ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

এডমন্টন, আলবার্টা (কানাডা) থেকে দেলোয়ার জাহিদ: পুলিশের নীতিনির্ধারকেরা নিঃসন্দেহে উভয়সংকটে, আর বর্তমান সরকার ক্রমধাবমান ভাবমূর্তি সংকটের মুখমুখি। পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী হত্যারহস্যে নতুন নতুন মাত্রা যোগ হচ্ছে। যোগ হচ্ছে, কিস্সা, কাহিনী, আলোচনা সমালোচনায় সরকারের সফলতা ও বিফলতার মাত্রা নির্ধারণের প্রয়াস।
দীর্ঘদিন আইন গবেষণা ও সাংবাদিকতার সুবাধে সংঘটিত এ হত্যারহস্যের বিষয়ের উপর আমি সহ বোদ্ধামহলের কড়া নজর রয়েছে বলে মনে হয়। যখন একটি অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে, তখন কিভাবে পুলিশ এ অপরাধটির তদন্ত করে? এর একচি সাধারন প্রক্রিয়া হলো-পুলিশকে নির্ধারণ করতে হয় যে কারা এটি সংঘটিত করেছে, তাদের কিভাবে ফৌজদারি বিচারের আওতায় আনা যাবে. কিন্তু পুলিশ কিভাবে এই অপরাধের তদন্ত কাজে এগুবে বা এ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারনা নিতে যা করা হয়-

-কর্মকর্তাদের অপরাধের ঘটনাস্থলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পাঠানো,
– কর্মকর্তাদের ফৌজদারি অপরাধ প্রমানের সামগ্রী সংগ্রহ, সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গ্রেফতার এবং তার পুলিশ স্টেশন বা স্থানীয় হাজত থেকে ত সরিয়ে নেয়া. পুলিশ বা তাদের কর্মীদের অপরাধের দৃশ্য ছাড়ার আগে, ছবি গ্রহণ এবং কোন বস্তু তারা প্রয়োজন মনে করলে প্রমাণের জন্য সংযুক্ত করা হয়, একটি সাইট তদন্ত করতে হয়. প্রায় সবই যারা এ দৃশ্য ছিল তাদের ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ, নাম এবং কোনো সম্ভাব্য সাক্ষী যোগাযোগের তথ্য, এবং কোন আইটেম যা তারা ঘটনাস্থল থেকে গ্রহণ সহ একটি রিপোর্ট লিখতে হয়.

অসমাধিত অপরাধের ক্ষেত্রে বিশেষ করে গুরুতর বা জটিল মামলায়, পুলিশের গোয়েন্দা শাখাকে মামলাটি ধার্য করা হয়. এরপর তদন্তকারীদের একটি দল পরিচালনা সন্দেহভাজনদের একটি তালিকা বিকাশ এবং প্রকৃত ফৌজদারি আসামীদের নাম প্রণয়ন. গোয়েন্দারা ফিঙ্গারপ্রিন্ট, রক্ত, অথবা লালা ঘটনাস্থলে পাওয়া নানা আলামত, ফরেনসিক প্রমাণ সংগ্রহ সহ বিশ্লেষণের জন্য ল্যাবসে পাঠাতে পারেন. একসঙ্গে টুকরো টুকরো কি কি ঘটনা ঘটেছে সাক্ষীদের সাথে এ নিয়ে কথা ও বলতে পারেন. সব সময়ে, পুলিশ ও তাদের কর্মীরা জায়েয অনুসন্ধান এবং জব্দের জন্য নিয়ম মেনে কাজ করেন বা করতে পারেন. এর মানে হল যে সাধারণভাবে, যদি পুলিশ কোন ব্যক্তিগত সম্পত্তি অনুসন্ধান করতে চান, তারা প্রথম ওয়ারেন্ট দেখান যে তারা অপরাধের সমাধানে বা প্রমাণে সাহায্য করবে এমন সম্ভাব্য কারণ আছে বিধায় এ অনুসন্ধানটি করবেন…

ঘটনা প্রবাহ: সদ্য পদোন্নতি পাওয়া পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রীকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা । গত ৫ই জুন, (রোববার) সকাল পৌনে ৭টার দিকে ছেলেকে স্কুলবাসে তুলে দিতে গিয়ে চট্টগ্রামে বাসার কাছেই খুন হন মাহমুদা খানম মিতু (৩২)। চট্টগ্রামে জঙ্গিবিরোধী বিভিন্ন অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া এ পুলিশ কর্মকর্তা ঘটনার সময় নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে ঢাকায় ছিলেন… নগরীর পাঁচলাইশ থানার এসআই ত্রিরতন অজ্ঞাতনামা চার-পাঁচজনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ ও সিসিটিভির ফুটেজ দেখে চট্টগ্রামের পুলিশ কর্মকর্তারা তদন্ত কাজ চালাচ্ছেন…

