ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

 
cp19 001
[ফাইল ছবি: স্পীকার শামসুল হুদা ও লেখক- তৎকালীন সাংবাদিক সমিতির সভাপতি সফিউদ্দিন কে ক্রেষ্ট হাতে তুলে দিচ্ছেন]

পঁয়ত্রিশ বছরের সাংবাদিকতা জীবনের সিংহভাগ সময় কেটেছে কুমিল্লায়। জীবনের কৈশোর ও যৌবন কেটেছে সমাজসেবায়। একাত্তোরের যুদ্ধের সময়টুকু কেটেছে ভারতের নরসিংঘর ও কাঠালিয়ায়। এবং রণাঙ্গনের গোলা বারুদের গন্ধ আর হত্যাযজ্ঞের ভীবৎস্যতার সময়টুকু কেটেছে ভৈরববাজার, বেলাবো, রায়পুরা, শিবপুর  ও নারায়নপুর মুক্তাঞ্চল এলাকায়। মহাত্মা গান্ধীর-আমার জীবন আমার বার্তা এ বাণী ভেবে দেখেছি আমার জীবনেও প্রযোজ্য হয়েছে। মানুষ মানুষের জন্যে, এ ভাবধারার প্রতি  গভীর শ্রদ্ধা  লালন করেছি এযাবতকাল। নেতিবাচক ধারার বিপরীতে চলায় আমার জীবনে গভীরভাবে দাগ কেটে আছে বেশকিছু ঘটনাবহুল সময়।

খুবই অল্প বয়সে সামাজিক স্বীকৃতি ও পরিচিতিকে কাজে লাগানো যায় বা যেত। এক- অর্থবিত্ত অর্জন, দুই -সন্মান অর্জন ও তা ধরে রাখা। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সংবাদপত্রে বিনিয়োগকে বিত্তবানদের জন্য এক আকর্ষণীয় মৃগয়া বলে আখ্যা দিয়েছিলেন এক সেমিনারে। সেই মৃগয়ার শিকারিগণ অনেক সময় আশুপ্রাপ্তি, চমকসৃষ্টি কিংবা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য ছাপার অক্ষরে কিছু প্রকাশ করে থাকে…তার মতে, ‘এখনো সম্পাদক বা প্রকাশকের একটি সরকারি বা সামাজিক স্বীকৃতি রয়েছে। এই সম্মানের আড়ালে তারা কার কী স্বার্থ উদ্ধার করছেন, তা খুব কম পাঠকের জানার সুযোগ হয়। নব্বইয়ের পর এ দেশের জাতীয় ও ছাত্ররাজনীতির এক বিরাট অংশ সন্ত্রাস ও দুর্বৃত্তায়নের পঙ্কে নিমজ্জিত হয়েছে…তাই আজ ঋণখেলাপি ও ভূমিদস্যু থেকে শুরু করে সামরিক, বেসামরিক নানা গোয়েন্দা সংস্থার অর্থসহায়তায় সংবাদপত্র প্রকাশনার অভিযোগ শোনা যায়…।

আশি এর দশকে আমার বাবা মরহুম কবি এম এ খালেকের পৃষ্টপোষকতায় সাপ্তাহিক সমাজকন্ঠ  প্রকাশ করি এবং তারই মাধ্যমে কুমিল্লায় সাংবাদিকতার জগতে আসা.সমাজকন্ঠের প্রকাশিত প্রথম সংখ্যায় প্রচলিত সাংবাদিকতার ধারাগুলো যেন উল্টে যায়। প্রবীন সাংবাদিক গোলাম মোস্তফা চৌধুরী, আধ্যাপক আবদুল ওহাব ও আফতাব ভাই ছুটে আসেন, আপনজন  হিসেবে আমায় সতর্ক করেন এবং মামলা মোকর্দমায় জড়িয়ে পড়ার নানা আশংকার কথাও ব্যক্ত করেন।

