ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 

কোথায় চলেছে নিয়ে যুগের বিশ্বায়ন

সাধারণভাবে বলা যায় যে বিশ্বায়ন হলো এমন একটি পদ্ধতি যার মাধ্যমে স্থানীয় বা আঞ্চলিক কোন বিষয় বা প্রপঞ্চ বিশ্বব্যাপী বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিস্তৃত হয়। শীলা এল ক্রাউচার ( গ্লোবালাইজেশন এ্যান্ড বিলংগিং : দ্য পলিটিকস অব আইডেন্টিটি এ চেঞ্জিং ওয়ার্ল্ড) বলেন যে এর মাধ্যমে বিশ্ব মানব গোষ্ঠী একটিমাত্র সমাজে একত্রিত হয় এবং একসাথে কাজ করে। আর এটি অর্থনৈতিক,প্রযুক্তিগত,সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক উপাদানমূহের সমষ্টি। জগদীশ ভগবতী (ইন ডিফেন্স অব গ্লোবালাইজেশন) একে অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন চিহ্নিত করে বলেছেন যে-দ্যাট ইজ ইন্টিগ্রেশন অব ন্যাশনাল ইকনমিকস ইনটু দ্য ইন্টারন্যাশনাল ইকনমি থ্রু ট্রেড,ফরেন ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট, ক্যাপিটাল ফ্লোস, মাইগ্রেশন এ্যান্ড দ্য স্প্রেড অব টেকনোলজি।বিশ্বায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সীমানাহীন উৎপাদন ও বিনিময়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য,আউটসোর্সিং, সরবরাহ শৃংখল,ব্যবসায়ী সংগঠন, বহুজাতিক কর্পোরেশন (এমএনসি),মিশ্র সংস্কৃতি প্রভৃতি বিষয়গুলো সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়। এ যুগের প্রথি্তযশা পণ্ডিত নোয়াম চমস্কি(কর্পোরেট গ্লোবালাইজেশন, কোরিয়া এ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স) অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের নিওলিবারেল কাঠামো প্রসঙ্গে বলেন এর অর্থ হলো অর্থনৈতিক কার্যক্রমে জাতীয় সীমানা উন্মুক্তকরণ এবং এখানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আন্তআঞ্চলিক বাণিজ্যে পরিণত হবে। ফলে বিশ্বায়নের সুবাদে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডকে কেন্দ্র করে বিশাল আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে।

অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের পরিমাপঃ মোটামুটিভাবে ০৪ টি অর্থনৈতিক গতিপ্রবাহের মাধ্যমে অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন আবর্তিত হয়। (ক) পণ্য ও সেবা: জনগণের মাথাপিছু জাতীয় আয়ের অনুপাত হিসেবে আমদানী ও রফতানি (খ) শ্রমিক/জনসম্পদ: নীট মাইগ্রেশন হার, বহির্গামী ও অস্তগামী মাইগ্রেশন গতিপ্রবাহ (গ) প্রযুক্তি: আন্তর্জাতিক গবেষণা ও উন্নয়ন গতিপ্রবাহ, ‘ফ্যাকটর-নিউট্রাল’ প্রযুক্তি গত উন্নয়ন যেমন-টেলিফোন, মোটরকার, ব্রডব্যান্ড প্রভৃতির মাধ্যমে গবেষণায় নিয়োজিত জনগণের অনুপাত। এসব চলকের ভিত্তিতে কেওএফ ইনডেক্স এর মতে বিশ্বের প্রধান গ্লোবালাইজড দেশ হলো বেলজিয়াম এবং এর পরপরই আছে অস্ট্রিয়া, সুইডেন, ব্রিটেন ও নেদারল্যান্ডের অবস্থান। হাইতি, মায়ানমার ও বুরুন্ডি এ তালিকার সর্বনিম্নে অবস্থান করছে। সাম্প্রতিক সময়ে সিঙ্গাপুর, আয়ারল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, নেদারল্যান্ড, কানাডা, ডেনমার্ক সর্ব্বোচ্চ গ্লোবালাইজড দেশ এবং সর্বনেম্নে রয়েছে মিশর, ইন্দোনেশিয়া,ভারত ও ইরান (এ টি কেয়ারনি)।

