ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

সময় ও সভ্যতার স্রোতে বাস্তবতাগুলো ক্রমেই ভোতা হয়ে যাচ্ছে না আমরাই আমাদের বিবেক গুলোকে অবশ ও অনুভূতিহীন করে ফেলছি এই যুক্তিতর্কের দ্বন্দ আজন্ম। ইতিহাসবিদদের আক্ষেপ, ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতা হচ্ছে মানুষ ইতিহাস থেকে শেখেনা, তথাকথিত প্রগতিশীলদের মতে, মানুষ নতুনকে বরন করতে চায়না, রাজনীতিবিদদের কাছেতো, শেষ বলে কিছু নেই। সবার পেছনেই অসংখ্য যুক্তি থাকলেও সাধারন খেটে খাওয়া মানুষের একটাই চাওয়া মুক্তি চাই, শুধুই মক্তি চাই আর দুবেলা পেট পুরে আহার করে অস্তিত্ব নিয়ে বাঁচতে চাই। দুর্ভাগ্য, সাধারনের এই নিষ্কলুষ ছোট্ট আকাংখাগুলিও সমাজে সর্বদা গুমরে কেঁদে ফিরে কখনও বাসন্তীর ছেঁড়া জালের বসনে, কখনও ফেলানীর মত কাটা তারে ঝুলে কিংবা ডাস্টবিনের মাঝে প্রতিপত্তিধারীদের উচ্ছিষ্ট অংশে কুকুরের সাথে ভাগ বসিয়ে। আর মধ্যবিত্তরা তো সারাজীবন অভেদ্য বৃত্তের মাঝে এক বুক দীর্ঘশ্বাস নিয়ে মৃত্যুর আকাঙ্খা নিয়ে অপেক্ষমান।

কলামিস্টরা সাহস দেয়, একদিন না একদিন অবশ্যই এর পরিবর্তন হবে, শোষক আর জালিমকে একদিন বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতেই হবে। আসলে আদৌ হবে কিনা তা নিয়ে চক্রবাকে ঘুরপাক খাওয়া নিষ্পেষিত মানুষগুলোর কিইবা আসে যায়। ঘুরপাক খাওয়া এই অভেদ্য বৃত্তের মাঝে নিষ্পেষিতরা উত্তরাধিকারদের জন্য একটি চমৎকার উইল রেখে যাচ্ছে, আমরা আমাদের বাবাদের কাছ থেকে কিছু পাইনি, সুতরাং তোমরাও কিছু আকাঙ্খা করনা। ধর্মের কিংবা সমাজতন্ত্রের আবহে বাক্যটিকে অমূল্য মনে হলেও এক বুক দীর্ঘশ্বাস মেশানো অভিব্যক্তি, তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। টাকার প্রিন্ট পরিবর্তন হয়, গাণিতিক মিটারে জিডিপি বাড়ে, মুদ্রাস্ফীতি এক না দুই অংকের কোটায় থাকবে তা নিয়ে অভিজাত হোটেলে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা হয়, ক্ষমতাসীন আর বিরোধীদলের মাঝে অর্থনীতি পাকে না বিপাকে এনিয়ে চায়ের কাপে ঝড় উঠলেও সাধারন মানুষ জানতে চায়, তার ভাতের মোটা চালের দাম কমল কিনা, বাচ্চার স্কুলে এবারও কি উন্নয়ন ফি দিতে হবে, সপ্তাহে একবেলা পরিবারে একটু আমিষের জোগান দেয়া যাবে কিনা। হয়ত বা এবারও তাকে নিরাশ হতে হবে। তারপর ও বেঁচে থাকার কি অকুণ্ঠ ব্যাকুলতা নিয়ে ভাল থাকার অভিনয় করতে হয়। রাজপথে প্রতিপত্তিদের নতুন ব্রান্ড গাড়ির ভিড়ে লক্কর ঝক্কর মুড়ির টিনের মত লোকাল গাড়ির ঠাই নিতে কতই না চেষ্টা করতে হয়, আর বেরসিক কন্ট্রাক্টর চিৎকার দিয়ে বলে, ওস্তাদ ডাইনে প্লাস্টিক অথবা, বায়ে বড় লোকের ছোট গাড়ি।