তখন স্পষ্টতই লক্ষ্য করি সাংবাদিকদের মধ্য বিভক্তি রয়েছে এবং এর সুযোগ নিচ্ছে প্রশাসন, রাজনৈতিক ও সামাজিক দুর্বৃত্তরা। মুক্ত সাংবাদিকতার দ্বার যেন রুদ্ধ, নিরাপত্তার অভাব পরিলক্ষিত হতে থাকে পদে পদে। দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করা যেন কঠিন হয়ে পড়ে। সাংবাদিকদের নিজের সদিচ্ছার কারণে এ নাজুক অবস্থা তা আমার কাছে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে থাকে। এ অবস্থায় সাংবাদিকদের জন্য শক্ত সাংগঠনিক ভিত গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি হতে থাকে।

কুমিল্লায় সাংবাদিকদের জন্য শক্ত একটি সাংগঠনিক ভিত গড়ে তোলার উপলব্ধি থেকে অনানুষ্ঠানিক ভাবে তৎসময়ে চলমান প্রেসক্লাবের কার্য্যক্রমে যোগ দেই। প্রবীন সাংবাদিক গোলাম মোস্তাফা চৌধুরী ও আমার উপর দায়িত্ব বর্তে প্রেসক্লাবকে পূনর্গঠনের। কুমিল্লা কান্দিরপাড়স্থ সিংহ প্রেসে  তখন আমরা নিয়মিত বসে এ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে থাকি।

আলোচনার প্রধান বিষয় ছিলো গঠনতন্ত্র প্রনয়ণ ও সদস্যপদ প্রদান।এবিষয়ে আমরা বেশ এগিয়ে ও যায়। কিন্তু আলোচনার ইতিটেনে একদিন মোস্তাফা ভাই জানান প্রবীনদের সাথে উনার কথা হয়েছে কাজেই প্রেসক্লাব যেভাবে আছে সেভাবেই চলবে। এ বিষয়টি আমি মেনে নিতে পারিনি। তখন স্পষ্ট বুঝতে পারি যে নবীনদের কোন সদস্যপদ দিতে এমনকি তাদেরকে সংবাদকর্মী হিসেবে মেনে নিতে ও উনারা নারাজ। কিন্তু ওই নবীনদের নিয়েই ছিলো আমার যত সব উদ্যোগ ও কর্মকাণ্ড।

মোস্তফা ভাইয়ের অনুরোধে ১৯৮৩ সালে সমাজকন্ঠের ঢাকা অফিস গুটিয়ে কুমিল্লায় চলে আসি । তিনি  তখন আমার মুহাম্মদপুরের বাসায় গিয়ে ছিলেন আমাকে কুমিল্লায় ফিরিয়ে আনতে এবং আমাকে নিয়ে তৎসময়ে কুমিল্লা মহিলা কলেজ স্থাপন করতে। কুমিল্লা মহিলা কলেজ স্থাপন করতে আমাদের শিক্ষক সংগ্রহ ও সাংগঠনিক ভিত তৈরী করতে হয় । ফরিদা বিদ্যালয়ের বারান্দায় একটি ভাঙ্গা চেয়ার ও টেবিল নিয়ে কলেজের কাজ শুরু করি। আমি ছিলাম শিক্ষক পর্ষদের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ও কলেজের ক্রান্তিকালীন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ। কুমিল্লা মহিলা কলেজের জন্য কয়েকজন মন্ত্রী ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশপত্র  সমূহ ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করে সংগ্রহ করে আনি। কুমিল্লা মহিলা কলেজের সাহায্যার্থে তৎসময়ে সমাজকন্ঠে একটি বিশেষ ক্রোড়পত্র  প্রকাশ করি। কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডে আমার  ঘনিষ্টজনেরা  তখন ইউনিয়নের ক্ষমতায়। এছাড়া তখন ৪টি শিক্ষাবোর্ডের  কারণিকদের অফিসার পদে পদায়নের জন্য তৎকালে আমি বোর্ড কর্মচারীদের অনেক সহায়তা করি এবং শিক্ষা সচিবের নিকট ব্যক্তিগতভাবে সাক্ষাতকরে বিষয়গুলোকে উপস্থাপন করি। দাবি-দাওয়া আদায়ে  শিক্ষাবোর্ড কর্মচারী এসোসিয়েশনের তৎকালীন সভাপতি  শামসুদ্দিন চৌধুরী, ফরিদ উদ্দিন, আয়েত আলী, শাহজাহান এবং আরো কয়জন বেশ তৎপর ছিলেন।