বিভাজনঃ অর্থনৈতিক বিশ্বায়নকে ঘিরে মোটামুটি ০৩ টি প্রধান চিন্তাধারা গড়ে উঠেছে। (ক) অর্থনৈতিক উদারবাদ: মিল্টন ফ্রিডম্যান, ওহন নেইসবিট প্রমুখ অর্থনৈতিক উদারবাদীরা আন্তর্জাতিক বাজার ব্যাবস্থাপনার সমান্তরালে দেখেছেন অর্থনৈতিক বিশ্বায়নকে। এখনকার বিশ্বে একটি পণ্য উৎপাদন বিশ্বের যে কোন প্রান্তে সম্ভব। পণ্য উৎপাদনের কাঁচামাল পৃথিবীর যেকোন প্রান্ত থেকে সংগ্রত করা যায়। পণ্য উৎপাদনের কাজে নিয়োজিত কোম্পানি বা কারখানাটি বিশ্বের যেকোন প্রান্তে অবস্থিত হতে পারে। উপরন্তু উক্ত পণ্যটি বিক্রয়েরও কোন নির্দিষ্ট জায়গা নেই অর্থ্যাৎ পৃথিবীর যেকোন বাজারে তা বিক্রয়যোগ্য। ফলে ব্যক্তি, পরিবার, কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশ্বায়ন আমাদের সামনে এমন এক সুযোগ এনে দিয়েছে যা মানব ইতিহাসের কোন পর্বে দেখা যায়নি।অর্থনীতির এমন বিশ্বায়নের ফলে ব্যাক্তি ব্যবসায়িক সফলতা অর্জন করেছে। ব্যাক্তিগত সফলতা তার পরিবার কে করেছে আরো সমৃদ্ধ ও গতিশীল। জীবনযাত্রার মান উন্নীত হয়েছে। এসব ব্যক্তিক সফলতা বিভিন্ন কোম্পানি প্রতিষ্ঠাকে ত্বরান্বিত করেছে। এভাবে বিশ্বব্যাপী গড়ে উঠেছে বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানি-কর্পোরেশন বা ট্রান্সন্যাশনাল কর্পোরেশন (টিএনসি), যার বেশ কয়েকটি বিভিন্ন খাতে বিশ্বের মোট উৎপাদন, বিপণন ও বিক্রয়ের প্রায় অর্ধেক অংশ নিয়ন্ত্রন করছে। যেমন সুইজারল্যান্ডের ফুড ইন্ডাস্ট্রি নেসলে এসএ এর বহুজাতিক ইনডেক্স হলো ৯৪.০। এসনিভাবে সুইডেনের ইলেকট্রনিক্স শিল্প ইলেকট্রোলাক্স এবি, জাপানের ইলেকট্রনিক্স শিল্প সনি, মার্কিন কম্পিউটার শিল্প আইবিএম,কোরিয়ার দাওয়াউ যথাক্রমে ৮৮.৩,৫৯.১,৫৪.৯ ও ৪৭.৭ অংশ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এভাবে জাতিসংঘের এক জরিপে দেখা যায়, বিশ্বের মাত্র ১০০ টি বহুজাতিক কর্পোরেশনের টিএনসি ইনডেক্সের হার ৫১.০ ভাগ।

(খ)বাস্তববাদী মার্কেন্টাইলিজম: থমসন, ক্রেন্সার, ক্যাপ্সটেইন প্রমুখ বলেন বিশ্বায়ন হলো জাতীয় রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা। এর বাইরে নতুন কিছু নেই।তারা দেখান যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে বিভিন্ন দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ খুব উঁচুস্তরে ছিল, যা কেবল আত্মনির্ভরশীলতার প্রতীক।উল্লেখ্য যে বহুজাতিক কোম্পানি সমূহ তাদের পরিচয় হারিয়ে ফেলে না। কারণ তারা হচ্ছে গ্লোবাল প্লেয়ার। মাতৃভূমির সাথে রয়েছে তাদের নিবিড় সম্পর্ক। যেমন টেলিনরের সাথে নরওয়ের রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক।তবে জাতি রাষ্ট্র বিশ্বায়নের ফলে হুমকির সম্মুখীন-উদারবাদীদের একথা অবাস্তব। কারণ এক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণের জন্য রাষ্ট্রের ক্যাপাসিটি কমেনি বরং বেড়েছে এ কথা সর্বোতভাবে গ্রহণযোগ্য।তবে তাত্ত্বিকভাবে এ মতবাদে রাষ্ট্রকে বড় করে এবং আন্তর্জাতিক নির্ভরশীলতাকে ছোট করে দেখাকে অন্যতম ত্রুটি হিসেবে বিবেচনা করা যায়।

