ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

আমাদের গ্রামের বাড়ী থেকে জেলা সদরে যাওয়ার জন্য যে বাসস্টপেজ থেকে বাসে উটতে হয় তার দূরত্ব প্রায় ১২ কিলোমিটার। বর্ষায় হাঁটু সমান কাঁদা আর গ্রীষ্মে গোড়ালি পর্যন্ত ধূলা। সেজ খালার শ্বশুরবাড়ি জেলা সদরে, গ্রীষ্ম বর্ষায় ধূলার পাহাড় আর কাঁদার সমুদ্র ডিঙ্গিয়ে মায়ের আঁচল ধরে খালা বাড়িতে যাওয়ার সে কি মহানন্দ। ওই ছয় সাত বছর বয়সে কাঁদা ধূলির ১২ কিলোমিটার পথের চেয়ে শহুরে মটরগাড়ির ধোঁয়াই ছিল আমার প্রিয় গন্ধ। আর ২ বছর যেতে না যেতেই মাথায় ঢাউস সাইজের এক কাঁঠাল ওঠার পর মনে হোত পা আরও এক হাটু ডুবে গেছে কাঁদার ভিতরে। তারপর যখন বাসের সাইরেন আর ইঞ্জিনের শব্দ পেতাম তখন শরীর চাঙ্গা হয়ে যেত নিমেষেই। সেই আমিই যখন প্রথম ঢাকাতে আসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য তখন আমার চোখে রাজ্যের বিস্ময়, চারিদিকে মটরগাড়ির সাইরেন তেল পোড়া মিষ্টি গন্ধ উঁচু প্রাসাদ সব কিছু কি ভালোই না লাগতো।

ক্লাস শুরু হল আমি তখন প্রাণপণে চেষ্টা করে যাচ্ছি আমার মুখ থেকে যশুরে ভাষার টান ঝেড়ে ফেলতে। নিজের আত্মপরিচয় গোপন করতে গিয়ে কখন যে জড়িয়ে পড়লাম আবৃত্তি, অভিনয়, সামাজিক আন্দোলনে বুঝতেই পারিনি। ক্রোমান্যয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি। নিজের বাঙালপনাকে ঢাকতে গিয়ে বিলিন হয়ে গেছি অন্য এক জগতে। তারপর হারিয়েছি আর পেয়েছি, পেয়েছি আবার হারিয়েছি। টিএসসি, হাকিম চত্বর, লাইব্রেরী, পলাশীতে দেখেছি উচ্চশিক্ষিত ভদ্রতা এবং আপতিত মানুষের রুদ্ধশ্বাস। হলের ডাইনিং এ খেতে গিয়ে মনে হয়েছে যারা খাবার পরিবেশন করছে তারা পৃথিবীর নিকৃষ্টতম জীব যাদের সাথে আপনি যেমন খুশি তেমন সাজোর মত ব্যবহার করতে পারেন। সেদিন বিকালে প্রতিদিনের মত হল থেকে বেরিয়ে টিএসসি তে যাচ্ছিলাম, প্রতিদিন দু তিনবার ওই ময়দানে যেতে না পারলে মনে হয় রাজ্য চালনায় কোথাও কিছু গোলমাল হয়ে গেছে। যখন স্বোপার্জিত স্বাধীনতা চত্বর পার হচ্ছি তখন রাজু ভাস্কর্য আর টিএসসির মাঝের রাস্তায় একটি কুস্তি খেলার দৃশ্য চোখে পড়ল। আপতিত দুই রিকশাওলার পরাজিত মানবাত্মার লড়ায়। একজন আর একজনের শার্টের কলার চেপে ধরে নেমে যাচ্ছে আরও অতলে ঠিক যতটা নামলে কুয়োর ব্যাঙ হওয়া যায়, আর তাই দেখে আমাদের মধ্য উচ্চশিক্ষিত ভদ্রতার পুলক জাগে। কেউ এক জন সিটি দিল, একজন বলল “বাহ দারুণ চালায়ে যান মামারা” সবাইকে ছাড়িয়ে আরও এক সরস বেশি উপহার দিলেন লাঠি এগিয়ে দিয়ে আর বললেন “ আরে মামা লাঠি থাকতে হাতাহাতি কেন? এই নেন লাঠি নেন”।

আমরা উচ্চশিক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া জাতির বিবেক, আমাদের বিবেক কতটা জাগ্রত হলে আমরা দুজন রিকশাওয়ালার মারামারিতে এভাবে পুলকিত হতে পারি তা আমাদের শিক্ষকেরা তাঁদের প্রোমোশন রিসার্স হিসেবে করে ফেলতে পারেন। কিছুদিন আগে জগন্নাথ হলের সামনে দুজন রিকশাওয়ালার মারামারিতে একজন নিহত হয়। আমি দেখেছি দুজন রিকশাওয়ালা যারা কিনা একে অপরকে একদমই চেনে না তারাও প্যাডেল মারতে মারতে নিজেদের মধ্য এমন ভাবে কথা বলে যে আপনার মনে হবে তারা কতকালের চেনা। “কিরে আইজকা কত মারলি? কাইলকা কি হরতাল দিছে রে? এইডা ভাংতি দে” কথাগুলো যে আত্মীয়তার অভিব্যক্তিতে বলে তা একজন পাকা অভিনেতার পক্ষেও সম্ভব নয় বলা। তাহলে এরাই কেন একজন আর একজনকে আঘাত করে, মারে ও মরে? ভাড়ায় ঠকানো, নির্ধারিত দূরত্বের চেয়ে বেশি দূরে নিয়ে যাওয়া, মাঝে মাঝে আমাদের মত বিবেকের হাতে চড় থাপ্পড় খাওয়ার কারনেই কি ওরা প্রতিবাদী হয়ে উঠে নিজেরাই নিজেদের কে পেটায় নাকি আমাদের বিবেকের জং ধরা বোতামগুলো টিপে ধরে আমাদের হৃদপিণ্ডকে সচল করতে চায়? আমি নিজেকে বদলাতে যেয়ে হারিয়ে গেছি। সত্যি হারিয়ে গেছে আমার বিবেক। আজ আমি প্রতিনিয়ত বিবেকের স্রোতে ভাসছি আর ডুবছি, ডুবছি আর ভাসছি। আজ আর মটরগাড়ির সাইরেন, ধোঁওয়া আমার ভালো লাগে না। আজ আমি আবারও কাঁদা মাখা ধুলোয় ওড়ানো পথে হাটতে চাই, আমার পথে, আমার মাটির পথে।