ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

“অবুঝ শিশুটির নেই কোন বড়মাপের চিন্তাভাবনা, সবেমাত্র জগৎটাকে দেখতে শিখছে; থাকে মায়ের নিবিড় তত্ত্বাবধানে। কত স্নেহমমতায় বেড়ে উঠছে সে। মায়েরও কত চিন্তা তাঁর কলিজার টুকরাটাকে নিয়ে। কিভাবে তাকে সুরক্ষিত রাখবেন এ নিয়ে সদা চিন্তিত। একমুহুর্ত চোখের আড়াল হতে দেন না তাকে। শিশুটি সবকিছু জিহ্বা লাগিয়ে পরখ করে, জিহ্বা দিয়েই যেন এই পৃথিবীটাকে চেনার এক প্রয়াস। আর মা আছেন সদা প্রস্তুত;  এটা-ওটা মুখে দিলেই বকা-ঝকা আর তা হাতের নাগাল থেকে সরিয়ে রাখা নিয়ে। এই আদরমাখা খুনসুটিতেই কেটে যায় এক একটি বছর! একসময় আবছা আবছা কথা বলা শিখে যায় শিশুটি। মায়ের যেন অনেকটা দায়িত্ব ঘাড় থেকে নামে। এতদিন এটা-ওটা মুখে দিলে বা আগুন সামনে পেলে হাত দিতে গেলে যে বকা বা চোখমুখ গরম করে ধমক দিত তার থোড়াই যদি সে বুঝত! শিশুটিরই বা কি দোষ আগুন কি সুন্দর একটা জিনিস দেখতে অনেক উজ্জ্বল আর একটু কাছে গেলে গরম গরম লাগে!যাই হোক এসব ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা থেকে রেহাই পেতে সার্বক্ষণিক যে সাথে সাথে থাকতে হত মাকে এখন আর তা লাগবে না।

01 mom and child (www.cute-pictures.blogspot.com)
কথা বলতে শিখেছে মানে এখন মা তাঁর আদরের ছেলেকে বোঝাতে পারবে   “বাবা, আগুন ধরে না, আগুন ধরলে পুড়ে যাবে এবং অনেক ব্যাথা পাবে”।   কিন্তু না এটা বললে কাজ হবে না ছেলেটা দিন দিন বড্ড বেয়াড়া হচ্ছে। আবার এদিকে সে কিভাবে যেন ভুতের সাথে পরিচিত হয়েছে, মানে ভুত ব্যাপারটার সাথে, যাতে লুকিয়ে আছে ভয় ভয় একটা অনুভুতি। তাই মায়ের মনে চট করে একটা বুদ্ধি খেলে গেলো আগুন যাতে না ধরে তাই বাচ্চাটিকে বললেন  “বাবা, আগুনে হাত দেবে না, আগুনে হাত দিলে রাতে ভুত তোমাকে নিয়ে যাবে”। ছেলেটি মনে মনে বেশ ভয় পেয়ে গেলো এবং এরপর আগুনে হাত দেওয়ার সাহস সে করে নি। ছোট্ট বাচ্চাটি এখন অনেক বড়, সাড়ে পাঁচ বছর বয়স তার; সে এখন হাঁটতে শিখেছে! রাস্তার ধারে বাসা তাদের তাই সুযোগ পেলেই চৌকাঠ ডিঙিয়ে রাস্তায় চলে যেতে চায়। মায়ের কোন ডাকই সে শুনতে চায় না। এবার মা তার মন ভোলাতে নতুন গল্পের অবতারণা ঘটান  “বাবা রাস্তায় ছেলেধরা থাকে। ওরা ছোট বাচ্চা পেলেই তাদের সাথে থাকা বস্তায় করে নিয়ে যায়। নিয়ে গিয়ে চোখ, কিডনি, কলিজা বেঁচে দেয়”। রাস্তায় একদিন এক বস্তা পাগলকে দেখে সে সত্যিই ভয় পেয়ে যারপরনাই হয়ে ছুটে আসে এবং ভেবে দেখে আসলে মায়ের কথাই সত্যি!”

এটুকু বলেই মুক্তাদির সাহেব খানিক থামলেন।

গ্রামের এই লোকটিকে সবাই বিজ্ঞ বলেই জানে এবং সম্মান করে। তেমন একটা গ্রামে থাকেন না। তবে দেখেই বোঝা যায় যে উনি একজন খাটি মাটির মানুষ। এই তো ঈদে কিছুদিনের জন্য বাড়ী এলেন আর এরইমধ্যে তালতলার বশীর চাচার চায়ের দোকানে আড্ডার আসর বসিয়ে দিয়েছেন। সদ্য কলেজ পেরোনো তাওসিফ মনে মনে ভাবছে মুক্তাদির চাচা এই মা ছেলের চিরায়ত গল্পগুলো কেন বলছেন…।  সত্যি বলতে তার এসব শুনতে একটু বিরক্তই লাগছে। গল্পের মাঝে কবীর ভাই, সালাম চাচা আর তন্ময় দাদাও কখন যে এসে বসেছেন তা মুক্তাদীর সাহেব খেয়াল করেন নি। সবার দিকে একবার তাকালেন এরপর।

