ক্যাটেগরিঃ মানবাধিকার

শুরুতেই একটা লাইন ধার করে নেই, ‘দরিদ্রের বিশেষ কোনো জাত হয় না, বিশেষ কোনো ধর্ম হয় না, দরিদ্রের জাত ও ধর্মের নাম, ‘দারিদ্র্য’ (কৃতজ্ঞতা- অসিত দা)। অগ্নিদগ্ধ মৃত্যুর গন্ধে নাক ডুবিয়ে স্থির হয়ে বসে থাকাটা শেষতক হয়ে উঠলোনা। চোখে কেবলই ভেসে উঠছে একপাল মনুষ্য পিপীলিকা, দলবেঁধে ছুটে চলছে, কখনো ঢুকছে কখনো বা বের হচ্ছে। সংখ্যার অনুপাতে এই দলে হতচ্ছাড়া স্ত্রী প্রজাতিই বেশি। কারো বাপ নেই, কারো মা নেই, কারো বা অতি ভালবাসার স্বামীটিও নেই। কারো বা বাপ-মা-ভাই-স্বামী-বোন সবই আছে, ফুটফুটে দু’একটা ছেলেপুলেও আছে। তারপরও যেন কিছুই নেই। সভ্যতার অন্যতম বাহক ‘লেবাস’ এর কারিগর তাঁরা। জীবনের সবটুকু দীনতা নিয়ে আকড়ে ধরে আছে আমাদের ভঙ্গুর অর্থনীতির একটি শক্তিশালী চাকাকে, এই চাকার নাম ‘তৈরি পোশাক শিল্প’।

বিশ্বের নানা কোণে প্রচুর নাম ডাক আমাদের এই শিল্পের, বিশ্ব-চাহিদার অন্যতম সংস্থানকারী আমরা। প্রসঙ্গত কানে হুর-ফোঁড় করছে, দারিদ্রের অন্য নাম- ক্ষুধার তাড়নায় দেড়শো টাকা রোজে সেলাই-দিদিমণীদের অগ্নিবলী। আমার বঙ্গদেশে দারিদ্র্য মানেই আজ মৃত্যুর উছিলা খোঁজা। নানা ছলে-চালে-কৌশলে রাজ্যের যতো অনাচারের বোঝা আমরা কেবলি কেন যেনো বারবার ঐ কপালপোড়াদের ঘাড়ে দিয়েই নিশ্চিন্ত হই। ওরা মরুক আগুনের কাঁচামাল হয়ে, ওরা মরুক ঠিক্কা মন্ত্রণালয়ের ঠিকাদারের কেয়ামত আকৃতির আকাশ-সেতু কিংবা উড়ালসেতুর ঠিক্কার চাপায় পড়ে। ওরা মরুক নদীমাতৃক বাংলার রুপালী নদীর লঞ্চ-ফেরীতে, বাসের তলায়, ট্রাকের তলায়, ঝড়-সিডরে অথবা র‍্যাব-পুলিশের ‘লক্ষ্যভ্রষ্ট’ গুলিতে পাখীর মতো। ওরা মরে ক্ষমতার চিরায়ত দ্বন্দের চিপা-গলির সিঁড়ির তলায়- লগির গুতোয়, বৈঠার চাম্পায়। আবার সংগ্রামে-যুদ্ধে-আন্দোলনেও ওরাই মরে। বারবার শুধু ওদের ঘরেই ‘ও বাজান রে…’ নামক কলিজা-চেঁড়া আর্তনাদ উঠে। মাঝে মাঝে তাঁদের জীবনের দাম হয়- একটা ছাগল, এক লাখ টাকা, দুই বান টিন, কিছু ত্রাণের চাল-গম এবং হালের নতুন দাম ‘এক দিবস শোক’।

অবস্থাদৃষ্টে আমাদের গা-সওয়ার মাত্রা এমন পর্যায়ে এসে ঠেকেছে যে- আমরা যেন ধরেই নিয়েছি এই মানুষগুলো মরেই একটা ছাগল, এক লাখ টাকা কিংবা তাঁদের স্বরণে এক দিবস শোক পালনের জন্যে। মানুষের মৃত্যুকে ঘিরেও যে উৎসব আর বাণিজ্য মাথা তুলে দাঁড়ায়, তা এই দেশের আজব কিসিমের দায়সারা গোছের হর্তা-কর্তাদের কান্ড-কীর্তি না দেখলে সভ্য বলে স্বীকৃত কোনো মানুষের পক্ষে বিশ্বাস করা কঠিন। এরা লঞ্চ ডুবলে বলে ‘উদ্ধারকাজে অমুক নেমেছে- তমুক তদন্ত কমিটি হয়েছে’, বাসে চাপা দিলে বলে ‘ড্রাইভারতো লাইসেন্স নেয়ার সময় বলেছিল গরু-ছাগল চিনে’, র‍্যাব-পুলিশে ফুটোস কিংবা হাওয়া করে দিলে বলে ‘ওমা সাংবিধান কি তাদের আত্নরক্ষার অধিকার দেয়নি? অথবা অমুকের লাপাত্তা হওয়ার কোন নির্ভরযোগ্য খবর আমাদের কাছে নেই কিংবা মলম বা অজ্ঞান পার্টির কাম’, আর আগুন লাগলে বলে ‘এটা অমুকের ষড়যন্ত্র, তমুকের ইন্ধন’। প্রশ্ন জাগে, যেখানে নাগরিকের জীবন নামক বস্তুটির টিকে থাকার কোনো গুণগত নিশ্চয়তা নেই- সেখানে একটি রাষ্ট্র কিংবা সমাজের সার্বজনীন অস্তিত্বের প্রয়োজনটা আসলে কী?

