ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

নির্বাচন হওয়ার আগেই লঙ্কাকাণ্ড । চারিদিকে যুদ্ধাদেহী মনোভাব । রনহুঙ্কার ছাড়ছে বড় দুই রাজনৈতিক জোট । তোড়জোড় চলছে আখের ঘর গোছানোর জন্য । সাজ সাজ রব বিরাজ করছে সবখানে । এত এত আয়োজন এবং সমরসজ্জা সব ই নির্বাচন কেন্দ্রিক । উদ্দেশ্য ক্ষমতায় থেকে যাওয়া বা ক্ষমতার মসনদে ফিরে আসা । নির্বাচনের এক বছর বাকি থাকলেও সাধারন মানুষ তো বটে রাজনৈতিক দলগুলুর সকল ভাবনা এখন নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে । আমাদের প্রেক্ষাপটে নব নির্বাচিত সরকারের প্রথম বছর হানিমুন পিরিয়ড , এ এক বছরে সরকারকে কিছুই বলা যায় না বা বললেও গায়ে মাখে না । তাই তো প্রথম বছরে লক্ষ্য করা যায় বিরোধী দলের নেতা কর্মীরা এলাকা ছাড়া হয়ে যায়, সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতনের রোল চালানো হয়, শিক্ষাঙ্গনে শুরু হয় হল দখল এবং সর্বক্ষেত্রে বিরাজ করে অভিবাবকবিহীন অবস্থা । ২য় বছরে এসে রুটিন মাফিক কাজ শুরু করে, তারপরে চলে দেশের ভেতরে বাইরে চুক্তি এবং বিদেশ সফর । ৩য় বছরে এসে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির নামে তোড়জোড় । এর মাঝে বিরোধী দল ও আওয়াজ তুলা শুরু করে । তারপর থেকে শুরু হয় অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ, কথায় কথায় সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করা বা সভা সমাবেশে ও সরকারের আজ্ঞাবহ মিডিয়াতে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের হিড়িক । নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে শুরু হয়ে যায় নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে মামাবাড়ির আবদার । এর ফাঁকে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয় নিজেদের পছন্দমাফিক লোক দিয়ে । নতুন নির্বাচন কমিশন শুরুতেই হাত দেই ভোটার তালিকা হালনাগাদে, তারপরে সংসদীয় এলাকা পুন-নির্ধারণ, নির্বাচনে সেনাবাহিনী থাকবে কি না তা নিয়ে চলে মনস্তাথিক লড়াই । এসবের ভেড়াজালে পড়ে সরকারের রুটিন মাফিক কাজ ব্যাহত হয় দারুণভাবে । যার দরুন জিনিসপত্রের লাগামহীনতা , আইন শৃঙ্খলার চরম অবনতি এবং সর্বক্ষেত্রে হাহাকার চলে নির্বাচনী ইশতেহার পুরন না হওয়ার জন্য । উল্লেখ্য সরকারে আসার জন্য রাজনৈতিক দলগুলুর পক্ষ থেকে বেশ বড়সড় লম্বা একটি ইশতেহার মুলা ঝুলানোর মত ঝুলিয়ে রাখা হয় আমজনতার সামনে । তাহলে গণতন্ত্র কি শুধু ভোটের আগে ফেরেস্তা সাজা তারপরে মসনদে বসেই ঝাণ্ডা হাতে নিয়ে জনগণের চাহিদা কে তাড়া করা ? গণতন্ত্র আটকে থাকে নেতা নেত্রীদের মুখের ভাষায় , রাজনীতিবিদদের জন্য