ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

ইভ-টিজিং এর আদিকথা –

এক বিংশ শতাব্দীতে এসে ইভ-টিজিং এর আরম্ভ নয়, এর শিকড় অনেক আগে থেকেই আমাদের সমাজে বিদ্যমান ছিল । সেটি ভয়াবহ রুপ ধারন করেছে আমাদের দেশে অবশ্য বেশ কিছু বছর আগে থেকে । ইভ-টিজিং এর সংজ্ঞা যুগে যুগে পরিবর্তন হয় , আগে যেমন গায়ে হাত না দিলে সেটা ইভ-টিজিং বলে গণ্য হত না । মনে করা হত, জোর করে দৈহিক মিলন বা ধর্ষণ অথবা গায়ে হাত দেয়া না হলে Sexual Offence হয় না। অর্থাৎ ইভ টিজিং কোন অপরাধ হিসেবেই গণ্য হতো না। অপরাধ ভেদে আইনের দণ্ড বিধি ব্রিটিশ আমল থেকে ইন্ডিয়া, তারপর পাকিস্থান থেকে বাংলাদেশ বলতে গেলে প্রায় একই রয়ে গেছে । সময়ের পরিবর্তনে অপরাধের আকার-ধরণ, রূপের পরিবর্তন ও বিস্তৃতি যেমন ঘটেছে, তেমনি আইনি পুস্তকে বা বিধানেও উভয় কুল (শ্যম ও ঘর) বজায় রেখে কিছুটা পরিবর্তন সংযোজন হয়েছে। মূলত ভারতে ৬০ সালেই ইভ টিজিং এর কুৎসিত চেহারা প্রকাশ হতে থাকে যদিও মুসলিম প্রধান দেশ পাকিস্তানের রাজনীতিবিদ বা নীতিনির্ধারকগণ তা দেখতে সক্ষম হননি, অথবা সচেতন ভাবেই তারা বিষয়টি আলোচনার বাইরে রেখেছিলেন। বলা বাহুল্য তারাও যে একই সিস্টেম বা ধারায়, একই কুসংস্কার ও প্রথায় বিশ্বাসী ছিলেন, এবং আজও আছেন। ভাবখানা এ রকম যে, আদমের পুত্র, ইভের মেয়েকে টিজিং করবে, এ এমন অপরাধ কি?

বাংলাদেশে ১৯৭৬ সালে ‘দ্যা ঢাকা মেট্রোপলিটান পুলিশ অর্ডিন্যান্স’ (DMPO) ইভ টিজিং নাম পরিবর্তন করে ‘ওমেন টিজিং’ নাম দিয়ে একে সঙ্গায়িত করেন এভাবে — “willful and indecent exposure of ones person in any street or public place within sight of, and in such manner as may be seen by, any woman, whether from within any house or building or not, or willful pressing or obstructing any woman in a street or public place or insulting or annoying any woman by using indecent language or making indecent sounds, gestures, or remarks in any street or public place”. এ আইন এখন ঠিক কত টুকু যুক্তিযুক্ত তা ভাবার সময় এসেছে বলে মনে করি ।

পরবর্তীতে ২০০০ সালে এসে বাংলাদেশ সরকার নারী-শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে শক্ত কঠিন! আইন প্রণয়নের উদ্দ্যোগ নেন। তখনই সর্বপ্রথম যৌন-হয়রানি বা sexual harassment এর ব্যাপারটি আলোচনায় তুলা হয়। ‘যৌন-হয়রানি’কে সঙ্গায়িত করা হয় এভাবে- “if a man, with a view to fulfilling his illegal sexual desire outrage a woman’s modesty or makes erotic gesture, such act of the man will amount to sexual harassment”. অবশ্য এ আইন ও যতক্ষণ না Victim না মরছে ততক্ষণ প্রয়োগ হবে না । আমাদের হ-য-ব-র-ল আইনে এটি কে এভাবেই দেখা হয় , কিছু সংগঠিত না হলে এরা কিছুই করবে না , কিন্তু সংগঠিত হলেই যত ফাঁকা বুলি ।

