ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 

পদ্মাসেতু নিয়ে ভাবছেন না এমন দু’চারজন মানুষ খুঁজে পাওয়া সত্যিই দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে হাল আমলে। আম জনতা থেকে শুরু করে দেশের রুই কাতলা সবার চিন্তার খোরাক জোগাচ্ছে এই প্রসঙ্গটি। যার যার জায়গা থেকে নিজেদের সুবিধা মত পদ্মাসেতুর পক্ষে বিপক্ষে অনেকেই বুলি কপচাচ্ছেন।কথার ফুলঝুরি ফুটাচ্ছেন সরকার, বিরোধী দল, আমলা থেকে কামলা সবাই।জ্ঞানীরা বলে বাঙালি নাকি হুজুগে মাতাল।কিছু একটা পেলে হয়, তার আপদ মস্তক,নাড়ি নক্ষত্র উদ্ধার না করে তার দু’চোখে ঘুম নেই। যুক্তি, বুদ্ধি, বিবেক, জ্ঞানদীপ্তির পথে পা না বাড়িয়ে আবেগতাড়িত হয়ে বার বার হোঁচট খাওয়া আমাদের স্বভাবে পরিণত হয়ে গেছে।পদ্মাসেতু নিয়ে এর একটা ডামাডোল বিলক্ষণ টের পাচ্ছি। চিলে কান নিয়ে গেল তো গেল, আবার কান তো জায়গায় আছে এ রকম যখন যে যা বলছে তাতে সবাই মাজায় গামছা বেঁধে পক্ষ বিপক্ষ নিচ্ছেন। প্রকৃতপক্ষে সেতুর প্রয়োজনীয়তা, বিশ্বব্যাংকের ঋণের প্রকৃতি, রাষ্ট্রযন্ত্রের সর্বোচ্চ মহল থেকে বারবার সেতুর পক্ষে সাফাই গাওয়া, বিশ্বব্যাংককে গালমন্দের কারণ, দুর্নীতির রাজপুত্রদের রক্ষা, বিশেষজ্ঞদের মতামত প্রভৃতি সম্পর্কে হৈ হৈ রৈ রৈ পাবলিকের খুব কমই জানাশোনা আছে।আর এই সস্তা জনমতকে অনেকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগাতে তৎপর-সরকার কি বিরোধী দু পক্ষই।তবে সেতু নির্মাণের ব্যাপারে বরাবরই উচ্চকণ্ঠ রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রধান ব্যক্তি।হয়ত দেশপ্রেম বা নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন করে পরবর্তী নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার আকাংখা-যেটাই হোক তিনি বারবার নিজেদের টাকায় সেতু করবেন বলে প্রচার করে আসছেন।মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি তার দলের লোকজনের জোর প্রচারণার পরিপ্রেক্ষিতে মনে হচ্ছে এটি একটি আন্দোলনে (!) রুপান্তরিত হয়েছে। অথচ বিশেষজ্ঞরা পুরো দেশীয় অর্থে সেতু নির্মাণে যথেষ্ট সন্দেহ সংশয়ে রয়েছেন।অনেকেই বলছেন সরকার এখন বিভিন্ন ব্যর্থতাকে আড়াল করার জন্য এটাকে একটা মোক্ষম টনিক হিসেবে ব্যবহার করছেন। অধিকন্তু সরকারের সদিচ্ছা থাকলেও সে শ্যাম রাখবে না কুল রাখবে তার ইয়ত্তা পাচ্ছে না।

অনেকের মতে পশ্মিমা দেশ আরো স্পষ্ট করে বলতে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের চরম আজ্ঞাবাহী বিশ্বব্যাংকের হিসেবে সেতুটির কারণে ২০১৫ সাল থেকে শুরু করে পরবর্তী ৩১ বছরে বাংলাদেশের জিডিপি বাড়বে ৬ বিলিয়ন ডলার অর্থ্যাৎ ৫০ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে দক্ষিণাঞ্চলে কৃষি উৎপাদন বাড়বে প্রায় ৫০ শতাংশ এবং কর্মসংস্থান বাড়বে ১০.২০ শতাংশ।বাৎসরিক হারে দারিদ্র্য জাতিয়ভাবে কমবে ১.৯০ শতাংশ এবং দক্ষিণাঞ্চলে ২ শতাংশ।এ ছাড়া নয় হাজার হেক্টর জমি নদী ভাঙন থেকে রক্ষা পাবে।জমি বক্ষা, বিদ্যুৎ গ্যাসলাইন ও ফাইবার অপটিক স্থাপন এবং ফেরি সার্ভিস বন্ধ থেকে সরকারের সাশ্রয় হবে প্রায় ৮৩০ কোটি টাকা।তাই এ সেতু নির্মাণ বন্ধকে অনেকেই বাংলাদেশি বিশেষত দক্ষিণ বঙ্গের মানুষের পেটে লাথি মারার সমতূল্য মনে করছেন।আসলে কি তাই?

