ক্যাটেগরিঃ ইতিহাস-ঐতিহ্য

এক নজরে টেরাকোটা প্যানেলসমূহ :

কান্তজিউ মন্দিরে মুলত রামায়নে বিবৃত রাম ও কৃষ্ণের ঘটনাবলী ধারাবাহিকভাবে চিত্রায়িত হয়েছে। তবে মহাভারতে বর্ণিত কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের অংশটি কৃষ্ণের ঘটনাবলী উৎকীর্ণের পরিপ্রেক্ষিতে এখানে আনা হয়েছে। নিম্নে মন্দিরের প্রতিটি দিকের প্যানেল ভিত্তিক সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরা হলো। মন্দিরের দক্ষিণ ডান ব্লকের (ডান থেকে বাম) প্যানেল ১ থেকে প্যানেল ২৫ পর্যন্ত, দক্ষিণ ডান কলামের (ডান থেকে বাম) প্যানেল ১ থেকে প্যানেল ১১ পর্যন্ত, পূর্ব বাম ব্লকের (বাম থেকে ডান) প্যানেল ১ থেকে প্যানেল ২৭ পর্যন্ত, পূর্ব বাম কলামের (বাম থেকে ডান) প্যানেল ১ থেকে প্যানেল ১৫ পর্যন্ত, পূর্ব ডান কলামের (বাম থেকে ডান) প্যানেল ১ থেকে প্যানেল ১৫ পর্যন্ত, পূর্ব ডান ব্লকের (বাম থেকে ডান) প্যানেল ১ থেকে প্যানেল ২৭ পর্যন্ত – রামায়নের বিভিন্ন কাহিনী টেরাকোটায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মন্দিরের দক্ষিণ বাম ব্লকের (ডান থেকে বাম) প্যানেল ১ থেকে প্যানেল ২৫ পর্যন্ত, দক্ষিণ বাম কলামের (বাম থেকে ডান) প্যানেল ১ থেকে প্যানেল ১১ পর্যন্ত, পশ্চিম ডান ব্লকের (ডান থেকে বাম) প্যানেল ১ থেকে প্যানেল ২৭ পর্যন্ত, পশ্চিম ডান কলামের ১৫ টি প্যানেল, পশ্চিম বাম কলামের (ডান থেকে বাম) প্যানেল ১ থেকে প্যানেল ২৭ পর্যন্ত, উত্তর বাম ব্লকের (বাম থেকে ডান) প্যানেল ১ থেকে প্যানেল ২৫ পর্যন্ত, উত্তর বাম কলামের (বাম থেকে ডান) প্যানেল ১ থেকে প্যানেল ১১ পর্যন্ত, উত্তর ডান ব্লকের (বাম থেকে ডান) প্যানেল ১ থেকে প্যানেল ২৫ পর্যন্ত, উত্তর ডান কলামের (বাম থেকে ডান) প্যানেল ১ থেকে প্যানেল ১১ পর্যন্ত – রামের জীবণ ও কর্মের নানা ঘটনাপ্রবাহ সুিিবন্যাস্তভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। মন্দিরের দক্ষিণ বাম ব্লকের (বাম থেকে ডান) প্যানেল ১ থেকে প্যানেল ২৫ পর্যন্ত, দক্ষিণ বাম কলামের (বাম থেকে ডান) প্যানেল ১ থেকে প্যানেল ১১ পর্যন্ত, দক্ষিণ ডান কলামের (বাম থেকে ডান) প্যানেল ১ থেকে প্যানেল ১১ পর্যন্ত, দক্ষিণ ডান ব্লকের (বাম থেকে ডান) প্যানেল ১ থেকে প্যানেল ২৫ পর্যন্ত, পূর্ব বাম ব্লকের (বাম থেকে ডান) প্যানেল ১ থেকে প্যানেল ২৭ পর্যন্ত, পূর্ব বাম কলামের (বাম থেকে ডান) প্যানেল ১ থেকে প্যানেল ১৫ পর্যন্ত, পূর্ব ডান কলামের (বাম থেকে ডান) প্যানেল ১ থেকে প্যানেল ১৫ পর্যন্ত, পূর্ব ডান ব্লকের (বাম থেকে ডান) প্যানেল ১ থেকে প্যানেল ২৭ পর্যন্ত, উত্তর বাম ব্লকের (বাম থেকে ডান) প্যানেল ১ থেকে প্যানেল ২৫ পর্যন্ত, উত্তর বাম কলামের (বাম থেকে ডান) প্যানেল ১ থেকে প্যানেল ১১ পর্যন্ত, উত্তর ডান কলামের (বাম থেকে ডান) প্যানেল ১ থেকে প্যানেল ১১ পর্যন্ত, উত্তর ডান ব্লকের (ডান থেকে বাম) প্যানেল ১ থেকে প্যানেল ২৫ পর্যন্ত, পশ্চিম বাম ব্লকের (বাম থেকে ডান) প্যানেল ১ থেকে প্যানেল ২৭ পর্যন্ত, পশ্চিম বাম কলামের (বাম থেকে ডান) প্যানেল ১ থেকে প্যানেল ১৪ পর্যন্ত, পশ্চিম ডান কলামের (বাম থেকে ডান) প্যানেল ১ থেকে প্যানেল ১৫ পর্যন্ত, এবং পশ্চিম ডান ব্লকের (বাম থেকে ডান) প্যানেল ১ থেকে প্যানেল ২৭ পর্যন্ত – অষ্টাদশ শতকের দিনাজপুর ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মানুষের সামাজিক জীবনের পরিচয় তুলে ধরে।৪৭

