ক্যাটেগরিঃ প্রতিবন্ধী বিষয়ক

 

অটিজম বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অতীব গুরুত্বপূর্ণ একটি সামাজিক ইস্যু। এ ইস্যুতে প্রশংসনীয় কিছু কাজের উদ্যোক্তা প্রধানমন্ত্রী’র কন্যা সায়মা হোসেন পুতুল। এ রকম একটি জনকল্যানকর কাজের প্রচেষ্টার জন্য তাকে অনেক ধন্যবাদ। অটিজম নিয়ে আমাদের সমাজে সচেতনতা ও সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্তের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। তাই অটিজম আক্রান্তরা সমাজে চরমভাবে অবহেলিত ও সুবিধা বঞ্চিত। এ বঞ্চিত জনগোষ্টীর বিষয়ে প্রাথমিক কিছু ধারনা দিতে এ নিবন্ধের উপস্থাপনা।

অটিজম কি? এবং অটিজম’র কারণগুলো কি? অটিজম নিয়ে এ প্রশ্নগুলোর সহজ উত্তর খুজে পেলে বিষয়টি আরো অনেক স্বচ্ছ হবে। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় এ বিষয়ে অনেক কাজ ও গবেষনা রয়েছে।
অটিজম হল একধরনের জটিল বিকাশ প্রতিবন্ধকতা (Complex Developmental Disorder)। বিশেষজ্ঞদের মতে মানুষের জীবনের প্রথম তিন বছরে অটিজমের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। স্নায়ু বৈকল্যের প্রভাবে মস্তিস্কের নিয়মিত কাজগুলো যখন বাধাগ্রস্থ হয়, তখন ব্যক্তির অভিব্যক্তি ও ভাব প্রকাশে পারস্পরিক ক্রিয়াগুলো ক্ষতিগ্রস্থ হয়। অটিজম হচ্ছে মানুষের একধরনের অবাচনিক (Non-verbal) যোগাযোগ ইস্যু যা পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া প্রকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে থাকে।

অটিজম বর্ণালী বৈকল্য –এএসডি (Autism Spectrum Disorder) কে আমরা সাধারনভাবে একধরনের বিকাশ প্রতিবন্ধকতা বা Developmental Disorder বলে মনে করে থাকি যা নাকি মস্তিস্কের নিয়মিত কাজগুলোকে বাধাগ্রস্থ করে। এ কারনে এএসডি আক্রান্ত মানুষের ব্যবহারিক ও দৈনন্দিন জীবন একটু ব্যতিক্রমী। এ সামাজিক সমস্যাটিকে অগ্রভাগে চিহ্নিত করা প্রয়োজন।

যেহেতু সমাজের সংখ্যাগরিষ্ট জনগোষ্টীর আচার আচরণ থেকে এএসডি লোকদের আচার আচরণ ভিন্নতর তাই তাদের মধ্যে একধরনের মনস্তাত্মিক জটিলতা লক্ষ্য করা যায়। তাদের আচরণ, মন্তব্য ও প্রকাশভঙ্গি কখনো কখনো ব্যতিক্রমী হওয়ায় অন্যদের কাছে তা বিব্রতকর মনে হতে পারে। এএসডি লোকদের কার্য্যক্রম করলে দেখা যায় যে, তারা কখনো কখনো অন্যদের বিষয়ে পরোওয়া করে না এবং চোখাচোখি হতে চায় না।

বাংলাদেশের মত স্বল্পোন্নত একটি দেশে এ সমস্যাটিকে চিহ্নিত করার প্রাতিষ্ঠিনিক কোন উদ্যোগ ছিলো না। সম্প্রতি অস্টিক শিশুদের নিয়ে দেশের পাঁচটি মন্ত্রণালয় যৌথভাবে কাজ করছে বলে জানা গেছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার আইনের খসড়া ও তৈরি হয়েছে । তৈরি হচ্ছে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। তবে সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্তের অভাবে অটিস্টিক শিশুদের নিয়ে কাজগুলো কার্য্যত তেমন একটা এগুচ্ছে না বলে পর্যবেক্ষকদের ধারনা। বেসরকারী স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো’র লক্ষ্যনীয় কোন অংশগ্রহন নেই। নেই এবিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টির কার্য্যকর কোন প্রয়াস।