বিশ্বব্যাংকের কথাই আসি।এর ঋণদান কর্মসূচী, খবরদারি ও তৃতীয় বিশ্বে তার অকার্যকারিতা বিশ্বব্যাপী অনেক আলোচিত সমালোচিত হয়েছে। উন্নয়নকামী দেশ হতে পশ্চিমা দেশে পুঁজি পাচারের হাতিয়ার হিসেবে এটি বছরের পর বছর কাজ করে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ তুলেছেন অনেকেই। এমনকি এ কারণেই বিশ্বব্যাংক থেকে চাকরি খোয়াতে হয়েছিল নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ যোসেফ স্টিগলিসকে।যেসব দেশ তাদের উন্নয়নের বিষয়টি ভালোমত উপলব্ধি করেছে, তারা বিশ্বব্যাংকের খপ্পরে পড়েনি। বরং তাদের গ্রহণযোগ্য শর্তেই তারা ঋণ নিয়ে থাকে।বিশ্বব্যাংকের সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে ঋণের বিষয়টি শুভংকরের ফাঁকি ছাড়া আর কিছুই নয়।কারণ ঋণের সাথে পরামর্শকসহ অন্যান্য যে সব শর্ত আরোপ করা হয় তার মূল্যও অনেক। এক জার্মান গবেষক এ সংক্রান্ত গবেষণায় দেখান যে, মাথাভারি এ সব ঋণ ও বৈদেশিক সাহায্যের টাকা বিভিন্ন উপায়ে দ্বিগুণ হয়ে ফিরে যায় পুঁজির আঁধার সংশ্লিস্ট পশ্চিমা দেশে। জনকল্যাণমুলক খাতে বিশ্বব্যাংক এ পর্যন্ত কোন দেশে কত ঋণ দিয়েছে তার হিসেব কষলেই তার তথাকথিত সদিচ্ছার বাস্তব প্রমাণ মিলবে।ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে যদি আমরা বিশ্বব্যাংকের কাছে হাত পাতি এবং সে যদি সাড়া দেয় তাহলে বুঝে নেব তার সদিচ্ছা আছে। কিন্তু বিধি বাম।আজ পর্যন্ত বিশ্বের কোথাও তারা এ সংক্রান্ত খাতে একটি টাকা ঋণ দিয়েছে কিনা আমার জানা নেই।আমাদের মত দেশে এসব খাতে অর্থ ঋণ দিলে কি আশির্বাদই না হতো।

আগেই বলেছি সেতু নির্মিত হলে বিশ্বব্যাংকের দেখানো মতে দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নের দ্বার উন্মোচিত হবে। আসলে কি তাই? বুয়েটের আমার প্রিয়-শ্রদ্ধেয় শিক্ষক মোহাম্মদ কায়কোবাদ বলছেন ভিন্ন কথা।বর্তমান হিসেবে সেতু নির্মাণে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা ব্যায় হবে।বাস্তবায়নের সময় এর দেড়গুণও ছাড়িয়ে যেতে পারে।এই ২২ হাজার কোটি টাকা দিয়ে পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ থেকে অধিক জনসংখ্যাসমৃদ্ধ দক্ষিণাঞ্চলের জন্য বেশ কয়েকটি বৃহদৃয়তন শিল্প এবং হাসাপাতাল তৈরি করা সম্ভব।তখন এই অঞ্চলের মানুষের আর ঢাকায় আসার প্রয়োজন হবে না। অর্থ্যাৎ ঢাকাও বাঁচল যানজট আর জনবিস্ফোরণের হাত থেকে,পাশাপাশি দক্ষিণাঞ্চলও বাঁচল বেকারত্ব আর ঢাকা যকওয়ার বিড়ম্বনা থেকে। প্রাক্কলিত টাকা দিয়ে মোটামুটি হাজার দশেক ক্ষুদ্র শিল্প প্রতিষ্ঠা করা যায়, এতে করে এলাকার জমির কম দাম ও অন্যান্য সুবিধা কাজে লাগিয়ে স্বল্প বিনিয়োগে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান করা যায়।ফলে সম্ববত এ অঞ্চলের প্রতিটি পরিবারই কর্মসংস্থানের সুফল ভোগ করতে পারবে।বিভিন্ন সেতু তৈরির কারণ যদি বাড়তি উৎপাদিত পচনশীল ফল,শাক সবজি সামনে হাজির করতে হয়, এর থেকে অনেক উৎপাদনশীল কাজ হতো ওই ফলমূল সংরক্ষণের জন্য শিল্প কলকারখানা চালু করা।আমাদের যদি রাজনৈতিক উদ্দেশ্রই থাকে জনগণের ভাগোন্নয়ন তবে আগে নজর দিতে হবে তাদের নিশ্চিতকরণের দিকে।এক্ষেত্রে আপাতত সমুদ্র থেকে মৎস আহরণ এবং দক্ষিণাঞ্চলের জন্য উপযোগী কলকারখানা তৈরিতে মনোযোগী হতে হবে।

উল্লেখ্য যে,কানাডার মত ধনী দেশের ভিক্টোরিয়া প্রদেশের রাজধানীর সাথে সর্ববৃহৎ শহর ভ্যানকুভারের মধ্যে যোগাযোগের জন্য কোন সেতু নির্মিত হয়নি। ফেরিই পারাপারের একমাত্র অবলম্বন সেখানে।ওই এলাকার উন্নয়নও থেমে থাকে নি।

দেশে যখন প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ সোজা কথায় প্রাদেশিক শাসনের পক্ষে অনেক কথা বার্তা জোরালোভাবে আলোচিত হচ্ছে তখন কেন এ বিষয়গুলো বিকল্প হিসেবে আমরা ভাবছি না। এমনিতেই ঢাকার সার্বিক পরিস্থিতিতে শহরবাসী নাকাল। তারপর ঢাকাকে উন্মুক্তকরণ কতটা যুক্তিযুক্ত তা নিয়ে প্রশ্ন তোলাই যেতে পারে। আর সেতু যদি করতেই হয় তাহলে তা দেশের টাকাতেই হোক এ দাবির সমর্থনে সবাই প্রায় একাট্টা। আমাদের দেশের ডিজাইনার, স্থপতি ও প্রকৌশলীরা বিদেশ গিয়ে অত্যন্ত সুনাম ও সুখ্যাতির সাথে অনেক বড় বড় দায়িত্ব পালন করছেন। তাদেরকে পদ্মাসেতুর জন্য কাজ করার সুযোগ দিলে দেশ কৃতার্থ হবে। মাথা উঁচু করে তখন বলতে পারব ‘ আমরাও পারি’। আর খরচ নেমে আসবে অনেক কমে। এভাবে পশ্চিমা দেশের নীতিকে পুরোপুরি গ্রহণ না করে রাষ্ট্রের নিজস্ব উপাদান কে কাজে লাগিয়ে অনেক দেশ আজ উন্নতির দিকে ধাবিত হয়েছে। চীন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া,ভারত প্রভৃতি দেশ এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

আমাদের দেশের সাবেক একজন রাষ্ট্রপ্রধান, জেনারেল,অনেককেই যাকে স্বৈরশাসক বলতে দেখি,যদিও তার শাসনামল চোখে দেখার সৌভাগ্য হয় নি তথাপি শুনেছি।যা হোক তার নাকি আবার রয়েছে ব্যাপক কাব্য প্রতিভা।কিন্তু প্রকৃত কবিরা কেন যে তার প্রতি ব্যাপক বিরক্ত তা আমার জ্ঞানে আসে না।তার এ প্রতিভার প্রশংসা(!) করে কবি মোতাম্মদ রফিক বলেছিলেন.”সব শালা কবি হবে/পিপীলিকা গো ধরেছে উড়বেই”।এ কবিতা খানির জন্য নাকি কবি রফিককে ঐ জেনারেলের সাঙ্গপাঙ্গরা ভয়ানক নির্যাতন করেন। তো কথা হলো গো ধরলে চলবে না।আগে সমস্যা বুঝতে হবে। সুবিধা-অসুবিধা যাচাই বাছাই করতে হবে।দেশীয় বিশেষজ্ঞের মতামত নিতে হবে। সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব খতিয়ে দেখতে হবে।বিকল্প অর্থায়নের নির্বাচনী নয় যৌক্তিক ভিত্তি খুঁজে পেতে হবে। ঋণ বাতিলের ফলে সেতু নির্মাণ ছাড়া পদ্মার ওপারের ব্যাপক উন্নয়নের কর্মসূচী হাতে নেয়া যেতে পারে। আর এসব কিছু নির্ভর করবে প্রধানত দেশের রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, প্রবাসী,বুদ্ধিজীবি সর্বোপরি সচেতন সাধারণ জনগণের সামগ্রিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে।একতরফা কোন কিছু করা থেকে বিরত থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। আমরা সবাই জানি পিপীলিকার উড়ার সাধ জাগে অর্থ্যাৎ উড়ার জন্য সে গো ধরে তখনই,যখন তার পাখা গজায়। আর আমরা এটাও জানি -পিপীলিকার পাখা গজায় মরিবার তরে। পদ্মাসেতু সরকারের জন্য পিপীলিকার পাখা হবে না এ কামনা প্রতিটি দেশদরদী মানুষের রয়েছে।

ছবিসূত্র: ইন্টারনেট থেকে নেয়া।