ক্যাটেগরিঃ ইতিহাস-ঐতিহ্য

 

ভূমিকম্পের আগে চূড়াসহ কান্তজিউ মন্দির

শুরু হলো যেভাবেঃ
একটি দেশের জাতীয় ইতিহাসের ন্যায় তার আঞ্চলিক এবং স্থানীয় ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ। একথা সুবিদিত যে, যুক্তরাজ্য তথা ইউরোপের দেশগুলোর জাতীয় ইতিহাস তো বটেই, এমনকি প্রতিটি “প্যারিশ” বা যাজক পল্লীরও ইতিহাস বিবৃত করা হয়েছে। অথচ দুর্ভাগ্যবশত ভারত উপমহাদেশে বিশেষত আমাদের দেশে স্থানীয় ইতিহাস চর্চা আজ পর্যন্ত অবহেলিতই বলা চলে। এ অবহেলা দেশের জন্য তিকর। একটি দেশের সকল অঞ্চলের মানুষের জীবন ও কর্ম প্রতিফলিত না হলে তা দেশের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস হয় না। তাছাড়া অঞ্চল এবং জেলার অবস্থান অনুযায়ীও জীবনযাত্রার কিছুটা তারতম্য হয়ে থাকে। কোন জেলা নদীমাতৃক, কোনটি দেশের প্রান্তসীমায়, কোনটি সমতল আবার কোনটি পাহাড় ঘেরা। তাই এসব বৈষম্য ও তার প্রভাব তুলে না ধরতে পারলে দেশের ইতিহাসের একটি খণ্ডিত রূপ পাওয়া যায় মাত্র। সমাজ ও নৃ-বিজ্ঞানীদের গ্রামভিত্তিক গবেষণার গণ্ডি যেমন সীমিত, তেমনি বিস্তৃত দেশ বা প্রদেশ ভিত্তিক ইতিহাস চর্চা। এর মাঝে রয়ে গেছে থানা, জেলা, বিভাগ ও অঞ্চল। মূলত ১৯৬০ এর দশকে বাংলাদেশে আধুনিক বিজ্ঞান সম্মত আঞ্চলিক ও জেলাভিত্তিক ইতিহাস রচনার সূচনা হয় এবং বেশ কয়েকটি গবেষণামূলক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। কিন্তু এ উদ্যোগ স্থিমিত হয়ে পড়ে। এতে আমরা একদিকে যেমন বহু ঐতিহাসিক তথ্য ও বিষয়বস্তু হারিয়ে ফেলেছি তেমনি বর্তমান প্রজন্ম ও ধীরে ধীরে তাদের নিজ এলাকার ইতিহাস বিস্মৃত হয়ে পড়েছে। ইতিহাস সচেতনতা দেশপ্রেমের অন্যতম পূর্বশর্ত। তাই আশংকা ইতিহাস জ্ঞান এবং সচেতনতার অভাবে নতুন প্রজন্মের দেশপ্রেমের ভিত্তি কতখানি সুদৃঢ় হবে। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবয়ের পেছনে এই ইতিহাস বিস্মৃতি অনেকখানি দায়ী। যত দ্রুত এরূপ আশংকাজনক পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ লাভ করা যায়, ততই মঙ্গল। এ বিষয়গুলো সা¤প্রতিককালের অনেক গবেষক, পণ্ডিত, ইতিহাসবিদ ও ইতিহাসের ছাত্র-শিকদের যথেষ্ট ভাবিয়ে তুলেছে। এ রকম দায়বদ্ধতা থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল বা জেলার ঐতিহাসিক বিষয়বস্তুর অনুসন্ধান ও পর্যবেণ চালানো সময়ের দাবি। এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশের সভ্যতা-সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্বকারী অন্যতম স্থাপনা দিনাজপুরের কান্তজিউ মন্দির নিয়ে একটি গবেষণাধর্মী ও প্রামাণ্য প্রতিবেদন প্রণয়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করি।