এতো গেল চলমান অর্থনৈতিক বৈষম্যের এক চিলতে প্রতিচ্ছবি। এবার আসা যাক বাজারের ক্ষেত্রে, ওজনে কম দেয়া কিংবা কম ওজনের বাটখারা দিয়ে ওজন করা এগুলো এখন হর-হামেশা, পাশাপাশি নতুন ডিজিটালাইজড সংস্করণ হচ্ছে ফরমালিন (প্রিজারভেটিভ!) এর যথেচ্ছ ব্যবহার, নাজির শাইল চালে এসেন্স মাখিয়ে কালোজিরায় রূপান্তর, মোটা চালকে দ্বি-ছাটা তত্ত্বের মাধ্যমে মিনিকেটে রূপান্তর, বৈদ্যুতিক ট্রান্সমিটারের মাঝে ভোজ্য তেলের উৎস প্রাপ্তি সহ কত হরেক রকমের গা শিহরিত পদ্ধতির প্রয়োগের পর ঝকঝকে তাজা, সজীব(!) পণ্যটি আমরা ভোগ করি। যানবাহনে তো আরক জগতের মুখোমুখি হতে হয়- সিটিং গাড়ির চিটিং বাস্তবতা জানিনা এমন মনে হয় কাউকেই খুজে পাওয়া যাবেনা, কন্ট্রাক্টর এর ডাইরেক্ট- ডাইরেক্ট বলে চিৎকারের মাধ্যমে যাত্রাস্থল থেকে গন্তব্য পর্যন্ত প্রতিটি নির্ধারিত বা অনির্ধারিত স্পটে যাত্রী উঠানামার পরেও যাত্রাস্থল-গন্তব্যস্থল (…) টাকা একটি টিকিটই পাওয়া যাবে মহামান্য (!) কন্ট্রাক্টর কাম সুপারভাইজর কাম ড্রাইভার এর কাছে। কারণ এরপরেও ওনার ইচ্ছার উপর নির্ভর করবে আপনাকে গাড়িতে তোলা, ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়া বা আপনাকে দু’গাল শুনিয়ে দেয়া। সকালে, বিকালে বা যেকোন পিক আওয়ারে সকল লোকাল গাড়িই সিটিংয়ে পরিবর্তন, বিশেষ পার্বনে টিকিটের দাম দ্বিগুন হাঁকান এরকম অসংখ্য নির্যাতন তো গা সওয়া প্রতিদিনেরই অংশ। কম যায়না কিছু কিছু যাত্রীরাও, নির্দিষ্ট পথের ভাড়া দিয়ে অতিরিক্ত পথ চুপ করে বসে থাকা, ভাড়া না দিয়ে, দিয়েছি বলে উল্টো শাসান- সব কিছুই নিত্যনৈমত্তিক খেলা। ভুল ক্রমেও যদি কোন রিক্সায় ভাড়া ঠিক না করে ওঠা হয়, আর যদি রিক্সাচালক টের পায় যে আপনি শার্ট পড়া ভদ্দরনোক, তাহলে পরিশেষে দেড়গুন ভাড়াযে আপনাকে গুনতে হবে এব্যাপারে আপনাকে শতভাগ নিশ্চিত থাকতে হবে। পাশাপাশি যদি আপনার সাথে বিপরীত লিঙ্গের কেহ থাকে , তাহলে তো পোয়াবারো। শিক্ষাক্ষেত্রে, ক্লাসরুম ট্রান্সফার টু কোচিং অর ব্যাচ ডট কম- এ থিউরির সাথে পরিচিত হননি এমন অভিভাবক খুঁজতে যাওয়া হাস্যকর বোকামি ছাড়া আর কিছুই না। চিকিৎসা ক্ষেত্রে তো কমিশন নির্ভর ঔষধ কোম্পানী টু ডাক্তার আর ডাক্তার টু কিনিক এ দুই থিউরির একটি না একটির মাধ্যমে নিষ্পেষিত হতেই হবে। চলমান সমাজে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে- এ রকম এমন কোন-ক্ষেত্র খুজে পাওয়া দুস্কর যেখানে আমাদের প্রতিনিয়ত কোন না কোন ভাবে নির্যাতিত হতে হয়না।