গণতন্ত্র হাঁটতে পারে নি সোজা পথে বা হাঁটতে দেওয়া হয় নি । নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে প্রতিবার ই সরকারের মেয়াদ শেষে এসে শুরু হয় নোংরা খেলা । সরকারি দল এক নিয়মে বললেও বিরোধী দল তার উল্টা বলে । কোন অবস্থাতেই কোন পক্ষই সমজোতায় আসে না । এ ক্ষেত্রে বিরোধী দল গো ধরে বসে থাকে, সাথে নির্বাচন বয়কট করার হুমকি, হরতাল,অবরোধ সহ নানা হুমকি অব্যাহত থাকে । প্রশাসনে জনতার মঞ্চের আবির্ভাব ঘটানো সহ নানান ধ্বংসাত্মক পদ্ধতি অবলম্বন করা হয় শুধু মাত্র মসনদে বসার নিমিত্তে । আর সরকারি দলও এর ফাঁকে বিরোধী পক্ষের উপর চালায় নির্যাতনের ষ্টীম রোলার , মামলা –হামলা করে চলে গণতন্ত্রের পথ রুদ্ধ করার ঘৃণ্য প্রক্রিয়া । তার মাঝে এসে গিজগিজ করে বিদেশি প্রভুরা । শুরু হয়ে যায় পরামর্শের হিড়িক, আর সরকারি মহল এবং বিরোধী শিবির উভয় মহল ই বড় কোন শক্তির পেছনে ঘুরঘুর করতে থাকে । তখন জনতা হয়ে যায় গৌণ । প্রশাসনে বিরাজ করে চরম অস্থিরতা, আমলাদের লাল ফিতায় আটকে থাকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ।

গত নির্বাচনের আগেও নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে এবং তত্তাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবেন তা নিয়ে ঘটে গেছে স্মরন কালের সবচাইতে ঘৃণ্য ও পৈশাচিক ঘটনা । ঢাকা সহ সারা দেশে রক্তের দাগে রাজপথ পিচ্ছিল হয়ে গিয়েছিল প্রায় শ-খানেক মানুষের প্রানে । রাজনীতির নির্মম বলি হল সাধারন মানুষ সহ রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীরা । এখনো চোখ বুঝলেই ভেসে উঠে সাপের মত আগাগোড়া পিটিয়ে মানুষ হত্যা করার ভয়ংকর দৃশ্য । শুধু মেরেই ক্ষান্ত হয় নি এরা,লাশের উপরে উদ্দাম ভাবে নেচে প্রমান করে দিয়েছিল এরা মানুষ নামে জানোয়ার । অবশেষে আসলো সামরিক আবরনে তত্তাবধায়ক সরকার । এবারো আগের বারের প্রতিধ্বনি শুনা যাচ্ছে । চরম অনিশ্চয়তা ভর করছে সাধারন মানুষের মনে । একই দাবি তবে ভিন্ন আঙ্গিকে । এরশাদের শাসনের পরে অদ্ভুদ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটাতে যে পদ্ধতির অবতারনা করা হয়েছিল তা আজকের প্রেক্ষাপটে কতটা গণতান্ত্রিক বা বাস্তবসম্মত ? বা আমাদের সংবিধান কি বলে ? সাধারন মানুষের উপলব্ধি কি এটা নিয়ে ? এ সবের অবসান ঘটাতে বিভিন্ন দল বা জোট একেক সময় একেক রকম ব্যাখ্যা আমাদের শুনিয়েছে । এই যেমন লীগ এবং জামায়াতের আবিষ্কৃত তত্তাবধায়ক সরকারের ফর্মুলা এখন লীগকে আর টানছে না যদিওবা জামায়াত এখনো আঁকড়ে আছে বিএনপিকে নিয়ে । বিএনপি শুরুর প্রাক্কালে এটার বিরোধিতা করলেও এখন তা আনার জন্য তাদের ভাষায় সংগ্রাম করছে । আমাদের নির্বাচনে প্রচলিত এই পদ্ধতির বহির্বিশ্বে কি হাল ? উইকিপিডিয়ার মতে – তত্তাবধায়ক হল তারাই , যারা কোন সরকার পদ্ধতিতে অস্থায়ী ভিত্তিতে ভুমিকা রাখে । কিন্তু তারা জানে যে তারা জানে যে তারা তাদের স্বপদে অল্প সময়ের জন্য বহাল থাকবে , দীর্ঘ মেয়াদের জন্য নয় । কিন্তু কোন ধরনের নীতি নিরাধারনি কাজের উপর অঘোষিত বিধি নিষেধ থাকলেও বাংলাদেশের মত তৃতীয় বিশ্বকে পরাশক্তিগুলুর কাছে নতুজান হতে হয় এবং এ নিয়ে বড় দুই দলের কেও তেমন একটা উচ্চবাক্য পোষণ করেন না । যার প্রমান মেলে লতিফুর রহমানের অধীনে তত্তাবধায়ক সরকারের সময় আফগানিস্থানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধের প্রয়োজনে বাংলাদেশের জল, স্থল ও আকাশ সীমা ব্যাবহারের অনুমতি দেওয়া । বিশ্বের অন্যান্য দেশে কি রকম পদ্ধতি নতুন সরকার নির্বাচন করা হয় ? এবং ঠিক কারা এ নির্বাচনের আয়োজন করে থাকে ? তা নিয়ে নিম্নে কিছু দেশের পদ্ধতি উল্লেখ করা হল –

গণতন্ত্রের সূতিকাগার লন্ডনে নির্বাচন পূর্ববর্তী সময়ে ক্ষমতাসীন সরকার আপনাআপনি তত্তাবধায়ক সরকারে রুপান্তর লাভ করে । কিন্তু নীতি নির্ধারণ মুলক কোন কাজই এ সময়ে সমাধান করা হয় না । এছাড়া প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা কর্মচারীরা সব সময় মনে রাখবেন তারা একটি কেরারটেকার পরিবেশ অতিক্রম করছেন । এ সময় তারা সিদ্ধান্ত নিতে বিশেষ যত্নশীল হবেন ।

অস্ট্রেলিয়ায় সাধারন নির্বাচনের আগে পার্লামেন্ট ভেঙ্গে দেওয়ার পরে নির্বাচন করার জন্য একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গড়ে উঠে । এক্ষেত্রে সাধারন অবস্থায় কোন নতুন নিয়োগের গঠনা ঘটে না । তারা ২০১০ সালে এসে কেয়ারটেকার কনভেনশন সংশোধন করে । এর সুচনাতেই উল্লেখ করা হয়েছে – নির্বাচন-পূর্বকালে সরকার নিজেই তত্তাবধায়কের ভুমিকা পালন করবে । এটার মেয়াদ সংক্ষিপ্ত এবং নতুন সরকার গঠন পর্যন্ত । এরা দেশের ভেতরে বা বাইরে কোন চুক্তি সই করতে পারবে না ।

আফ্রিকা মহাদেশের অন্যতম দেশ দক্ষিণ আফ্রিকায় আছে নির্বাচনের কাজ তদারকির জন্য ১৬ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিশন । এতে দেশের ১১ জনের সাথে বাইরের ৫ জন সদস্যও থাকে । কমিশনারের যোগ্যতা সম্পর্কে বলা আছে – তারা হবেন নিরপেক্ষ, শ্রদ্ধাভাজন, উপযুক্ত নারী- পুরুষ, যাদের থাকবে না কোন দলীয় রাজনৈতিক অবস্থান । যারা জনসংখ্যার কোন উল্লেখযোগ্য অংশের প্রতিনিধিত্ব করবেন না ।

পাশের দেশ ভারতে পুরাপুরি তত্তাবধায়ক সরকার না থাকলেও বর্তমানে এটার পেছনেই হাঁটছে । যদিওবা ভারতের নির্বাচন কমিশন অনেকটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে । নির্বাচন নিরপেক্ষভাবে সম্পাদনের জন্য এ সময়ে কোন নীতিনির্ধারণী কাজ যেন না করতে পারে তার জন্য লোকসভায় অনেক বিল আনা হয়েছে । যেন নির্বাচন কাজে প্রভাব খাঁটাতে না পেরে ক্ষমতাসীন মহল ।

উপরিউক্ত মডেলগুলুর সাথে আমাদের পদ্ধতির বেশ কিছু সাদৃশ্য থাকলেও আমাদের আসল সমস্যা হচ্ছে রাজনীতিতে ছাড় দেওয়ার মন মানসিকতার অভাব এবং ক্ষমতা না ছাড়ার কু-প্রবনতা । যার জন্য ক্ষমতাসীন মহল মনে করে নির্বাচন নিরপেক্ষ হলে তারা হারতে পারে না । আর বিরোধী দলের সরকারের উপর বিন্দু মাত্র আস্থা থাকে না যার জন্য বিরোধী মহল কখনোয় ক্ষমতাসীনদের অধীনে নির্বাচনে যাওয়ার কথা ভাবতেই পারেন না । এ ধারা থেকে বের হওয়ার লক্ষে প্রচলিত হল–তত্তাবধায়ক সরকারের ফর্মুলা, কিন্তু যে লাউ সেই কদু । সমস্যা সমস্যার আবর্তেই ঘুরপাক খাচ্ছে । ২০০৩ সালের ২১ ই জুলাই বাংলাদেশের সুপ্রিম কোটের হাইকোর্ট ডিভিশনের একটি বেঞ্চ তত্তাবধায়ক সরকার কে সংবিধানের পরিপন্থী বলে অভিমত প্রকাশ করেন । কিন্তু সংবিধানের অন্যতম প্রনেতা ডঃ কামাল হোসেন এর মতে – তত্তাবধায়ক সরকারের বিধান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে এর মৌলিক চেতনায় আঘাত করা হয় নি । এবার লীগের আমলে অবশেষে সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে তত্তাবধায়ক সরকার বিলুপ্ত করা হয়েছে । আদালতের প্রকাশ করা আংশিক রায়ে আগামি দুই মেয়াদে রাখতে বললেও রাজনৈতিক দল গুলুকে এরা মাঝেই আলাপ আলোচনা করে ভবিষ্যতে কোন পদ্ধতিতে নির্বাচন হবে । কিন্তু আদালত থেকে যেমন পুরনাঙ্গ রায় দেওয়া হয় নি আবার সরকারও এটাকে পুরুপুরি বাতিলের খাতায় ফেলে দিয়ে রাজনৈতিক সংকটকে ঘনীভূত করার চেষ্টায় লিপ্ত আছে । তবে হ্যাঁ ১৫তম সংশোধনীর আওতায় নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ শেষে পদত্যাগ করলে রাষ্ট্রপতি তা গ্রহন করে যে কোন সাংসদ কে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করতে পারেন । তবে এটা মামুলি নয় যে রাজনৈতিক দল গুলু তা সহজেই মানবে । এর মুলে আছে পরস্পরের প্রতি আস্থার অভাব এবং কুরুচিপূর্ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতি । আর যিনি নতুন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করবেন মানে রাষ্ট্রপতি তিনি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কোন ক্ষমতায় বহন করেন না । বাস্তব অবস্থা হল তিনি দলের বাইরে গিয়ে কোন কাজ করবেন না বা করার সাহসও দেখাবেন না । আমাদের শাসন পদ্ধতিতে রাষ্ট্রপতির কাজ মাজারে গিয়ে ফাতেহা পাঠ করা এবং বিদেশী রাষ্ট্রদূতের কাছ থেকেই পরিচয় পত্র গ্রহণ করার কাজেই সীমাবদ্ধ । সেটা আগের বারের খালেদার ইয়েসম্যান ইয়াজউদ্দীন যেমন প্রমান করেছেন ঠিক বর্তমান রাষ্ট্রপতি তার যে বাতিক্রম হবেন না হলফ করেই বলা যায় ।

এখানে লক্ষণীয় একটা বিষয় যেটা আদালত হওক বা রাজনৈতিক দল হওক কোন পক্ষ কিন্তু স্বাধীন নির্বাচন কমিশন নিয়ে প্রস্তাব উত্তাপন করছে না । যেটা করা গেলে তত্তাবধায়ক সরকারের ফর্মুলা কে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়া যেত । দুঃখের বিষয় হল এই যে, যারাই ক্ষমতায় থাকে তাদের কথার বা সিদ্দান্ত্বের বাইরে কিছুই চিন্তা করতে পারে না আমাদের তথাকতিত স্বাধীন নির্বাচন কমিশন । তাহলে নির্বাচন কমিশন কি ঢাল-তলোয়ার বিহীন সর্দার হবে, না কি একটি গ্রহনযোগ্য নির্বাচন আয়োজনে সক্ষম হবে ? সংবিধান প্রদত্ত ক্ষমতাবলে নির্বাচনের সম্পূর্ণ দায় দায়িত্ব কমিশনের । অন্যান্যরা এটার সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সহায়তা করে যাবে কিন্তু আমাদের কাজের ক্ষেত্রে এটাই স্পষ্ট প্রতীয়মান এটার ঠিক উল্টা দিক প্রতিফলিত হচ্ছে । যদি তা না করা হয় তাহলে প্রতি বার ই নির্বাচন করার জন্য আলাপ করতে হবে আর বার বার পদ্ধতি কে পাল্টাতে হবে সকলের মনপুত করার নিমিত্তে । যা গণতন্ত্রকে শুধু দুর্বল’ই করবে না সাথে সাথে দুরব্রিত্তায়নের পথকেই উৎসাহিত করবে । এ প্রসঙ্গে যদি বলি গণতন্ত্র কি ? গণতন্ত্র কি গনতান্ত্রয়নের পথে আছে ? না কি কক্ষচ্যুত হয়েছে ? গণতন্ত্রের বহুল প্রচারিত সংজ্ঞা কি বলে – জনগণের, জনগনের দ্বারা এবং জনগণের জন্য একটি রাষ্ট্রীয় শাসন পদ্ধতি । এই যদি গণতন্ত্রের মুল কথা হয় তাহলে বলি এদেশে গণতন্ত্র তো নেই বরঞ্চ বলা যায় সামান্য লেশমাত্রও নেই । যদিওবা বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে এখনো শিশু বলা যায় তার সাথে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক দল গুলুর মাঝে আস্থা এবং বোজাপড়ার অভাব । যেটা সরকারের শেষ মেয়াদে এসে যখন নতুন সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করার কাজ শুরু করার সময়েই টের পাওয়া যায় । কার অধীনে নির্বাচন হবে ? সংসদ কি বহাল থাকবে না কি থাকবে না ? গত কিছু দিন আগে শেখ হাসিনা প্রস্তাব দিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের যেটাতে বিরোধী দল চাইলে অংশ নিতে পারে । উনি নিজেই যদি প্রধান হন তাহলে বিরোধী শিবির এটা মানবে না আবার বিএনপির পক্ষে যদি খালেদা প্রধান হতে চান লীগ ও তা মানবে না । তাহলে কে হবেন ? আদালতের নির্দেশনা মতে অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে টেনে আনা যাবে না । তাহলে উপায় কি ? কিন্তু বিচারপতিদের এদিকে না টানায় ভালো মনে করছি কারন নিজেদের পছন্দের লোককে প্রধান বিচারপতি বানানোর জন্য দলীয় ধ্যান ধারনার লোকদের বসিয়ে দেওয়া বা বিচারপতিদের অবসরের বয়স বাড়িয়ে দেওয়া এবং বিচারক নিয়োগে হস্থখেপের দরুন রাজনীতির অঙ্গনের মত বিচার বিভাগেও বিরাজ করছে অস্থিতিশীল পরিবেশ । রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা সহ আইনজীবী সমিতি, বার কাউন্সিল এর সকল আইনজীবীদের মনে হয় উনারা কোন না কোন দলের প্রতিনিধিত্ব করছেন । যার ফলে রাষ্ট্রের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বিতর্কিত হয়ে পড়ছে । কিন্তু তার বাইরে যদি চিন্তা করি তাহলে স্পীকার বা রাষ্ট্রপতি এর সমাধান হতে পারে না বা কোন সুশীল না অন্তত বিচারপতি সাহাবুদ্দিন এর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে । অথবা সুপ্রিম জুডিশিয়াল বেঞ্চ গঠন কতটা ন্যায়সঙ্গত তাও ভেবে দেখা জরুরি কারন এটা বুয়েট নয় যে ন্যায্য আন্দোলনকে স্তগিতাদেশ দিয়ে বন্ধ করবে । এখন উপায় একটাই আলোচনায় বসা উচিত উভয়পক্ষের । এটা ঠিক করা উচিত আদালতের নির্দেশনা বলি বা গণতন্ত্রকে সঠিক পথে আনতে বলি বা সংবিধান কে সমুন্নত করার কথা বলি যায় বলি না কেন – সময় হয়েছে নির্বাচন কমিশন কে শক্তিশালী করণের । আমাদের পোড়া কপাল যে সরকার গুলু সবসময় এম এ আজিজ মার্কা নির্বাচন কমিশন কেন যে গঠন করে তা মোটেও বোধগম্য না । বর্তমান কমিশন দিয়েও ফ্রি এবং ফেয়ার নির্বাচন হবে কি না তা নিয়ে ঘোরতর সন্দেহ আছে । এই নির্বাচন কমিশন কে চটজলদি বিদায় করে সংবিধান মোতাবেক এবং রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি সহ সকলকে নিয়ে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠনের রূপরেখা তৈরি করা হওক এবং তত্তাবধায়ক ফর্মুলা কে চিরতরে বিদায় বলা হওক ।

তত্তাবধায়ক সরকার প্রসঙ্গে আরও একটি প্রাসঙ্গিক বিষয় সেনাবাহিনী । বিশেষ করে গতবারের অভিজ্ঞতা থেকে এ আশংকা আরও জোরালো হয়েছে সাধারন মানুষ সহ রাজনৈতিক দল গুলুর মাঝে । তাহলে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তত্তাবধায়ক সরকার কি একটা সামরিক আবরনের সরকার ? নানা যুক্তি এবং তর্কের খাতিরে এটাকে সেই মডেলে ফেলা যায় । সেনা শাসন নিয়ে অবশ্য বড় দুই দল একে অপরের দিকে অভিযোগের তীর ছুড়ে । ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চের যেমনটা স্বাগত জানিয়েছে লীগ । সর্বশেষ সেনা শাসনকেও তারা বৈধতা দেওয়ার আগাম জানান দিয়েছিল । তবে এ কথা স্বীকার করতেই হবে যে রাজনৈতিক মদদ ছাড়া সেনা শাসন আসা বা উৎসাহিত করা সম্ভব নয় । কিন্তু বড় দুই দলের ডামাডোলে পিষ্ট হতে হতে সাধারন মানুষের জন সমর্থন ও দেখা মিলেছিল সেনা শাসনের প্রতি , যেটা প্রকারন্তরে গণতন্ত্রের জন্য হুমকি । অনুকুল পরিবেশ পরিস্থিতিততে