একটু ঝেড়ে কেশে মুক্তাদির সাহেব আবার শুরু করলেনঃ

“ছেলেটি আরো বড় হল। তাকে নামিয়ে দেয়া হল পড়াশোনা নামক রেসে। বাবার সাথে ছেলেটা একদিন বাজারে গিয়ে একটা ভিডিও গেমসের বায়না করে। খুবই ভালো লেগেছিলো খেলনাটা তার! অনেক কান্নাকাটির ফল হিসেবে একটা শর্ত থাকে যে ক্লাসে ফার্স্ট হতে হবে তার পর ওটা কিনে দেওয়া হবে। তার চোখে তখন শুধু ঐ খেলনা আর শুধু খেলনাই। তার সব শর্ত মঞ্জুর। শুরু হয়ে গেলো তার দেদারসে পড়াশোনা।”

তাওসিফের চোখমুখ খানিক উজ্জ্বল দেখে মুক্তাদির সাহেব “কি? তাওসিফ কি কিছু বলবা নাকি?”

“না ভাবছিলাম ভয়-ভীতি আর পুরষ্কারের লোভ মানুষকে বশ করার সবচেয়ে সহজ উপায়” থতমত খেয়ে দ্রুত বলে ফেলল তাওসিফ।

মুক্তাদির সাহেবের দিকে তাকিয়ে সালাম চাচা তাতে আপত্তি জানালেন “ছোটবাচ্চার কাহিনী থেকে মানুষ সম্পর্কে এমন সিদ্ধান্ত  নেওয়া ঠিক হয় নি তাওসিফের।”

কিন্তু কবীর ভাই সালাম চাচার উদ্দেশ্যে বললেন “না চাচা, মানুষের আসল রূপ শৈশবেই দেখা যায়। বড় হওয়ার পর তো শুধু অভিনয় করে একেক চরিত্রে। তাই আমার মনে হয় শৈশব দিয়েই আসল মানুষের বৈশিষ্ট্য নির্ণয় সম্ভব।”

মুক্তাদ্দির সাহেব সব শুনছিলেন আর মনে মনে খুশি হচ্ছিলেন এই ভেবে যে উনার এই সামান্য গল্পটা ওরা সিরিয়াসলি নিয়ে ওটা নিয়ে আলোচনা করছে। আর তিনিও এই সামান্য গল্পে অনেক বড় কোন ইতি খুঁজে পাচ্ছিলেন যেন। তাই এবার তিনি নিজে থেকেই কাহিনীর ভিন্ন মোড় দিচ্ছেন-

“আসলে এই সামান্য গল্পটা আরো বড় পরিস্থিতির সাথে মেলানো যায়। আমরা কি দেশের সমসাময়িক পরিস্থিতির আলোকে আমার গল্পটা ব্যাখ্যা করতে পারি না?” সালাম চাচা জিজ্ঞেস করলেন “কোন পরিস্থিতি?”

মূলত মুক্তাদির সাহেব নিজেও গল্পটা যে শেষ অবধি এদিকে ঘুরাবেন তা জানতেন না। তবে দেশের পরিস্থিতি খারাপ তাই এ বিষয় নিয়ে এভাবে খোলাখুলি ভাবে বলা উচিৎ হচ্ছে কিনা বুঝতে পারছেন না…। অনিচ্ছা সত্ত্বেও হঠাৎ বলে ফেললেন “ধর্ম আর জঙ্গিবাদ!”

সবাই কেমন যেন নড়েচড়ে বসল। কি হতে চলেছে তা জানতে সবার অধীর আগ্রহ…।  মুক্তাদির সাহেব শুরু করলে,

“‘মা’ ব্যাপারটার সাথে আমরা সবাই পরিচিত। মা বলতেই সবার সামনে ভেসে উঠে একটা চির পরিচিত মঙ্গলময় মূর্তি। আমাদের ধর্মেই লেখা আছে  ‘মাতার পদতলে সন্তানের বেহেস্ত’। তেমনই  ধর্মের চিন্তা করলে গল্পের সাথে এমন একজনের মিল পাওয়া যায়। তাঁর কোন শরীক নেই তিনি অসীম ক্ষমতাশালি, দয়াবান, ক্ষমাশীল এবং চির মঙ্গলময় রূপ। মায়ের সব মন ভোলানো কথায় যেমন শেষ পর্যন্ত সন্তানের উপকারই হয়। মা জানেন আগুন ধরলে কখনও ভুত এসে তাঁর সন্তানকে নিয়ে যাবে না। সন্তানও একদিন বড় হলে এটা জেনে নিশ্চয় হাসবে কিন্তু সে এটাও বুঝবে যে মায়ের মত কেও হয় না। মনের অজান্তেই হয়ত গেয়ে উঠবে “মায়ের একধার দুধের দাম কাটিয়া গায়ের চাম…।” তেমনই রহীম-রহমানও আমাদের মঙ্গলের জন্যই ধর্মীয় কিতাব নাযিল করেছেন। তা পালন করলে অবশ্যই মঙ্গল হবে এবং জগত হবে শান্তিময়।…”