বর্তমান কান্তজিউ মন্দির

মন্দির পরিচিতি ও নির্মাণ পরিপ্রেক্ষিত:
বাংলাদেশের রয়েছে সুদীর্ঘ ইতিহাস এবং গৌরবময় অতীত। হিন্দু-বৌদ্ধিক যুগের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন যেমন পাহাড়পুর, ভোজবিহার, শালবন বিহার, রূপবান মোড়া, চারপত্র মোড়া, গোকুল মেধ প্রভৃতি এবং মুসলিম যুগের আতিয়া মসজিদ, বাঘা মসজিদ, ষাটগম্বুজ মসজিদ, ছোট সোনা মসজিদ, এবং অন্যান্য অসংখ্য মসজিদ বাংলাদেশের জাতীয় গর্ব। এ সমস্ত মনুমেন্টের উপকরণ, সম্পাদনা, অলংকরণ, সজ্জায়ন, ব্যবস্থাপনা এবং ধারণা হলো সর্বজনগ্রাহ্য। এ স্থাপনাসমূহের প্রত্যেকটি নিজ নিজ বৈশিষ্ট্য ভাস্বর হয়ে আছে। এগুলোর উপস্থিতি এদেশের আর্থ সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় ইতিহাসের সমৃদ্ধি প্রমাণ করে। এদেশের প্রাকৃতিক ভূচিত্র পৃথিবীর যে কোন দেশের বাস্তুতান্ত্রিক যথাযোগ্য স্থানের চেয়ে ভিন্ন প্রকৃতির। সময়ের বিবর্তনে এদেশে বিভিন্ন বৈদেশিক ধারণা, বিশ্বাস, দর্শন, গোঁড়ামি ও এ রকম নানা বিষয়ের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। এ অঞ্চলে বসবাসকারী জনগোষ্ঠী এ সমস্ত বিষয় আত্মীকরণ করেছে। ফলে বিভিন্ন ধারণা ও দর্শনের মিশ্র প্রতিফলন ঘটেছে বিভিন্ন শৈল্পিক, স্থাপত্যিক ও ব্যবহারিক ক্রিয়াকর্মে। বিশেষ করে এখানকার স্থাপত্য শিল্পে এক বহুরূপী বৈশিষ্ট্যের সৃষ্টি হয়েছে, যাকে শংকর শিরোনাম- ইন্দো-অ্যারিয়ান ও ইন্দো ইসলামীয় ধারা বলে অভিহিত করা হয়।

রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে সুলতানী শাসনামলে বাংলাদেশে মন্দির নির্মাণ হয়নি বললেই চলে। মুঘল যুগের উদারনৈতিক পর্বে স্থানীয় জমিদাররা অসংখ্য ধর্মীয় সৌধ নির্মাণ করার প্রয়াস পায়। বিভিন্ন তথ্য প্রমাণ থেকে জানা যায়, ১৬০০ সাল থেকে ১৮৯৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মোট ১৩০টি মন্দির ও অন্যান্য ধর্মীয় স্থাপনা গড়ে তোলা হয়।১ মধ্যযুগের শেষ দিকে বাংলাদেশের গৌরবময় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মধ্যে কান্তজিউ মন্দির, দৈর্ঘ্য্য ৮৮/ ৪০/৩৬ ও প্রস্থ ২৫/ ৪৫ /৩৩, একটি সর্বোৎকৃষ্ট ও দৃষ্টিনন্দন মনুমেন্ট, যার পুরোটাই পোড়ামাটির ফলকের অলংকরণে মোড়ানো। মন্দিরটি দিনাজপুর শহর থেকে ২১ কিলোমিটার উত্তরে দিনাজপুর তেঁতুলিয়া-মহাসড়কের সন্নিকটে ঢেপা নদীর পূর্বতীরে সুন্দরপুর ইউনিয়নের কান্তনগরে অবস্থিত। প্রকৃতপে এটি ঢেপা নদীর পশ্চিম তীরে প্রথমে নির্মিত হয়েছিল। কিন্তু একটি ভূমিকম্পে ও প্রলয়ংকরী বন্যায় ঢেপা নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয় এবং ১৭৮৭ সালে পূর্বদিকে চলে আসে। পূর্বের গভীর ও খরস্রোতা নদীটি বর্তমানে প্রায় শুকিয়ে গেছে। মন্দিরের সন্নিকটে ইতস্তত ছড়ানো ছিটানো প্রায় দুইশত ছোট ছোট বাড়ীঘর দেখা যায়। এগুলি বেড়ার উপর মাটির আস্তরণ দিয়ে তৈরি করা। খুব কমসংখ্যক বাড়ীঘরে টিনের চাল দেখা যায়। অবশ্য অতীতে টিনের কোন রকম ব্যবহার ছিল না। মন্দিরের আশেপাশের এলাকায় মানুষের বসবাসের ধরণ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন থেকে এ এলাকার নাম কেন নগর হলো তা বিচার বিশ্লেষণ করলে তেমন সদ্যুত্তর পাওয়া যায় না। তথাপি এ কথা ধরে নিতে হবে যে, কান্তনগর মন্দির ও এর কমপ্লেক্সের আওতায় অন্যান্য সহযোগী স্থাপনাসমূহ নির্মাণের পরিপ্রেক্ষিতে এ রকম নামকরণ করা হয়েছে।