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান ঘটনার পর পর মন্তব্য করেন, পুলিশের মনোবল ভেঙে দিতেই জঙ্গিরা এ হামলা চালিয়েছে। বিভিন্ন সুত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনগুলো থেকে জানা গেছে, হত্যায় ৭ ভাড়াটে খুনি অংশ নিয়েছিল তাদের মধ্যে তিনজন সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয় এবং বাকিরা হত্যাকাণ্ডের সময় ঘটনাস্থলের আশপাশে অবস্থান গ্রহন করে। এছাড়াও অস্ত্র সরবরাহকারী হিসেবে একজন স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতার নাম উঠে এসেছে। মিতু হত্যাকাণ্ডে সন্দেহভাজন পাঁচজনের দেশ ছাড়ার উপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে পুলিশ। চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) পক্ষ থেকে এ নিষেধাজ্ঞা জারি করে বার্তা পাঠানো হয় বাংলাদেশের সব স্থল ও বিমানবন্দরে। পুলিশ বলছে, মিতু হত্যাকাণ্ডে এরা সরাসরি জড়িত ছিলো। যারা হলেন- মুসা, রাশেদ, নবী, শাজাহান ও কালু।

অথচ পুলিশের সোর্স মুসার স্ত্রী পান্না আক্তার দাবি মিতু হত্যার মূল সমন্বয়ক মুসাকে পুলিশ আটক করেছে এবং হত্যার মূল হোতাকে বাঁচাতেই হয়তো মুসাকে গুম করা হয়েছে।পুলিশ মুসাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে বলে দাবি করে আসছে, মুসার মুখোমুখি করতেই পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারকে সম্প্রতি গভীর রাতে পুলিশ তার ঢাকার শ্বশুরের বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল পরদিন ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে গণমাধ্যমকে জানান, মিতু হত্যার কয়েকজন আসামির মুখোমুখি করার জন্য বাবুল আক্তারকে আনা হয়েছে। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেননি ওই মোকাবেলাকৃত আসামিগনের মধ্যে কারা ছিল। ওই আসামিদের মধ্যে মুসা থাকার কথা সঙ্গত কারণেই মানুষ ধরে নিতে পারে। মুসাকে খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছে না পুলিশের এ দাবি এখনো বিশ্বাস করছে না মানুষ। সিএমপি কমিশনার ইকবাল বাহার ও ইত্তেফাককে বলেছেন, মিতু হত্যাকাণ্ডের ‘মূল জায়গা’ হলো মুসা।
পুলিশ সুপার বাবুল আক্তার স্ত্রীকে হত্যার পর নিজেই খুনের মামলাটির বাদী হয়েছেন। মামলার বাদী হিসেবে তদন্তের অগ্রগতি ও আনুষঙ্গিক ব্যাপারে তার দৃশ্যমান কিছু পদক্ষেপ থাকার কথা। কিন্তু দৃশ্যপট যেন পুরোপুরি উল্টো দিকে এগুচ্ছ। ১৫ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর থেকে পাল্টে যাচ্ছে পুরো পরিস্থিতি। মামলার বাদী নিজেই এখন সন্দেহের কাঠগড়ায়! মিতু হত্যার ব্যাপারে নানা জটিল প্রশ্ন উঠলেও পুলিশ বা সরকারের পক্ষ থেকে এখনও কোন তথ্যবহুল ও বস্থুনিষ্ট বক্তব্য দেওয়া হয়নি। ‘কঠিন’ সত্যকে সামনে আনাতে পুলিশ ও সরকারকে যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে আইনীভাবে জিজ্ঞাসাবাদ ও এর ফলাফল প্রকাশ করা উচিত। এই মামলায় মোটিভ স্পষ্ট করাসহ আসামিদের গ্রেফতারের সর্বাত্মক চেষ্টা করা উচিত।
বাবুল আক্তারের শ্বশুর মোশাররফ হোসেন এর দাবি, তদন্ত অন্যদিকে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। আমার মেয়ে হত্যার বিচার চাই। আমার মেয়ে কোনো চাকরি বা ব্যবসা করত না। কিন্তু পুলিশের তদন্তকারীরা হত্যাকান্ডের তদন্তে মূল জায়গা থেকে সরে যাচ্ছে বা এড়িয়ে যাচ্ছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ কামরুজ্জামান এর মতে, মিতু হত্যার ব্যাপারে তথ্য যাচাই-বাছাই করতে হলে বাবুলকে প্রয়োজন হলে তদন্ত সহায়ক টিম রয়েছে। তারাই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে….
চৌকষ পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আক্তারের বিরুদ্ধে আন্তঃ বিভাগীয় কিছুলোক ও একটি প্রভাবশালী মহল ষড়যন্ত্রে লিপ্ত বলেও সামাজিক মাধ্যমে কথা উঠেছে। মামলার তদন্তে ক্ষীপ্রতা ও অগ্রগতি দেখে এর জোড়ালো বিরোধিতা নেই। তবে সৎ, নিষ্ঠাবান পুলিশ কর্মকর্তারা কিভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হন এর নজির আছে। নজির আছে মামলার বাদি কিভাবে অভিযুক্ত ও সাজা প্রাপ্ত হন এরও।
একাত্তুরের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেয়া বীর পুলিশ কর্মকর্তা ভৈরবের তদানিন্তন ওসি কতুবুর রহমান স্বাধীনতাত্তোর এমনই কিছু ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করছেন। যিনি ভৈরব পাকবাহিনী দখলের পুর্বে ব্যাংক লুট করে সমস্ত টাকাপয়সা মুক্তিযোদ্ধা শহীদ নুরুকে নিয়ে অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারকে পৌছে দিয়েছিলেন।একজন সহযোদ্ধা হিসেবে তাকে অনেক কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিলো। ওসি কতুবুরের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অভিযোগ বঙ্গবন্ধু আমলে নেননি বরং তাকে আশির্বাদের ছায়াতলে নিয়ে পদোন্নতি দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর আশির্বাদ ও পৃষ্টপোষকতা পেতেন সৎ নিষ্ঠাবান কর্মচারী, কর্মকর্তাগণ।
আশির দশকে কুমিল্লার পুলিশ সুপার হয়ে আসেন মালিক খসরু, যিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা ও ধর্মপ্রাণ মানুষ ছিলেন। কুমিল্লা প্রেসক্লাব ও বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার সভাপতি হিসেবে বেশকবছর একসাথে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। বন্ধুত্বের প্রান্তিক সীমায় কবারই আমরা মিলিত হয়েছি কিন্তু তা ভেঙ্গে যায়নি কখনো। বরং দুইজনেই আমাদের পেশাদারিত্বকে তুলে ধরেছি। স্থানাভাবে শুধু দু‘টি ঘটনার কথা এখানে উল্লেখ করতে চাই। সে সময়ে কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলায় ট্রিপল মার্ডার (বারেক মেম্বার, তার স্ত্রী, গর্ভস্ত বাচ্ছাকে কুপিয় হত্যা )এর দৃশ্যমান ঘটনার অন্তরাল থেকে মূল হত্যা রহস্য উন্মোচন করি ও মুখোসধারীদের বিচারের আওতায় আনি শাস্তির ব্যবস্থা করি।