(গ) রবার্ট কক্স প্রমুখ মনে করেন অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন একদিকে যেমন পারস্পারিক নির্ভরশীলতাকে তীব্রতর করে তোলে তেমনি অন্যদিকে বিশ্ব অর্থনীতি সৃষ্টিতে তৎপর হয়। জাতীয় রাষ্ট্রসমূহ বিশ্বায়নের গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক, কিন্তু এক্ষেত্রে তারা অর্থনীতির উপর তাদের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এর ফলে তারা গঠন করে ম্যাক্রো রিজিওন। মূলত অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন হলো অসম, স্বেচ্ছাচারী পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে অর্থনৈতিক ক্ষমতা ধীরে ধীরে নেতৃত্বদানকারী শিল্পোন্নত দেশের কব্জায় চলে যায়। মূলকথা বিশ্বায়ন হলো পুঁজিবাদের একটি ধরণ। পুঁজিবাদী ক্লাস ডোমিনেশনকে তা আরো পোক্ত করে। পাশাপাশি বিশ্বের অসহায় দরিদ্র জনগণকে শোষণের যাঁতাকলে পিষ্ট করে।

বিশ্বায়নের নীতি ও তত্ত্ব বিশ্ব অর্থনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।যেমন-(ক) শিল্প: বিশ্বব্যাপী উৎপাদন মার্কেটের উত্থান পর্ব ভোক্তা ও কোম্পানীর জন্য বিদেশী পণ্যের অবাধ প্রবেশাধিকার, বিশেষত, বস্তুগত ও খাদ্য সামগ্রীর আন্তদেশীয় বিনিময় বিশ্বায়নেরই ফল। (খ) ফিনান্সিয়াল:বিশ্বব্যাপী ফিনান্স মার্কেটের উত্থান এবং বৈদেশিক বিনিয়োগের বিকাশ হয়। (গ) ইকোনমিক: পণ্যসামগ্রী মূলধন বিনিয়োগের স্বাধীনতার মাধ্যমে গড়ে উঠেছে একটি গ্লোবাল কমন মার্কেট। (ঘ) রাজনৈতিক: ফ্রান্সিস্কো স্টিপো ( ওয়ার্ল্ড ফেডারেলিস্ট মেনিফেস্টো: গাউড টু পলিটিক্যাল গ্লোবালাইজেশন) মনে করেন যে বিশ্বায়ন মানে হলো একটি বিশ্ব সরকার বা কতগুলো সরকারের সমষ্টি। ডব্লিউটিও, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও আইএমএফ সহ বিভিন্ন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এসব সরকারের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনে ভূমিকা পালন করে। রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ অর্থনীতির কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বে একক পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশ্বায়নের প্রভাব ও নিজ বলিষ্ঠ-কার্যকর নীতিমালার সাহায্যে চীনও গত শতকে বহুমুখী প্রবৃদ্ধি অর্জন ও সফলতা লাভ করেছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে অচিরেই চীন বিশ্বের অদ্বীতিয় পরাশক্তি হয়ে উঠবে এতে সন্দেহের অবকাশ নেই। চার্লস হার্স্ট ( সোস্যাল ইনইকুয়ালিটি) বলেছেন যে- চাইনা উইল হ্যাভ ইনাফ ওয়েলথ, ইন্ডাস্ট্রি এ্যান্ড টেকনোলজি টু রাইভাল দ্য ইউনাইটেড স্টেটস ফর দ্য পজিশান অব লিডিং ওয়ার্ল্ড পাওয়ার। (ঙ) প্রযুক্তি: ইন্টারনেট, কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট,সাবমেরিন কেবল, ওয়ারলেস টেলিফোন প্রভৃতি ব্যবহার করে বিশ্বব্যাপী টেলিকমিউনিকেশন অবকাঠামো ও বহু সীমা উপাত্ত গতিপ্রবাহ গড়ে তোলা হচ্ছে,যা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে করেছে আরো আধুনিক আরো গতিশীল।প্রযুক্তির উপর ভর দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি সমূহের প্রয়োগ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বিশ্বায়ন বিভিন্ন দেশের দরিদ্র হার নিম্নমুখী করেছে। জেফরি সাচস ( দ্য এন্ড অব প্রোভার্টি,২০০৫) পরীক্ষা করে দেখান যে সাব সাহারান দেশের তুলনায় চীনে অধিক মাত্রায় বিশ্বায়ন ঘটেছে।ফলে চীনে দারিদ্রের হার উল্লখযোগ্যভাবে কমে আসে।তাছাড়া উন্মুক্ত বাণিজ্য, পুঁজিবাদ ও গণতন্ত্রকেও বিশ্বায়ন আরো সুসংহত করেছে বলে তার দাবি।উন্মুক্ত বাণিজ্যের সমর্থকরা বলে থাকেন যে বিভিন্ন দেশ বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশে বিশ্বায়ন অর্থনেতিক সুযোগ সুবিধা ও সমৃদ্ধি বৃদ্ধি করেছে। দ্রব্যমূল্যের নিম্নগতি, অধিক কর্মসংস্থান, উৎপাদনের উচ্চহার এবং জীবন যাত্রার মানের উন্নয়ন ঘটেছে। উন্নয়নশীল দেশ যার ফলে সাফল্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করা হয়। সাউহুয়া চেন ও মার্টিন রেভেলিওন ( হাউ হ্যাভ দ্য ওয়ার্ল্ড’স পুওরেস্ট ফেয়ারড সিনস দ্য আরলি এইটিস) এবং বিশ্বব্যাংকের ডাটা থেকে দেখা যায় যে পূর্ব এশিয়া ও প্যাসিফিক এলাকায় বিশ্বায়নের অভিঘাতে অগ্রগতির সূচক উর্ধ্বমুখী। অবশ্য সাব সাহারার ক্ষেত্রে বিপরীত প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। পূর্ব এশিয়া ও প্যাসিফিক এলাকায় ১৯৮১,১৯৮৭,১৯৯৩,১৯৯৯ ও ২০০২ সালে দিনে ১ ডলারের নিচে আয় করা মানুষের হার ছিল যথাক্রমে শতকরা ৫৭.৭,২৮.০,২৪.৯,১৫.৭ ও ১১.১ ভাগ এবং ১৯৮১ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত মোট পরিবর্তনের হার ছিল, -৮০.৭৬%। আর অত্র অঞ্চলে দিনে ২ ডলারের নিচে আয় করা মানুষের এ পরিবর্তনের হার ছিল উল্লিখিত সময়ে ,-৫২,০০%। সাব সাহারান আফ্রিকায় একই সময়ে দৈনিক ১ ডলারের ক্সেত্রে হার ছিল যথাক্রমে ৪১.৬, ৪৬.৮,৪৪.০, ৪৫.৭ ও ৪৪.০ ভাগ এবং মোট পরিবর্তনের হার হলো +৫.৭৭%। ২ ডলারের ক্ষেত্রে মোট পরিবর্তনের হার ছিল +২.১%।

