ক্যাটেগরিঃ ব্লগ

 


রোমানদের ছিল ক্রীতদাস, স্পার্টার্নদের ছিল সেবাদাস, ইংরেজদের ছিল ভূমিদাস, আমেরিকানদের ছিল নিগ্রো, জার্মানদের ইহুদি আর হিন্দুদের আছে অস্পৃশ্য দলিতরা। ভারতীয় উপমহাদেশে দলিত জনগোষ্ঠীর প্রতি জাত-পাত তথা জন্ম পরিচয় ও পেশাভিত্তিক বৈষম্য এবং তাদের ব্যাপারে সামাজিক মনোভাব সম্পর্কে দলিত আন্দোলনের গুরু ড. আম্বেদকর এই উচ্চারণ করেছিলেন এই অমোঘ বাণী।

ইদানীংকালেও এই অবস্থার তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। গত দশকের গোড়ার দিকে ১৯ অক্টোবর, ২০০২ তারিখ দৈনিক ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় প্রকাশিত খবর- স্থানীয় এক প্রভাবশালী হরিয়ানায় গরুর চামড়া বিক্রীর অপরাধে (!) ৫ জন দলিত ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার পর বলেছিলেন, ‘দলিতদের থেকে একটা গরুর জীবন অনেক মূল্যবান’।

বাংলাদেশেও এই ধরনের চর্চা বিদ্যমান। গত ৩ এপ্রিল, ২০১০ তারিখ দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা যায়- যশোরের মনিরামপুর উপজেলার ভোজগাতী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান থেকে দলিত সমপ্রদায়ের ৭০ জন শিক্ষার্থীকে বের করে দেয়ার সময় ঐ স্কুলের প্রধান শিক্ষকসহ অন্য শিক্ষকরা বলেন, ‘তোরা ছোট জাতের লোক। এতবড় অনুষ্ঠানে তোদের মানায় না। গণ্যমান্য ব্যক্তিরা এ অনুষ্ঠানে অতিথি থাকবেন। তোরা এ অনুষ্ঠান থেকে বের হয়ে যা।’

উভয় ক্ষেত্রে আমরা দেখছি- যে মানুষগুলো সামাজিকভাবে এ রকম অবিচারের শিকার হয়েছেন, তারা হয় জন্মগত অথবা পেশাগত পরিচয়ের জন্য এই অমানবিক আচরণের শিকার। ঐতিহ্যগতভাবে ভারতবর্ষে যে চতুবর্ণীয় সামাজিক ব্যবস্থার প্রচলন এবং বর্ণভিত্তিক পেশা নির্ধারণ করা হয়েছিল, আজো তা বিদ্যমান আছে। এই ব্যবস্থার নির্মম শিকার মুলত দলিত জনগোষ্ঠী; বর্ণ বিভাজনের এই বৈষম্যমূলক ব্যবস্থাতে যারা কোনো বর্ণ ভুক্ত হতে পারেননি। তারা যেমন সমাজ-ধর্মীয়ভাবে বর্ণহীন, তেমনি তাদের সামাজিক জীবনও বর্ণহীন ধূসর অর্থাৎ এক কথায় অবর্ণনীয় এক জীবন তাদের ললাট লিখন। কায়িক শ্রমনির্ভর, দারিদ্র্য এবং বৈষম্যের যাঁতাকলে পিষ্ট এই জনগোষ্ঠী ঐতিহ্যিকভাবে হিন্দু বা মুসলিম কিংবা বাঙালী বা অবাঙালী যা-ই হোন না কেন জ্ঞাতি সম্পর্ক ও আত্মীয়তার বন্ধনের আওতায় সুদূর অতীতকাল ধরে এরা কিছু নির্দিষ্ট পেশায় নিয়োজিত। সমাজে যেহেতু তারা এখনো ‘অশুচি’ ও ‘অপবিত্র’ হিসেবে গণ্য হয়, তাই তারা তথাকথিত পবিত্র জনগোষ্ঠী বা ‘মূলধারার সমাজ’ হতে আলাদা স্থানে বাস করতে বাধ্য হয়।

