ক্যাটেগরিঃ মানবাধিকার

 

আমাদের দেশের সর্বোচচ আইন-গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সংবিধান, যা ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্ত আর পাঁচ লক্ষ মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে। সংবিধান আমাদের কাছে মহান এবং অনেক পবিত্র একটি আইন গ্রন্থ,যা লংঘন করা জাতির অস্তিত্বকে অস্বীকার করার সমতুল্য একটি অপরাধ।

বাংলাদেশ সংবিধানের মূল দর্শন তথা নৈতিক ও আইনগত ভিত্তি সংবিধানের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে যে, আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হইবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা-যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন,মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য,স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে।

সংবিধানের ৭(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে,জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচচ আইন এবং অন্য কোন আইন যদি এই সংবিধানের সাথে অসমঞ্জস হয়,তাহা হলে সেই আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হবে৷ অর্থাৎ সংবিধানের কোন অনুচ্ছেদ বা উদ্দেশ্যের সাথে দেশের প্রচলিত কোন আইনের বিরোধ দেখা দিলে সে আইন কার্যকারিতা হারাবে অর্থাৎ সে আইন বাতিল বলে গন্য হবে।

সংবিধানের ৭(খ) অনুচ্ছেদ মোতাবেক সংবিধানের প্রস্তাবনা,প্রথম ভাগের সকল অনুচ্ছেদ,দ্বিতীয় ভাগের সকল অনুচ্ছেদসহ সংবিধানের অন্যান্য মৌলিক কাঠামো সংক্রান্ত অনুচ্ছেদসমূহের বিধানাবলী সংযোজন,পরিবর্তন, প্রতিস্থাপন,রহিতকরণ কিংবা অন্য কোন পন্থায় সংশোধন করা যাবে না। অর্থাৎ কেউ ইচ্ছে করলেই কোন আইনের মাধ্যমে বা অন্য কোন ভাবে কোন নাগরিকের জন্য আইনের শাসন বা মৌলিক মানবাধিকার ভোগ করা থেকে বঞ্চিত করতে পারবে না।

সংবিধানের ১৯(১) অনুচ্ছেদে অনুযায়ী রাষ্ট্র সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করতে বাধ্য এবং ২৬(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংবিধানের মৌলিক অধিকারের সাথে অসমঞ্জস সকল প্রচলিত আইন আপনা আপনি বাতিল বলে গন্য হবে। একই সাথে,২৬(২)অনুচ্ছেদ মোতাবেক রাষ্ট্র সংবিধানের মৌলিক অধিকারের সাথে অসমঞ্জস কোন আইন প্রণয়ন করবে না এবং অনুরূপ কোন আইন প্রণীত হলে তা বাতিল হয়ে যাবে। তাছাড়া,২৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী বলে ঘোষনা করেছে।

আমাদের পবিত্র ও মহান সংবিধানে সকল প্রকার বৈষম্যহীন উল্লেখিত অধিকার সুস্পষ্টভাবে ঘোষিত হলেও বাস্তবে আমারা তার প্রতিফলন দেখি না। বিশেষত যৌন প্রবৃত্তিগত সংখ্যালঘু ব্যক্তি সর্বদা পরিবার,সমাজ,রাষ্ট্র,শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রসহ সর্বত্র বৈষম্যের শিকার হয়। এমন কি দেশের প্রচলিত আইন দ্বারাও তাদের প্রতি বৈষম্য করা হয়।

আমাদের দেশে প্রচলিত আইনে দুজন পুরুষ ও মহিলা ইচ্ছার বিরুদ্ধে,সম্মতি ব্যতীত,ভয় দেখিয়ে বা প্রলোভনের দ্বারা সম্মতি আদায়ের মাধ্যমে অথবা অপ্রাপ্ত বয়স্ক কোন মহিলাকে তার সম্মতিসহ বা সম্মতি ব্যতীত যৌন সহবাস করে তবে তা দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গন্য হয়। কিন্তু প্রাপ্ত বয়স্ক দুজন পুরুষ ও মহিলা কোন প্রকার প্রলোভন ও ভয়ভীতি ছাড়া স্বেচ্ছায় জনসম্মুখের অগোচরে বেশ্যাবৃত্তির উদ্দেশ্য ব্যতীত যৌন সহবাস করে তবে তা অপরাধ নয়।

অথচ যদি পূর্ণ সম্মতিতে কোন প্রকার প্রলোভন ও ভয়ভীতি ব্যতীত দুজন প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষ নিজেদের সাথে যৌনসহবাস করে;বা দু’জন মহিলা নিজেদের সাথে যৌনসহবাস করে;বা একজন পুরুষ একজন মহিলার সাথে ভ্যাজাইনাল যৌনসহবাস ব্যতীত অন্য কোন উপায়ে যৌনসহবাস করে,তবে তা আমাদের দেশে প্রচলিত আইনে নিষিদ্ধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

বাংলাদেশ দন্ড বিধির ৩৭৭ ধারা অনুযায়ী যে ব্যক্তি স্বেচ্ছাকৃতভাবে কোন পুরুষ,নারী বা জন্তুর সহিত,প্রাকৃতিক নিয়মের বিরুদ্ধে যৌন সহবাস করে সেই ব্যক্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে বা যেকোন বর্ণনার কারাদণ্ডে–যার মেয়াদ দশ বছর পর্যন্ত হতে পারে-দন্ডিত হবে এবং তদুপরি অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হবে। এই ধারায় অস্বাভাবিক অপরাধের শাস্তির বিধান করা হয়েছে এবং তা অবশ্য প্রাকৃতিক নিয়মের বিরুদ্ধ ভাবে হতে হবে। যদিও প্রাকৃতিক নিয়ম বিরুদ্ধ যৌন সহবাসের সর্বজনীন স্বীকৃত সংজ্ঞা এখনো নির্ণীত হয়নি।

দুজন প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষ ও মহিলা কোন প্রকার প্রলোভন ও ভয়ভীতি ছাড়া স্বেচ্ছায় জনসম্মুখের অগোচরে বেশ্যাবৃত্তির উদ্দেশ্য ব্যতীত যৌনসহবাস করলে যদি তা অপরাধ না হয়,তবে দুজন প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষ বা মহিলা বা পুরুষ ও মহিলা কোন প্রকার প্রলোভন ও ভয়ভীতি ছাড়া স্বেচ্ছায় জনসম্মুখের অগোচরে বেশ্যাবৃত্তির উদ্দেশ্য ব্যতীত ভ্যাজাইনাল যৌনসহবাস ব্যতীত অন্য কোন উপায়ে যৌনসহবাস করলে তা কখনো অপরাধ হিসেবে গন্য হতে পারে না। কোন রাষ্ট্র যদি উল্লেখিত প্রকারের যৌনসহবাস অপরাধ বলে গন্য করে আইন প্রণ্যন করে, তবে উক্ত আইন ন্যাচারাল জাস্টিসের পরিপন্থি বলে গন্য হতে বাধ্য।

অতঃএব, একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা আমাদের পবিত্র মহান সংবিধানের প্রস্তাবনা,৭(২),৭(খ),১৯(১),ও ২৭ অনুচ্ছেদে বর্ণিত সমঅধিকার,সমসুযোগ,আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার, ন্যাচারাল জাস্টিস ও আইনের দৃষ্টিতে সমান অধিকারের সুস্পষ্ট লংঘন এবং উক্ত ধারা সংবিধানের ৭(২),৭(খ) ও ২৬(১)(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংবিধান ও মৌলিক মানবাধিকারের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিধায় আপনা আপনি বাতিল বলে গন্য।

আরো জানতে ভিজিট করুনঃ