ডেভিড ব্রুক (গুড নিউজ এ্যাবাউট পোভার্টি) বলেন বিশ্বায়নের ফলে সমগ্র বিশ্বের আয় অসমতা অর্থ্যাৎ ইনকাম ইনইকুয়ালিটি ধীরে ধীরে হ্রাস পাচ্ছে। জেভিয়ার সালা-ই মার্টিন অবশ্য বলছেন আয় অসমতা একেবারে দূরীভূত হয়ে গেছে। মূলত আপেক্ষিক অসমতার চেয়ে দারিদ্র মোকাবিলা হলো মূখ্য ব্যাপার। বিশ্বায়ন মানুষের আয় বৃদ্ধির সুযোগ করে দিয়েছে এটা সত্য।

উন্নত বিশ্বে বিভিন্ন অর্থনৈতিক সুযোগ সুবিধা প্রাপ্তির ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মানুষের জীবনকাল দ্বিগুণে উপনীত হয়েছে। এমনকি অনুন্নত সাব সাহারান আফ্রিকায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে এব আগের তুলনায় ৩০ বছর আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি পেয়েছে। উন্নয়নশীল দেশসমূহে শিশু মৃত্যুহার হ্রাস পেয়েছে (গে পেফারম্যান, দ্য এইট লুজারস অব গ্লোবালাইজেশন)।

বিশ্বায়নের ফলে দেশে দেশে গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়েছে একথা সমবেশী সত্য। ফ্রিডম হাউসের তথ্যমতে ১৯০০ সালে বিশ্বের প্রায় অধিকাংশ জাতির ভোটাধিকার ছিল না। অথচ ২০০০ সালে এসে সমগ্র জাতির শতকরা ৬২.৫ ভাগ ভোটাধিকার পায়। এর পাশাপাশি নারীর অধিকার, সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি পেয়েছে। যেমন বাংলাদেশেই নারীদের চাকরি-বাকরি, কর্মসংস্থান, শিক্ষাসহ সামগ্রিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিশ্বব্যাপী খাদ্যঘাটতি গ্রাস পেয়েছে। এক হিসেবে দেখা যায় যে ১৯৬০ এর দশকে বিশ্ব জনগণের খাদ্য সরবরাহে ব্যক্তি প্রতি ২২০০ ক্যালরি ঘাটতি ছিল।যার শতকর হার ছিল ৫৬%। ১৯৯০ এর দশকে এ হার ১০% এর নিচে নেমে আসে। তাছাড়া ১৯৫০-১৯৯০ সালের মদ্ধ্যে বিশ্ব স্বাক্ষরতার হার ৫২% থেকে ৮১% এ উন্নীত হয়। অন্যদিকে শ্রমখাতে শিশুশ্রম ১৯৬০ সালের ২৪% থেকে ২০০০ সালে ১০% নামানো সম্ভব হয়েছে।