বাংলাদেশে দলিত নারীঃ

এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে সবচে’ বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার দলিত নারীরা। তারা দু’ভাবে বঞ্চিত ও বৈষম্যের শিকার। প্রথমত, দলিত হিসেবে বৃহৎ সমাজে। দ্বিতীয়ত, নিজ সমাজে নারী হিসেবে। বাল্যবিবাহ এই জনগোষ্ঠীর জন্য এক সাধারণ সত্য। এ ছাড়া রয়েছে নারী হিসেবে তার সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা। পিতৃতান্ত্রিক মনোভাব এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রবল। এই জনগোষ্ঠীর নারীদের মধ্যে বাইরে বের হওয়ার ক্ষেত্রে পুরুষতান্ত্রিক চর্চা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করে। কোনো কারণে দলিত নারীরা স্বামী পরিত্যক্ত হলে বা বিধবা হলে সমাজে টিকে থাকা তাদের জন্য আরো কঠিন হয়ে পড়ে।

সুবিচারের অধিকার ও আইনগত পরিস্থিতিঃ
সামাজিক বৈষম্য ও অস্পৃশ্যতা বিরোধী কেনো আইন না থাকার কারণে জন্ম ও পেশাভিত্তিক বৈষম্যের শিকার এই দলিত জনগোষ্ঠী অস্পৃশ্যতার শিকার হলে আদালতে যেতে পারে না। এর পাশাপাশি দলিত নারীদের বেশিরভাগই যেহেতু ধর্মগত ভাবে হিন্দু এবং বিবাহ নিবন্ধনের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে সে ‘মূলধারার নারীদের তুলনায় আইনী সুরা পাওয়ার ব্যাপারে ভঙ্গুর পরিস্থিতির শিকার।

দলিত নারীর স্বাস্থ্য চিত্রঃ
দলিত নারীর স্বাস্থ্য পরিস্থিতি তাদের বাসস্থান ও পয়:নিষ্কাষণ সুবিধার সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। দলিত জনগোষ্ঠী সাধারণত নোংরা পরিবেশে বাস করতে বাধ্য হয় এবং চরম দারিদ্র্য যেহেতু তাদের নিত্যসঙ্গী, ফলে তারা নানারকম রোগ-শোকে; যেমন- ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, পেটের পিড়া ও ত্বকের অসুখে ভুগতে থাকে। উপরন্তু নারী হওয়ার কারণে পুরুষতান্ত্রিক চর্চাও তার দুর্বল স্বাস্থ্যের কারণ হিসেবে ক্রিয়াশীল। খাদ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে তারা বৈষম্যের শিকার হয়। তেমনি চিকিৎসা সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে নারী হওয়া একটি প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করে। অন্যদিকে, যদি কেউ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে যায়ও, অস্পৃশ্যতার কারণে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে তারা বৈষম্যের শিকার হয়।

