ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

ফ্যাক্টরি বন্ধ

লেবার সিয়িং নোটিশ টু দ্য ফার্ম

উন্নয়ন-উৎপাদন কিংবা উৎপাদন-উন্নয়ন পরস্পর সন্নিবিষ্ট। পুঁজিবাদী সমাজে উৎপাদনের আখ্যানভাগ জুড়ে আছে শিল্পোৎপাদন। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে শিল্পে বেশ অগ্রগতি সাধন করেছে। পাশ্চাত্য ধনবাদী অর্থনীতির অনুসরণ-অনুকরণে কৃষিভিত্তিক সমাজ কাঠামো থেকে বেরিয়ে এসে শিল্পে ব্যাপকভাবে পুঁজি বিনিয়োগে সে তৎপর রয়েছে। এদেশের উল্লেখ করার মত শিল্প হলো গার্মেন্টস শিল্প। জিডিপিতে এর অবদান ক্রমবর্ধমান। এ শিল্পের প্রায় বিশ শতাংশ উৎপাদন রাজধানীর অদূরে আশুলিয়া এলাকায় সম্পন্ন হয়ে থাকে। দু:খজনক যে বেশকিছু দিন যাবত শ্রমিক অসন্তোষের জের ধরে আশুলিয়ার কারখানাগুলো বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। থেমে গেছে উৎপাদন। স্থবির হয়ে গেছে এ কারখানার চাকা। নিরবতা আর শূন্যতা বিরাজ করছে কর্মমুখর প্রাণচাঞ্চল্যময় এ শিল্পাঞ্চলে। জিবনের কোলাহলের বিপরীতে শোনা যাচ্ছে সেলাই দিদিমনিদের কান্না। লাখ লাখ শ্রমিক ও তাদের উপর নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের খাদ্য সংস্থান হুমকির মুখে। স্টেক হোল্ডার তথা মালিক, শ্রমিক, সরকার সবাই শিল্পের-নিজেদের-দেশের উন্নয়ন,অগ্রগতি ও ভবিষ্যত নিয়ে যার পর নাই উদ্বিগ্ন ও শংকিত। কবে কাজ ফিরে পাবে আমাদের ক্রন্দনরত শিল্প কন্যারা? সবেগে ঘুরবে কবে উন্নয়ন-উৎপাদনের চাকা?

যে শ্রমিকেরা একদিন কাজ না করলে ঠিকমত রুটি-রুজির সংস্থান করতে পারেনা তাদের পক্ষে কিভাবে এত সহিংস ও মারমুখি হয়ে উঠা সম্বব তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। তাছাড়া প্রতিটি অসন্তোষ কেন হা-মীম গ্রুপের কারখানা থেকে শুরু হচ্ছে তার পেছনেও হয়ত যুক্তিযুক্ত কারণ থাকতে পারে। মালিক পক্ষই বা কেন সমঝোতার মাধ্যমে দ্রুত কারখানাগুলো খুলে দিতে আগ্রহী নয়। খোদ সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আশুলিয়া গিয়ে শ্রমিক-মালিক বৈঠক করেও কেন এর সুরাহা করতে পারলেন না, এ প্রশ্নও অপ্রাসঙ্গিক নয়। আমিনুল ইসলামের হত্যাকাণ্ড এ অসন্তোষকে উস্কে দিয়েছে এমন কথাও শোনা গেছে। এসব জিজ্ঞাসার জটলা খুলতে কিছুটা হলেও সাহায্য করবে এ শিল্পের সাথে জড়িত বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গের দেয়া বিভিন্ন মন্তব্য-বক্তব্য থেকে। পাশাপাশি সম্প্রতি সরকারের কাছে জমা দেয়া একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন থেকে কিছুটা সহায়তা পাওয়া যেতে পারে। চলুন দেখি এ ব্যাপারে কে কি মন্তব্য করল-

বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি সালাম মুর্শেদী গতকাল বলেন, গার্মেন্ট শিল্প নিয়ে কি কি সমস্যা আছে তার সব কিছুই তো সরকার জানে। যদি দ্রুত এসব সমস্যা দূর করা না হয় তবে এ শিল্প সঙ্কট থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে না।