মুক্তাদির সাহেবের কথার মাঝে হঠাত তাওসিফ বলে উঠল “মুক্তাদির চাচা, তাইলে তো আপনার গল্পে শুধু ধর্মই দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু আপনি তো ধর্ম আর জঙ্গিবাদ নিয়ে বলবেন বলেছিলেন। আর আরেকটা প্রশ্ন হল আপনার গল্পের মায়ের মত ভুলিয়েভালিয়েই সন্তানের উপকার করে বলেছেন আপনি কিন্তু সব মা তো এমন নাও হতে পারে…”

“ভালোই বলেছো তুমি তাওসিফ…”  আবার বলতে লাগলেন মুক্তাদির সাহেব

“মা কনসেপ্ট সার্বজনীন। মা সত্য। একেকজনের মা একেক ভাবে বড় করে কিন্তু মায়ের সার্বজনীনতা নষ্ট হয় না। আমরা মা বলতে আমার মা বা তোমার মা বা কোন মানুষ সম্পর্কে আলোচনা করছি না। আমরা মা ধারনাটা নিয়ে আলোচনা করছি। তোমার মতই এই ব্যাপারটা ভুল বুঝে এবং ভুল বুঝিয়ে মগজ ধোলাই করে একদল সংগঠন বাড়তে থাকে এবং তাদের ভুল বোঝাটাই ধর্ম ভেবে ভুল করে। তাদের কাছে তখন আসল নিয়ম অনিয়ম বা কুনিয়ম আর নিজেদের মস্তিষ্কবিকৃত নিয়মই আসল নিয়ম। আগুনে হাত না লাগাতে একেক জনের মা একেক ভাবে সন্তানকে ভোলাচ্ছে ঠিকই কিন্তু মূল উদ্দেশ্য হল আগুন না ধরতে দেওয়া। তেমনই পৃথিবীতে তাঁর ইচ্ছেতেই অনেক ধর্মের আবির্ভাব ঘটেছে। মায়ের ভোলানোর মত ধর্মগুলো বোঝানোর পদ্ধতি ভিন্ন কিন্তু উদ্দেশ্য এক। আমার গল্পের ছেলেটির মা  বলেছিল আগুন ধরলে ভুত তাকে নিয়ে যাবে। ধর অন্য একজনের মা এমনটা না বলে বলেছে আগুন ধরলে মা হারিয়ে যায়। তাই বলে আমার গল্পের ছেলেটি যদি এই ছেলেটির সাথে তর্কে জড়ায় আগুন ধরলে মা হারিয়ে যায় না বরং ভুত ধরে নিয়ে যায়। আমার মা-ই সত্য বলেছে তোমার মা মিথ্যা। এবং আরো কিছুক্ষনপর ধর মারামারি লাগিয়ে দিলো অথবা ধর কিছুদিন ধরে যার যার সাথে তাঁর মায়ের মতাদর্শ মিলে তাদের সাথে এক হয়ে একটা দল গঠন করে ফেলল! বুঝতে পারছো তাওসিফ কিভাবে এমন জঙ্গি তৈরি হয়?militant

তাওসিফ মুক্তাদির সাহেবের কথা গুণমুগ্ধের মত শুনছিল। সে কিছু বলল না।

তন্ময় দাদা এতক্ষন সব কথা শুনছিলো। একটা টু শব্দও করে নি। এবার সে হঠাত বলা শুরু করল এবং সবাই চুপ করে গেলো তার কথা শুনতে… সে শুরু করল-

“মুক্তাদির আঙ্কেল ব্যাপারটা অনেকটা পরিষ্কার হয়ে গেছে আমার কাছে…। এভাবে মায়ের কথা নিয়ে ঝগড়া করতে গেলে শুধু অশান্তিই হবে। এতে মায়ের উদ্দেশ্যও সফল হবে না। মায়ের উদ্দেশ্য ছিলো আগুন থেকে সন্তানকে দূরে রাখা মাত্র। আর ওই অশান্তি থেকেই জঙ্গিবাদের জন্ম।”

মুক্তাদির সাহেব মেঘকালো আকাশের দিকে তাকিয়ে হাসছেন। বশীর চাচার চায়ের দোকানে আরোকিছুক্ষন নিরবতা চলল। মুক্তাদির সাহেবের মনে হল মেঘের আড়াল থেকেও কে যেন হাসছেন। মানুষটা বড়ই কল্পনাপ্রবণ। মাঝে মাঝে তার কল্পনা থেকেই ঘোর সত্য বেড়িয়ে আসে…