ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

একজন মানুষ হিসেবে সাগর-রুনী’র হত্যাকাণ্ড আমাদের হৃদয়কে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। আমার বিশ্বাস সারা দেশে দলমত নির্বিশেষে সকল মানুষ এ হত্যাকাণ্ডে প্রচণ্ডভাবে বিক্ষুব্ধ ও মর্মাহত। পেশাদার সাংবাদিকদের কষ্টানুভুতি হয়তো আরো গভীর, এগুলো উপলব্ধি করার মতো সক্ষমতার অভাব অন্ততঃ বাংলাদেশে কারো না থাকার কথা নয়। সম্প্রতি কানাডায় এক মর্মান্তিক সড়ক দূর্ঘটনায় আমি আমার কনিষ্টপুত্র মাহিনুর জাহিদ (মাহিন) কে হারিয়েছি। সহযোদ্ধা ও সহকর্মীদের মাঝে দুঃসাহসী হিসাবে একদা পরিচিত মানুষ, সেই আমি ও আমার মৃত সন্তানের মুখটি পর্যন্ত দেখার সাহস অর্জন করতে পারিনি। দেশ ও বিদেশ থেকে অগণিত ফোনকলগুলো গ্রহন বা এর কোন জবাব ও দিতে পারিনি। সারা জীবনে নিজকে এতো অসহায় ও কাতর আর কখনোই মনে হয়নি।

স্বজন হারানো বেদনা’র উপলব্ধি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমার চেয়েও আরো অনেক গভীর, আরো অনেক মর্মান্তিক। সারা দেশের মানুষ একদা তার কষ্টের অংশীদার হয়েছে। তার স্বজন হত্যায় দায়ী খুনীদের বিচার করতে ও আইনের আওতায় আনতে দেশের প্রতিটি মানুষ তাদের সহানুভূতি জানিয়েছে। তিনি (প্রধানমন্ত্রী) ও জনতার আদালতে একদিন হাত তুলে বিচার চেয়েছেন, অশ্রু বিসর্জন করেছেন যেমনটি আজ করছে সাংবাদিক দম্পতি পুত্র মাহিন ও তার পরিবার।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে উদ্ধৃত করে ‘সরকারের পক্ষে কারো বেডরুম পাহারা দেওয়া সম্ভব নয়’ মর্মে যে খবরটি প্রকাশ পেয়েছিল তা খুবই সংবেদনশীল এবং কঠোর মনে হয়েছে। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতা-কর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করতে গিয়ে তিনি এ মন্তব্য করেছিলেন। সাবেক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আলতাফ হুসেনের ‘আল্লাহ’র মাল আল্লাহ নিয়েছেন’ এবং ‘দুই সাংবাদিককে নিজ ঘরে মারা হয়েছে। সরকারের পক্ষে কারও বেডরুম পাহারা দেওয়া সম্ভব নয়।’ এমনতর মন্তব্যের একটি সুদীর্ঘ তালিকা তৈরী করা যাবে যা আমাদের দেশের মন্ত্রী মহোদয় বা রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীরা বিভিন্ন সময় বলেছেন বা বলে থাকেন কিন্তু আমার উদ্দেশ্য তা নয়। নিঃসন্দেহে খবরটি প্রকাশ হওয়ার পর মানুষের মাঝে কিছু প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে যা যে কোন সংবাদপত্রের পাতা খুললেই বুঝা যায়।

৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই খুনিদের গ্রেপ্তার করার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী’র নির্দেশটি ব্যর্থ হওয়ার পর পরোক্ষভাবে আবারো প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়টি দেখছেন বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এ মন্তব্য মূলতঃ সরকার ও আওয়ামীলীগের জন্য ইতিমধ্যে একটি বিশাল রাজনৈতিক ঝুকি তৈরী করেছে। প্রধানমন্ত্রীর এধরনের বক্তব্যটির একটি ব্যাখ্যাদান এখনই জরুরী হয়ে পড়েছে বলে আমরা মনে করি।

দেশের মানুষের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়া খুবই স্বাভাবিক, যা রক্ষা করা সরকারের অবশ্যদায়িত্ব এবং কর্তব্য এবং যার ব্যতয় নিয়ে ক্ষীপ্ত হবার কোন সুযোগ নেই।

যেকোনো হত্যাকাণ্ড বা অপরাধ সংঘটনের পর খুনি বা অপরাধীরা দ্রুত ধরা পড়লে, অপরাধের সঠিক তদন্ত এবং এর প্রভাবমুক্ত বিচার হলে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড হয়তো ঘটত না। পুলিশের উপর চাপ প্রয়োগই একমাত্র অপরাধ দমন বা নির্মূলের উপায় বলে মনে করা কতটা সঙ্গত তা অবশ্যই পর্যালোচনার দাবি রাখে।

নৃশংসভাবে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের পর সবার মাঝেই একধরনের নিরাপত্তাহীনতার বোধ তৈরি হয়েছে তা প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকারের দৃঢ় অবস্থান ব্যাখ্যা করেই কেবল লাঘব করা যেতো, ক্ষিপ্ত হয়ে নয়। ইতিমধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনগণের মধ্যে যে হতাশার সৃষ্টি হয়েছে তা প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যে আরো বাড়বে বৈ কমবে না, কারন এ সরকারে প্রধানমন্ত্রীই জনগনের শেষ ভরসা।

সর্বাধিক আলোচিত এ বিষয়টির অন্তর্নিহিত আরো ক’টি বিষয়ের উপর আলোকপাত না করলেই নয় আর তা হলো যেকোন তদন্তাধীন ও বিচারাধীন বিষয়ে আমাদের দেশে বল্গাহীন ভাবে আগাম রাজনৈতিক বক্তব্য প্রদান এবং অসহিষ্ণু কথা বলার সংস্কৃতি, আর এ সংস্কৃতি থেকে বের হতে না পারলে আমাদের জাতিয় জীবনে কখনোই অগ্রগতি ও উন্নয়ন সম্ভব নয়। আগামী প্রজন্মের কথা ভেবে আমাদের এ রাজনৈতিক ধারায় আশু পরিবর্তন আনতে হবে এবং সাগর-রুনী’র হত্যাকাণ্ডের সুবিচার নিশ্চিত করতে হবে।

***
লেখকঃ দেলোয়ার জাহিদ, নোটারী পাবলিক অব সাস্কাচুয়ান, হিউমান রাইটস এডভোকেট, একজন সাংবাদিক, জাতীয় সংবাদপত্রে নিয়মিত প্রবন্ধ, ফিচার ও স্তম্ভ লেখক। কুমিল্লা প্রেসক্লাব ও কুমিল্লা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি, বর্তমানে কানাডা নিবাসী।