ক্যাটেগরিঃ জনজীবন

 

পৃথিবীতে কতো ধরণের অসহায় মুখ হয়…ছুটির প্রার্থণায় বসের সামনে অসহায় মুখ…চাকুরিপ্রার্থীর অসহায় মুখ…স্বচ্ছল বন্ধুর কাছে টাকা ধার চাইতে গিয়ে অসহায় মুখ…নিজের পাওনা টাকা চাইতে গিয়ে বড়লোক আত্মীয়ের সামনে অসহায় মুখ…পাওনাদারের কড়া কথার মুখে দেনাদারের অসহায় মুখ…জরিমানার ভয়ে ট্রাফিক সার্জেন্টের সামনে দাঁড়ানো চালকের অসহায় মুখ…সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে ডাক্তারের সামনে দাঁড়ানো অসহায় মুখ…বিয়ে বাড়ির ফেলে দেয়া খাবার চাইতে গিয়ে চোর সন্দেহে আটক টোকাইয়ের অসহায় মুখ…

আরো কতো কতো ধরণের অসহায় মুখের ছবি দেখি প্রতিদিন…তবে একটা অসহায় মুখের ছবি মনে গেঁথে রয়েছে…বোধহয় থাকবে আজীবন…

বছর ছ’য়েক আগে একদিন দুপুরে ভাত খেতে যাচ্ছি হোটেলে…হোটেলে ঢোকার সিঁড়ির মুখেই জিলেপির দোকান…বেশ আয়োজন করে গরমা গরম তেলে শাহী জিলেপি ভাজা হচ্ছে…সিঁড়ি বেয়ে এক দুকদম উঠতে না উঠতেই চোখ গেলো জিলেপির দোকানের পাশে দিয়ে হেঁটে যাওয়া এক যুবকের দিকে…

আধ ময়লা শার্ট-প্যান্ট পরা যুবক…যুবকের হাত ধরে আছে ৪-৫ বছরের ফুটফুটে একটা বাচ্চা…মূলত বাচ্চাটার কারনেই ওই যুবককে এতো ভালো করে খেয়াল করা…বাচ্চাটা খুব আগ্রহ নিয়ে তার বাঁ হাতে তুলে দোকানের থরে থরে সাজানো জিলেপি দেখিয়ে বললাে, খাবো।

যুবকটি সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে বললো, বাবা জিলেপি খাবে? এ কথা বলতে বলতেই সে তার বুক পকেটে হাত দিলো…আর অসহায় মুখ করে খুব দ্রুত জবাব দিলো, ‘থাক বাবা। এগুলো খাওয়া লাগবে না। এগুলো ভালো না।’ কথাগুলো বলেই বাচ্চাটিকে দ্বিতীয় কোন আবদারের সুযোগ না দিয়ে চট করে ওকে কোলে নিয়ে হনহন করে হাঁটা দিলো সে।

এক মিনিটেরই ঘটনা…আর ওই অসহায় মুখের সিন তো বোধহয় ২-৩ সেকেন্ডের…কিন্ত ওই স্বল্প সময়ের অসহায় মুখটায় লেখা ছিলো অনেক কিছু…

লেখা ছিল, আমি একজন বেকার যুবক…অক্ষম অসহায় পিতা…যার পকেটে মাত্র আটটি টাকা নেই বাচ্চাকে একটা গরম জিলেপী কিনে দেবার জন্যে…

একবার ভেবেছিলাম বাপ ব্যাটাকে ডাক দিয়ে পেট পুরে জিলেপী খাওয়াই…পরক্ষনেই মনে হলো আমাদের মানে গরীবের আত্মসম্মানবোধ তীব্র…আর লুঙ্গি পরা মানুষদের যতো সহজে করুণা করা যায়, সে তুলনায় প্যান্ট পরাদের করুণা করা রীতিমতো সাহসের ব্যাপার…