কুমিল্লা প্রেসক্লাবের পূনর্গঠন নিয়ে মোস্তফা ভাই তার অবস্থানে অনঢ় থাকেন। মোস্তফা ভাইয়ের হাত ধরে  শৈশবে কচিকাচার মেলায় গিয়েছি। কৈশোর থেকে উনার প্রিয়জনদের মধ্য হয়তো আমি ছিলাম  একজন। কাজেই উনার সিদ্ধান্তের বিরোধীতা করা আমার পক্ষে খুবই কঠিন ছিলো। যার কারনে সংঘাতের পথ এড়াতে এসোসিয়েট  প্রেসক্লাব নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলি এবং নানাবিধ কল্যানমূলক কাজ শুরু করি। প্রেসক্লাবের ধারনায় সেবা ও মানবাধিকারের চর্চা একটি অন্যতম বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

প্রেসক্লাবকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ, ও গণতন্ত্রায়নে ১৯৮৫ সালের ১৬ই অক্টোবর ৩টি আগ্রহী সাংবাদিক সংগঠনের এক যৌথ  সন্মেলনে পর্যায়ক্রমে সরকারী নিবন্ধন গ্রহন সহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া হয় । যতদূর মনে পড়ে ১৯৮৫ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত সব ক’টি নির্বাচনে আমি সভাপতি, অধ্যাপক আবদুস সামাদ কুমিল্লা প্রেসক্লাব এর সাধারন সম্পাদক পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন।

আমার সাথে সক্রিয় ভাবে যারা কুমিল্লা প্রেসক্লাবকে গড়ে তুলতে যারা কাজ করেছিলেন তাদের মধ্যে গোলাম মাহফুজ, নজরুল ইসলাম বাবুল, আবদুল আজিজ মাসুদ, খায়রুল আহসান মানিক, সৈয়দ নূরুর রহমান, মরহুম বদিউল আমিন দুলাল, আবুল কাশেম, আমিনুল হক, আলী আকবর মাসুম, শামীম আহসান, কুদরত-ই-খোদা, ওমর ফারুকী তাপস, রমিজ খান,শহীদউল্লাহ,ফিরোজ মিয়া,  জসিমউদ্দিন প্রমুখ।

কুমিল্লার সাংবাদিকতাকে অর্থবহ ও সমৃদ্ধ করে তুলতে বিভিন্ন উপজেলা থেকে এসে যোগ দিয়েছেন অনেকে সংবাদকর্মী.তাদের উৎসাহিত ও সংগঠিত করতে প্রতিটি উপজেলায় প্রেসক্লাব গঠন করা  ছিলো আমাদের অন্যতম প্রচেষ্টা। জেলা সদরের কুমিল্লা প্রেসক্লাবকে একটি প্রতিনিধিত্বশীল প্রেসক্লাব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করি। আমাদের প্রচেষ্টা ছিলো তরুন মেধাবী যুবকদের এ পেশার প্রতি আকৃষ্ট করা। কুমিল্লা প্রেসক্লাব ছিলো একটি সমন্বিত প্রচেষ্টার অংশ বিশেষ। সুখে দুঃখে জড়িয়ে ছিলাম আমরা। কুমিল্লা প্রেসক্লাব পূণর্গঠনকালীন সময়ে উল্লেখযোগ্য তেমন কোন অর্থকরি, বা সম্পদ ছিলো না। একতা, পারষ্পরিক বিশ্বাস এবং শ্রদ্ধাবোধই ছিলো আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ। একটি শক্ত  ভিত্তির উপর গড়ে উঠেছিলো কুমিল্লা প্রেসক্লাব।

