ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

ঈদ মানে আনন্দ, ঈদের দিনকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যাবসা হয় আমাদের এ সোনার বাংলায়। ১৯৭১ এর ঈদুল ফিতর কেমন ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়, নতুন প্রজন্মের অনেকই জানিনা।

২০ নভেম্বর থেকে ০৮ ডিসেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ঈদের জামাতে সাধারণ মানুষের সংখ্যা হাতেগোনা। বাড়ী বাড়ী হুমকি দিয়ে কিছু লোক জমায়েত করা হয়েছিল। মাঠ ছিল বর্তমানের তিন ভাগের একভাগ। ভয়ে হুমকিতে যারা গেছে তারাও নামাজ কখন শেষ হবে সে অপেক্ষায় উসখুস হয়ে উঠে। কারো ভাবনাতেই ছিলনা সেদিন সকলের অলক্ষ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কি ঘটতে চলেছে।

তখনকার ব্রাহ্মণবাড়িয়া সাবজেল থেকে শহীদ সিরু মিয়া দারোগা ও তার সন্তান শহীদ কামাল আনোয়ার ও শহীদ নজরুলসহ ৩৯ জনকে ঈদের দিন কারাগার থেকে বের করে এনে পৈরতলা (দঃ) (গণকবরের কাছে) ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে গণকবর দেয় পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকাররা।

পৈরতলা গণকবর এখানেই ঈদের দিন ৩৯কে হত্যা করা হয়

বর্ণিত পৈরতলা গণকবরের ছবি

তখন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাবজেলে বন্দি ছিলেন ১৫ বছরের কিশোর মুক্তিযোদ্ধা বর্তমানে জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত জনপ্রিয় সুরকার ও গীতিকার এবং মুক্তিযোদ্ধা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল।

গোলাম আযমের মামলার ১৪তম সাক্ষী হিসেবে তাঁর হৃদয় বিদারক বর্ণনা থেকে জানা যায়, ‘রোজার ঈদের দিন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলের দরজা খুব জোরে শব্দ করে খুলে যায়। আমরা সকলে চমকে উঠি। জেলে ভেতরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী প্রবেশ করে খুব উচ্চস্বরে লাইন আপ, লাইন আপ বলে চিৎকার করে। আমরা এ শব্দটির সাথে পরিচিত ছিলাম। ওই কথা শুনে আমরা জেলের গারদ থেকে বেরিয়ে কংক্রিটের মেঝেতে লাইন দিয়ে বসে পড়ি। সেখানে ক্যাপ্টেন আলী রেজা এবং লে. ইফতেখারকে দেখতে পাই। এরপর ব্রিগেডিয়ার সাদুল্লাহ এবং অনেক রাজাকারসহ পেয়ারা মিয়াকে দেখতে পাই। ক্যাপ্টেন আলী রেজা আঙ্গুল তুলে একজন একজন করে দাঁড় করাতে থাকেন। আমাকে একা রেখে এভাবে ৪৩ জনকে দাঁড় করায়। তখন আমি ভেবেছিলাম, এখনই বুঝি আমাকে হত্যা করা হবে। আমি সাহস করে ব্রিগেডিয়ার সাদুল্লাহকে প্রশ্ন করি, আমাকে নাকি ওদেরকে মারবে। সাদুল্লাহ তখন আমার হাত ধরে বলে, ‘আজকের দিনটা কত পবিত্র জানো? আজ এই দিনে কোনো মানুষকে হত্যা করা হলে সরাসরি আল্লাহর কাছে চলে যাবে।’

এ সময় আমি জিজ্ঞেস করি, তবে এই ৪৩ জনকে হত্যা করবেন? সাদুল্লাহ হাসিমুখে ‘সেটা করবো’ বলে জানান। এ সময় আমি তাকে আমার সঙ্গে থাকা মানিক, মাহবুব, খোকাকে আমার সঙ্গে রাখতে বলে আমাকে মারা হবে কিনা জিজ্ঞেস করলে তিনি জানান, যেহেতু দুইদিন পর আমাকে ধরা হয়েছে, এজন্য আরও দুই দিন পর আমাকে মারা হবে। … তখন তিন জনকে আলাদা করে রাখা হয়। এরপর আমি নজরুল ভাইয়ের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করি, আপনি তো পালিয়ে গেলেন না। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বলেন, আমার কিছু বলার নেই রে। এই লুঙ্গিটা আমার মায়ের কাছে পৌঁছে দিস। একটি সিগারেটের টুকরা দেখিয়ে সেটিও দিতে বলেন।

কামালের বাবা সিরু মিয়া দারোগা বারবার কাঁদছিলেন। তখন কামাল তার বাবাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে বলে, বুলবুল, যদি কোনো দিন রাস্তায় কোনো পাগলিকে দেখিস, তাহলে মনে করিস, ওটাই আমার মা। নজরুল বলেছিলেন, যখন কোনো পাকিস্তানি আর্মি দেখবি, একটা করে মাথায় গুলি করবি। কুমিল্লার বাতেন ভাই তার গায়ের চাদরটি আমাকে দিয়ে দিয়েছিলেন। সে চাদর দিয়ে আমি প্রত্যেকের চোখের পানি মুছে দিয়েছিলাম।‘ এরপর তাদেরকে (৪০ জন) নিয়ে যাওয়া হয় এবং আমাদেরকে গারদে আটকে রাখা হয়। আমার জানা মতে, তাদের মধ্য থেকে একজনকে জেল গেট থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। পরদিন আমি জানতে পারি, স্টেশনের পশ্চিমে পৈরতলা নামক স্থানে তাদেরকে এক নাগাড়ে হত্যা করা হয়েছে।’

তথ্যসূত্র: আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের স্বাক্ষ্য, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য।