ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

ধৈর্য। আর কতো ধরবো? বিশ্বে ধৈয্য ধারণের জন্য যদি কোন এ্যাওয়ার্ড থাকতো তবে নিশ্চিত ভাবেই আমরা বাংলাদেশী জনগণেরা পেতাম। স্বাধীনতা পেতে ধৈয্য ধরতে হয়েছে, তারপর গনতন্ত্র পেতে। আর নূর হোসেনের সেই গনতন্ত্র আজো মুক্তি পায়নি। ২২ বছর হয়ে গিয়েছে। গণতন্ত্রের পরিবর্তিত রূপ আজ “ গণতান্ত্রিক রাজতন্ত্র”। আজ মুজিব কন্যা বা জিয়ার পুত্র তাদেরই তো দেশ। তারা দয়া করে আমাদের থাকতে দিয়েছে, আমরা সৌভাগ্যবান। তাদের শত ভুল সিদ্ধান্ত সত্ত্বেও আমরা হাততালি দেই, তাদের দুর্নীতি দেখেও আমরা দেখি না। তাদের ডাক দেয়া জনসভায় আমরা বিপুল উৎসাহে হাজির হই। তাদের অনবরত মিথ্যা আমরা হাসি মুখে মেনে নেই। রাজাই তো। মিথ্যা বলা তো তাকেই মানায়। প্রেমিকাকে বলেছিলাম, তুমি আমার প্রথম প্রেম। উত্তরে সে বলেছিল “মিথ্যুক”। শুনতে অনেক মিষ্টি লেগেছিল। তাকে অনেক সময় ধরে বুঝিয়েছিলাম যে আমি মিথ্যুক নই। কি যে ভাল লেগেছিল তখন, তা ভাষায় প্রকাশ করার মত নয়। আমাদের রাজাদের কাছে জনগন তো প্রেমিকাই। শুধু মিষ্টি করে বলবে” মিথ্যুক”। তাতে কি? আমি যেমন ওকে বুঝিয়েছিলাম যে সেই আমার প্রথম প্রেম। আমাদের রাজারাও তেমনি আমাদের বোঝায় জনগণই তাদের প্রথম প্রেম। শুল্ক মুক্ত গাড়ি, বাড়ি, আয়কর মুক্ত জীবন ইত্যাদি তো তাদের অধিকার। তাই বলে কি তাদের প্রথম প্রেম জনগন নয়? পারলে জনগন প্রমাণ করুক! তাদের মিছিল বর্জন করুক, তাদের সভাতে না যাক। দেখি পারে কিনা। পারবে না। আমাদের দেশের জনগন পারবে না। তাই তো আমাদের দেশের রাজারা বলতে পারে “হে জনগন তোমরা মোদের করেছ মহান, গাধা হয়েও তাই পাই মোরা বাঘের সম্মান।“

রাজার ছেলেই তো রাজা হবে। আমরাতো জন্ম থেকেই প্রজা। কথা বললেই লাথি-গুতা খেতে হবে। তাই রাজাদের কুলাঙ্গার সন্তানেরা রাজা হয়। আমরা হাসি মুখে তাদের কথা শুনি। কথায় বলে “পেটে গেলে পিঠে সয়”। রাজাদের জন্যই তো আমাদের পেট চলছে। তাই তাদের লাথি-গুতা আমাদের পিঠে সয়।

রাজাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ প্রজারা একসময় বিদ্রোহ করে। সব বিদ্রোহ যে ফরাসি বিপ্লবের রূপ নেবে তা নয়। অনেক বিদ্রোহ সিপাহি বিপ্লবের মত অঙ্কুরেই শেষ হয়ে যায়। আর আমরা বলি “ ইস! এভাবে করলেই জিতে যেত”। আমাদের আক্ষেপ শেষ হয়না। আমরা যে প্রজা। বাংলাদেশ নামক গণতান্ত্রিক রাজতন্ত্রের দেশে আমরা যে প্রজা। তাই চায়ের দোকানে তর্কের ঝড় তুলি। অনেক আশা নিয়ে বলি এইবার বোধয় কিছু হবে। কিন্তু আবার আমরা আক্ষেপ এর কাতারে পরে যাই। কারণ আমরা যে প্রজা। আমাদের যে বলার অধিকার নাই। আমাদের যে রাজার ছেলেদের মত সাহস নাই। কারণ আমাদের পিতা প্রজাতন্ত্রের একজন সামান্য কেরানি। তাদের দেয়া শিক্ষা হল রাজার সেবা করো, না হলে রাজপুত্রের তাও যদি না পার তবে রাজার মন্ত্রিদের। কিন্তু সেবা করতেই হবে। তোমরা জন্মেছ রাজপরিবারের সেবক হিসাবে। আহ! কি শান্তি রাজার সেবায়। তা কি আর বিদ্রোহে আসে?