কুমিল্লা প্রেসক্লাবকে নৈপথ্যে পৃষ্টপোষকতা করেছিলেন দৈনিক রূপসী বাংলার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক  মরহুম অধ্যাপক আবদুল ওহাব। তার এ পৃষ্টপোষকতা  নিঃসন্দেহে তৎসময়ে ছিলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও অর্থবহ। অগ্রজ মরহুম ফজলে রাব্বী, মরহুম আফতাবুর রহমান ও কাজী মমতাজ উদ্দিন, ও তরুন সাংবাদিকদের মধ্যে অধ্যাপক আলী হোসেন, প্রদীপ সিংহ রায়, রেজাউল করিম শামীম, অশোক বড়ুয়া, এডভোকেট মাহবুব ও আবুল হাসানাত বাবুল সহ ক’জন  ছিলেন পেশাদার। অবাক হওয়ার মতো বিষয় হলো এত যুদ্ধযুদ্ধ ভাবের মধ্যে ও আমরা একে অপরের বিপদে-আপদে ঝাপিয়ে পড়েছি । কিন্তু এর ব্যতিক্রমও হয়েছিলো একবার।
বিগত ১৬ই অক্টোবর ছিলো কুমিল্লা প্রেসক্লাব এর ৩২তম পুনর্গঠন বার্ষিকী। অনুজ শাহজাদা এমরানের অনুরোধে প্রবাসে শত ব্যস্ততার মাঝেও কুমিল্লায় সাংবাদিকতা, পেশাজীবী সংগঠন ও খেটে খাওয়া মানুষের মাঝে কাটানো সময়ের স্মৃতি রোমন্থন করার প্রয়াস। যেখানে জীবনের মূল্যবান অনেকটা সময় কেটেছে স্বাধীনতাপূর্ব ও স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে।

মহাত্মা গান্ধীর ‘আমার জীবন আমার বার্তা'(ম্যাই লাইফ ইজ ম্যাই মেসেজ) রবার্ট জে বুরোস এর একটি লেখা দ্বারা আমি বেশ অনুপ্রানিত হয়েছি। মনে হলো আমার জীবনসংগ্রাম, সফলতা, ব্যর্থতা ও সীমাবদ্ধতাগুলো থেকে এ প্রজন্মের সাংবাদিকেরা হয়তো একটি বার্তা পেতে পারেন। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ চুপচাপ গান্ধীর জীবনকে অবলোকন করে বিশ্বকে নির্মাণের ধারা অব্যাহত রাখেন জ্ঞাতে অজ্ঞাতে। মহাত্মা গান্ধীর নিকট বিশ্বের জন্য তার বার্তা চাওয়া হলে তিনি এ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন এবং তার সহিংসতার বিরুদ্ধে জীবনযাত্রার সংগ্রামকে প্রতিফলনের প্রতি ইঙ্গিত করেন। গান্ধীর জীবন থেকে নেয়া অনেক স্মরণীয় উদ্ধৃতি রয়েছে এর মধ্য যেটি খুবই কম পরিচিত তার মর্মার্থ্য হলো: ‘আপনি আপনার কর্মের ফলাফল জানবেন না… যদি আপনি কিছুই  না করেন…তবে তো ফলাফলই নেই।’

‘আমার জীবন আমার বার্তা’বিষয়বস্তুটি কোনো সমাধানে পৌঁছা বা আত্মতৃপ্তির জন্য নয়। এটি একটি অতীতভিত্তিক যাপিত-সমস্যা ও সমাধানের রসায়নসূত্র। আমার জীবনবোধ, দুঃখবোধ,ও সমাজের দৃশ্যকল্পগুলোর বিবেচনা রঙিন চশমা দিয়ে দেখলে অনুভব করা সত্যি কঠিন। আমি সাধারণ মানুষের কাতারে দাঁড়িয়েই তাদের দুঃখকাতরতাকে অনুভব করতে চেষ্টা করেছি। ৭১ এ হারিয়ে যাওয়া সুখগুলোকে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে আবারও খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করেছি।

