবিন তেলের দাম বেড়ে চলেছে।

ভেজাল ও বিষাক্ত খাবারে অসুস্থ হয়ে পড়ছে পুরো দেশ

নিত্য পণ্যের দাম বৃদ্ধির সাথে সাধারণ মানুষের জন্য ভয়ংকর বিপদের কারণ হয়ে দাড়িয়েছে ভেজাল খাদ্য। রমজান এলে খাবারে ভেজালের প্রাদুর্ভাবও বেড়ে যায়। বাজারে প্রায় সব ধরনের শাক-সব্জি, দুধ, ফল-মুল ও মাছ-মাংসে ফরমালিনের উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে। আম, কাঁঠাল, আনারস, লিচু, আপেল, আংগুর সহ সব ধরনের ফল পাকাতে এবং টাটকা দেখাতে ব্যবহার করা হচ্ছে ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ইথানল ও ফরমালিন-যা মানবদেহের জন্য অতীব ক্ষতিকর। স্থল, বিমান ও নৌ-বন্দরের সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে আমদানী করা ফল-মুলের মান ভাল বলে ছাড়পত্র দেওয়া হলেও তার মধ্যেও বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতি পেয়েছে ভেজাল বিরোধী ভ্রাম্যমান আদালত। ফরমালিনযুক্ত খাবার ফুসফুসের কার্যক্ষমতা নষ্ট করে; লিভার ক্যান্সার, আজমা, অন্ধত্বসহ নান রোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

খাদ্য ও ভেজাল বিরোধী আইন ও শাস্তি

বাংলাদেশে খাদ্য সংক্রান্ত ১৭ টি আইন বিদ্যমান। ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে খাদ্যে ভেজাল মেশানোর সর্বোচচ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। কোন কোন ক্ষেত্রে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ১৪ বছরের কারাদণ্ডের বিধানও রাখা হয়েছে। কিন্তু এ ধারায় মামলা তেমন হয়না বললেই চলে। এমনকি কারো কথিত শাস্তি হয়েছে বলেও শোনা যায়নি। খাদ্যের মান বজায় রাখা সহ নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে ২০০৯ সালের ২০ জুন মহামান্য হাই কোর্ট বিভাগ একটি যুগান্তকারী রায় প্রদান করেছিল। উক্ত রায়ে প্রতিটি জেলায় খাদ্য আদালত গঠন এবং ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠা করে খাদ্যের গুন অ রাসায়নিক মান পরীক্ষার জন্য খাদ্য পরীক্ষক নিয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়। আজও বাস্তবায়ন হয়নি সে রায়। বর্তমানে দেশে ভ্রাম্যমান আদালতের প্রচলন রয়েছে। এই আদালত সংক্ষিপ্ত বিচার করে থাকে। বিশুদ্ধ খাদ্য অধ্যাদেশ ও বাংলাদেশ স্টান্ডার্ড এন্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বি এসটিআই) অর্ডিন্যান্স আনুযায়ী ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করা হয়। এতে শাস্তির মেয়াদ কম। এই কারণে গুরুত্বর অপরাধ করেও ভেজালকারীরা কম সাজায় পার পেয়ে যায়। বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ২৭২ ও ২৭৩ ধারায় খাদ্যে ভেজাল মেশানোর অভিযোগ প্রমাণিত হলে শাস্তির বিধান রয়েছে। ২৭২ ধারায় বিক্রয়ের জন্য খাদ্য ও পানীয়তে ভেজাল মেশানোর দায়ে কোন ব্যক্তিকে অনধিক ছয় মাস পর্যন্ত শাস্তির বিধান রয়েছে। ২৭৩ ধারায় ক্ষতিকর খাদ্য ও পানীয় বিক্রয়ের অপরাধেও ছয় মাসের শাস্তির বিধান রয়েছে। ভেজাল খাদ্য মানুষকে ক্রমে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। এ থেকে পরিত্রাণের জন্য এখনই কঠোর ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে। কিন্তু সরকারের উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম কোথাও নজরে পড়ছে না। মাঝে মাঝে রুটিন মাফিক কিছু অভিযান চালানো, কিছু জরিমানা আদায় ইত্যাদিতে সীমাবদ্ধ প্রশাসনিক তৎপরতা। যেসব ব্যবসায়ীর একবার ভেজালের কারণে জরিমানা আদায় করা হচ্ছে। তারাই পরক্ষণে আবার ভেজাল খাদ্য বিক্রয় করছে।

করণীয় রয়েছে আমাদেরও

মানুষ যাতে আয়ের সাথে সঙ্গতি রেখে জীবন যাপন করতে পারে সেজন্য দ্রব্যমূল্য ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে রাখার এবং নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকারকেই মুল ভুমিকা রাখতে হবে। এ বিষয়ে আমাদের ক্রমাগত সচেতনতা, প্রয়োজনীয় আইন ও নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সরকারের উপর চাপ অব্যহত রাখতে হবে। অধিক ও অসৎ মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ও আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে, হতে হবে সংগঠিত।

***
ফিচার ছবি: ব্লগার নাসিরুদ্দীন এর ফটোপোস্ট থেকে সংগৃহিত