ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

ধর্ষনের পর ছাদ থেকে গৃহকর্মীকে ফেলে হত্যার অভিযোগের ঘটনায় কাফরুল থানার অপমৃত্যুর মামলা রেকর্ড করার খবরটি দেখে আমি মোটেও বিস্মিত হইনি। কারণ প্রতিদিন চারিদিকে পুলিশের এত অনিয়ম, দুর্নীতি আর ক্ষমতার অপব্যবহারের কথা শুনতে শুনতে কেমন যেন আর কোন কিছুতেই অবাক হইনা। সবকিছুই কেমন যেন স্বাভাবিক মনে হয়। তা না হলে কি এত বড় একটা ঘটনার পরও আমি নির্বিকার হয়ে অফিসে বসে দাসত্ব করি?

গরীব গৃহকর্মীকে গৃহকর্তার ছেলে, মাঝে মাঝে গৃহকর্তা নিজেও ধর্ষণ করবে, মেয়েটি যেন বিষয়টি কাউকে না জানায় সেজন্য প্রলোভন, ভয়-ভীতি দেখাবে, প্রয়োজন হলে হত্যা করে লাশ গুম করবে অথবা ছাঁদ থেকে দূর্ঘটনা বসত পড়ে গিয়ে নিহত হয়ছে বলে প্রচার করবে, আর ঘটনাটি ধামাচাঁপা দিতে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা আর পুলিশ প্রশাসন গৃহকর্তাকে সহযোগিতা করবে,গৃহকর্মীর গরীব অভিভাবককে কিছু অর্থ প্রদানের লোভ অথবা ভয়ভীতি দেখিয়ে স্থানীয় থানায় একটি অপমৃর্ত্যুর মামলা নথিভুক্ত করবে- এ আবার নতুন কি?

একইসাথে দু’-একটি সংবাদপত্র তাদের কাটতি বাড়ানোর জন্য দু-একদিন নিউজ করে ক্ষান্ত দিবে। আর কিছু তথাকথিত মানবাধিকার সংস্থা ভবিষ্যৎ প্রজেক্টের আশায় কিছুদিন চিৎকার চেঁচামেচি করে তাদের নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে সচেষ্ট হবে। পরিশেষে গৃহকর্মীর বাবা-মা কিছুদিন চোখের জল ফেলে একসময় বাস্তবতার যাঁতাকলে সবকিছু ভুলে জীবন সংগ্রামে মগ্ন হবে।

গৃহকর্তার যে ছেলেটি মেয়েটিকে ধর্ষণপূর্বক হত্যা করল সে কিন্তু বহাল তবিয়তে রইল, তার কোন বিচার হল না। কারণ আমাদের সমাজ ব্যবস্থা তাকে সেই সুরক্ষা প্রদান করেছে। আমাদের পুলিশ-প্রশাসন, আইন-আদালত তার ভাষায় কথা বলে। কারণ সে ক্ষমতাশালী পরিবারের সন্তান। তার বাবা জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের যুগ্ম সচিব আহসান হাবিব। তার বাবার টাকা আছে, তার বাবার ক্ষমতা আছে। তার বাবা চাইলেই তার ক্ষমতা দিয়ে তার টাকা দিয়ে পুলিশ-প্রশাসন, আইন-আদালতকে নিমিশেই তার পক্ষভুক্ত করতে পারে।

আজকে যে ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই লিখাটির অবকাশ সে ঘটনার শিকার গৃহকর্মীর মা ফুলবানু মিরপুর-১৩ নম্বরে সরকারি কর্মকর্তাদের আবাসিক এলাকা ন্যাম গার্ডেনের তিন নম্বর ভবনের ৪০৩ বি-ফ্লাটে বসবাসরত জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের যুগ্ম সচিব আহসান হাবিব এর বাসায় কাজ করত। কয়েক দিন ধরে অসুস্থ থাকায় তিনি তার দ্বিতীয় সন্তান জানিয়াকে গতকাল সকালে ওই বাসায় কাজে পাঠান। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে পুলিশ তাঁকে খবর দিলে তিনি ওই বাসায় গিয়ে দেখেন যে, মেয়ের লাশ পড়ে আছে আর মেয়ের শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাতের চিহ্ন। তার অভিযোগ গৃহকর্তার ছেলে তার মেয়েকে ধর্ষণ করে হত্যা করেছে। সে কাফরুল থানা পুলিশের কাছে মামলা নেয়ার জন্য কান্নাকাটি করেছে, কিন্তু পুলিশ মামলা নেইনি। বরং পুলিশ নিজেরা সুনির্দিষ্ট অভিযোগে মামলা গ্রহণ না করে একটি অপমৃত্যুর মামলা রেকর্ড করে নামকাওয়াস্তে ময়না তদন্ত করে ভিক্টিমের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছে।

কি সাংঘাতিক বিষয়! একটি শিশু কন্যাকে ধর্ষণপূর্বক হত্যা করা হলো অথচ পুলিশ কোনো মামলা গ্রহণ করল না! অথচ ন্যায়বিচারের স্বার্থে পুলিশের সর্বপ্রথম দায়িত্ব ছিল ঘটনাটির জানার পর প্রথমে মামলা নথিভুক্ত করে সুরৎহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত ও ময়না তদন্তসহ অন্যান্য আইনগত বিষয়গুলো সম্পন্ন করা। একই সাথে ঘটনার সাথে জড়িত অভিযুক্তদের গ্রেফতার করে আইনের হাতে সমর্পণ করা। বিচার প্রাপ্তির প্রথম পর্যায়ে পুলিশ প্রশাসন আজ যে ব্যার্থতার (নাকি ইচ্ছে করে ঘটনাটিকে অন্যখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা) পরিচয় দিয়েছে তার জন্য এখন অভিযুক্ত পুলিশদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া দরকার।

আজ যদি মেয়েটি গরীব ঘরের অসহায় মেয়ে না হয়ে কোন ক্ষমতাবান-বিত্তশালীর মেয়ে হত, তাহলে কি পুলিশ সুনির্দিষ্ট অভিযোগে মামলা না নিয়ে অপমৃত্যুর মামলা নথিভুক্ত করতে পারত? আমাদের মহান সংবিধানে ধনী-দরিদ্র, উঁচু-নিচু, জাত-পাত নির্বিশেষে যে সবার ন্যায়বিচার পাবার অধিকারের স্বীকৃতি দিয়েছে আজ এই মেয়েটির ক্ষেত্রে কোথায় সেই অধিকার? তবে কি মেয়েটি কখনোই ন্যায় বিচার পাবে না? তবে কি বিচার শুধু ক্ষমতাশালীদের জন্য?

এখন পর্যন্ত কোন মানবাধিকার সংগঠনকে অথবা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে ঘটনাটি নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে দেখলাম না। অথচ আগামীকাল ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপন নিয়ে সবাই ব্যস্ত! হায়রে মানবাধিকার!