পর্যালোচনা
প্রথমত: হিন্দু স¤প্রদায়ের নিকটে মন্দির হলো ভগবানের আবাসস্থল। গুপ্ত, পাল, সেন ও চন্দ্র বংশের শাসনামলে অর্থাৎ সাধারণভাবে বলা চলে প্রাচীনকালে বাংলাদেশে অসংখ্য মন্দির নির্মাণ করা হয়। হিন্দু বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী শাসকদের পরে আসে মুসলিম শাসন। মুসলিম শাসনের প্রাথমিক পর্বে বিশেষত সুলতানী আমলে বাংলাদেশে মন্দির নির্মাণের কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। কিন্তু শেষ দিকে বিশেষ করে মুঘল শাসনের শেষ দিকে বাংলায় কিছু সংখ্যক মন্দির নির্মাণ করা হয়। দিনাজপুর শহর থেকে ২১ কি.মি উত্তরে অবস্থিত কান্তজিউ মন্দির হলো এর মধ্যে একটি। এটি হলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ ধর্মীয় উপসনালয়। রাজা প্রাণনাথ ১৬৮২ থেকে ১৭২২ সালের মধ্যে এই মনুমেন্ট স্থাপন করে তা কৃষ্ণ ও তাঁর স্ত্রী রুকমিনির নামে উৎসর্গ করেন। মন্দিরের নির্মাণ কাজ অসমাপ্ত রেখে ১৭২২ সালে প্রাণনাথ মৃত্যুবরণ করলে তাঁর পালক পুত্র রামনাথ ১৭৫২ সালে এর নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করেন। বাংলাদেশ হলো একটি নদীমাতৃক দেশ। এর মাটি খুব সুন্দর ও উর্বর। এর কাদা মাটিকে অতি সহজেই ইটে রূপান্তরিত করা যায়। ফলে দেখা যায় যে, মধ্যযুগের শেষ পর্বে অধিকাংশ মন্দির পোড়া ইটের মাধ্যমে নির্মাণ করা হয় এবং প্রায় সকল মন্দির, টেরাকোটার ফলকে আবৃত করা হয়েছে।

দ্বিতীয়ত: বলা হয়ে থাকে যে, রাজা প্রাণনাথ কান্তের (প্রভু কৃষ্ণের ভালোবেসে দেয়া নাম) প্রতিকৃতি বৃন্দাবন থেকে এনে তাঁর প্রাসাদের ১৮ কি.মি উত্তরে কান্তনগরে স্থাপন করেন। রাজা কেন মূল শহর ও প্রাসাদ থেকে এত দূরে এ মন্দির নির্মাণ করেন, এ প্রশ্ন সকলের মনে উদ্রেক হইতেই পারে। স্থানীয় ভাবে বলা হয় যে, তিনি স্বপ্ন দ্বারা তাড়িত হন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় যে, কান্তনগর ছিল যথেষ্ট উর্বর এলাকা। তাছাড়া ঢেপা নদীর উপর দিয়ে যাওয়া নদীপথের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে জমিদারের ছিল। এ সকল উদ্দেশ্যে রাজা স্থানীয় হিন্দু প্রজাদেরকে সন্তুষ্ট করতে এবং তাঁর মানবীয় জনকল্যাণমূলক নীতির আওতায় এখানে মনুমেন্ট স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। তাঁর নীতি তাঁর পুত্র রামনাথ ও অনুস্মরণ করে মন্দিরের অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করেন।