গতকাল বিজিএমইএ সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, গার্মেন্ট খাতকে একটা স্থিতিশীল অবস্থায় নিয়ে যেতে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। যদি বারবার কারখানা ভাঙচুর করা হয়, লুটপাট চালানো হয় তবে এ শিল্প ধ্বংস হতে বাধ্য।

শিল্প পুলিশের মহাপরিচালক আবদুস সালাম বলছেন, শিল্প পুলিশ যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ করছে। শিল্প পুলিশের তৎপরতার কারণে আগের চেয়ে বিক্ষোভের সময় জানমালের ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।

বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক জাহানারা বেগম বলছেন, কিছু শ্রমিক সংগঠন বিদেশীদের টাকায় কাজ করছে এটা সত্য। তবে সবাই এটা করছে এটা ঠিক নয়। সরকারের উচিত যারা দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করছে তাদের চিহ্নিত করা। মালিকরা অর্থবিত্তের মালিক হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। অনেক শ্রমিক নেতাকে ধরে নির্যাতন করা হচ্ছে। গোয়েন্দা সংস্থার লোকজনের হুমকির মুখে অনেক শ্রমিক নেতা নিজের বাড়িতে ঘুমাতে পারছেন না। গার্মেন্ট শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলামকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। শ্রমিক সংগঠনগুলো যাতে সাধারণ শ্রমিকদের স্বার্থ নিয়ে আর কথা বলতে না পারে এজন্য তাদের চরিত্র হনন করা হচ্ছে।

এবার নজর দেয়া যাক গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের দিকে। এ রিপোর্ট বলছে, বাংলাদেশের গার্মেন্ট খাতকে অস্থিতিশীল করতে তিনটি বিদেশী শক্তি তৎপরতা চালাচ্ছে। এই ৩ দেশের অর্থায়নে গার্মেন্ট খাতকে অস্থিতিশীল করতে কাজ করছে ৫টি শ্রমিক সংগঠন। এর সঙ্গে আছে ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সন্ত্রাসীদের তৎপরতা। গোয়েন্দারা জানাল, কতিপয় শ্রমিক সংগঠনের নেতারা মালিকদের শ্রমিক অসন্তোষের ভয়-ভীতি দেখায়ে মোটা অংকের মাসোহারা নিয়ে আসছে। তাদের ঢোকানো গার্মেন্টস কর্মীদের মাধ্যমে বিক্ষোভের ভয় দেখিয়ে এসব টাকা আদায় করা হচ্ছিল। বিজিএমইএ নেতারা বলছেন, এসব শ্রমিক সংগঠন সম্পর্কে সরকারকে একাধিকবার অবহিত করা হয়েছে। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে পাওয়া তথ্যের ব্যাপারে বিজিএমইএ’র এক নেতা বলেন, তারা যা বলেছে তা টু হানড্রেড পার্সেন্ট সঠিক।

নাম জানা না গেলেও গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ০৩ টি দেশের কথা বলা হয়েছে যারা কোটামুক্ত বিশ্বে গার্মেন্টসের বাজার ধরার জন্য এদেশের শিল্পকে ধ্বংস করে বা অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করে এদেশ থেকে এ শিলপকে সরিয়ে নিতে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে। এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তারা বেশ কিছু কারখানা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ঢাকা শহরে ২০ টির মত বায়িং হাউস চালু করেছে।