জাত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের নিরাপদ জীবন-যাপন নিশ্চিত করা যেখানে রাষ্ট্রের খুবই প্রাথমিক এবং মৌলিক অঙ্গিকার, সেখানে রাষ্ট্র নামক সার্বভৌম সেবককে আমরা কার কার পদ লেহন করার মোক্ষম সুযোগ করে দেই প্রতি পাঁচ বছর পর পর? বস্তির ঘিঞ্জি টিনের ঘরে ছেলে-পুলে-স্বামী নিয়ে পুরোদস্তুর সংসারী কিশোরীটি ১৪-১৫ ঘণ্টার অমানুষিক পরিশ্রম শেষে যখন গা এলিয়ে দেয় নোংরা-আধানোংরা বিছানায়, সে কি একটিবারও ভাবে- রুটি-ভাতের জোগানের পাথেয় নিজের কটকটা শীর্ণ শরীরটার একটা ‘নূন্যতম সুন্দর’ মৃত্যুর নিশ্চয়তাও এই রাষ্ট্র দিতে অপারগ? যে রাষ্ট্রের কোষাগারে ‘ডলার’ নামক এক সুন্দর মুদ্রার জোগান দিতে নিজের সহজ-সরল জীবনটাকে পুড়িয়ে অঙ্গার চলেছে সে, সেই চক্রে নিজের কংকালের অবশিষ্ট মাংসটুকুও পুড়িয়ে দগ্ধ-বিদগ্ধ লাশ হওয়ার প্রস্তুতিটুকুও কি তাকেই নিতে হবে? এই সেলাই-দিদিমণীরা জীবনের ঠিক কতটা পথ পাড়ি দিয়ে ঢাকা-গাজীপুর-মিরপুর-আশুলিয়ায় বেঁচে থাকার ঠিকানা খুঁজে নেয়, তার খবর কবে কোনকালে আমাদের রাষ্ট্রের কানে আঘাত হেনেছে? ইস্ত্রী করা পায়জামা-পাঞ্জাবী পড়ে জনস্রোতে বয়ান দিতে বড় আরামবোধ করি আমরা, খবর রাখি কি পায়াজামার মাঝখানের যে সেলাইটা ‘ইজ্জতের প্রস্থান’ আটকে দিয়েছে সেটা কার হাতের নরম তালু পাথর করে এসেছে?

আমরা উপরতলার মানুষ, উপর থেকে আরও উপরে উঠাই আমাদের অভীষ্ট লক্ষ্য। আমরা ব্যস্ত হাততালি কুঁড়াতে, হাতের তলায় রীতি-নীতি পিষ্ট করে কড়কড়ে ডলার-পাউন্ড কামাতে, আমাদের বিবিদের তুষ্ট রাখতে, বাচ্চাদের ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে যাতায়াত নিশ্চিত রাখতে। অথচ খুব বেশি কি কষ্ট- আমাদের ফ্যাশন-ভূষণ আরাম-আয়েশের অবিরাম নিশ্চয়তা দিয়ে যাচ্ছে যে মানুষগুলো, তাঁদের আর না পারি অন্তত মূল্যবান জীবনটার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে? কই, গ্রামীণফোনের সি.ই.ও টরি জনসনেরা তো কেউ আগুনে পুড়ে পরিচয়হীন লাশ হয়ে থাকেনা? আমরা নিজেদেরকে শায়েস্থা খাঁ-দের জাত বলে পরিচয় দিতে পছন্দ করি। শায়েস্থা খাঁর আমলে চাল-ডাল-ভূষি পাই-পয়সায় মিললেও, মানুশের লাশ এত সস্থায় মিলতো এমন নজির কেউ দিবেনা। বিদেশে আমরা সুনাম কুড়াচ্ছি ‘বিশাল সম্ভাবনার শ্রমবাজার’ হিসেবে, আসলে ‘বিশাল সস্থার শ্রমবাজার’।

