ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 
বস্তুগত সাফল্য অর্জনে, আত্মার উন্নয়ন ঘটান এবং মানবিক উন্নয়ন ঘটাতে বইয়ের বিকল্প নেই

আত্মা এবং মানবিক উন্নয়ন ব্যতিত বস্তুগত সাফল্য অর্জন করা সম্ভব নয়। এই ক্ষেত্রে সবাগ্রে প্রয়োজন আত্মিক উন্নয়ন। আত্মিক শব্দটি আত্মার বিশেষণ। আত্মিক উন্নয়নের মাধ্যমে মানুষের মানবিক গুনাবলীর বিস্তৃতি ঘটিয়ে যে কোন সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করা সম্ভব। বিশ্বনন্দিত দার্শনিক মহাত্মা সক্রেটিস এর বিখ্যাত উক্তি’ Know thyself (নিজেকে জান)। আবার সংস্কৃত সাহিত্যে বলা হয়েছে’ আত্মা নাং বৃদ্ধি। অর্থাৎ সব উক্তির মাঝে একই বিষয় বস্তু, নিজেকে জানার মাধ্যদিয়ে আত্মোন্নতি ঘটান। আর এই সঠিক আত্মোস্বচেতন ব্যক্তি বা ব্যষ্ঠি সকল সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে বিচরণ করতে পারেন মানবতার সুউচ্চ শিখরে। Jhon keats এর চিরন্তন সেই বাণী, Beuty is Truth, Truth is Beuty (সত্যই সুন্দর, সুন্দরই সত্য)। এই সত্যের মাঝে সুন্দর সৌন্দর্য্যকে অবলোকন করতে গেলে প্রয়োজন সৌন্দর্য্য বোধ বা চেতনা। আর এ বোধ বা চেতনার অধিকারী সেই আত্মা, যে মানবিক সীমাবদ্ধতার উর্দ্ধে।

মানুষের সকল কর্ম প্রেরণার উৎস হচ্ছে হচ্ছে চাওয়া-পাওয়া। আর তাই সকল প্রকার চাওয়াকে পাওয়াতে পরিণত করতে প্রতি প্রত্যেকে নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বাস্তব মূখী কর্ম ক্ষেত্রে। সেই অভীষ্ঠ লক্ষ্যে পৌঁছাতে প্রথমে তাকে কল্পনার ডানায় ভর করে এবং তথ্য ও তত্ত্বগত দিক বিশ্লেষণ করে স্বীয় জ্ঞান দ্বারা পরিমার্জিত করে সুপরিকল্পিত ভাবে অগ্রযাত্রা করতে হয়।যে কোন কাঙ্খিত বিষয়ে সুগভীর ভাবে মনোনিবেশের মাধ্যমে এবং বারবার অনুশীলন ও কার্যকারিতার মাধ্যমে হয়ত বা স্বীয় লক্ষ্য স্থলে পৌঁছান যায় ঠিকই কিন্তু সেই চাওয়া এবং পাওয়ার মাঝে দূরত্ব ও তার বৈধতাকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য চাই জাগ্রত বিবেক। কেননা, পঞ্চ ইন্দ্রিয় আশ্রিত হৃদয়ের বেড়াজাল মানুষকে সঠিক পথে চলতে ও বলতে পূনঃ পূনঃ বাধাগ্রস্থ করে। জন্ম সূত্রে প্রাপ্ত মনের সংকীর্ণতা শুধু সাধারণ মানুষকে কেন, অনেক সময় মহাজনকেও বিপদগামী করে তোলে।