তথা কতিত নির্দলীয় সরকারের প্রতি জনগনের সমর্থন কতটা প্রবল ও সর্বব্যাপী হতে পারে , সেটা এক-এগার দেখে স্পষ্ট অবলোকন করা যায় । কিন্তু সেটা প্রহেলিকা । তাই তো কিছুদিন পরেই জনগণের মোহ ভঙ্গ হয়ে গিয়েছিল । আসলে আমাদের দেশের চলমান রাজনীতিকে রাজনীতির বা গণতন্ত্রের ঠিক কোন স্কেলে মাপা যায় তা নিয়ে বিভ্রান্তির অবকাশ আছে । এটা কি আসলেই গণতন্ত্র ? না কি গণতন্ত্রের সাথে স্বৈরতন্ত্র এবং পরিবারতন্ত্র ? ২০১১ সালে দি ইকোনমিষ্ট-এর আন্তর্জাতিক সূচকে বাংলাদেশকে স্বৈরশাসন ও গণতন্ত্রের মিশেলে এক হাইব্রিড বা সংকর গণতন্ত্র হিসেবে চিনহিত করা হয়েছে । তাছাড়া এই সুচক অনুযায়ী তত্তাবধায়ক সরকার পদ্ধতির আওতায় নির্বাচিত সরকারের আমলগুলুতেই বাংলাদেশের শাসন গত এক ধাপ অবনতি ঘটেছে । মার্কিন ফরেন পলিসির সূচকেও বাংলাদেশ রয়ে গেছে অকার্যকর রাষ্ট্র ।

এ থেকে উত্তরনের জন্য দরকার রাজনীতিতে আস্থার পরিবেশ তৈরিকরণে কাজ শুরু করে দেওয়া , তার জন্য সাধারন জনগনের দায়িত্ব কোন অংশে কম নয় বরঞ্চ বেশিই বলা যায় । কারন আমাদের একটি অংশ আমেরিকান ধনকুবের হেনরি ফোরড তত্বে বিশ্বাস করে – তিনি একসময় বলেছিলেন যে আমি রিপাবলিকান বা ডেমোক্রেট যেই জিতুক না কেন ,আমি কখনোই হারবো না । কারন আমি দুই ঘোড়াতেই বাজি রাখি । আর আমাদের দেশে এই ধরনের মন মানসিকতার মানুষের দেখা মেলে হরমোশায় । আর এরাই দেশের সব কিছুই নিয়ন্ত্রন করে থাকে । আসল কথা হচ্ছে গন্ত্রতায়নের জন্য রাজনিতিবিদদের জনগণকেই চাপ সৃষ্টি করতে হবে, নিজেদের অধিকার আদায়ে সংগ্রামী ভুমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে । আমাদের রাজনৈতিক দল গুলুর অভ্যন্তরে যেখানে গণতন্ত্রের চর্চা করা হয় না সেখানে শাসনতন্ত্রে বা নিত্যদিনের কার্যকলাপে এটা আশা করাটা বাতুল হবে । তাই তো সব সময় দেখা যায় গণতান্ত্রিক পদ্ধতিকে চাপিয়ে অগণতান্ত্রিক বা সামরিকতন্ত্রের পক্ষে সাফাই গেয়ে যান রাজনৈতিক দল গুলু , যেটার জন্য গণতন্ত্র তার আপন ধারায় বিকশিত হতে পারে নি । এখন এই জঞ্জালমুখর অবস্থা থেকে বাঁচতে দরকার নির্বাচন কমিশন কে স্বাধীন করা এবং আস্থার পরিবেশ সৃষ্টিতে কাজ করা । তা করা না হলে রাজনীতি আমাদের জন্য বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়াবে । যে রাজনীতির শক্তিতে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম সেই রাজনীতির জন্য আমরা স্বাধীনতাকে হারাতে বাধ্য হব।

আসুন রাজনীতিকে ঘৃণা না করে রাজনীতিতে দূরব্রিত্তায়নের প্রবেশ রোধ করি । সোচ্চার কণ্ঠ তুলি অপরাজনীতির বিরুদ্ধে , আমি আপনি সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন হলে গণতন্ত্র কখনোয় পথচ্যুত হবে না ।