পঞ্চাশোর্ধ গার্মেন্টসের আড়ালে তারা এদেশের যাবতীয় তথ্য পাচার করছে। শিল্পমালিকদের দাবি তাদের চিহ্নিত ৫ টি শ্রমিক সংগঠনকে এসব বিদেশী শক্তি মদদ দিচেছ। মদদপুষ্ট এসব সমিতি দফায় দফায় শিল্পে অস্থিরতা তৈরি করছে। এসব সংগঠনের শিবোমণি হলো ওয়্যার এ্যান্ড ওয়্যার নামক একটি সংগঠন। এগুলো শ্রমিকদের ন্যায্য প্লাটফর্ম ট্রেড ইউনিয়ন গড়তেও বাধা দিচ্ছে। ঝুট ব্যাবসা নিয়ন্ত্রণে এক রাঘব বোয়ালের কথা বলেছে গোয়েন্দারা। তাকে আশুলিয়ার হামীম গ্রুপই একমাত্র ঝুট দেয় না। ফলে ভাইয়ের মাঝে মাঝে সাধ জাগে হামীমকে একটু আধটু শায়েস্তা করতে। বারবার হামীমের কারখানায় শ্রমিক বিক্ষোভের পেছনে ওই গডফাদারের হাত আছে কিনা তা জনগণ আমলে নিতে পারে। অন্যদিকে শিল্প পুলিশ অস্থিরতা রোধকল্পে তেমন ভূমিকা নিতে পারছে না ।অপর্যাপ্ত জনবল ও লজিস্টিক সাপোর্ট নিয়ে পুলিশের নতুন এ ইউনিট পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খাচ্ছে। তবে ঝুট ব্যাবসা থেকে মাসোয়ারা খাওয়ার অভিযোগ তাদের কর্মকান্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।শিল্প এলাকায় পুলিশের এ ইউনিটকে আরো আধুনিকায়ন, গতিশীল ও স্বচ্ছ করা দরকার।

অবশেষে আশার বাণী শুনালেন মাননীয় শ্রম প্রতিমন্ত্রি । আগামী শনিবারে আশুলিয়ার গার্মেন্টস খুলে দেওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী তিনি। আমরাও সে রকম আশা করে বসে আছি। তবে এ সময়ের মধ্যে বিষয়টির কার্যকর ও যৌক্তিক সমাধান সকলের কাম্য। বিজিএমইএ’র কথা ও কার্যকলাপে মনে হচেছনা যে ব্যাপারটির চূড়ান্ত সুরাহা ছাড়া তারা কারখানা খুলে দিবে। বরং গতকালই তো ঢাকর শিল্প মালিকরা কারখানা বন্ধ করে শফিউল ইসলামের কাছে প্রতীকী চাবি হস্তান্তর করেছে। হুমকি দিয়েছে প্রয়োজনে সারা দেশের শিল্প কারখানা বন্ধ করে দেবেন। অন্যদিকে শ্রমিক সংগঠনগুলো আশুলিয়াতে বিক্ষোভ করছে কারখানা খুলে দেয়ার জন্য। স্বরাস্ট্র প্রতিমন্ত্রির ভাষায় সরকার রেফারীর ভূকিমায় আছে। এ ভুমিকা পালনে তারা কতটুকু সফল হবেন সময় তা বলে দেবে। সব পক্ষের সমঝোতার এখন জরুরী। আর দোষী-দেশী বিদেশী যেই বা যে প্রতিষ্ঠান হোক না কেন তাদেরকে যথাপোযুক্ত শাস্তির ব্যাবস্থা করতে হবে।