গ্লোবাল অটিজম পাবলিক হেলথ ইনিশিয়েটিভ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সম্প্রতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয় যে দেশের পাঁচটি মন্ত্রণালয় সমন্বিতভাবে কিছু কাজ করছে। চিকিৎসক ও কমিউনিটি পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা এবং পর্যায়ক্রমে কমিউনিটির সবাইকে এই কাজের সঙ্গে সম্পৃত্তা করার কথা ঘোষনা করা হয়েছে এ সংবাদ সম্মেলনে।

প্রথম আলো (২২-০৩-২০১২) অটিস্টিক শিশু চিহ্নিতকরণে সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে সায়মা হোসেন বলেন, ক্যানসারে আক্রান্ত একটি শিশুর চেয়েও অটিস্টিক শিশুদের শনাক্ত করার কাজটি কঠিন। তাই অটিজমে আক্রান্তদের চিহ্নিত করার আগে স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দরকার। যাঁরা কমিউনিটি পর্যায়ে কাজ করেন, তাঁদের শেখাতে হবে অটিজম কী এবং কীভাবে তা নির্ণয় করা যায়। তিনি আরও বলেন, দেশে অটিজমে আক্রান্তের সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান না থাকলেও ধীরে ধীরে এই বিষয়ে সচেতনতা গড়ে উঠছে। এ-সংক্রান্ত কাজ এগিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বয় জরুরি। সরকারি-বেসরকারি কাজের একটি সেতুবন্ধ গড়ে তোলাও দরকার। সমাজকল্যাণমন্ত্রী এনামুল হক মোস্তফা শহীদ বলেন, অভিভাবকেরা অটিস্টিক শিশুদের সামনে আনতে চান না বলে তাদের চিহ্নিত করা কঠিন। এ বিষয়ে জরিপ শুরু হয়েছে। অগ্রগতি সম্পর্কে বিএসএমএমইউর উপাচার্য প্রাণ গোপাল দত্ত বলেন, এ বিষয়ে ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে। তবে সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে হবে। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শিরীন শারমিন চৌধুরী, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব রনজিত বিশ্বাস, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি অলকা গুহ, যুক্তরাষ্ট্রের অটিজম বিশেষজ্ঞ মাইকেল রোজানোক প্রমুখ।
এএসডি লোকদের বিশেষ ধরনের শিক্ষাক্রম ও প্রশিক্ষনের আওতায় আনা দরকার। তারা অন্যসব মানুষের মতোই সুখ, দুঃখ, হাসিকান্না ও ভালবাসার উপলব্ধি নিয়ে বেড়ে উঠে তবে তা প্রকাশে কিছুটা ব্যতিক্রমতা থাকলে ও মানুষ হিসাবে তাদের অধিকার-মানবাধিকার একান্ত প্রাপ্য এবং তা আমাদের নিশ্চিত করতে হবে।

এ বঞ্চিত জনগোষ্টীর বিষয়ে আরো গবেষনা ও তৃণমূলে এ ধারনাগুলো পৌছে দিতে গণমাধ্যমের একান্ত সহযোগিতা প্রয়োজন।

লেখকঃ দেলোয়ার জাহিদ, রিসার্চ ফেলো, সেন্ট পলস কলেজ, ইউনিভার্সিটি অব ম্যানিটোবা। প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বাংলাদেশ মানবাধিকার ফাউন্ডেশান, কুমিল্লা, ৮০’র দশক থেকে তৃণমূলে মানবাধিকার সংগঠক, সাংবাদিক, আইন ও অধিকার বিষয়ক গবেষক। উপদেষ্টা, মাহিনুর জাহিদ মেমোরিয়েল ফাউন্ডেশান/কানাডা প্রবাসী।