আজ সমাজ জীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় জীবনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করলে ভেসে ওঠে এক অনভিপ্রেৎ ও অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্যপট।এর মূলে রয়েছে পারিবারিক ও রাষ্ট্রীয় দর্শনের অভাব, যার কারনে একটা দেশ, জাতি বা গোষ্ঠী পরিণতিতে ধ্বংস প্রাপ্ত হতে পারে অতি অনায়াসে। কারণ সেখানে অনুপস্থিত রয়েছে আত্মচর্চা ও আত্মিক সমালোচনা এবং দলের গঠন মূলক অভ্যন্তরীন সমালোচনা। ব্যক্তি বা ব্যষ্ঠির সফলতা ও বিফলতার প্রকৃত নিয়ন্ত্রনের চাবিকাঠি হচ্ছে বিবেক। তাই বিবেককে সমুন্নত রাখার জন্য প্রয়োজন শুদ্ধ আত্মার। কর্ম যোগ, ফল যোগ যা কিছু করা হোক বা বলা হোক না কেন, সব কিছুই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে যদি না আত্মার উন্নতির মাধ্যমে বিবেককে সঠিক পথে পরিচালিত করা না যায়।

পবিত্র কোরআন শরীফে উল্লেখ আছে, ‚আশরাফুল মাকলুকাত“ অর্থাৎ, মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব।আর এই শ্রেষ্টত্ব অর্জন করতে গিয়ে তাকে অন্যান্য প্যাণী সকলের চেয়ে কিছু স্বাতন্ত্র গুণের অধিকারী হতে হয়েছে।কিছু অতিরিক্ত গুণ ও বৈশিষ্ঠের জন্য মানুষ জীব জগতে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে নিয়েছে। অন্যান্য প্রাণী থেকে মানুষের স্বাধীন চিন্তা-চেতনার শক্তি রয়েছে। এ কারনে হিতাহিত বোধটাও তাদের মাঝে সমুজ্জ্বল।

মানুষের গুণাবলীর মাঝে দান, দমন, দয়াই প্রধান। এই তিনটি গুনকে বিশ্লেষণ করলে হজার গুণের উন্মেশ পাওয়া যায়। মানুষের এই মানবিক গুণাবলীর বিকাশ ঘটাতে হলে তারও আগে প্রয়োজন আত্মিক উন্নয়ন। আত্মার উন্নয়নই আত্মিক উন্নয়ন। শ্রমদ্ভাগবাদ গীতায় উল্লেখ আছে, আত্মার তিনটি অবস্থা। সতঃ, রজঃ ও তমঃ।অর্থাৎ, তমঃ গুণাশ্রয়ী আত্মা, রজঃ গুণাশ্রয়ী আত্মা ও সতঃ বা স্বাত্ত্বিক গুণাশ্রয়ী আত্মা। সৃষ্টির আদি ভাগে মানুষ যখন শাখা বাসী বা গুহা বাসী ছিলো, যখন তারা ভলোও কি? মন্দোও বা কি? তাও তারা জানত না; শুধু মাত্র নিজেদের প্রবৃত্তির তাড়নায় অগ্রভোগী বা এগিয়ে যাওয়াই ছিলো তাদের উদ্দেশ্য। তখন তাদের হৃদয় ছিলো তমশাবৃত্ত্ব। তারা মানব মাতৃ-ভোগিনী যোনী ও মানবেতর যোনী বিভেদ করত না। তখন তাদের আত্মা ছিলো তমগুনাশ্রয়ী।

এরপর প্রবাহমান কালের স্রোতে দীর্ঘ পথ পরিক্রমার পর মানুষের মাঝে এলো বিবেক। সে মানুষকে অঙ্গুলী নির্দেশ করে দেখিয়ে দিতে লাগল কোনটা ভালো, কোনটা মন্দো, কোনটা সৎ, কোনটা অসৎ, কোনটা উচিৎ, কোনটা অনুচিৎ। ভালো-মন্দের টানাপোড়েনে যখন তারা দুলছে, তখন তাদের মধ্যে এসে দেখাদিল অহংমত্ততা। আর এই অহংমত্ততার প্রভাবেই সৃষ্টি হলো বীরভোগ্যা বসুন্দরা। অর্থাৎ, মারো, কাটো, লোটো, খাও। প্রসঙ্গতঃ বর্তমান বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায় স্ন্ত্রাস ও বিছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর ধ্বংসাত্তক কার্য কলাপ। সৃষ্টির সেরা জীব হিসাবে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে হলে অহম্ অহং দূর করে, দান-দমন-দয়ার মতো গুণাবলীকে নিজেদের পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রিক ও বিশ্ব জীবনে চারিয়ে নিয়ে অর্জন করতে হবে; অসুরত্ত্ব-দেবত্ত্ব অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ সম্পদ মনুষ্যত্বকে। এই মানুষই মানুষকে পণ্য করে, এই মনোভাব সমাজ থেকে সমূলে উৎপাটন করে; সেখানে ‚মানুষ মানুষের জন্য“ বেদীটি প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। আর এই বেদীমূলে দাঁড়িয়ে শান্তির নোবেল পুরস্কারের মালাটি পরে নিলেন, জিমি র্কাটার, মাদার তেরেসার ন্যায় আরও অনেক সুগন্ধী পূস্প সমতুল মানবতাবাদী মহাত্মাশ্রয়ী। তাঁরা হয়ে উঠুক আমাদের আদর্শ।

পূর্বে বলেছি, মানুষের সকল কর্ম প্রেরণার উৎস হচ্ছে চাওয়া-পাওয়া। চাওয়ার সঙ্গে পাওয়ার যখন সামঞ্জস্য বিধান করে তখন তাকে বলে সাফল্য। মানুষের সকল চাওয়া পাওয়ায় পরিণত হয় তখন তা হয়ে দাঁড়ায় বাস্তব। আর এই বাস্তব চাওয়া-পাওয়াই বস্তুগত। মানুষের চাওয়া যখন হয় জীব ও জগতের কল্যাণ কর, তখন তা হয় শাশ্বত চাওয়া। প্রসঙ্গতঃ মহাত্মা আলফ্রেড বার্নাড নোবেল চেয়েছিলেন তাঁর গবেষণা লব্দ সৃষ্টি হবে মানুষের কল্যাণ কর। কিন্তু তিনি আবিষ্কার করলেন সৃষ্টি বিধ্বংসী ডিনামাইট।তাঁর সাত্বিক গুণাশ্রয়ী আত্মা বাঁধ মানল না। তিনি ডিনামাইট বিক্রয় লব্দ অর্থ দিয়ে মানুষের পার্থিব বস্তুগত সাফল্যের উপর কল্যাণ জনক বিষয়ের শ্রেষ্ঠ কৃতিত্ত্বের জন্য ঘোষণা করলেন নোবেল পুরস্কার। তিনি এই নশ্বর পৃথিবীতে মরেও হলেন অমর।

সৎ চিন্তা, সৎ ধ্যান, সৎ সংসর্গ প্রভৃতি মানবিক গুণাবলীর সংমিশ্রন কারু হৃদয়ে একবার কেন্দ্রীভূত হলে, সে পারে অসাধ্যকে সাধন করতে, অজেয়কে জয় করতে। ক্ষয়িষ্ণু হৃদয়ের সংস্কারের জন্য প্রয়োজন স্থায়ী অকুতভয় সার্ব্বজনীন মানবতাবাদী সৎ চরিত্র। মানুষের চাহিদা- অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসার মত বস্তু গত মৌলিক চাওয়া গুলি যখন পাওয়ায় পরিণত হয়, তখনই আসে সমাজে-রাষ্ট্রে বস্তু গত সাফল্য। এই বস্তু গত সাফল্য অর্জন করতে চাই জ্ঞান। আর এই জ্ঞান অর্জনের জন্য চাই জ্ঞানানুশীলন। এই জ্ঞানানুশীলনের জন্য প্রয়েজন মহাত্মা মনীষী ও মহজনদের সঙ্গ বা সাহচর্য লাভ। একক ব্যক্তির পক্ষে বহু গুণী জনের সঙ্গ লাভ করা সম্ভব হয় না। সে ক্ষেত্রে প্রয়োজন জ্ঞাণী ও গুণী জনদের চিন্তা-চেতনা প্রসূত অসীম জ্ঞানভাণ্ডার বইয়ের। মহা জ্ঞানসমুদ্রের শত বছরের কল্ললকে কাগজ-কালির শৃঙ্খলে আটকে রাখা যায় বই মাধ্যমে। বই মানুষকে বাঁচতে শেখায়। বই মানুষের মানষিক ও আত্মিক উন্নয়ন ঘটায়। বই মানুষের আত্মিক ও মানবীয় উন্নয়নের মাধ্যমে বস্তু গত সাফল্য এনে দেয়। মহাত্মাশ্রয়ী ওমরখৈয়া এর ভাষায়,-

‘রুটি-মদ ফুরিয়ে যাবে
প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হবে
কিন্তু এক খানা বই অনন্ত যৌবনা
যদি তেমন বই হয়।’

এছাড়া পবিত্র হাদিসে উল্লেখ আছে, ‚আল্ ইল্ মু নুরুন, আজ্জাহালু জুলমুন “ অর্থাৎ, বিদ্যা স্বর্গীয় জ্যোতি বা আলোক স্বরুপ এবং মূর্খতা অন্ধোকার স্বরুপ।

মানুষের মননশীলতা থেকে জন্ম লাভ করে মানবীয় গুণাবলী। এই গুণাবলীর বিকাশ ঘটাতে ও তার উৎকর্ষ সাধনের জন্য প্রয়োজন এমন মাধ্যম যা পারে ব্যক্তিকে একক ভাবে সার্বক্ষনিক সঙ্গ দিতে। এ ক্ষেত্রে বোধ করি বই ই পারে সেই শূণ্যতাকে পূরণ করে নব দিক উন্মোচন করতে। কারণ বই হাজার হাজার বছর ধরে লাখ লাখ মানুষের অর্জিত জ্ঞানকে সঞ্চয় করে রাখে। বই এর হাত ধরে আসে অনাগত ভবিষ্যতের নব্য প্রগতির অসাধারণ মানব শিল্প। তাই জ্ঞান সমুদ্রে অবগাহন করলে হৃদয়ের সকল বর্জ পদার্থ দূরীভূত হয়ে দূলর্ভ মানব জনমকে সুন্দর ও স্বাথর্ক করে তুলে অমৃতের সন্ধান দিতে পারে। মানব জনম নিয়েই শুরু হয় তার জানার। তবে বই যদি পেছনের এক একটা অভিজ্ঞতাকে ধরে না রাখত, তাহলে সমগ্র জীবনই দিতে হতো এ জ্ঞান অর্জনে। কিন্তু বই মানুষকে একটা দীর্ঘ সময়ের ধারনাকে অতি সংক্ষিপ্ততার মধ্যে বোধগম্য করিয়ে, এক একটা প্রজন্মের জ্ঞানের পরিধিকে এগিয়ে নিতে অহরহ কাজ করে যাচ্ছে। বই এর মাধ্যমে মানুষ পেছনের জীবনযাত্রার ভালো-মন্দো দিকটি জানতে সক্ষম হচ্ছে। ফলে এক মাত্র বই মানুষের মধ্যে সত্যাশ্রয়ী আত্মা ও মানবতা বোধের উন্মেশ ঘটাচ্ছে। আত্মার উন্নতি না ঘটলে সমগ্র জগতটাকে প্রসারিত দৃষ্টির আওতায় নিয়ে সঠিক ভাবে দেখা সম্ভব নয়। এক মাত্র আত্মিক ও মানবিক উন্নয়নের ফলেই পার্থিব জগতে বস্তু গত ভাবে মানুষ মানুষকে কিছু দিতে পারে। মানুষের কল্যানে তার জন্য কিছু করা সম্ভব হয়।

পরিশেষে পবিত্র কোরআন শরিফের প্রথম আয়াতটি উল্লেখ করা যেতে পারে, ‚ইকরা বিইছমি রাব্বি কালাজি খালাক…. “ অর্থাৎ পড়ো তোমার প্রভুর নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং বই বস্তুগত সাফল্য ও মানবীয় গুনাবলী বিকাশের যে কোন মাধ্যম অপেক্ষা শ্রেয়, এ কথা অনিস্বীকার্য।

29.03.2015
dipeshroy@gmail.com