পানি ও পয়: নিষ্কাষণ ব্যবস্থা এবং দলিত নারীঃ
যে জনগোষ্ঠী সাধারণত রাস্তাঘাট পরিষ্কার ও অন্যদের টয়লেট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখে, পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ ও পয়:নিষ্কাষণ সুবিধার অভাবে তাদের কলোনিগুলো থাকে সবচে’ নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর। ঢাকার গাবতলী সিটি সুইপার কলোনিতে সিটি করপোরেশনের কোনো পানির লাইন নেই। এখানে পানির একমাত্র উৎস একটি টিউবওয়েল থেকে প্রায় ৫০ টি পরিবার পানি সংগ্রহ করে। তাছাড়া, ওয়ারি, গণকটুলি, নাজিরাবাজার, পঙ্গু সুইপার কলোনিসহ ঢাকার প্রায় ১৭ টি কলোনীর অবস্থা আলাদা কিছু নয়। এ ছাড়া, নগরাঞ্চলের বাইরে চা-বাগানসহ গ্রামীণ দলিত পল্লীগুলোর অবস্থা এর চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। মফস্বলে অস্পৃশ্যতার ধারণা প্রবল হওয়ার কারণে পানির উৎসগুলোতে এই জনগোষ্ঠীর প্রবেশাধিকারও সহজ নয়। ফলে তারা পানি সংকটে বেশি করে ভোগে। এই পানির অভাবে তাদের পয়:নিষ্কাষণ ব্যবস্থা অত্যন্ত ঝুঁকি পূর্ণ। এই পরিস্থিতিতে দলিত নারীরা সবচে’ বেশি ভোগান্তির শিকার হয়। কারণ, পানি সংগ্রহের পুরো দায়িত্ব নারীর ওপরই বর্তায়। এ ছাড়া শহরাঞ্চলে কলোনিতে যে সাধারণ চৌবাচ্চা আছে সেখানে নারী-পুরুষের জন্য পৃথক গোসলের ব্যবস্থা না থাকায় নারীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার খর্ব হয়। ফলে সে আত্মগ্লানী ও মানসিক হীনমন্যতায় ভোগে; যা তার সুস্থ্য বিকাশের প্রতিবন্ধক।

বাসস্থান ও দলিত নারীঃ
দলিত জনগোষ্ঠীর বাসস্থানের যে দুর্দশা, তা বর্ণনা দিয়ে প্রকাশ করা দুরূহ। শহরাঞ্চলে দলিতরা সাধারণত সিটি কলোনী, পৌর কলোনিতে এবং গ্রামাঞ্চলে পুকুর পাড়, রাস্তার ধার এবং খাস জায়গায় খড় এবং কাদা দিয়ে ঘর বানিয়ে নিজেরা একত্রে বসবাস করে। শহরে এগুলো সুইপার কলোনী, ডোমপাড়া, মেথরপট্টী এবং গ্রামাঞ্চলে মুচিপাড়া, ঋষিপাড়া ইত্যাদি নামে পরিচিত। শহরাঞ্চলে সিটি কলোনিগুলোতে দলিতরা ৮/১০ ফুট মাপের একটি ঘরে অন্তত ৩ টি প্রজন্ম বাস করে; যা পুরো মানব সভ্যতার জন্য লজ্জাজনক। একটি ঘরে তিন প্রজন্ম বাস করা যেমন অস্বাস্থ্যকর, তেমনি মানহানিকর ওই ঘরের বাসিন্দাদের জন্য এবং সমাজের জন্য। এতে করে দলিত শিশুদের আত্মসম্মানবোধ ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। আরো দুঃখজনক, তারা যদি কোথাও বাসা ভাড়া করতে যায়, পরিচয় পেলে তাদের বাসা ভাড়াও দেয়া হয় না। এই পরিস্থিতিতে নারীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হয়। একটিমাত্র ঘরে বাস করার কারণে সে যেমন ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়, একই সাথে সে নারী হওয়ার কারণে সংসারে বেশি কাজ করতে হয়। ফলে সে বেশিমাত্রায় স্বাস্থ্যহীনতার শিকার হয়।