কুমিল্লা প্রেসক্লাব এর অতীত সকল কার্য্যক্রমে একটি পরিশীলিত জলছাপ পাওয়া যাবে। কুমিল্লায় মানুষের সমাজকে গভীরভাবে আত্মস্থ করার এক অপূর্ব সুযোগ পেয়েছিলাম আমরা এর প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগাতে চেষ্টা করেছি। কুমিল্লায় কৃষক, শ্রমিক, ভুমিহীন মানুষ সুখের স্বল্পতায় ভোগেন দুঃখ-কাতরতায় তাইতো  ড আকতার হামিদ খান তার নিজ দৃষ্টিকোণ থেকে সমবায়ের মাধ্যমে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিকে মেরামত করতে চেষ্টা করেছেন। বার্ডের প্রতিষ্ঠাতার নামাবলি গায়ে জড়িয়ে অহংকার, অহমিকায় ভোগেননি কোনো দিন। নিজেকে এগিয়ে নিয়েছেন সাধারণের সঙ্গে সাধারণের মানুষের বিশেষ বিশেষণে। আমরা শুধু সেই চেতনার অতলকে মেলে ধরতে চেষ্টা করেছি কুমিল্লার মানুষের বিবেকের দরজায়। আমাদের কাফেলায় শ্রেণির যাঁতাকলে পিষ্ট না হয়ে অবিচ্ছিন্ন সমতা ও মমতার দ্বীপে দাঁড়িয়ে চারপাশের তরুনদের ডেকেছি। বিনিময়ে পেয়েছি প্রবাসে পাড়ি দেয়ার প্রাক্কালে  বিশুদ্ধ ভালোবাসা তাদের স্বচ্ছ বিশ্বস্ততায়।

সাংবাদিকতা পেশা কোন ব্যবসা, চাটুকারিতা বা ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার নয়, এ পেশা আমাদের রাজনৈতিকভাবে বিভাজিত হবার নয়, এ পেশার নিজস্ব কিছু ষ্পিরিট রয়েছে যারা একে ধারন করতে পারেন না তাদের জন্য এ পেশা নয়। কুমিল্লার অধিকাংশ সাংবাদিক মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা, তাদের সবার জীবনেই কম-বেশী অভাব, অনটন, দুঃখ, বেদনা ও দারিদ্রের ছোয়া রয়েছে এবং তা থাকাটাই স্বাভাবিক।  কুমিল্লা প্রেসক্লাবের ছত্রছায়ায়  গড়ে উঠা সাংবাদিক পরিবারের অভিবাবক হিসেবে সৎ, সাহসী ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের প্রয়োজন এবং সে প্রয়োজনকে সামনে রেখেই কুমিল্লা প্রেসক্লাবের নেতৃত্বকে কাজ করা উচিত। সময়ের প্রেক্ষাপটে তা খুবই তাৎপর্য্যপূর্ণ।

কুমিল্লা প্রেসক্লাবের নেতৃত্বে হবে নবীন-প্রবীনের মিলন মেলা,  হবে আদর্শিক একটি প্রতিষ্ঠান। ঢাকা, চট্রগ্রামের পরই  কুমিল্লা প্রেসক্লাবের নাম উঠে আসতো।  কুমিল্লা প্রেসক্লাবের কার্যক্রম ও পেশাদারীত্বের উল্লেখযোগ্য একটি কেন্দ্র ছিলো কুমিল্লা প্রেসক্লাব। তখন সোসাইটিস রেজিষ্ট্রশান এ্যাক্টের অধীনে নিবনন্ধন করে কুমিল্লা প্রেসক্লাবের শুধু আইনী ভিত্তিই তৈরী করা হয়নি বরং সারাদেশের প্রেসক্লাবগুলোকে সংগঠিত হতে ও অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। ঢাকা, চট্রগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, নোয়াখালী, ময়মনসিং, জামালপুর, রাঙ্গামাটি, গাইবান্ধা জেলা সদর সহ অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চলে ও সাংবাদিকদের ডাকে ছুটে গিয়েছি।

