ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত জামাত শিবিরের বিচার করে জাতিকে দায়মুক্ত করার দাবী বাঙ্গালী জাতি দীর্ঘদিন থেকেই করে আসছিল। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর স্বদিচ্ছার অভাবে তা হয়ে উঠছিল না। অবশেষে ৯ম সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে মহান স্বাধীনতায় নেতৃত্ব দেয়া রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ যখন মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের প্রতিজ্ঞা করেছিল তখন বাংঙ্গালি জাতি খুশিই হয়েছিল।

ভেবেছিল যে রাজনৈতিক দল নেতৃত্ব দিয়ে দেশের স্বাধীনতা অর্জন করতে পারে, সে রাজনৈতিক দল নিশ্চয় তাদের কথা রেখে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারও করতে পারবে। তাইত বাঙ্গালী জাতির প্রানের চাওয়াকে বাস্তবে রূপ দিতে ভূমিধ্বস সমর্থন নিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ সরকার গঠন করেছিল।

সরকার গঠনের পর আন্তরিকতা সহকারে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের জন্য সরকার সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রস্তাব পাশ করেছিল। তারপর ট্রাইবুন্যাল আইন সংশোধন, ট্রাইব্যুনাল গঠন, তদন্ত সংস্থা গঠন, প্রসিকিউটর নিয়োগ, ট্রাইব্যুনালের বিচারক নিয়োগসহ বিচার কাজ পরিচালনায় সরকারের ধীরে চল নীতিতে ধাবমান হতে থাকে।

তাছাড়া বিভিন্ন বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্তহীনতা ও ট্রাইব্যুলানের অপরিপক্বতার বিষয়ে দেশ বিদেশের সমালোচনা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধীদের ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম প্রশ্নবিদ্ধ করার আপ্রাণ চেষ্টার মধ্যেও সরকারের মেয়াদের শেষের দিকে বিচার কার্যক্রম বেশ খানিকটা গতিশিলতা পায়। ফলে বেশ কয়েকজন অপরাধীয় বিচার কার্যক্রম ট্রাইব্যুনাল শেষ করতে সমর্থ হন এবং চুড়ান্ত বিচার শেষে একজন অপরাধীর ফাঁসি কার্যকর হয়।

যদিও ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রমের স্বচ্ছতার বিষয়ে শুরু থেকেই দেশি বিদেশি মানবাধিকার সংস্থা প্রশ্ন তুলে আসছে এবং বিচার কার্যক্রম বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছিল তার পরও সরকারের আন্তরিকতা ও বাংঙ্গালি জাতির প্রানের চাওয়াকে সম্মান জানিয়ে ট্রাইব্যুনাল তার বিচার কার্যক্রম নিজস্ব গতিতে চালিয়ে নিয়েছে।

যদিও বিচার কার্যক্রম চলাকালীন অপরাধী সংগঠনের জালাও পোড়াও এর মত ধ্বংসাত্ত্বক কার্যক্রমের ফলে দেশে এক ধরনের ভীতিকর অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। যা অবশ্য সরকার খুব দক্ষতার সাথে সামাল দিতে সক্ষম হয়েছে। একপর্যায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার কাজ সমাপ্ত হওয়ার আগেই সরকারের মেয়াদ শেষ। তবে কি আর বিচার কার্যক্রম সামনের দিকে এগুবে না?

মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আবারো বাংলাদেশ আওয়ামীলীগকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসানোর আহবান দলটির। কিন্তু ক্ষমতায় থাকাকালীন নজীরবিহীন দূর্নীতির দায়গ্রস্ত দলটির প্রতি জনগনের আস্থা হারিয়ে যাওয়ায় একরকম ভোটারবিহীন একতরফা নির্বাচনে দলটি ক্ষমতায় আসে। তার পর শুরু হয় দলটির নতুন খেলা।

মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের দাবীতে সোচ্ছার সংগঠনগুলোর উপর চলতে থাকে সরকারের দমন প্রীড়ন। মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের দাবীতে গড়ে উঠা অরাজনৈতিক সংগঠন গণজাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে চলতে থাকে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র। তাদের উপর চলতে থাকে পুলিশী এবং সরকারের ক্যাডার বাহীনি ছাত্রলীগের নগ্ন আগ্রমন।

অবশেষে বাঙ্গালি জাতির আজন্মলালিত স্বপ্নের ওপর আসে মরণ আঘাত। তাও আবার সরাসরি সরকারের নিকট থেকেই। মানবতা বিরোধী অপরাধের দায়ে জামাতে ইসলামীর বিচারের দাবী যেখানে বাঙ্গালী জাতির প্রানের দাবী এবং সেই দাবীর প্রতি সম্মান জানিয়ে যখন সরকার তার বিচারের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। একইসাথে জামাতের বিরুদ্ধে মানবতা বিরোধী অপরাধে যুক্ত থাকার তথ্য প্রমান সংগ্রহের জন্য তদন্ত সংস্থা দীর্ঘ ছয় মাস অক্লান্ত পরিশ্রম করে তথ্য প্রমানসহ প্রতিবেদন জমা দেয়।

ঠিক তখনই সরকার জামাতের বিরুদ্ধে মানবতাবরোধী অপরাধের বিচারে অনীহা প্রকাশ করে। খোড়া কিছু অজুহাতে সরকার জামাতের বিচার করা থেকে সরে আসার ঘোষণা দেন। বিশ্বের ইতিহাসে যেখানে বিভিন্ন যুদ্ধাপরাধি সঙ্গগঠনের বিচার করার নজীর অহরহ দেখা যায় সেখানে সরকার কেন জামাতে ইসলামীর বিচার করা থেকে সরে আসতে চাচ্ছে?

আইনের অপর্যাপ্ততার যে দোহায় দিয়ে সরকার পিছিয়ে আসতে চাচ্ছে তা কতটা যৌতিক? যেখানে সরকার চাইলে নিমিষেই আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধন করতে পারে। তাহলে কি জামাতের বিচার করা থেকে সরে আসায় সরকারের কোন গভীর স্বার্থ জড়িত রয়েছে? তবে কি সরকার ক্ষমতায় টিকিয়ে থাকার জন্য জামাতের মত একটি মানবতা বিরোধী সন্ত্রাসী রাজনৈতিক দলের সাথে গোপন আঁতাত করতে যাচ্ছে?