ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

আপা আসেন শুই! আপা আসেন শুই! না,না খারাপ কিছু ভাববেন না। নিউমার্কেটের ওভারব্রিজের ওপর সুঁই ওয়ালা হকার নিত্য এভাবেই সুঁই বিক্রি করছে। প্রথমদিকে আপারা রাগ হয়েছে কিনা জানিনা, কিন্তু এখন যে কেউ এটা নিয়ে মাথা ঘামায় না তা বোঝা যায়। ইংরেজিতে লাইড এবং নিডল এর মাঝে আকাশ পাতাল ব্যবধান। কিন্তু বাংলায় শুই এবং সুঁই এর মাঝে উচ্চারণের খুব অল্প পার্থক্য, এবং অর্থ, সেতো সহজেই অনুমেয়।

প্রচণ্ড শুদ্ধ বাংলার দ্বিতীয় পর্বে আপনাকে স্বাগতম।শুদ্ধ বাংলা বলতে উচ্চারণ শুদ্ধ করা অতীব জরুরী। তার সাথে অক্ষরের উচ্চারণের পার্থক্য ধরতে পারা। আমার সাথে আমার স্ত্রীর প্রথম যে ব্যাপারটি নিয়ে ঝগড়া শুরু হয়েছিল তাহল “শরিল”। বাংলা খুব জটিল একটি ভাষা। এই কথাটিতে আবার অন্য কিছু কেউ ভাববেন না। আমি ফোনে আমার মা’কে বলতাম, মা তোমার শরিল ভালো? আমার বউ এর এই কথাতে ছিল প্রবল আপত্তি। ভাবখানা এমন ব্যঞ্জনচ্যুতি ব্যাপারটি খুব একটি জঘন্য ব্যাপার। আর আমি এমনভাবে অপমানিত হতাম যে আমাদের বাংলার ধুতি পরা স্যারের টুটি চেপে ধরতে ইচ্ছে হত আর মনে মনে বউকে বলতাম “ডাবল ডিম খাওয়া বাংলার প্রফেসর”। আমাদের স্কুলে বাংলা স্যার ক্লাসে পড়াতেন” কিতা বে তোরা ব্যঞ্জনচ্যুতি বুঝরে নি? পোয়াইন মাঝে মাঝে “ইসকা” ডাকে না? ওগুরে কয় ব্যঞ্জনচ্যুতি। বুঝরে নি!” কেগুরে যে ইসকা ডাকে তা আমার বুঝতে অনেক সময় লেগেছিল। তারপর ও আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক আমাদের অনেক পড়িয়েছেন। যদিও সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায়। কিন্তু আমরা বাংলা তো শিখেছি! অনেকদিনের ব্যক্তিগত চেষ্টায় আজ আমি ব্যঞ্জনচ্যুতি মুক্ত। এখন আমি শরীলকে শরীর বলি, ইসকাকে বলি রিকশা। আহ! শান্তি। মাঝে মাঝে মনে হয়, আমিও ডাবল ডিম খাওয়া বাংলার প্রফেসর হচ্ছি।

আমাদের পরিচিতের এক বস বাংলা বলতেই পারেন না। বিদেশে পড়াশোনা করেছেন কিনা। তো উনি যাচ্ছেন এক শাখা অফিস এর কাজ দেখতে। ঢাকা থেকে লোক আসছে জেনে স্বাভাবিকভাবেই শাখা অফিসের লোকজন দুপুরের খাবারের আয়োজন করলেন, পোলাউ-কোর্মা। লাঞ্চের সময় বসকে বললেন, স্যার লাঞ্চ দেই? স্যার বলেন,”ভাট ড্যান, ভাট ড্যান।“এখন বেচারা তো কনফুজ হয়ে গ্যাছে। স্যার কি ভাত চাইলো? দুপুরের খাবারে তো তারা ভাতের আয়োজন করে নাই। এখন কি হবে? স্যার তো ততক্ষণে গাড়িতে উঠে বসেছে। বেচারার তো জান কাবাব হবার যোগার। পরে অনেক অনুরধের পর তিনি লাঞ্চ করেছিলেন পোলাও দিয়েই। আর ভাট ড্যান মানে হল“বাদ দেন”।

