ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

 

উৎসর্গ – চাকরি জাতীয়করণের দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষক ,দেশের সূর্যসন্তান আজিজুর রহমানকে। , যিনি পুলিশ নামক হিংস্র,বর্বর বাহিনীর নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। এবং সদ্য প্রয়াত নাগরিক অধিকার আন্দোলনের প্রাণপুরুষ টিআইবির সাবেক প্রধান অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদকে । যিনি আজীবন দুর্নীতি ও অপরাজনীতির বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ প্রকাশ করেছেন ।

প্রতিটি দেশে/ রাষ্ট্রের একটি অংশ থাকে যাদের কোন দল বা মতের প্রতি সমর্থন থাকে না । এরা দেশের যে কোন ক্রান্তিলগ্নে নিজেদের মতামত প্রকাশ করে থাকেন উচ্চকণ্ঠে যা দেশকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে আনতে সহায়ক ভুমিকা হিসেবে পালন করে । সাধারণত এরা কোন দলের প্রতি প্রচ্ছন্ন সমর্থন জ্ঞাপন করেন না । এ ধরনের ধ্যান ধারনা পোষণ করা মানুষদের সাধারণত সুশীল সমাজের অংশ বলে গণ্য করা হয় ।

যুগে যুগে বিভিন্ন সমাজে সুশীলরা দেশ গঠনে উল্লেখযোগ্য ভুমিকা পালন করে এসেছে । অবশ্য কিছু ব্যতিক্রমও লক্ষ করা যায় । সুশীলদের বলা হয় সমাজের বিবেক, যারা আদর্শকে জলাঞ্জলি দেয় না, কোন চাপের কাছে নতি স্বীকার করে না । দেশের যে কোন সংকটময় মুহূর্তে এরা ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে সমাজে এমন ধারনা প্রচলিত আছে কম বেশি । এ জন্য সুশীলদের কদর বেশি হয়ে থাকে । একটি দেশের সুশীলদের কথায় প্রায় সময় উঠে আসবে সমাজের নানান অসঙ্গতি , বর্তমান সমাজের ভালো মন্দের আসল চিত্র । যাহা সর্বোপরি দেশ গঠনে অপরিহার্য ভুমিকা রাখতে সক্ষম ।

কিন্তু আজকাল সুশীল সমাজের ভুমিকা প্রশ্নবিদ্ধ(?) । যদিওবা মাঝে মাঝে কিছু সুশীলের আবির্ভাব ঘটে যারা আড়ালে দেশ বিক্রির ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকে । সুশীলদের মধ্যেও বিভক্তি আছে , আছে শ্রেণী বিভাগ । এর মাঝে কিছু সুশীল সর্বদা অপেক্ষায় থাকে কখন তাদের প্রভুদের ইনিয়ে বিনিয়ে বলবে দেশ রসাতলে গেছে অচিরেই আক্রমন না করলে পুরাই যাবে । এরা দেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটকে সব সময় ই উল্টা বলে থাকে । আর তার ফায়দা তুলতে অপেক্ষায় থাকে । সোজা বাংলায় খাল খেটে কুমির আনে এরা ।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সুশীলরা অবশ্য বেশিই পূজনীয় । তারা তথাকথিত নির্দলের আড়ালে লীগের চামচামি করবে আর নতুবা বিএনপির নীতিকে প্রচার করবে । আবার অন্য একটি সুশীল অংশ আছে যারা সাম্রাজ্যবাদের প্রতিভূ হিসেবে কাজ করে থাকে । সামান্য উনিশ-বিশ হলেই তারা গেল গেল বলে রব তুলে থাকে , তারা অবশ্য পেইড চিন্তাবিদ হিসেবেই কাজ করে । যাদের নিরপেক্ষতার আড়ালে দেশ কে পরাধীন করার নীল নকশা কাজ করে । আবার দেশের ক্রান্তিলগ্নেও কিছু মৌসুমি সুশীলের আবির্ভাব ঘটে যারা স্বার্থ হাসিলে ( পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে ) উম্মুখ থাকে । এ ধরনের বেশ কিছ সুশীলের আবির্ভাব হয়েছিল ১-১১ এর সময় । অবৈধ সরকারকে স্বীকৃতি দিতে উঠে পড়ে লেগেছিল । যদিওবা দুই দলের দলাদলিতে দেশের সাধারন মানুষ এমনিতেই বিরক্ত ছিল । কিন্তু অবৈধ সামরিক সরকার ও কুটিলতার উপরে উঠে কাজ করতে পারে নি, উপরন্তু আস্ফালন ই সার বলে প্রমানিত হয়েছে , নীতি কথার আড়ালে এরা নিজেদের পকেট ভারী করতেই সময় পার করেছে ( কিছু ইতিবাচক ছাড়া ) যার ফলশ্রুতিতে সেই সব নায়কেরা আজ দেশে আসতে ভয় পেয়ে যাযাবর দিন অতিবাহিত করছে । এমনকি তাদের কৃত কাজ কর্মের স্বীকৃতি দেওয়ার আশ্বাস পাওয়ায় পরেও । বাংলাদেশের রাজনীতি পর্যবেক্ষণে বুঝা যায় বড় দুই দল ই কিছু পাবলিক কে লালন পালন করে থাকে , যাদের কাজ ই হল লীগ বা বিএনপির নীতির পক্ষে জনমত তৈরি করা । এরা এ সব ভ্রান্ত নীতির পক্ষে প্রচার প্রচারনা চালিয়ে থাকে দেশ ছাড়িয়ে বহির্বিশ্বে পর্যন্ত । এ নীতিগুলোকে জনতার মগজে ঢুকিয়ে দেওয়ার মানসে এরা সভা , সেমিনার ও পত্রিকায় ও লেখা-লিখি পর্যন্ত করে । এখানেও বলা যায় নেত্রীই সর্বসেবা , নেত্রীর কৌশল ই শিরোধার্য । তাইতো কিছু কিছু বিষয়ে তারা যেমন উচ্চকণ্ঠ প্রকাশ করে আবার কিছু কিছু জনকল্যাণ মুলক অসঙ্গতিতে এদের নিরবতা আমাদের ভাবিয়ে তুলে । আবার কিছু কিছু আছে যারা সময়ে সময়ে নীতি কথা শুনিয়ে থাকে আমাদের । তাইতো একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা মানুষ গড়ার কারিগর প্রধানমন্ত্রীকে স্মারক লিপি দেওয়ার দুঃসাহস দেখানোর অপরাধে পুলিশের নির্মম নির্যাতনে মারা গেলেও তেমন কেও একটা উচ্চবাক্য পোষণ করেননি । রাষ্ট্রযন্ত্র সাধারন মানুষের ভাগ্য নিয়ে নিরন্তর ছিনিমিনি খেলেই যাচ্ছে কিন্তু এটা নিয়ে বেশি কিছু সুশীলদের মাথা ব্যথা ও নেই । মুষ্টিমেয় যারা প্রতিবাদ করে তারাও প্রায় মৌসুমি সুশীল সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে এদের মুখও বন্ধ হয়ে যায় ।