মানুষের অর্থনৈতিক অগ্রগতি সাধিত হওয়ার ফলে তাদের বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রবণতাও বৃদ্ধি পেয়েছে।বিদ্যুৎ, মোটর কার, টেলিফোন-মোবাইল ও নতুন নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ ও ব্যবহারের গতি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে বিশ্বায়নের পরিবেশগত প্রভাব নেতিবাচক হওয়ায় তার অগ্রগতিকে অনেকটা সীমাবদ্ধ করে ফেলেছে।

অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের ইতিবাচক প্রভাব অনেক ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন।যেমন- দরিদ্র রাষ্ট্রের অবস্থা: চার্লস হার্স্ট (সোস্যাল ইনইকুয়ালিটি:ফর্মস কজেজ এ্যান্ড কনসিকুয়েন্সেস) মত দেন বিশ্বায়ন দরিদ্র রাষ্ট্রের জন্য অকল্যাণ বয়ে আনে।উল্লেখ্য যে বিশ্বায়ন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন দেশের মধ্যে উন্মুক্ত বাণিজ্যকে উৎসাহিত করে।এর অনেক নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। কারণ কিছু দেশ তাদের জাতীয় বাজারকে সংরক্ষণের জন্য প্রচেষ্টা চালায়। দরিদ্র রাষ্ট্রের সাধারণত প্রধান রফতানি পণ্য হচ্ছে কৃষি ও কৃষিজাত সামগ্রী।এসব দেশের কৃষকদের ভর্তুকি প্রদান করে উন্নত দেশের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে গরিব দেশের কৃষকরা বাজারের মূল্য অপেক্ষা অত্যন্ত কম মূল্যে তাদের পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হয়।

বিদেশী দরিদ্র শ্রমিক নির্যাতন:শক্তিশালী শিল্পোন্নত দেশসমূহের উন্নত ও বলিষ্ঠ পুঁজির অভিঘাতে দুর্বল ও দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোর আত্মরক্ষা ব্যুহ ক্রমেই ভেঙে পড়ে। এসব দেশের সস্তা শ্রমের নিশ্চয়তা তাদেরকে প্রলুব্ধ করে। আত্মরক্ষার অভাবের সুযোগ নিয়ে শিল্পোন্নত দেশের বিভিন্ন কোম্পানি উন্নয়নশীল দেশের শ্রমিকদের অল্প মজুরিতে নিয়োগ দেয়। এসব দেশে কর্মঘণ্টাও উন্নত দেশের তুলনায় অনেক বেশি।কাজের পরিবেশও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও অস্বাস্থ্যকর।এক্ষেত্রে বহুজাতিক কোম্পানি নাইকির প্রসঙ্গ টানতে পারি।

আমেরিকা ভিত্তিক এ কর্পোরেশন ক্রীড়া ও অ্যাপারেল সামগ্রী তৈরির জন্য বিখ্যাত। অত্যন্ত লাভজনক এ প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন খরচ নিতান্তই কম। এর কারণ হলো এর ফ্যাক্টরি সমূহ এশিয়ার দরিদ্র দেশসমূহে স্থাপন করা হয়েছ্ শ্রমিকদেরও মজুরি হিসেবে কোনমতে জীবনধারনের জন্য সামান্য অর্থ প্রদান করা হয়। এমনকি শিশুরাও কম মজুরিতে এখানে কাজ করে। যদি এসব উন্নয়নশীল দেশে প্রতিরক্ষামূলক বিভিন্ন ব্যাবস্থা (আইন ও তার প্রয়োগ) থাকত তে এসব কারখানা বন্ধ হয়ে যেত। তবে অনেকেই বলে থাকেন যে মুক্তবাজার অর্থনীতিতে শ্রমিকরা কাজের স্বাধীনতা পায়। তারা এক্ষেত্রে কারখানা বদল করতে পাওে বা চাকরি ছেড়ে দিতে পারে। কিন্তু অনেক দরিদ্র দেশের শ্রমিকদের এ স্বাধীনতা ভোগ করা মানে কর্মসংস্থার হারানো বা ুধার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করা । এসব দেশে কর্মসংস্থানের ত্রে অত্যন্ত সীমিত।