কান্তজিউ মন্দির হলো মধ্যযুগের শেষপাদে নির্মিত এক অসাধারণ ধর্মীয় উপসনালয়। এর অবয়ব অত্যন্ত চমৎকার ও দৃষ্টিনন্দন। এর অপূর্ব অলংকরণ, ধর্মানুরাগী, দর্শনার্থী, ছাত্র, গবেষক, পর্যটক, শিল্প-ঐতিহাসিকদেরকে নির্মাণকালীন সময় থেকেই ম্গ্ধু ও বিমোহিত করে আসছে। বিভিন্ন পণ্ডিত যেমন Ahmed (1990), Ali (1998), Chakrabarti (1987), Ferguson (1972), Haque (1980), Hasan (1970) McCutchion (1972), Michell (1983), Martin (1976), F. Xligar (2001), Rahman (2001), Sirajuddin (1992), C.W Strong (1992) প্রমুখ কান্তজিউ মন্দির পরিদর্শনে গেছেন এবং এ সংক্রান্ত তাদের রচনাবলী প্রকাশ করেছেন। এ স্থাপনার ব্যাপারে তাদের চিন্তাধারা ও মতামত বিভিন্ন আঙ্গিকে বেরিয়ে এসেছে। তাঁরা এর ইতিহাস, নির্মাতা, গঠনরীতি, স্টাইল, টেরাকোটার বিন্যাস শৈলী ও অলংকরণ, বৃহৎ ও ক্ষুদ্র টেরাকোটা, সমাজতত্ত্ব ও বর্তমান গতিপ্রবাহ প্রভৃতি বিষয়ে তাদের নিজস্ব মতামত তুলে ধরেন। বিস্তৃত সম্পাদনা ও পরিকল্পনা, ফলকের অলংকরণ, প্যানেলগুলির ব্যবস্থাপনা প্রভৃতি বৈশিষ্ট্য, এ মন্দিরের গ্রহণযোগ্যতা ও নির্মাণশৈলীকে উচ্চতর পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছে। ১৮ শতকের মন্দিরগুলোর অধিকাংশই বর্তমানে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে কিন্তু কান্তজিউ মন্দির এখনো বহাল তবিয়তে দাঁড়িয়ে আছে। এর কারণ হিসেবে বলা যায়, প্রথমত এই মন্দির জনপ্রিয় হিন্দু দেবতা কান্ত বা কৃষ্ণের নামে উৎসর্গ করা হয়েছে। বাংলায় ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে রাধা-কৃষ্ণের কাহিনী বেশ জনপ্রিয়। দ্বিতীয়ত, এ মন্দিরে অসংখ্য থিমেটিক টেরাকোটা স্থাপিত হয়েছে। এগুলি তৎকালীন সময়ের সমাজচিত্র, বিষ্ণুর দশ রূপ ধারণ প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলী আমাদেরকে জানায়। তৃতীয়ত, স্থানীয় জনগণ এখনো পর্যন্ত এই মন্দিরে ধর্মীয় বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠান পালন করে থাকে। নিয়মিত ধর্মীয় কার্যাবলীর মধ্যে প্রথমে আসে পুজোর বিষয়। লোকজন নিয়মিতভাবে প্রতিদিন তিনবার -সূর্যোদয়, দিনের সময় এবং সূর্যাস্ত- মন্দিরে পূজা দেয়। কিছু ধর্মীয় রীতি যেমন ঝপর বা শিশুর প্রথম চুল কাটা, অন্নপ্রসন বা শিশুর প্রথম খাদ্য গ্রহণ, বিয়ের ভোজ এবং শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান নিয়মিতভাবে এ মন্দিরে উদযাপিত হয়। পাশাপাশি মন্দির কর্তৃপ মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ভক্তদের নিকট থেকে আর্থিক সাহায্য পাবার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব ও অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। যেমন স্নানযাত্রা, দোলযাত্রা, রাশমেলা, হরিসভা, হরিজপ প্রভৃতি। এ সমস্ত উৎসব অনুষ্ঠানাদি মন্দির ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে অকৃত্রিম সম্পর্ক গড়তে সাহায্য করে।২

তথ্য নির্দেশনাঃ
১.Hoque, Z.”Literary sources in Brick Temples of Bengal” (Michell, G, Edited), New Jersey, 1983, Princeton University press, PP. 171-176. এবং Mc Cutchion, D.J, Architecture in Brick Temples of Bengal (Michell, G. Ed) New Jersey, Princeton University press, 1983, PP.15-51.উদ্ধৃত Hoque, M. M. et.al. “Kantajee Temple An Outstanding Monument of Late Madieval Bengal”, publication Dept. of Drik, Dkaha, 2005, P. 16

২.Nigar, M; “A living Temple “Kantaji Mondir”- An Anthropological Analysis.” Dhaka, 2001, Unpublished M.S.S thesis submitted to Dept of Anthropology, Dhaka University. উদ্ধুত Hoque, M. M. et.al. “Kantajee Temple An Outstanding Monument of Late Madieval Bengal”, publication Dept. of Drik, Dkaha, 2005, PP. 17-18.