ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

পহেলা বৈশাখ নিয়ে কিছুদিন ধরে যা হচ্ছে তা দেখছি! হাত খুঁতখুঁত করছিলো কিছু লিখবো বলে। তবে ধর্ম অনেক স্পর্শকাতর একটা বিষয়। বছরের পর বছর শেষ হলেও এর তর্ক শেষ হবে না। যার যার বিশ্বাস তার তার কাছে। তাও সহজভাবে যা দেখি তা লিখছি।

দেখুন একটা বিষয়, আমি উড়িষ্যার হিন্দু কাওকে কখনও আমার মুসলিম রুমমেট অথবা ফ্রেন্ডস, ফেমিলির দিক দিয়ে ভালো সম্পর্কের- এদের চাইতে বেশি আপন ভাবতে পারি না। আবার আমরা জাতিগত ভাবে বাঙালি… উড়িষ্যার হিন্দুটি ধর্মের দিক থেকে আমার সাথে মিল সম্পন্ন হলেও আত্মিক সম্পর্কের দিক থেকে মুসলিম মানুষগুলোই আমার প্রিয় মানুষ। উড়িষ্যার হিন্দুটি আমার কাছে ঠিক তেমনই যেমনটা আমার কাছে একজন ইংরেজ, একজন জার্মান ব্লা ব্লা..। আশা করি আপনার কাছেও তাই অথবা নাও হতে পারে। কারণ আমি বিধর্মী আর ভিনদেশি মুসলমান বা ধরুন আরবীয়রা বেশি আপন হেতুঃ সাচ্চা মুসলমান! দেখুন অনেক দেশেই বা অনেক সম্প্রদায়েই অনেক অনুষ্ঠান দেখা যায় যা বর্তমান প্রেক্ষিতে আজব, অদ্ভুত। তাও তারা নিজেদের সংস্কৃতি ধরে রেখে এগিয়ে চলেছে। ‘আমরা জাতিগত ভাবে আগে বাঙালি তারপর আমরা যে যার ধর্মের’- এই কথার সাথে আপনি একমত না-ও হতে পারেন বলতেই পারেন আরে কিসের বাঙালি ফাঙালি আগে মুসলিম আমি!

কত সাধের পহেলা বৈশাখ আমাদের বলুন! সর্ববৃহৎ জাতীয় অনুষ্ঠান আমাদের। ধর্ম আমাদের সংকীর্ণ নয় উদার হতে শেখায়। আপনার নিয়ত আপনি ঠিক রাখুন বাহ্যিকতায় কিছুই আসে যায় না। কি হাস্যকর একটু আগেই দেখলাম লাল সাদা রঙ নিয়েও আপত্তি! লাল সাদা নাকি শাঁখাসিঁদুরের রঙ তাই! কতিপয় গোষ্ঠী ধর্মপ্রাণ সাধারণ মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে এসব ভাঙ্গনের সৃষ্টি করছে। কারণ ধর্ম মানুষের কাছে সেই পর্যায়ের এক বিশ্বাস… একবার মগজে ঢুকিয়ে দিতে পারলেই কাজ হয়ে গেলো।

কতটা সেন্সিটিভ হয় ধর্ম তার একটা উদাহরণ দিই:- হাইস্কুলে থাকাকালীন একটা সংগঠন প্রতিষ্ঠার কথা ক্লাসে উত্থাপন করেছিলাম। সবাই রাজী। ভোটাভোটির মাধ্যমে বিভিন্ন পদ ভাগ করা হবে সিদ্ধান্ত হল। হাইস্কুল জীবনে পড়ালেখার প্রতিদ্বন্দ্বী আমার এক ফ্রেন্ড সে মুসলিম, আরেকজন ফ্রেন্ড মার্মা, আর আমি সভাপতি পদে দাড়ালাম। মুসলিম ফ্রেন্ডটা সবার কাছে ভোট চাইলো এভাবে “ভাই তুইও মুসলিম আমিও মুসলিম তাই ভোটটা কিন্তু আমাকেই দিবি”। সারাদিন আমার সাথে থাকত আমার এক মুসলিম ফ্রেন্ড যাকে পড়ালেখায় হোক বা যেকোন কিছুতে আমি সবার আগে হেল্প করতাম এবং আমরা খুব ভালো বন্ধু ছিলাম সেও আমাকে ভোট দেয় নাই বিশ্বাস করেন। ভোট তো গোপনে দেওয়া হয় তাও জানলাম কিভাবে শোনেন। আমি ভোট পেয়েছিলাম মাত্র দুইটা তার একটা আমার আরেকটা একটা মুসলিম মেয়ে ফ্রেন্ডের যে কিনা আমাকে দেখায়েই ভোটটা দিয়েছিলো। পরে ওই মুসলিম আপন ফ্রেন্ড অনেক সরি টরি বলল। ভাবুন। এটা স্বল্প পরিসরের একটা ঘটনা। একই প্রেক্ষাপটের কত বিশাল বিশাল ঘটনা প্রতিমুহূর্তে আমাদের দেশে ঘটে যাচ্ছে তা কি বলার অপেক্ষা রাখে? ধর্ম অনেক পবিত্র একটা অনুভূতি যেটাকে ব্যাবহার করা হচ্ছে সবক্ষেত্রেই।

আমার লেখার প্রথমদিকেই ছিলো যে, একজন মানুষকে ধর্মীয় পরিচয়ে না দেখে মানুষ পরিচয়ে দেখার কথা। এটা নিয়ে আরেকটা ঘটনার সম্মুখীন হয়েছিলাম তা বলছিঃ

আমরা ফ্রেন্ডরা মিলে কত মজা করি কত গোপন ঘটনা জানি একে অপরের। তেমনই মজা করে আমরা দুইজন মিলে একটা ফ্রেন্ডকে পঁচাচ্ছিলাম। হঠাৎই যাকে পঁচাচ্ছিলাম সে অন্য ফ্রেন্ডটাকে বলে উঠলো “দেখ ভাই একজন মুসলমান আরেকজন মুসলমানের জিহ্বা থেকে মুক্ত” তারপর সে আর আমার সাথে নাই! ফ্রেন্ডশিপে ধর্মের ব্যবহার! এসবই সত্যি ঘটনা চাইলে তাদের নাম বা ট্যাগাতে পারতাম কি দরকার নিজেরা পড়ে নিজেরা লজ্জা পাক বা মানসিকতা চেঞ্জ না হলে গর্বিত হোক!

এই ঘটনা গুলো ভিন্ন দিক দিয়েও দেখতে পারেন।

আমার বেশিরভাগ ফ্রেন্ডই মুসলিম- কই তারা তো অনেক ভালো (চরমপন্থি কয়েকজনকে বাদ দিলে আর এখন আমি খারাপ কাওকেই দেখি না হয়ত এখন পজিটিভিটি বেশি কাজ করে)। সত্যি বলতে আমি ভালো ফ্রেন্ডদের কথা চিন্তা করলে এই স্ট্যাটাস লিখতেই পারতাম না। এটা লেখার সময় আমার একেকজন ফ্রেন্ডের চেহারা চোখের সামনে ভাসছিলো। আচ্ছা আমার ধর্ম নিয়ে যখন চরমপন্থী ফ্রেন্ডরা লিখে তখন কি আমার চেহারা তাদের চোখে ভাসে? খুব জানতে ইচ্ছে করে।

ফেসবুকে পহেলা বৈশাখ নিয়ে ওই ইভেন্টে কিছু বাজে পোস্ট দেখে স্ট্যাটাসটি লিখলাম। ফেসবুকে এরকম বিকৃত মানসিকতার আরো নিদর্শন অতীতে পেয়েছি যেমনঃ নেপালে যখন ভূমিকম্প হল এবং শতশত মানুষ মারা গেলো তখন সেই দিকভ্রান্তরা আনন্দিত হল এবং বেশকয়েক স্ট্যাটাসই শেয়ার করা বা আমার ফেসবুক ফ্রেন্ডদেরই লেখা থিমটা অনেকটা এরকম – কাফিরদের দেশে আল্লাহর গজব পড়েছে তাই তারা খুশি হয়েছে। কতটা বিকৃত মানসিকতা চিন্তা করে দেখুন! আর হজ্বে মক্কায় মিনা ট্রাজেডিতে মানুষ মারা গেলো তখন- আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয়েছে তাদের উপর। এটা একসেন্সে মতবিশ্বাস হতেই পারে এতে আমার কোন অভিযোগ নেই তবে লক্ষ্য করুন বিধর্মীকেও কিন্তু খুশি হয়েছে টাইপ কোন স্ট্যাটাস দেয় নি। কারো মৃত্যু খুশির কারণ হতে পারে না। গাজায় যখন ইসরায়েলি গনহত্যার জন্য হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে সবাই স্ট্যাটাস দিচ্ছিলো তখন আমিও দিয়েছিলাম আমার মনে আছে। আমি যেমন আচরণ দেখাই তেমন আচরণ কেন আমি পাই না? আমি যেকোন ধরনের রক্তারক্তির বিরুদ্ধে। এজন্য আমি ফাঁসিরও বিরোধী।

আমরা বিভিন্নজন বিভিন্ন ধর্মে বিশ্বাসী তাই বলে কোন নাস্তিককে খুন করা হলে আমরা উল্লসিত হলাম এটা আমাদের ধার্মিকতার লক্ষণ না। আর নাস্তিক আস্তিক ব্যাপারে কোন মানুষ সিদ্ধান্ত দিতে পারে না। মহান সৃষ্টিকর্তাই ভালো জানেন কে আস্তিক আর কে নাস্তিক।

আগেই বলেছি কতিপয় গোষ্ঠী স্বার্থ হাসিলের জন্য এসব অপতৎপরতা চালাচ্ছে এবং এমন একটা শব্দ মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছে যে এখন আমরা মুক্তমনা আর নাস্তিকতা দুটোকে এক ভাবি! দেখুন বাংলা বা এই ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে হিন্দু-মুসলিমকে কখনও আলাদা করা যাবে না… আমরা সবাই সবার সাথে আত্মার বাঁধনে যুক্ত। একটু আগেই প্রথম আলোর একটা নিউজ ছিলো ‘ভারতের কেরালায় মন্দিরে আগুন; নিহত ৮০” আমারই বাবার এককালের একজন প্রাইভেট স্টুডেন্ট এখন ভালো অবস্থানে আছে উনি সেটা শেয়ার করে লিখলো ‘এভাবেই শেষ হয়ে যাক রেন্ডিয়ানরা’। এটা একটা বিকৃত মস্তিষ্কপ্রসূত ঘটনা। তাই বলে আমি সমস্ত মুসলিমের উপর এই দোষ চাপাতে পারি না। এই যে বিদ্বেষ মনে এটাকে এখনই লাগাম দিয়ে বেঁধে ফেলা উচিত। এই বাংলায় হিন্দু মুসলিমের মধ্যে অনেক সম্পর্ক বিদ্যমান। আমার তো প্রিয় শিক্ষকই একজন মুসলিম স্যার। উনার মুখে হিংসাত্মক কোন কথা আমি শুনিনি বরং মুসলিম ছাত্রদের ছাপিয়ে আমিই উনার প্রিয় ছাত্র ছিলাম। ছাত্র-শিক্ষকের মত শত শত পবিত্র সম্পর্ক রয়েছে এই বাংলায়।

ভিন্ন ধর্মে আঘাতের আগে একবার ওই ভিন্ন ধর্মের প্রিয় মানুষটির কথা চিন্তা করুন এবং ভাবুন যে উনি আপনার এই আঘাত সহ্য করতে পারবেন কি না। এরপর দেখুন আপনার আর সেই আঘাত করার ইচ্ছা থাকে কি না। বললাম তো হিন্দু-মুসলিম এই অঞ্চলের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ধর্মান্ধতার কারণে আমরা যে পিছিয়ে পড়ছি তা কিন্তু স্পষ্ট। আমার এ উদাত্ত আহ্বান ভাঙনের নয়; মিলনের। কোন একটা নির্দিষ্ট ব্যাক্তি বা গোষ্ঠীর সম্পর্কে আপনার ব্যাক্তিগত ক্ষোভ থাকতেই পারে তাই বলে পুরা ধর্মকে নিয়ে গালিগালাজ করা ঠিক নয়। আমি হিন্দু বা ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী। আমি আমার ধর্ম ঠিকমত পালন করছি না তাই আমাকে দোষ দিন আমার ধর্মকে নয়। পবিত্র ধর্মকে অপবিত্র করবেন না। ব্যাক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থ হাসিলের জন্য ধর্মকে ব্যবহার করবেন না। আমাদের কে সৃষ্টিকর্তা সবকিছুই দিয়ে পাঠিয়েছেন। যা আছে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে তা আছে আমার দেহ ভান্ডে। বিবেককে আমরা বিচারের প্রথম মানদণ্ড করতে পারি না? কিছু একটা করার আগে আমাদের অবশ্যই একবার ভাবা উচিত এটা করলে উপকার হবে নাকি অপকার বেশি হবে… আমরা সবাই এক… একই ইশ্বরের সৃষ্টি।