আমাদের সস্থা শ্রম নিয়ে কতো কচ্ছপ যে কতো তেলেসমাতি খেলে- একবার এই দেশ আমাদের নেয়না তো আরেকবার ঐ দেশ নেয়না। একবার মালয়েশিয়া নেয়না, তো আবার দুবাই নেয়না। পেটের ক্ষুধায় বউ চেনা দায়- এই যখন আমাদের শ্রমবাজারের অবস্থা তখন সুবিধা তো মানুষ নেবেই! তৈরি পোশাক রপ্তানি ব্যবসায় জড়িত থাকার কারণে পরিচয় সূত্রে এমন অনেক নালায়েকও দেখেছি যারা সময়মতো ডেলিভারী দিতে না পারলে কিংবা লোকসান দেখানোর জন্যে- যেদিন কারখানায় শ্রমিক কম থাকে সেদিন স্ব-উদ্যোগে নিজ কারখানায় আগুন লাগিয়ে দেয়, এমন কি অগ্নিকান্ডকে দূর্ঘটনা হিসেবে বিশ্বাসযোগ্য করানোর জন্য নূন্যতম কতজনের মৃত্যু নিশ্চিত করতে হবে তাও ঠিক করে দেয়! এর চেয়ে জঘন্য, ঘৃণ্য, বর্বর কাজ সভ্য লেবাসে আর কি হতে পারে তা রিতিমত পরাবাস্তব চিন্তা। দেখে মনে হয়, দিদিদের হাতে তৈরি একটা পোশাকের দামও যেনো দিদির জীবনের দামের চেয়ে বেশি। সস্থা হলে দিদি সস্থা, আমাদের লোভ-লালসা তো আর সস্থা নয়। সস্থা দিদির লোভে শায়েস্থা খাঁর শ্রমবাজারে মৌমাছির মতো ধেয়ে আসছে ভীন দেশী ক্রেতারাও। চীন থেকে আসছে, হংকং থেকে আসছে। আসছে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা জাপান থেকে। মাসিক তিন বা চার হাজার টাকার মাত্র একটা দিদিমনি দিয়ে ‘তিন বা চার হাজার ডলারের’ সভ্য লেবাস বানানোর মওকা আর কোন দেশে পাওয়া যাবে বলুন! এটা অর্থনৈতিকভাবে দূর্দশাগ্রস্থ একটা জাতির জন্য বিশ্বায়নের এই যুগে নিঃসন্দেহে বিরাট আশির্বাদ, আর আমাদের জন্য আশির্বাদ মানেই যেন লক্ষীর হাতে বিষ। আশির্বাদ মানেই যেন মৃত্যুর খেলা, লাশের মিছিল। আমরা লাশ নিয়ে নৃত্য দেখতে দেখতে ক্লান্ত।

বায়ান্ন, একাত্তর, নব্বই সবই আমাদের লাশে পরিপূর্ণ। সীমান্তে লাশ, পিলখানায় লাশ, বেডরুমে লাশ, নদী-নালা-ডোবায় লাশ, গণমানুষের মিছিলেও লাশ। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়েও লাশ। লাশ মানেই জীবনের প্রস্থান, চিরতরে একটি মায়ের বুক হাহাকারে ভরে যাওয়া। পাড়া গাঁয়ের বুড়ির সন্তান আর আমাদের দুধ-ভাতের প্রাচুর্য্যের সন্তানের মাঝে আদরে-যত্নে অসুখে-শোকে যেমন কোন পার্থক্য নেই, অট্রালিকার লাশ আর বস্তির টিন-শেডের লাশের মাঝেও গুণগত কোন পার্থক্য নেই। অট্রালিকায় মরলে পালা করে শোক-বিলাপ হয়, আর দিদিমণী মরলে ‘লাশটা আসলে কার?’ এই প্রশ্ন ঘুরেফিরে উঠে- এটুকুই পার্থক্য। আমরা এই পার্থক্যের অবসান চাই। জীবন হারাতে হারাতে রাষ্ট্রের কাছে আমাদের দাবি দিন দিন আজ এক অশুভ প্রার্থনায় গিয়ে ঠেকেছে- ‘রাষ্ট্র, বাঁচতে না দিস না দে- অন্তত চেহারা সুরত অক্ষত রেখে মরতে দে’। ইতোমধ্যে রাষ্ট্র তার নানা অযুহাত দেখাতে শুরু করেছে। একজন বলে দিয়েছেন ‘এর পেছনে একটি বিশেষ গোষ্টির সুনির্দিষ্ট ষড়যন্ত্র এবং পরিকল্পনা রয়েছে’। বেশ ভালো কথা, রাষ্ট্রের কাজটা তাহলে কী? তাজরীন ফ্যাশন হাউসেইতো আর স্বাধীনতার পর প্রথম আগুন লাগেনি, বাহদ্দরহাটের এটাইতো প্রথম গার্ডার ভেঙ্গে পড়া নয়। বাস-ট্রাক-রেল তো আর এমন কোন নতুন দূর্ঘটনা নয়। লঞ্চডুবি আর নৌকাডুবিও তো আর প্রথম কোন ঘটনা নয়। আমাদের কপাল এতো ভালো যে, লাশের গন্ধযুক্ত বাতাসেও আমরা অবলীলায় পেটভরে শ্বাস নিতে পারি, চাঁদনী রাতে গলফ কোর্টে সিগারেট টেনে যেতে পারি।

বিনিয়ামিন
ঢাকা, ২৭ নভেম্বর, ২০১২ সাল।