শিক্ষাঃ
সাধারণভাবে দলিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উচ্চশিক্ষিতের সংখ্যা নগণ্য। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরীর এক গবেষণা থেকে জানা যায়, শুধুমাত্র লিখতে পড়তে পারা বিবেচনায় দলিতদের মধ্যে শিক্ষিতের হার মাত্র ৫ শতাংশ। সাধারণভাবে স্কুলে শিশুদের ভর্তির হার যেখানে ৮৫ শতাংশ সেখানে দলিত শিশুদের মধ্যে স্কুলে ভর্তির হার ১০ শতাংশ; যার মধ্যে ঝরে পড়ার হার ৯৫ শতাংশ। এর পাশাপাশি দলিত শিশুদের যারা স্কুলে ভর্তি হয়, তারা কখনো শিক, কখনো আবার সহপাঠীদের দ্বারা এমন সব আচরণ ও বৈষম্যের শিকার হয়; যা তাদের স্কুলে পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক নয়। এ প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলা করেও যারা পড়ালেখা শেষ করে তারাও শুধুমাত্র জন্মগত পরিচয়ের কারণে উপযুক্ত চাকরি পায় না। এটি ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা করানোর ক্ষেত্রে অভিভাবকদের নিরুৎসাহিত করে। এছাড়া সমাজে অসংখ্য প্রতিকূলতার শিকার এই দলিত শিশুদের উচ্চ শিক্ষার জন্য কোনো কোটা ব্যবস্থা বা প্রণোদনা বৃত্তিও চালু নেই। এই অবস্থায় দলিত কন্যাশিশুদের শিক্ষা গ্রহণের অবস্থা সহজেই অনুমেয়।

রাজনীতিতে দলিত নারীর অংশগ্রহণঃ
প্রচলিত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বলতে যা বোঝায় সেখানে দলিত নারীর কোনো অংশগ্রহণ চোখে পড়ে না। এমনকি সংসারের বাইরে নিকটতম সামাজিক প্রতিষ্ঠান পঞ্চায়েতেও এক/দু’জন ব্যতিক্রম ছাড়া দলিত নারীদের অংশগ্রহণ দেখা যায় না। তবে ইদানিং বিশেষত যেসব এনজিও দলিত জনগোষ্ঠীর সাথে অধিকার ভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে, তাদের প্রণোদনায় দলিত নারীরা ঘরের বাইরে দৃশ্যমান হচ্ছে। এটি সামাজিক উন্নয়নের পথে একটি শুভবার্তা বলেই আমরা মনে করছি।

করণীয়ঃ
উপরোক্ত পরিস্থিতি এই জনগোষ্ঠীকে এমন এক জীবনের দিকে ঠেলে দিয়েছে, যেখানে তাদের মানবিক মর্যাদা চরমভাবে ভুলুণ্ঠিত। সামাজিকভাবে মর্যাদাহীন, অনিরাপদ ও নাগরিক সুবিধাবঞ্চিত হয়ে এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে আরেক ধাপ পেছনে থাকা দলিত নারীদের বিকাশের জন্য আমাদের প্রস্তাব হচ্ছে-

ক) দলিতদের প্রতি বিদ্যমান সকল বৈষম্য ও অস্পৃশ্যতা চর্চা বন্ধ করতে প্রত্যয় ও পরো সকল অস্পৃশ্যতাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ ঘোষণা করে বৈষম্যবিরোধী আইন করতে হবে।

খ) নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে দলিত নারীদের উন্নয়নে বিশেষ শাখা ও সেল গঠন এবং স্থানীয় সরকার বিভাগেও অনুরুপ শাখা বা সেল গঠন করতে হবে।

গ) জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে দলিত ও বঞ্চিতদের অধিকার বিষয়ক বিশেষ সেল গঠন করতে হবে এবং দলিতদের মানবাধিকার বিষয়ে জাতীয়ভিত্তিক অনুসন্ধান কার্যক্রম হাতে নিতে হবে।

ঘ) শিশু অধিকারভিত্তিক যেসব সরকারি-বেসরকারি উন্নয়ন কার্যক্রম চালু আছে সেগুলোতে দলিত কন্যাশিশুদের বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়ে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

ঙ) স্থানীর সরকার মন্ত্রণালয় কর্তৃক নির্দেশ জারি করে সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভাগুলোতে অবস্থিত দলিত কলোনিগুলোর আবাসন, পানি ও পয়:নিষ্কাষণ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটিয়ে দলিত নারীর জীবনকে বিকাশ যোগ্য করতে হবে।

( তথ্যসূত্রঃ জাতীয় দলিত নারী সম্মেলন ২০১২ এ উপস্থাপিত প্রবন্ধ, প্রদত্ত বক্তব্য এবং উম্মুক্ত আলোচনা)।