রবার্ট টেড গার। একজন সমাজ দার্শনিক। তার হিউম্যান রেবেলিয়ন গ্রন্থে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন মানুষ কেন বিদ্রোহ বিক্ষোভ করে।তিনি প্রত্যেক মানুষের সমস্যা, চাওয়া-পাওয়া,আচার-ব্যাবহার, অভ্যাস, রুচিবোধ, দিনযাপন প্রভৃতি বিষয়গুলোকে দু’ভাগে বিভক্ত করেছেন:কেন্দ্র ও পেরিফেরী বা প্রান্ত। তার উল্লিখিত বিষয়গুলোর উপর প্রান্তিক পর্যায়ের কোন হুমকি বা চ্যালেঞ্জ আসলে সে তা মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু তা যদি তার কেন্দ্রের দিকে উদ্যত হয় সে তার প্রতিরোধ করে।প্রয়োজনে বিদ্রোহ করে। অহিংস থেকে সহিংস আন্দোলনের দিকে ধাবিত হয়। বিপ্লবে শামিল হয়। আর এগুলো করে তার টিকে থাকার জন্য।এটাই ইতিহাসের নির্মম সত্য । এটাই চ্যালেঞ্জ এ্যান্ড রেসপন্স থিওরী। উর্ধ্বমুখী দ্রব্যমুল্য, বেতন ভাতার অপ্রতুলতা, চাকুরির নিরাপত্তাহীনতা, জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের ভরণপোয়ণরে দায়বদ্ধতা, মাত্রাতিরিক্ত শ্রম, মহিলা শ্রমিকদের নিরাপত্তাহীনতা,কর্তৃপক্ষের অমানবিক আচরণ প্রভৃতির অভিঘাতে সাম্প্রতিককালে ফুঁসে ওঠে আশুলিয়ার শ্রমিক সমাজ। অবশ্য নিজ স্বার্থসিদ্ধির লক্ষ্যে কতিপয় মালিক,ঝুট ব্যাবসায়ী,শ্রমিক নেতা, বিদেশী দালাল ও অন্যান্য পক্ষ ইন্ধন দিয়ে পরিস্থিতিকে সংঘাত ও সংঘর্ষের দিকে নিয়ে যায়। যাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি সকলেরই কাম্য।তবে বিশেষ নজর দিতে হবে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি দাওয়ার প্রতি। কারণ গার্মেন্টস শিল্পের নিউক্লিয়াস কিন্তু মালিক বা সরকার পক্ষ নয়, নিগৃহীত, শোষিত শ্রমকেরা, আমাদের সেলাই দিদিমনিরা।তাদের দু’বেলা দু মুঠো খাবার সংস্থানে রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব রয়েছে। কারখানা খুলে দেয়ার আগে তাদের যৌক্তিক ও সময়পোযোগী মজুরি ও কর্মঘন্টা নির্ধারণসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধার নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে।তাদের জিবন যাত্রার মানোন্নয়নে এগিয়ে আসতে হবে।আর এতে করে বিদেশী বিনিয়োগ বাড়বে বৈ কমবে না।সম্প্রতি হিলারি ক্লিনটন, ইইউসহ অন্যন্য উন্নয়ন অংশীদারেরা বারবার এ বিষয় নিয়ে জোরালো বক্তব্য দিয়েছে। শুধুমাত্র মালিক-পুঁজিপতি শ্রেণীর স্বার্থ দেখলে চলবে না। লক্ষ্য রাখা উচিত যে, মালিক শ্রেণী কারখানা বন্ধ রেখেও নিজেদের অন্তত বাঁচিয়ে রাখতে পারবেন, শ্রমিকেরা পারবেন না।

ইট হ্যাজ টু বি ওপেনড

আর ষড়যন্ত্রী যারা । ব্যাক্তি হোক। প্রতিষ্ঠান হোক। তারা রাষ্ট্রদ্রোহী। কূচক্রে অংশগ্রহণকারী বিদেশী কারখানা ও বায়িং হাউসগুলো বন্ধ করে দিতে হবে। এক্ষেত্রে কোন আপোস পরবর্তীতে এ শিল্পকে মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ্য করবে। স্থানীয় অপরাধীদের ওদের দোসর বিবেচিত করে এক্সেমপ্লারী সাজার আওতায় আনা হোক। কিছুদিন আগে দেশের প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ আকবর আলী খান বলেছিলেন আমাদের অর্থনীতি অমিত সম্ভাবনাময় কিন্তু তা ঝুঁকিমুক্ত নয়।যার প্রমাণ আমরা পেয়ে গেলাম। তবে আপাতত গার্মেন্টস শিল্পের ঝুঁকি কাটাতে হলে বিদেশী ষড়যন্ত্রী ইবলিশগুলোকে দেশ থেকে বহিষ্কার করা প্রয়োজন। চীন যদি গুগলের মত সর্বব্যাপী সার্চ ইঞ্জিনকে নিজেদের স্বার্থে নিষিদ্ধ করে গুজিতে ভর করতে পারে আমরা বিলক্ষণ কিছু করতে পারব। অপরাধী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান গুলোকে এদেশ থেকে ঘাড় ধরে বের করে দিতে আমরা মোটেও কার্পণ্য করব না। বাংলাদেশ এগিয়ে যাবেই।