চিত্র: যথাক্রমে গ্রাউন্ড, প্রথম তলা ও দোতলার ভূমি নকশাঁ, কান্তজিউ মন্দির।

তৃতীয়ত: কান্তজিউ মন্দির হলো নবরত্নœ মন্দিরের ইন্দো-ইসলামীয় প্রকৃতির। যদিও এ মন্দিরের নয়টি শিখর বা রত্নœ কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। এর পরিকল্পনা, বিন্যাস ও অলংকরণে মধ্যযুগীয় শেষ দিকের মন্দিরের প্রচলিত স্টাইলের যথার্থ প্রয়োগ ঘটেছে। এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও অসম্ভব সুন্দর একটি মনুমেন্ট। এর আদ্যপান্ত পোড়ামাটির অসংখ্য ফলকে সাজানো হয়েছে। প্যানেলগুলি আনুভূমিক ও উল্লম্ব দু’ভাবেই বিন্যাস্ত। আনুভূমিক সারিতে মধ্যযুগের শেষ পর্বে অভিজাতদের সামাজিক জীবনাচরণ, পৌরাণিক নায়ক রাম ও কৃষ্ণের জীবন-কর্ম অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ছবির মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়েছে। টেরাকোটার ফলক বিশ্লেষণ করে একথা ভাবা অপরিণামদর্শী হবে না যে, শিল্পীরা স্থানীয় জনসাধারণের গান, নাটক এবং কবিতা দ্বারা অনেকাংশে প্রভাবিত হন। বিভিন্ন মিথলজিকাল আকৃতি ও গল্প নির্মাণে এগুলি ছিল তাদের অন্যতম প্রধান উৎস।৪৮ উল্লম্ব কলামে ঋষিদের নানাপ্রকার প্রতিকৃতির পাশাপাশি বিষ্ণুর দশটি রূপ- মৎস, কর্ম, বরহ, নরসিমা, বমন, পরশুরাম, রাম, বলরাম, কৃষ্ণ ও কলকি উৎকীর্ণ করা হয়েছে। মন্দিরের যাবতীয় কার্যক্রম এখনও বহমান। আজো হিন্দু ধর্মানুযায়ী জনগণ এখানে পুজা দেয় এবং স্থানীয় অনেকেই দৈনন্দিন ধর্মীয় কার্যাবলী পালন করেন।

শেষত: বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাস ঐতিহ্যের অন্যতম অংশ হলো এই সার্বজনীন মন্দিরটি। কিন্তু বর্তমানে এর সংরণের ব্যবস্থাপত্র খুবই দূর্বল। কর্তৃপ ও জনগণ উভয়ের দায়বদ্ধতা থেকেই এর প্রতি বিশেষ যতœবান হওয়া জরুরী। বর্তমানে সংরণের েেত্র গৃহীত পদ্ধতির মধ্যে কতিপয় অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা রয়েছে, যা সৌধটিকে অনেকাংশে তিগ্রস্থ করছে। উপরের তলা থেকে বৃষ্টির পানি নির্গমনের জন্য লোহার পাইপ ব্যবহার করা হয়। পাইপগুলি যথেষ্ট ছোট। এর ফলে উপর তলা থেকে পানি নিচে আসার সময় পিলারগুলি ভিজে যায়। যা টেরাকোটা প্যানেলকে তিগ্রস্থ করে। অবশ্য একথা ভেবে দেখা দরকার যে, আগা গোড়া টেরাকোটা যুক্ত স্থাপত্য কর্মে লোহাড় পাইপ ব্যবহার করা কতটুকু যুক্তিসংক্রান্ত। বরং এেেত্র লোহার পাইপের পরিবর্তে পোড়ামাটির তৈরি পাইপ ব্যবহার করা আশু দরকার। তাছাড়া আরো কতগুলি কারণে টেরাকোটার ফলকগুলি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কোন কোন সময় অসচেতন অনেক দর্শনার্থী ফলকগুলো স্পর্শ করে। পুজোর সময় পূজারী একটু দূরত্ব থেকে প্রতিমার দিকে মুদ্রা/কয়েন ছুড়ে মারে। অনেক সময় এগুলি অসাবধানতাবশত টেরাকোটায় আঘাত হানে। অসংখ্য কবুতর মন্দিরের উপর দিনে সব সময় অবস্থান করে এবং মলত্যাগ করে। কবুতরের বর্জ্য পদার্থ হলো অম্লীয়, যা টেরাকোটর ফলকসহ পুরো স্থাপনার জন্য তিকর। মন্দিরের দুই পার্শ্বে অনেককে রান্না করতে দেখা যায়। উদ্বায়ী পদার্থ, ধোঁয়া ও ছাই পোড়ামাটির ফলকের উজ্জলতা নষ্ট করে এবং ময়লা পড়ে তা অনেকটা অস্পষ্ট হয়ে ওঠে। মন্দিরের অধিকাংশ রণাবেণকারী প্রতœসম্পদ সংরণে গৃহীত নীতিমালা ও কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে প্রায় একেবারেই অজ্ঞ। প্রতিদিনের পুজা পালনকারী অনেক পূজারী মন্দির রায় ততটা সচেতন নয় তাদের সাথে কথা বলে একথা জানা যায়। বাংলাদেশের সভ্যতা-সংস্কৃতি ও ইতিহাস-ঐতিহ্যের নিরব স্বাী শেষ মধ্যযুগীয় এ স্থাপনাকে বাঁচানো দেশের সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ দেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিককে দায়িত্ব পালন করতে হবে। বলা হয়ে থাকে যে, সভ্যতা সংস্কৃতি এবং উন্নয়ন প্রগতি পরস্পরের পরিপূরক।

৪৭.
Hoque, M.M et al, ” Kantajee Temple An Outstanding Monument of Late Madieval Bengal “, publication Dept. of Drik, Dkaha, 2005, PP. 152-177.

৪৮.
Hoque, Z. “Literary Sources in Brick Temples of Bengal” (Michell, G. ed) New Jersey: Princeton University press, 1983, PP.171-176.
উদ্ধৃতH o
Hoque, M. M et al. Op. Cit. P. 181.