নানা কারনে কুমিল্লা প্রেসক্লাবের পূনর্গঠনের প্রচেষ্টাটি ছিলো বেশ দূরহ । তবে তরুনদের সাথে নিয়ে সে দূর্গম পথ ও পাড়ি দিতে পেরেছি। অনেক বাধা ও প্রতিকুলতা অতিক্রম করে পূনর্গঠিত করেছি কুমিল্লা প্রেসক্লাবকে। আজো কুমিল্লা প্রেসক্লাব সে ভিত্তির উপরই দাড়িয়ে। তাই সফলতার কৃতিত্বগুলো উৎসর্গ বা নিবেদন করবো সে তরুনদের যাদের নিয়ে এসব কাজ করেছি। তাদের অবদানগুলো কোন বিলবোর্ডে নয় বরং প্রতিটি সাংবাদিকের হৃদয়ে যেন গেথে থাকে। প্রত্যাশা করবো, যাদের সাহসী পদক্ষেপে কুমিল্লা প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা পেয়েছে তাদের নাম,পরিচতি রেজিষ্ট্রশান কর্তৃপক্ষ থেকে এনে তা ক্লাব সদস্যদের জন্য উন্মুক্ত করা হোক। মরহুম অধ্যাপক আবদুল ওহাব, মরহুম গোলাম মোস্তাফা চৌধুরী, মরহুম ফজলে রাব্বী, মরহুম আফতাবুর রহমান, মরহুম মোহাম্মদ উল্লাহ  কে  প্রেসক্লাবের জীর্ণ ফটো ফ্রেমে বন্দী করার পরিহাস বন্ধ করে প্রতিবছরই তাদের জন্ম, মৃত্য বার্ষিকী যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করা হউক।

সাংবাদিকতা পেশার উন্নয়নে তাদের নামে স্মারক বক্তৃতামালার আয়োজন করা হোক। ভিন্নমুখী প্রতিভাগুলো থেকে এ প্র্রজন্মের সাংবাদিকদের অনেক কিছুই শেখার আছে। স্নেহাস্পদ সাংবাদিক মরহুম বদিউল আমিন দুলাল ও মরহুম নওশাদ কবিরের স্মৃতিকে তুলে ধরা হোক…।সাংবাদিকতা পেশার উন্নয়নে সাংবাদিক-বুজুর্গদের নামে স্মারক বক্তৃতামালার আয়োজনের সুপারিশ করেছি যে কারনে তা হলো- বর্তমান প্রজন্মের সাংবাদিকদের এগুলো বস্তুনিষ্টভাবে বিশ্লেষণ ও অনুপ্র্রেরণার খোড়াক যোগাবে।জেলার প্রতিটি উপজেলায় কুমিল্লা প্রেসক্লাবের অতীত কার্যক্রম এর শেকর গ্রথিত ছিলো, প্রতিটি পেশাজিবী ও শ্রমজীবি মানুষের মিলনষ্থল ছিলো কুমিল্লা প্রেসক্লাব। অব্যবস্থাপনা ও দূর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাড়াতে, কুমিল্লার সাংবাদিকেরা ছিলো সদা সোচ্চার। এক অনন্য নজীর ও স্থাপন করেছিলো কুমিল্লা প্রেসক্লাবের সংগঠিত তরুন সাংবাদিকেরা;  ভবিষ্যতের জন্য এগুলো অনুকরনীয় কটি দৃষ্টান্ত হতে পারে. মানবাধিকার লংঘনের বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে সেবাদানের কটি ঘটনার কথা উল্লেখ করলাম যা সুযোগ পেলে ঘটনা ভিত্তিক বিস্তারিত লিখার আশা রয়েছে – যেমনঃ

