ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

উনসত্তুরে গণআন্দোলন যখন তুঙ্গে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী আমাদের বেলাবো উপজেলার গ্রামের বাড়ীতে এসেছিলেন । আমার জ্যেঠা আবদুস সোবহান পন্ডিত মওলানা ভাসানী এর একজন খুবই ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন।। স্ব-শিক্ষিত ভাসানী, ঔপনিবেশিক রীতিনীতির প্রতি যেমন ছিলেন চরম আস্থাহীন। তেমনি আমার জ্যেঠা মহাশয় ও ছিলেন তাই. উনসত্তুরে নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামে মওলানা ছিলেন আমাদের অণুপ্রেরনার উৎস্য। জ্যেঠার বাংলা ঘরে ঢুকেই হেসে উঠেছিলেন মওলানা ভাসানী…কারন আর কিছু নয়, প্রথমেই তার নজরে এসেছিলো বেড়ায় ঝুলানো শেখ মুজিবের একটি ছবি।
ক্ষমতাবিমুখ ভাসানী গ্রাম ভিত্তিক, উগ্র মতবাদে উজ্জিবিত করেছিলেন ছাত্র, কৃষক শ্রমিক ও জনসাধারণকে, যাদের অধিকার এবং স্বার্থ রক্ষার জন্য তিনি আগরতলা (ষড়যন্ত্র!)মামলা বাতিল, এবং জেলের তালা ভেঙ্গে শেখ মুজিবকে বের করে আনার আন্দোলনকে সারাদেশে ছড়িয়ে দিয়ে ছিলেন।
পাকিস্তান সরকার ১৯৬৮ সালের জানুয়ারি মাসে আগরতলা (ষড়যন্ত্র!) মামলা রুজু করে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান কে প্রধান আসামি করে জেলে ঢুকিয়ে ছিলো। তার সংগে সেনাবাহিনীর কয়েকজন কর্মরত ও প্রাক্তন সদস্য এবং ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তাদেরও এ মামলায় জড়িয়ে দেয়া হয়েছিলো। তাদের বিরুদ্ধে মূলতঃ যে অভিযোগ ছিল:
ভারত সরকারের সহায়তায় সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্র ভারতের ত্রিপুরার আগরতলা শহরে ভারতীয় পক্ষ ও আসামি পক্ষদের মধ্যে এ ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে অত্র মামলায় উল্লেখ করা হয় যার জন্য একে আগরতলা (ষড়যন্ত্র!) মামলা বলা হয়।

পাকিস্তান সরকারের গোয়েন্দাবাহিনী সারা পাকিস্তানে প্রায় দেড় হাজার বাঙালিকে এ মামলায় গ্রেফতার করে। কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্র দফতর ১৯৬৮ সালের ৬ জানুয়ারি এক প্রেসনোটে জানায়, ১৯৬৭ সালের ডিসেম্বর মাসে পাকিস্তানের জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী এক চক্রান্ত উদ্ঘাটন করেছে। এ প্রেসনোটে ২ জন সিএসপি অফিসারসহ ৮ জনের গ্রেফতারের খবর প্রকাশ পায়। স্বরাষ্ট্র দফতর ১৯৬৮ সালের ১৮ জানুয়ারি অপর এক ঘোষণায় শেখ মুজিবুর রহমানকেও এ ষড়যন্ত্রে অভিযুক্ত করে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে এ মামলা ও এর প্রতিক্রিয়া বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রজনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে পাকিস্তান সরকার মামলাটি প্রত্যাহারে বাধ্য হয়।
এ মামলায় অভিযুক্ত যে ৩৫ জনের বিরুদ্ধে চার্জশীট দাখিল করা হয় তারা হচ্ছেন শেখ মুজিবুর রহমান, কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন, স্টুয়ার্ড মুজিবুর রহমান, প্রাক্তন এলএস সুলতান উদ্দিন আহমেদ, সিডিআই নূর মোহাম্মদ, আহমেদ ফজলুর রহমান সিএসপি, ফ্লাইট সার্জেন্ট মাহফিজউল্লাহ, প্রাক্তন কর্পোরাল আবুল বাশার, মোহাম্মদ আবদুস সামাদ, প্রাক্তন হাবিলদার দলিল উদ্দিন, রুহুল কুদ্দুস সিএসপি, ফ্লাইট সার্জেন্ট মো. ফজলুল হক, ভূপতিভুষণ চৌধুরী ওরফে মানিক চৌধুরী, বিধানকৃষ্ণ সেন, সুবেদার আব দুর রাজ্জাক, প্রাক্তন হাবিলদার ক্লার্ক মুজিবুর রহমান, প্রাক্তন ফ্লাইট সার্জেন্ট মো. আবদুর রাজ্জাক, সার্জেন্ট জহুরুল হক, মো. খুরশীদ, খান মোহাম্মদ শামসুর রহমান সিএসপি, হাবিলদার আজিজুল হক, মাহফুজুল বারী, সার্জেন্ট শামসুল হক, শামসুল আলম এএমসি, ক্যাপ্টেন মো. আবদুল মোতালেব, ক্যাপ্টেন এ শওকত আলী মিয়া, ক্যাপ্টেন খন্দকার নাজমুল হুদা এএমসি, ক্যাপ্টেন এ.এন.এম নুরুজ্জামান, সার্জেন্ট আবদুল জলিল, মো. মাহবুব উদ্দিন চৌধুরী, লে. এস.এম.এম রহমান, প্রাক্তন সুবেদার এ.কে.এম তাজুল ইসলাম, মোহাম্মদ আলী রেজা, ক্যাপ্টেন খুরশিদ উদ্দিন আহমেদ এএমসি এবং লে. আবদুর রউফ।
সার্জেন্ট আবদুল জলিল, (আগরতলা (ষড়যন্ত্র!)মামলার ২৯ নং অভিযোক্ত ছিলেন আমার জে্যঠাতো ভাই। যিনি একাত্তুরে মুক্তিযুদ্ধে আমাদের সাথে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়ে ছিলেন। এসব কারনে আমার বাবা কবি এম. এ খালেক ও বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত স্নেহভাজন ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে ভৈরবে শহীদ নুরু আতিকের জীবনদানের জন্য আমার মাতৃকুল, ও আগরতলা (ষড়যন্ত্র!)মামলায় সহঅভিযুক্ত হবার কারনে পিতৃকুলের অনেকেই বঙ্গবন্ধুর হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছিলেন।

আগরতলা (ষড়যন্ত্র!)মামলার বিষয়ে ইতিহাস বিস্মৃতিই আমাদের স্বাধীনতার মূল জাতীয় ইতিহাসকে ভিন্ন পথে নেয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে। আজো এ মামলা ষড়যন্ত্র! মামলা হিসেবেই পরিচিত। যা হবার কথা নয় বা ছিলো না। এ মামলাটি স্বাধীনতার একটি পরিকল্পনা! মামলা. স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমে এর সফলতা এসেছে। এ মামলায় সংশ্লিষ্টদের জাতীয় বীরের মর্যাদা দেয়া উচিত এবং পাঠ্য পুস্তকে বিষয়টি অন্তর্ভূক্ত করা উচিত।

লেখক: দেলোয়ার জাহিদ, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, কানাডা ইউনিট কমান্ডের অন্যতম নির্বাহী ও বাংলাদেশ প্রেসক্লাব অব আলবার্টা এর সভাপতি।

slide

আগরতলা (ষড়যন্ত্র!) মামলার অভিযুক্তদের ছবি ও তালিকা