মসজিদে ইমাম সেদিন জুলুম নিয়ে জুমার আগে খুতবা দিচ্ছিল, বেশ আবেগঘনভাবে কোরআন-হাদীসের রেফারেন্স দিয়ে পরকালে আজাবের বর্ননা দিচ্ছিলেন, যথারীতি মুক্তাদিরা নিশ্চুপতার সাথে শুনছিল, অন্যের এক বিঘাত জমি যদি জুলুম করে কেউ ভোগ করে, কিয়ামতের দিনে সাত তবক আসমান তার গলায় ঝুলিয়ে দেযা হবে। অপেক্ষার প্রহর গুনতে ছিলাম, ইমাম সাহেব কখন সেই হাদিসটি শুনাবেন, যে-জুলুম দেখলে সাথে সাথে সেখানে হাত দিয়ে বাধা দিতে হবে, হাত দিয়ে বাধা দেবার ক্ষমতা না থাকলে মুখে প্রতিবাদ করতে হবে, সে ক্ষমতা না থাকলে নূন্যতম জুলুমকে মন দিয়ে ঘৃনা করতে হবে , আর এটা হচ্ছে সবচেয়ে দূর্বল ঈমানের লক্ষন। কেন জানিনা, সেদিন ইমাম সাহেব আর বেশী দূর গেলেন না, হয়ত বা চাকুরী চলে যাবার ভাবনা! প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ, প্রতিস্থানে এ ভাবেই আমরা হারিয়ে যাই প্রতিবাদের গলি থেকে, ব্যক্তিত্ব আর অভিজাত্যের সংরক্ষণের আবরণে।

বিরাজমান সমাজের সকল বড় বড় অনাচারের সৃষ্টি এভাবেই ক্ষুদ্র অবয়ব থেকে শুরু হয়। সমজাতীয় প্রসঙ্গে সেদিন লোকাল গাড়ির এক সহযাত্রী বলছিল, বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাধঁবে কে? হ্যাঁ, নেতৃত্বের সমস্যা শুধু আজ এবং এখানেই নয়, পৃথিবী ব্যাপী আজন্ম ছিল এবং চলমান। এক সময় ইরানী দূতাবাস থেকে প্রকাশিত নিউজ লেটারের কাভার পেইজের বদৌলতে কুরআনের সূরা আন-নেসার ৭৫নং আয়াতটির সাথে পরিচয়। বড় হয়ে আয়াতটি বহুভাবে বুঝার চেষ্টা করেছি যেখানে আল্লাহ বলেন, “তোমাদের কি হয়েছে? তোমরা কেন সেই সমস্ত অসহায নর-নারী ও (দুস্থ) শিশুদের বাঁচাবার জন্য আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করোনা, যারা ( নির্যাতনে কাতর হয়ে) ফরিয়াদ করছে, হে আমাদের রব, আমাদের এই যালেমদের জনপদ থেকে বের করে অন্য কোথাও নিয়ে যাও। অতপর তুমি আমাদের জন্য তোমার কাছ থেকে একজন অবিভাবক বানিয়ে দাও, তোমার কাছ থেকে আমাদের জন্য একজন সাহায্যকারী দাঁড় করিয়ে দাও”- আয়তটিতে যুগ যুগ ধরে বিরাজমান সমাজের নির্যাতিত সেই মানুষগুলোর অসহায় আর্তি ই প্রকাশ্য। কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট: প্রথমত প্রতিবাদ করতে হবে তৎক্ষনাৎ, সকলকে, সর্বতভাবে। দ্বিতীয়ত: নিজের অক্ষমতা প্রকাশ করে, অন্য কেহ প্রতিবাদ করবে আর আমি সর্বতভাবে সাহায্য করব- এই ধারণা পোষন করে অপেক্ষার প্রহর গোনার কোন সুযোগ নেই। তৃতীয়ত: প্রতিবাদ করলেই সমর্থন ও সাহায্য অবধারিত।

চেঙ্গিস খানের নাম শুনেনি এমন লোক পাওয়া দুস্কর। মঙ্গোলিয়ানদের এক দু:সময়ে শান্ত সুবোধ ছেলেটি ইতিহাসের অন্যতম নায়ক পরিণত হয়েছিল। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, সভ্যতার সকল উত্থান-পতনকারী নায়কেরা একদা দূর্বল ও শান্ত স্বভাবের ছিল। পরবর্তীতে তারা নায়ক বা খল নায়ক যাই হোক না কেন, পরিচিতি কিন্তু প্রতিবাদের মাঝ দিয়েই। সুতরাং পাছে লোকে কিছু বলে – এমন ধারণার বশবর্তী হয়ে পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই। তবে প্রতিবাদের ভাষা হতে হবে নি:স্বার্থ ও গঠনমূলক। ছাত্র জীবনে ক্যাম্পাসের দেয়ালের একটি স্লোগান আজও মনে পড়ে- “ সত্য বলতে হবে সর্ব্বোচ্চ চিৎকারে”।
তবে কি , এখনও হয়নি সময় আমাদের জেগে উঠার! স্বাগত হে বন্ধু…………… সমাজ ও সভ্যতা তোমার অপেক্ষায়!