সে রকম আরেকটি ছোট অভিজ্ঞতা শেয়ার করি। আমার এলাকার বড় ভাইয়ের বউ, খুব ভালো মেয়ে। খুব সুন্দর করে কথা বলে। তো একদিন আমরা সবাই মিলে আমাদের এক বন্ধুর বাসায় বিয়ের দাওয়াত খাবার জন্য যাবো বলে বের হয়েছি। রিক্সার জন্য অপেক্ষা করছি। আমাদের শুদ্ধ বলা স্মার্ট ভাবী রিকশা ডাকলেন। “এই রিসকা যাবে?” রিকশা ওয়ালা বলল কোথায় যাবেন। ভাবী উত্তর দিলেন” পানির ট্যাঁঙ্কির ওম্মুরা”। বলেই ভাবী চুপ। আর আমরা… বুঝতেই পারছেন।

হাঁস আর বাঁশের ঘটনা তো টিভি তেই দেখেছেন। সেরকম পুটি আর পুঁটি র মাঝে ও কিন্তু ফারাক আছে। ছোট থাকতে আমাদের পাড়ার আমাদের দলের নাম ছিল “ট্যাংরা – পুটি একাদশ”। আমরা এর প্রবল বিরোধিতা করেছিলাম। কিন্তু আমাদের অধিনায়কের এক কথা দলের নাম হবে “ট্যাংরা – পুটি একাদশ” চন্দ্রবিন্দু ছাড়া। মানে পুঁটি এর ওপরের চন্দ্রবিন্দু ছাড়া। এমনিতেই এই নাম পছন্দ না। তার ওপর বানান ভুল। আমি ট্যাংরা – পুটি একাদশের সবার মধ্যে ভালো ছাত্র এবং খারাপ খেলোয়াড় ছিলাম বলে আমার মনটা আরও বেশি খারাপ। ওই সময় টি ভি তে টিপু সুলতান ক্রেজ চলছে। আমরা “ট্যাংরা – পুটি একাদশ” সাদা কাপড়ে লিখে উড়িয়ে দিলাম। সাথে হলুদ রঙের বাঘের ছবি। পাড়ার লোকজন সবাই হাসাহাসি করেছিল। দলের নাম ট্যাংরা – পুটি একাদশ, তার প্রতীক কিনা বাঘ! আমাদের অধিনায়কের সে কি খুশি পতাকা দেখে। পড়ে আবিস্কার করলাম, পাড়ার সুন্দরী মেয়ে, যার ডাক নাম পুটি (চন্দ্রবিন্দু ছাড়া) তার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের জন্যই আমাদের দলের এই নামকরণ। আরও গোপন সূত্রে খবর পাওয়া গিয়েছিল, পুটি আপু নাকি আমাদের অধিনায়ককে আদর করে ট্যাংরা নামে ডাকে। হায়রে ভালোবাসা! ট্যাংরা আর পুটিতে।

লোকজনের উদাহরণ বাদ দেই। আমার কথা বলি। জলি আমার বান্ধবী। তো বান্ধবী বললে সে কিঞ্চিত রাগ হয়। সে বলে বন্ধু বলতে। তো আমি ও উৎসাহে সবাইকে বলি আমার বন্ধু আছে জলি নাম। কোথাও এই নিয়ে কখনো সমস্যায় পরি নাই। কিন্তু প্রথমে বাধ সাধে আমার বউ। বলে এইসব মেয়ে মেয়ে নামের বন্ধু পেলে কোথায়। আমি তো বাংলায় বউকে ধরতেই পারি না। জলি এলএলবি সিনেমাটা দেখেছিলাম। ছেলে মেয়ের নামের পার্থক্য বোঝানোর একটি মোক্ষম সুযোগ। বউকে বাংলার কিছু জ্ঞান দেয়া যাবে ভেবে তর্ক শুরু করলাম। বাংলা একাডেমীর দশাসই ডিকশনারিটা খুঁজে বের করে তর্ক করা মাত্র জমে উঠেছে, ঠিক সে সময় আমার বউ তার তূন থেকে এটম বোমের মত প্রশ্ন ছুড়ল, “ জলি তোমার বান্ধবী আর এত দিন তুমি বন্ধু বন্ধু বলে আমায় ঠকাচ্ছ? আমায় মিথ্যা বলে আসছ?” হায়রে বাংলা শিক্ষা! সেই রাগ ভাঙ্গাতে আমার বেশ কিছুদিন বেগ পেতে হবে বলে মনে হচ্ছে। কারণ সেই রাগে পরের দিন সে অফিস থেকে বাপের বাড়ি চলে গিয়েছে। আমি আমার বন্ধু জলিকে দায়িত্ব দিয়েছি আমাদের মিলমহাব্বাত করানোর। দেখা যাক কিছু হয় কিনা।