১৯৯২ সালে আমার বাবা কবি এম এ খালেক তার এক সহযোগি সহ কুমিল্লায় প্রকাশ্য দিবালোকে ছুরিকাহত হন তাদেরকে বাচাতে এসে স্থানীয় এক যুবক ঘটনাস্থলে মৃত্যু বরণ করে । ব্যবসায়ীমহল সহ কুমিল্লাবাসি এতে উত্তাল হয়ে উঠে এবং প্রতিবাদ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে সাড়া কুমিল্লা। আটচল্লিশ ঘন্টার মধ্যে খুনিদের পুলিশ গ্রেফতার করে বিচারের সন্মুক্ষীন করে এবং বিচারে তাদের যাবতজীবন করাবাস হয়।

পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আক্তারের স্ত্রী হত্যারহস্যের সাথে সরকারের ভাবমূর্তির বিষয়টি ও জড়িত । কারন নিছক ষড়য্ন্ত্র ও চক্রান্তের কারণে কোন নিরপরাধ মানুষ সাজা পাক এটা মুটে ও কাম্য নয়। এ সংকটে প্রধানমন্ত্রী’র বঙ্গবন্ধুর মতো কঠোরতা জরুরী । বাবুল আক্তার কোনভাবে এ হত্যাকাণ্ডের সাথে সংশ্ল্টি থাকলে যথাযথ আইনী প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিত।

ছবিতে: প্রেসক্লাব সভাপতি দেলোয়ার জাহিদ ও এসপি মালিক খসরু

লেখকঃ দেলোয়ার জাহিদ, সাবেক সভাপতি বাংলাদেশ হেরিটেজ সোসাইটি, সভাপতি, বাংলাদেশ প্রেসক্লাব এবং বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, কানাডা ইউনিট কমান্ডের অন্যতম নির্বাহী