রক্ত গরম করা এক একটি যন্ত্রণাময় সিদ্ধান্ত আসে রাজবাড়ি থেকে, আমরা তা মেনে নেই। বাসায় মা, বোন,বউ, ছেলে মেয়ে, রাস্তায় বাসের হেল্পার, রিকশাওয়ালা, বাজারের দোকানদার যাদের ওপর আমি কথা বলতে পারি, তাদেরকে আমার রক্ত গরম হউয়া রাগ ঝাড়ি। উত্তাল মনের ইচ্ছে হয় ভেঙ্গে চুরমার করে ফেলতে। রাগ দেখে বাড়ির সবাই চুপ থাকে। তা দেখে আমার রাগ আরও বেড়ে যায়। গুষ্টি উদ্ধার করি রাজতন্ত্রের। তারপর রাগ পরে যায়। অসহায়ের মত নিজের শখ জলাঞ্জলি দিয়ে রাজার সেবা করি। সফট ড্রিংক আর খাইনা, মিষ্টির দোকানে আর তাকাই না, বড় মাছের চেহারা কেমন? আহ! কতদিন গোশত খাইনা। কিন্তু তারপরও তো আমার সংসার চলে না? আমি কি নিয়ে বিলাসিতা করি? আমি তো করমুক্ত জীবন-যাপন করিনা, আমি তো চুরি করে নিজের সংসার চালাই না। তাহলে রাজারা কেন আমার প্রতি অবিচার করছেন? আমি তো রাজার কাছে দুমুঠো অন্ন ভিক্ষা চাইনি। কাজ করে তার বিনিময়ে অর্থ চেয়েছি। বাসার কাজের লোক রাখতে পারিনা বলে বিদায় করে দিয়েছি। তাই বলে কাজের লোকের বেতন থেকে ভর্তুকির নাম করে টাকা কেটে নেইনি। তেলের দাম এক বছরে তিনবার বৃদ্ধি! গাধা কাজের লোক দিয়ে যেমন সংসারে খরচ কমে না, তেমনি গাধা মন্ত্রী দিয়ে দেশ চলে না। আমাদের মত নিরীহ প্রজাদের ওপর শোষণের রোলার চালিয়ে, মহারানীর স্নেহের পাত্র হিসাবেই মন্ত্রিরা আছেন। ভর্তুকি কমানোর নাম করে আমাদের মত ক্ষুদ্র আয়ের লোকদের ওপর নীলকরদের মত অত্যাচার চালাচ্ছেন।তারা কেউ দুর্নীতিগ্রস্থ নন, শেয়ার কি তাই তো তারা জানেন না সেখানে দুর্নীতি করবেন কিভাবে? কিছু দুষ্ট প্রজার কথায় কি আর মহারানীর চিড়া ভেজে? মহারানী তো ইতিহাসের কল্পনায় বিভোর। পিতা শুধু ওনার ছিল আর আমরা হলাম বেজন্মা! আমাদের যে ওনার রাজ্যে থাকতে দিয়েছেন তাতেই আমরা কৃতজ্ঞ। আপনি অবশ্যই ইতিহাস নিয়ে থাকবেন। স্বাধীনতার ৪০ বছর পরও মুক্তিযুদ্ধ রাজনীতির অন্যতম হাতিয়ার। অবশ্যই আপনি গরু-গাধা দিয়ে দেশ চালাবেন। আপনাকেই মানায়। আপনি রাজরানী না! আমরা তো প্রজাতন্ত্রের বেজন্মা প্রজা মাত্র।

আমি কি এর প্রতিবাদ জানাবো? কিন্তু পিতার শিক্ষা যে, রাজার প্রতি আনুগত্য। আর কতো আনুগত্য দেখাবো? আমার প্রতিবাদের ভাষা কি হারিয়ে গেছে? ইস! রাজারা যদি বুঝত। কে বলে রাজারা বোঝে না! তারা তো জানে এই জাতির প্রতিবাদের ভাষা নাই। এই জাতির জন্ম হয়েছে গোলামি করার জন্য। তাই তো তাদের ইচ্ছা মত সব কিছু চলছে। তারা আমাদের ওপর যা চাপিয়ে দিচ্ছে আমরা তাই মেনে নিচ্ছি। তাদের তো ইচ্ছে গুলো অপূর্ণ থাকছে না। আর আমাদের জন্মই তো তাদের ইচ্ছে গুলোর পূরণের জন্য। ইস!কেন রাজার ঘরে জন্ম নিলাম না।

আমার মা বলে, আমার ছেলের জীবন দিয়ে যদি দেশের ভাল হয় তবে সে মরণে আমার গৌরব। কতটা কষ্টে থাকলে একজন মা তার ছেলের জীবন উৎসর্গ করতে চায় একটি স্বাধীন দেশে? আমি জানিনা। তারপরও আমি প্রতিবাদী হই না। আমার সাথে যে কেউ নেই। কোথাও কেউ নেই। কোথাও কেউ নেই।

***
১২ই নভেম্বর, ২০১১