কিন্তু বাস্তবতা হল- এমন একটি মূর্ত প্রেক্ষাপট যেখানে আবেগিয় ধ্যানধারণার স্ফুরণ ঘটে এবং সে কাজকর্ম শুরু করতে পারে । তবে প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে বুঝা যায় সুশীল বাবুদের ঘুম অনেক সময় ই ভাঙ্গে না । তবে হা এখানে বলা বাহুল্য -কেও কাউকে মুক্তি এনে দিতে পারে না,কিন্তু সম্মিলিতভাবে মানুষ নিজেদেরকে মুক্ত করতে পারে ।

তবে বিশিষ্ট শিক্ষা সমালোচক ফ্রেইরির মতে- মানুষ একটি অনন্য সত্তা তখনি ই যখন সে তার নিজের মুক্তি নিয়ে বিচারবিবেচনা করে । নিজেকে মুক্তির চিন্তা তারাই করতে পারে যারা নিজেদের অবস্থা ও বাস্তবতা সম্পর্কে সঠিকভাবে অবগত । একটি ভাসাভাসা, অতৎপর চেতনাবোধ থেকে কোন কার্যকর বিচার বিশ্লেষণ গড়ে উঠে না । সেজন্য দরকার এমন একটি অনুশীলনের যা পরিবর্তনের নিমিত্তে গৃহীত ।এ ছাড়া অন্য কোন পথ খোলা আছে বলে মনে হয় না । আমাদের কে আগে ঠিক করতে হবে কি চাই ? কিভাবে চাই? কেন চাই? জনগণ সচেতন হলেই এসব ভ্রান্ত সুশীলরা খড়কুটার মত ভেসে যাবে , নিক্ষিপ্ত হইবে ইতিহাসে আস্তাকুঁড়ে। এর জন্য সবচাইতে বেশি দরকার সঠিক ইতিহাস জানা । অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে এই অভিশাপ নিজেরা বরন করেছি এবং স্বেচ্ছাই শক্তিশালী সমাজ থেকে নিজেদের বঞ্চিত রেখেছি । আমাদের সবার ই লক্ষ্য হওয়া উচিত বিমুক্তির লক্ষে শিক্ষিত হওয়া । হয়ত বা মুক্তি এর মাঝেই নিহিত ।