নোয়াখালী জেলার কোম্পানীগন্জ উপজেলাধীন চরাঞ্চলগুলোতে জলোচ্ছাসের পর ত্রান বিতরন ও চরাঞ্চলের মানুষের হৃদয়স্পর্শী কতগুলো প্রতিবেদন প্রকাশ
·         দাউদকান্দি’র চরাঞ্চলে লাঠিয়ালদের আক্রমনে মিশে যাওয়া এক বিরান জনপদের কথা,
·         কুমিল্লা বিমানবন্দর এলাকার তৎকালে ১১ গ্রাম বাচাও আন্দোলন,
·         হালিমা সুতাকলের শ্রমিকদের দীর্ঘ আন্দোলন,
·         লাকসাম ও সদর দক্ষিন উপজেলার মাছের বাড়া অপসারন আন্দোলন নিস্পতিতে সক্রিয় ভুমিকা পালন,
·          কৃষকদের আন্দোলনে সহায়তা -ব্রাহ্মনপাড়া উপজেলার কৃষিঋণ কারচুপির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ,
·         কুয়েত প্রত্যাগত শ্রমিকদের পাওনা আদায়ে সহায়তা ও সফফলতা
·         নিয়মিতভাবে সংবাদপত্রে মানবাধিকার বিষয়ক ষ্টোরী প্রকাশ এবং
·         বুড়িচং এ বারেক মেম্বার সহ ট্রিপল মার্ডার, মুরাদনগরের রোকেয়া হত্যা, চৌদ্দগ্রাম কাজের মেয়ে হত্যা এমন কয়েকটি খুন ও বিচার ব্যবস্থায় চিহ্নিত দূর্নীতির বিরুদ্ধে ক্ষুরধার লিখনি…।

এমন অনেক কিছুই রয়েছে ভবিষ্যতে লেখার মতো।

কুমিল্লা প্রেসক্লাবের সাথে সহযোগিতার জন্য কুমিল্লায় সাংবাদিক ইউনিয়ন গঠন করি ও পেশাগত দায়িত্ব পালনে  সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ হতে সহায়তা করি। বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি, জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা স্থানীয় সাংবাদিকদের প্রতিনিধিত্ব করতো যেকোন পেশাগত  সমস্যায়। নিপীড়ন, নিগ্রহ,  বাধা, বিপত্তি ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে আমার সাথে একসময় রুখে দাড়িয়েছে তারা। সবাইকে ঐক্যের বন্ধনে বেধে ছিলো কুমিল্লা প্রেসক্লাবের নেতৃত্ব ।  এখন দেশের প্রায় সবগুলো গণমাধ্যমেরই কুমিল্লায় ষ্টাফ রিপোর্টার বা জেলা প্রতিনিধি রয়েছে। নবীনের জোয়ারএসেছে কুমিল্লার সাংবাদিকতায়. একশ্রেনীর শিক্ষিত, মার্জিত ও মেধাবী তরুণের সন্মিলন ঘটেছে এ সাংবাদিক পেশায়। কোন দল ও রাজনৈতিক মতাদর্শের উদ্ধে উঠে কাজ করার প্রচেষ্টা তাদের রয়েছে । অতীতের মতো সাংবাদিকতার বিকাশে গঠনমূলক ভূমিকা  রাখবে এ নবীনেরা।কুমিল্লা প্রেসক্লাবের মতো একটি প্রতিষ্ঠানই এ প্রয়োজন মেটাতে পারে। এতে গণতান্ত্রিক ও নির্লোভ নেতৃত্ব সৃষ্টি করতে হবে ।

 

মত ও পথের ভিন্নতা সত্বেও নীতি, নৈতিকতা, পেশাদারীত্বের প্রতি সন্মান প্রর্দশন করে বর্তমান প্রজন্মের সাংবাদিকদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে। সিটিজেন জার্নালিজমের পাদপীঠ কুমিল্লা প্রেসক্লাবে দলমতের উর্দ্ধে উঠে আবারো কাজ করবে এ প্রতাশা অমূলক নয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও ক্ষমতার অংশীদারিত্ব সৃষ্টি করতে নবীন-প্রবীনের নেতৃত্বের সমন্বয় অতীব প্রয়োজন।

 

(চলবে)

লেখকঃ  দেলোয়ার জাহিদ, সভাপতি, বাংলাদেশ প্রেসক্লাব অব আলবার্টা, কুমিল্লা প্রেসক্লাব ও কুমিল্লা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি।