ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

প্রত্যেক বিচারপ্রার্থীর নিজে অথবা পছন্দমতো আইনজীবী নিয়োগের মাধ্যমে চাপমুক্ত পরিবেশে ভয়ভীতির ঊধর্ে্ব থেকে বিচারপ্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সংবিধান, মানবাধিকার ঘোষণাপত্রসহ নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী স্বীকৃত এসব মানবাধিকার অনস্বীকার্য। কিন্তু বাংলাদেশের মতো একটি দরিদ্র রাষ্ট্রে বিচারপ্রক্রিয়া ব্যয়বহুল হওয়ায় বিচারপ্রার্থীরা অনেক সময় অর্থের অভাবে বিচারপ্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারে না। ফলে ন্যায়বিচারপ্রাপ্তি থেকে তারা বঞ্চিত হয়।

কোনো ব্যক্তি যেন ন্যায়বিচারপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত না হয় সে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আর্থিকভাবে অসচ্ছল, সহায়সম্বলহীন এবং নানাবিধ আর্থ-সামাজিক কারণে বিচারপ্রাপ্তিতে অসমর্থ বিচারপ্রার্থীর ন্যায়বিচায় নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকার ‘আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০’ প্রণয়ন করেছে। এ আইন যথাযথভাবে বাস্তবায়নের জন্য সরকার সারাদেশের বিভিন্ন জেলায় পৃথক পৃথক জেলা আইন সহায়তা অফিস স্থাপন করেছে এবং অফিসগুলো কার্যকরের জন্য প্রতিটি অফিসে একজন সহকারী জজ পদমর্যাদার কর্মকর্তাকে পদায়নসহ প্রতিটি অফিসে তিনজন করে কর্মচারী নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করেছে।

‘আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০’-এর অধীনে প্রণীত আইনগত সহায়তা প্রদান নীতিমালা, ২০১১ অনুযায়ী কর্মক্ষম নন, আংশিক কর্মক্ষম, কর্মহীন বা বার্ষিক ৭৫ হাজার টাকার ঊধর্ে্ব আয় করতে অক্ষম মুক্তিযোদ্ধা ও বয়স্কভাতা পাচ্ছেন এমনসব ব্যক্তি সরকারের কাছ থেকে আইনগত সহায়তা পাওয়ার অধিকারী। তা ছাড়া ভিজিডি কার্ডধারী দুস্থ মা ও পাচারের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত নারী বা শিশু এবং দুর্বৃত্ত দ্বারা এসিডদগ্ধ নারী বা শিশু আইনগত সহায়তা পেতে পারেন। পাশাপাশি আদর্শ গ্রামে ঘর বা ভূমি বরাদ্দপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি, অসচ্ছল বিধবা, স্বামীপরিত্যক্তা ও দুস্থ মহিলা, উপার্জনে অক্ষম এবং সহায়সম্বলহীন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিও এ আইনের অধীনে সুবিধা পেতে পারেন।

তা ছাড়া আর্থিক অসচ্ছলতার দরুন আদালতে অধিকার প্রতিষ্ঠা বা আত্মপক্ষ সমর্থন করতে অসমর্থ ব্যক্তি, বিনাবিচারে আটক এমন ব্যক্তি যিনি আত্মপক্ষ সমর্থন করার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণে আর্থিকভাবে অসচ্ছল ও আদালত কর্তৃক আর্থিকভাবে অসহায় বা অসচ্ছল বলে বিবেচিত ব্যক্তি এবং জেল কর্তৃপক্ষ কর্তৃক আর্থিকভাবে অসহায় বা অসচ্ছল বলে সুপারিশকৃত কোনো ব্যক্তিও আইনের অধীনে আইনগত সহায়তা পাওয়ার অধিকারী। সর্বোপরি আর্থিকভাবে অসচ্ছল, সহায়সম্বলহীন, নানাবিধ আর্থ-সামাজিক এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত অসচ্ছলতার কারণে অধিকার প্রতিষ্ঠার মামলা পরিচালনায় অক্ষম ব্যক্তিরা আইনগত সহায়তা পাবেন।
আইনি সহায়তাপ্রাপ্তির যোগ্যতাসম্পন্ন যে কোনো ব্যক্তি তার নাম, পূর্ণ ঠিকানা এবং সহায়তা চাওয়ার কারণ উল্লেখ করে নির্ধারিত ফরমে বা সাদা কাগজে আবেদন করবেন। তবে যে বিষয়ে সহায়তা চাওয়া হচ্ছে তা সুপ্রিমকোর্টের কোনো বিভাগে বিচারাধীন হলে সে ক্ষেত্রে বিচারপ্রার্থী আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর সভাপতিত্বে গঠিত জাতীয় আইনগত সহায়তা বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করবেন।

সুপ্রিমকোর্ট ছাড়া অন্য কোনো আদালতে মামলাটি বিচারাধীন হলে সরাসরি জেলা ও দায়রা জজের সভাপতিত্বে গঠিত ‘জেলা আইনগত সহায়তা কমিটি’র কাছে আবেদন করতে হবে। তবে উপজেলা চেয়ারম্যানের সভাপতিত্বে গঠিত উপজেলা আইনগত সহায়তা কমিটি অথবা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের সভাপতিত্বে গঠিত ইউনিয়ন আইনগত সহায়তা কমিটির কাছেও আবেদন করা যাবে। জেলা আইনগত সহায়তা কমিটি কারো আবেদন অগ্রাহ্য করলে বা বাতিল করলে সে সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আবেদনকারী জাতীয় আইনগত সহায়তা পরিচালনা বোর্ডের কাছে পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে আবেদন করতে পারবেন।

জনগণকে ‘আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০’ সম্পর্কে অবগত এবং অসহায় বিচারপ্রার্থীদের আইনগত সহায়তা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করতে প্রতি বছরের মতো এ বছরও ২৮ এপ্রিল সারাদেশে সরকার যথাযথ গুরুত্বসহকারে জাঁকজমকপূর্ণভাবে জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস উদযাপন করে। কিন্তু যাদের জন্য এ দিবস পালন আর এ আইন প্রণয়ন করা হয়েছে, তারা এ থেকে কতটুকু উপকৃত হয়েছেন? যদি সহজ-সরল হিসাবও করা হয় তবে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হবে যে এ আইন খুব সামান্যই তাদের কাজে লেগেছে।

কারণ অধিকাংশ মানুষ এ আইন সম্পর্কে যথেষ্ট অবগত নয়। আবার যারা এ আইন সম্পর্কে কিছুটা ধারণা রাখেন তারাও অস্পষ্ট ধারণার কারণে এ আইনের অধীনে সহায়তা নেন না। এমনকি তৃণমূল পর্যায়ে উপজেলা ও ইউনিয়নে যে আইনগত সহায়তা কমিটি আছে সে বিষয়েও খুব কম মানুষই ওয়াকিবহাল। আরেকটি দুঃখজনক বিষয় হলো, কমিটির সদস্যরাও তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে সঠিকভাবে অবগত নন। তা ছাড়া সহায়তাপ্রাপ্তিতে যে জটিল ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়, তাতে বিচারপ্রার্থীরা সহায়তা নেয়ার আগ্রহও হারিয়ে ফেলেন। আইনগত সহায়তা দেয়ার জন্য যেসব প্যানেল আইনজীবী রয়েছেন, তাদের সংখ্যা অনেক কম এবং তাদের সম্মানীর পরিমাণ যৎসামান্য হওয়ায় মামলা পরিচালনায় তাদের আন্তরিকতা কম থাকে। এসব কারণে যথেষ্ট পরিমাণ অসহায় বিচারপ্রার্থী থাকা সত্ত্বেও প্রতি বছর সরকার কর্তৃক বরাদ্দকৃত অর্থের অনেকাংশই অব্যবহার্য থেকে যায়।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয়লাভের অধিকারকে জনগণের মৌলিক অধিকার হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। নাগরিকদের এ মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় ‘আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০’ বাস্তবায়নের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে রেডিও, টেলিভিশন, সংবাদপত্রসহ অন্যান্য গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারের মাধ্যমে জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে। আইন, বিধি ও অন্যান্য তথ্যসংবলিত ক্ষুদ্র পুস্তিকা প্রকাশসহ সেমিনার, কর্মশালা ও জনসচেতনতামূলক অনুষ্ঠান ও ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে আইনগত অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আইনগত সহায়তা জনগণের দোরগোড়ায় পেঁৗছাতে সরকারকে অনেক বেশি আন্তরিক হতে হবে।