আউটসোর্সিং ও ইকোনমিক গ্যাপ: মধ্যবিত্ত নিম্নবিত্তের ফাঁদ-প্যাচ্রিক ম্যাকমোহন ( দ্য ডিকাইনিং মিডল কাস: এ্যা ফারদার এ্যানালাইসিস) দেখান যে উন্নয়নশীল দেশের সস্তা শ্রম কর্পোরেশনগুলোকে বিদেশের বাজারে পণ্য সামগ্রী উৎপাদন ও চালানে প্রলুব্ধ। মজুরি ও লাভ কম থাকার পরেও এখানকার অদ শমিকরা সার্ভিস সেক্টরে শ্রম দিতে বাধ্য হয়। উৎপাদন হয় কিন্তু বেশি। এভাবে দ ও অদ শ্রমিকদের মধ্যে ইকোনমিক গ্যাপ প্রলম্বিত হয়। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর কিঞ্চিত ধ্বংসের জন্য এটি দায়ী। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর এ রকম ক্ষতিগ্রস্থতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অসমতা বৃদ্ধিতে একটি বড় ফ্যাকটর হিসেবে কাজ করে। এভাবে আউটসোর্সিং ও অধিক উৎপাদনের জন্য অনেক মধ্যবিত্ত পরিবার নিু অবস্থানে চলে আসছে। আর নিুবিত্তের অবস্থা আরো সঙ্গীন। তাদের অবস্থা ম্যাকমোহনের ভাষায়-দ্যাট পিপল ইন দ্য লোয়ার কাস হ্যাভ মাচ হার্ডার টাইম কাইম্বিং আউট অফ পোভার্টি বিকজ অফ দ্য এ্যাবসেন্স অফ দ্য মিডল কাস এ্যাজ এ স্টিপিং স্টোন।

দুর্বল লেবার ইউনিয়ন: চার্লস হার্স্ট যুক্তি দেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কোম্পানি নিজেদের মধ্যে উøুত্ত সস্তা শ্রমিক বিনিময় করার ফলে লেবার ইউনিয়নের মতা ও কার্যকারিতা দুর্বল হয়ে পড়ছে।লেবার ইউনিয়নের সদস্য প্রাপ্তি ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। ফলে কর্পোরেশনের উপর ইউনিয়নের প্রভাব কমে আসছে বলে তিনি মনে করেন।

অর্থনৈতিক অসমতা: অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের অন্যতম প্রধান নেতিবাচক দিক হলো অর্থনৈতিক অসমতা। বিশ্বব্যাংকের বিশ্বব্যাংকের এক খর্থনীতিবিদ ব্রাঙ্কো মিলানোভিক ডিসেম্বর ২০০৭ সালের এক হিসেবে বলেন নভেম্বর মাসে বিশ্বব্যাপী অসমতা (বিশ্বের সকল ব্যক্রির মধ্যকার প্রকৃত আয়ের পার্থক্য) হিসাব করা হয় ৬৫ গিনি পয়েন্টস; যেখানে ১০০ পয়েন্টস হলো সম্পূর্ণ অসমতা এবং ০ সম্পূর্ণ সমতা প্রকাশ করে; যেখানে সকলের আয় সমান ধরা হয়। এখানে অসমতার লেভেল দক্ষিণ আফ্রিকার অসমতার লেভেল থেকে উচ্চ। কিন্তু ডিসেম্বরে এই বিশ্ব অসমতা হয় ৭০ গিনি পয়েন্টস যা বিশ্বের কোথাও কোনোদিন আগে দেখা যায়নি। আর এর নগ্ন শিকার হলো তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রগুলো।

কর্পোরেট স্বার্থ: বিশ্বায়নের সমালোচনাকারীরা বলে থাকেন যে বিশ্বায়ন এমন একটি পদ্ধতি যা কর্পোরেট স্বার্থের তাহিদেই সৃষ্টি হয়েছে। আর এ স্বার্থুসদ্ধির তাগিদেই শূলত তৈরী হয় গ্লোবাল ইনস্টিটিউশন ও নীতিমালার বিকল্প সম্ভাব্যতা। এ সমস্ত প্রতিষ্ঠান ও নীতিমালা দরিদ্র ও শ্রমিক শ্রেণীর ভাগ্য নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। পরিবেশগত বিষয়াবলী একই উৎস থেকে ব্যাখ্যা করা হয়। তার মানে কর্পোরেট সংস্থা০ই এখানে মূখ্য।

বিশ্বায়ন বিরোধী তত্ত্ব: বিশ্বায়ন বিরোধী আন্দোলন বেশ ব্যাপক। এখানে আছে চার্চ গ্রুপ, জাতীয় স্বাধীনতা গ্রুপ, কৃষক ইউনিয়নবাদী, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, প্রতিরক্ষাবাদী, নৈরাজ্যবাদীসহ আরো অনেকে। নৈরাজ্যবাদীরা বলেন – বিশ্বায়ন হলো –রি লোকালাইজেশন। কিন্তু সংস্কার বাদীরা বলেন যে অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন পুঁজিবাদের মানবিক রুপ। বিপ্লববাদীরা একে দেখেন-এটি পুঁজিবাদ অপেক্ষা অধিক মানবিক পদ্ধতি। প্রতিক্রিয়াশীলরা বিশ্বাস করনে-বিশ্বায়ন জাতীয় শিল্প ও কর্মসংস্থানকে ধ্বংস করেছে।ৎ

শ্যাম্পেন গ্লাস ইফেক্ট: অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের ফলে বিভিন্ন জাতির মধ্যে আয় বৈষম্য বৃদ্ধি পেয়েছে। রবার্ট হান্টার ওয়েড ( দ্য রাইজিং ইনইকোয়ালিটি অফ ওয়াল্ড ইনকাম ডিস্ট্রিবিউশান) দেখান যে ২০০১ সালের আগের ২০ বছরে ৮ মেট্রিকসের মধ্যে ৭ টি আয় বৈষম্য বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৮০ এর দশকে নিম্নশ্রেণীর আয় ও বিশ্ব আয় বিতরণের মধ্যে স্পষ্ট ব্যাবধান গড়ে ওঠে। এ আয় বৈষম্য কে জেভিয়ার গোবোস্টিয়াগ শ্যাম্পেন গ্লাস ইফেক্ট তত্ত্বের মাধ্যমে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। তার নির্দেশিত নিম্নোক্ত অধ্যয়ন থেকে দেখা যায় যে, বিশ্ব আয় বিতরণ ব্যাবস্থা অসম। ১৯৯২ সালের ইউএনডিপি রিপোর্ট মতে বিশ্বের ২০% ধনী ব্যক্তি বিশ্ব আয়ের মোট ৮২.৭% নিয়ন্ত্রণ করে। সর্বোচ্চ পর্যায়ের নিচের দ্বিতীয় ২০% ধনীর এ হার ১১.৭%, তৃতীয় ২০% এর ক্ষেত্রে ২.৩%, চতুর্থ ২০% এর ক্ষেত্রে ১.৪% এবং সর্বনিম্ন পর্যায়ের অতি দরিদ্র ২০% ক্ষেত্রে এ আয় মাত্র ১.২%। এখান থেকে প্রতীয়মান হয় যে কি পরিমাণ আয় বৈষম্য বিশ্বে বিরাজমান।

ফেয়ার ট্রেড তাত্ত্বিক যেমন জেফ ফক্স ( ইকোনমিক পলিসি ইনস্টিটিউট) প্রমুখদের মতে নিয়ন্ত্রণহীন মুক্ত বাণিজ্য গরিবের টাকায় ধনিকশ্রেণীর মুনাফার সন্ধান দিবে। বিভিন্ন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান যেমন বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ প্রভৃতি গরিব দেশের কাছ থেকে শোষণমূলক শর্তযুক্ত লোনের বিপরীতে মোটা অংকের সুদ নিয়ে তা দিয়ে পশ্চিমা উন্নত দেশের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে। আর তৃতীয় বিশ্বের তাদেরই পৃষ্ঠপোষকতায় লালিত পালিত একশেণীর দালাল তাদের পক্ষে সাফাই গেয়ে যাচ্ছে।

আমেরিকানাইজেশন:আমেরিকাকরণ এমন একটি পিরিয়ড যখন অন্যদেশ ও জনগোষ্ঠীর সাথে আমেরিকার উচ্চ রাজনৈতিক আঁতাত থাকবে।পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরে আমেরিকার দোকান, বাজার ও অন্যান্য স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়াদি সহজেই প্রবেশ করতে পারবে। আমেরিকানাইজেশন মূলত মার্কিন নয়া সাম্রাজ্যবাদের একটি পরিভাষা।

লরেন্স লী, জোয়েল বাকান প্রমুখ মনে করেন যে, অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন হলো কর্পোরেটওদর স্বার্থসিদ্ধির ধারাবাহিক উন্নতি ও অগ্রগতিমূলক পদ্ধতি ও উৎকৃষ্ট হাতিয়ার। কর্পোরেট সংগঠনসমূহের স্বায়ত্ত্বশাসন ও শক্তিমত্ত্বা বৃদ্ধির ফলে বিভিন্ন দেষের রাজনৈতিক নীতি নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে এগুলো প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কাজ করে যা ঐসব দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি স্বরুপ। ঐসব দেশের সাধারণ জনগণ এগুলো কখনোই ভালো চোখে দেখে না। যেমন- বাংলাদেশ ইউএনডিপির সাবেক আবাসিক প্রতিনিধি রেনেটা লক ডেসালিয়ান, মার্কিন রাষ্ট্রদূত বিউটেনিস, ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত আনোয়ার চৌধুরী প্রমুখ বাংলাদেশর বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে মূখ্য ভূমিকা পালন করে।

অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন হলো মানুষের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও প্রযুক্তিগত কর্মকান্ডের ঐতিহাসিক বিবর্তনের একটি পর্ব। এর ইতিবাচক নেতিবাচক দুটি দিকই রয়েছে। দরিদ্র বিশ্বের ক্রমাবনতি, শ্রমিক নিপীড়ন, অবাধ আউটসোর্সিং, লেবার ইউনিয়নের ক্ষমতা হ্রাস, অর্থনৈতিক ও আয় বৈষম্য, একক কর্পোরেট স্বার্থ, ধনকি শ্রেণীর অর্থ শোষণ প্রভৃতি বিশ্বায়নের অগ্রযাত্রাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।আর এসবের পরিপ্রেক্ষিতে দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে এন্টি গ্লোবালাইজেশন মুভমেন্ট। যোসেফ স্টিগলিস, অ্যান্ড্রু চার্লটন প্রমুখ মনে করেন যে এ আন্দোলন মূলত বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও ডব্লিউটিও- এ প্রতিষ্ঠানগুলোর অতিমাত্রায় শর্তারোপ, বিশ্বব্যাপী পরিবেশ দূষণ, বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর দৌরাত্ন্য, উন্নত পশ্চিমা বিশ্ব কর্তৃক তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহকে শোষণ প্রভৃতি বিষয়গুলোর প্রতি বেশি নজর দিয়ে থাকে। এ ব্যাপারে তাদের অভিমত হলো- এ ম্যালটিচ্যুড অফ ইন্টারকানেক্টেড ফ্যাটাল কনসিকুয়েন্সেস-সোসাল ডিসইন্টিগ্রেশান, এ ব্রেকডাউন অফ ডেমোক্রেসি, মোর র্যাপিড এ্যান্ড এক্সটেনসিভ ডেটারিওরেশান অফ দ্য এনভায়রনমেন্ট, দ্য স্প্রেড অফ নিউ ডিজিজ, ইনক্রিজিং পোভার্টি এ্যান্ড অ্যালিয়েনেশান ( ফ্রিটজ অফ কোপরা, দ্য হিডেন কারনকশান)।এমনকি যুগের বিখ্যাত পন্ডিত নোয়াম চমস্কি অর্থনৈতিক বিশ্বায়নকে ধনিক শ্রেণীর স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে দেখেছেন। তবে আমরা অস্বীকার করব না যে শিল্প, ফিন্যান্স,অর্থনীতি , রাজনীতি, তথ্য-উপাত্ত, সংস্কৃতি, ইকোলজি, পারস্পারিক বিনিময়, প্রযুক্তি, আইনও নৈতিকতা, বাণিজ্য, আউটসোর্সিং, স্টাইল প্রভৃতি বিষয়ে বিশ্বায়ন জগতের সামগ্রিক অগ্রগতির ধারাকে শক্তিশালী ও এক সূত্রে গ্রোথিত করতে সচেষ্ট আছে। যাকে অনেকেই বলছেন-হোয়াট এ্যান এক্সট্রা অর্ডিনারি এপিসোড ইন দ্য ইকোনমিক প্রোগ্রেস অফ ম্যান। বিশ্বায়নের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য, পশ্চিমা উন্নত দেশগুলোর গতিবিধি, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আচরণ, পুঁজি ও মেধা পাচার প্রভৃতি বিশ্বায়নের কল্যাণকামিতাকে মোটাদাগে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। উদ্বৃত্ত্ব পুঁজি বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের মাধ্যমে মুনাফা লাভ করার উদ্দেশ্যে উপনিবেশিক যুগে উন্নত দেশগুলো কেবলমাত্র নিজেদের স্বার্থে কলোনী স্থাপন করেছিলো। বর্তমানে সেই পুরনো পুঁজিবাদ তার বাহ্যিক রুপ পাল্টে ফেলেছে।অতীত নীতি ও উদ্দেশ্য ঠিক রেখে প্রতিষ্ঠিত করেছে নয়া উপনিবেশবাদ। নব্য সাম্রাজ্যবাদ। আর বিশ্বায়ন সেই বাহ্যিক অবয়ব বৈ কিছু নয়। এসব কথা এখন বিশ্বের আনাচে কানাচে সমস্বরে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।