মাঝে মধ্যে দেখা যায় তাৎক্ষনিক শাস্তি দেয়া হচ্ছে, অথবা কান ধরে কতক্ষণ শরীর চর্চা করানো হচ্ছে শাস্তি স্বরুপ । কিন্তু শর্ষের মধ্যে তো ভুত ! এই যেমন কিছুদিন আগে একজন বিচারক নিজেই কি না ছিঃ ছিঃ ছিঃ ! বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যিনি রক্ষক তিনি অবশ্যই ভক্ষক ।

ধর্ম ও নৈতিকতা এবং ইভ টিজিং-

আজকাল অনেকেই বলে থাকেন ধর্মীয় অনুশাসনের কথা, উঁচু গলায় বলে থাকেন ধর্ম পালনে অবসান ঘটতে পারে যৌন নিপীড়ন এর । সে সব জ্ঞানপাপীদের বলতে চাই- কেন মোল্লা দ্বারা মেয়েরা ধর্ষিত হয় ? না কি মোল্লার জন্য হালাল ! মানুষদের নৈতিকতা শিখানোর আড়ালে অধিকাংশ হুজুরদের আড়ালে লুকায়িত আছে কুৎসিত চেহারা। তা না হলে মাদ্রাসা গুলুতে সমকামিতার চর্চা হত না । না হলে ছাত্রীরা পাগড়ী এবং লম্বা জুব্বা পরিহিত হুজুরদের বিকৃত লোভ লালসার নির্মম বলি হত না । হ্যাঁ নৈতিকতা অবশ্যই দরকার আছে, তবে তার জন্য ধর্ম কত টুকু দরকার তা আজ প্রশ্নের সম্মুখীন নয় কি? না কি তা ধর্মের অপব্যাবহার! অবশ্য শুধু মাত্র মাদ্রাসাতেই নয় স্কুল, কলেজগুলোতেও হরমোশাই ঘটছে যৌন নিপীড়নের ঘটনা । যৌন নিপীড়নের শিকার ছাত্রী তার পিতৃতুল্য শিক্ষকের কাছে, শিকার গ্রামের মোড়লরূপি জন্তু জানোয়ারদের হাতে, শিকার রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিপত্তি বিদ্যমানদের হাতে ।এক্ষেত্রে বলা বাহুল্য এটার চুড়ান্ত পরিণতি হয়ে দাঁড়ায় অনেক সময় এসিড নিক্ষেপ , জোর করে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করা এরপর খুন করে লাশ গুম করা । ভাগ্যক্রমে বেঁচে থাকলে শরীরের দাম নির্ধারণ করা হয় ক্ষেত্র বিশেষে ১০,০০০-২০,০০০ হাজার টাকার মত। এটা করেই বগলদাবা করে আমাদের রাজনৈতিক প্রতিভূরা। তাহলে এটাই প্রতীয়মান হচ্ছে শুধুমাত্র ধর্মীয় অনুশাসনের কথা বলে এটাকে থামানো যাবে না । যদি তাই যেত ৫ বছরের মেয়েটি ধর্ষিত হত না ! আসলে আমাদের মন মানসিকতার আগে পরিবর্তন করতে হবে । নারীকে অবজ্ঞার চোখে দেখার অবসান করতে হবে।

ইভ টিজিং নিয়ে আমাদের সমাজের অবস্থানঃ-

আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে ইভ টিজিং এর শিকার নারীদের অনেকটা অবজ্ঞার চোখে দেখা হয়, ভাবখানা এমন যে তুই ওড়নাটা গলায় দিয়ে গেলে কিন্তু এ রকম হত না, অথবা কতবার বলেছি ফতুয়া, বা টি শার্ট পরে বাইরে না যাওয়ার জন্য তোকে অনেকবার বারন করেছিলাম, এখন দেখ না শুনার ফল কি হতে পারে।মোদ্দা কথা ঘরে বসে থাক, এ সুন্দর ধরা তোমার জন্য ক্ষেত্র বিশেষে নিষিদ্ধ । তার উপর সামাজিক মান সম্মান তো আছেই ! আমাদের শহুরে সমাজেও এর তেমন বাতিক্রম পরিলক্ষিত হয় না । সমাজ না পালটালে নারীর অধিকার আদায় সুদুর প্রাহত, এ কথা নি সন্দেহেই বলা যায় । এর জন্য দরকার সমাজ পরিবরতন, তথাকথিত শিক্ষিত না হয়ে সু শিক্ষিত রুপে গড়ে উঠতে না পারলে আরও কত ঘানি টানতে হবে তার কোন ইয়ত্তা নেই।

সরকারি গুণ্ডাদের লাগামছাড়া কর্মকাণ্ড –

ইভ টিজিং আমাদের সমাজে ক্যান্সারের মত বিস্তারের পেছনে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্লিপ্ততা ও অনেকখানি দায়ী। প্রায়ই দেখা যায় ইভটিজারদের কোন না কোন রাজনৈতিক পরিচয় থাকে। ক্ষেত্র বিশেষে এমন ও হয় যে, ইভ টিজিং এর শিকার নারী বা তার পরিবার অথবা প্রতিবাদকারী শ্রেণী শিক্ষকদের অবস্তা এতটায় খারাপ হয়ে যায় তা বলার বাইরে। অনেক সময় প্রতিবাদকারী লাশ হয়ে আমাদের ঘাড়ের উপর ঋণের বোঝার পরিমান বাড়িয়ে দিয়ে যায়, অবশ্য এটাকে ঋণ মনে করে কি না তা নিয়ে ব্যাপক সন্দেহ আছে ! সামান্য কিছু দোররা মেরে এটার মিমাংসা করা হয় । কিন্তু এ সব মৌসুমি গুণ্ডাদের ব্যাপারে সরকারি মহল বা রাজনৈতিক দলগুলো খুব একটা উচ্চ বাক্য পোষণ করেন না । উল্টা এদেরকে পুরস্কৃত করা হয়, তাই তো আমাদের সমাজে এখন মানিকদের ছড়াছড়ি !

প্রতিকার করা আজ সময়ের দাবি-

ইভ টিজিং বা যৌন নিপীড়নের ভয়াবহ ছোবল থেকে সমাজ কে রক্ষার্থে সব চাইতে বড় ভুমিকা পালন করতে পারে পরিবার। কারন পরিবার থেকেই ভালো মন্দের তফাৎ বা নৈতিক শিক্ষার প্রাইমারি ধারনা পেয়ে থাকি আমরা। ছোটকাল থেকেই নৈতিক শিক্ষায় দীক্ষিত করতে হবে। এক সময় বাল্য শিখার প্রচলন ছিল, পড়ানো হত সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি সারা দিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি। কিন্তু কালের পরিক্রমায় তা শুধু মাত্র বিলুপ্তির পথেই বলবো না, বলা যায় বর্তমান সমাজে অধিকাংশ পরিবারেই এর বালাই পর্যন্ত নেই।উল্টা ছোটকাল থেকেই শিশুদের ইন্দিয়ান সিরিয়াল যে গুলু family politics এ ভরপুর, যে গুলু যৌন সুড়সুড়িতে ভরা, বা english movie দেখানোর মহা উৎসব চলে। মা-বাবার ভুলে ছেলেমেয়েরা ভুল পথে পা বাড়াই । এ থেকে উত্তরন ঘটাতে না পারলে পারিবারিক রীতি নীতিতে ভয়াবহ বিপর্যয় ঢেকে আনবে। এবং তা সামাজিক অবক্ষয়ের চূড়ান্ত রুপ ধারন করবে। ইভ টিজিং বা যৌন নিপীড়ন রোধে শিক্ষক সমাজও উদ্যোগী ভুমিকা পালন করতে পারে, তবে তা যেন পরিমল বা হুসনে আরার কার্বন কপি না হয়। আদালত আমাদের শেষ আস্রয়স্থল এর শাস্তি নির্ধারণে আলাদা বেঞ্চ গঠন করা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করি। জেলা, উপজেলা গুলুতে এ ধরনের বেঞ্চ থাকাটা বাঞ্ছনিয় । এ ধরনের বিচার কাজ সমাধা করতে ৭-১৫ দিন কার্যদিবস সময় বেঁধে দেওয়া উচিত হবে বলে মনে কতি। তবে এ ক্ষেত্রে পুলিশ বাহিনীর ভুমকাই হচ্ছে আসল, কত তাড়াতাড়ি আসামিকে ধরা হচ্ছে । কোন ধরনের রাজনিতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করা যাবে না, আসামী কোন দলের তা যেন বিবেচ্য না হয় এ দিকটায় নজর দেওয়া অত্যাবশ্যক বলে মনে করি। আর একটি কাজ করা যায় তা হল ইভ টিজিং এর ভয়াবহতা নিয়ে পাঠ্য বইয়ে কোন প্রবন্ধ বা নিবন্ধ রাখা যেতে পারে। সর্বোপরি সবচাইতে বড় ভুমিকা পালন করতে পারে স্কুল, কলেজের ছাত্র ছাত্রী দের সমন্বয়ে ঘটিত একটি টিম । যারা সারা দেশে ঘটে যাওয়া ঘটনা গুলু নিয়ে পর্যালোচনা করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ে অথবা মানবাধিকার কমিশনে রিপোর্ট প্রদান করবে। এক্ষেত্রে গাইড লাইন দিতে পারেন সায়িদ স্যার, ডঃ জাফর ইকবাল, লেখিকা সেলিনা হোসেন , ডঃইউনুস এর মত পরিচ্ছন্নরা।

ইভ টিজিং বা যৌন নিপীড়নের শিকার নারীদের মনোবল বাড়ানোর ক্ষেত্রে সম্ভাব্য করনীয়-

একটি নারী যখনি এর ভায়াবহতার শিকার হয় তখন সে মানসিক ভাবে খুব ভেঙ্গে পরে, অনেক সময় দেখা যায় সে অবলীলায় চেপে জায়, বা কখনো কখনো পরিবারে মা কে বললেও বাবা কে বলে না। আর মা সন্তানের অনাগত ভবিষ্যৎ এবং সামাজিক ভাবে হেয় হওয়ার ভয়ে এটা নিয়ে তেমন একটা উচ্চবাক্য পোষণ করে না । কিন্তু মেয়েটার মানসিক অবস্থার কথা কেও একটা চিন্তা করে না। বলা বাহুল্য এ গটনা শুধু যে তার মানসিক বিকাশ ই বাধা করে না , বরঞ্চ বলা যায় , একটি ভয়ানক ভীতি ও তৈরি হয় তার মনে । সে সবখানে নিগৃহীত, অপমানিত এক সময় এটা তার বদ্ধমূল ধারণাতে রুপ ধারন করে।

এ অবস্থা থেকে উত্তরনের অন্যতম একটা উপায় হতে পারে মনোবিদের শরণাপন্ন করানো । মানসিক ভাবে উজ্জীবিত করার মহান ব্রত নিয়ে মনোবিদ বা শিক্ষক সমাজের পরিচ্ছন্ন ইমেজ আছে এমন মানুষরা এগিয়ে আসতে পারেন । যেমন আব্দুল্লাহ আবু সায়িদ স্যার, ডঃ জাফর ইকবাল, লেখিকা সেলিনা হোসেন, ডঃ ইউনুস এর মত প্রমুখ আইডলরা ।

সেটা সরকারীভাবে হোক বা বেসরকারিভাবে হোক । তাকে বোঝাতে হবে এটা কিছু বিকৃত ছেলেদের আচরণ মাত্র , তাকে প্রতিবাদের ভাষা শিখাতে হবে, অধিকার আদায়ের মন্ত্র কানে সঁপে দিতে হবে। আমার মনে হয় এতে ভালো কাজ দিবে।

এগুলোর সফল বাস্তবায়নের জন্য চাই সুস্থ সামাজিক আন্দোলন , চাই জন সম্পৃক্ততা ।

চাই রাজনীতির কুটিল বর্জিত সমাজ , চাই সবার সমান অধিকার _ এবার এটাকে সময় হয়েছে সংবিধান থেকে বের করা আনার, সময় হয়েছে অলংকারিক ভাবে পড়ে থাকার চাইতে বা থাকাই মনে হয় ভাল এ উপলব্ধি যত দিন না সবার বদ্ধমূল ধারনাতে পরিনত না হচ্ছে তত দিন মুক্তি সুদুর পরাহত।