ক্যাটেগরিঃ নাগরিক সমস্যা

 

বাংলাদেশের তথা ঢাকা শহরের মানুষের আপন বাসস্থানে বসবাসের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়। তা পূরণ করা সোনার হরিণের মতো দুরূহ বিষয় অন্যদিকে মাথা গোঁজার ঠাঁই হিসেবে সাধারণ মানুষ ভাড়া বাড়িতে বসবাস ছাড়া গত্যন্তর নেই আর এর সুযোগ নেন সমাজের বিত্তশালী বাড়িওয়ালারা। নিয়মনীতি ছাড়া যখন-তখন খেয়ালখুশিমতো ভাড়া বৃদ্ধি হচ্ছে এমনকি নির্দিষ্ট সময়সীমা পার হওয়ার অপেক্ষা পর্যন্ত না করে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির দোহাই দিয়ে ভাড়ার পরিমাণ অযৌক্তিক হারে বাড়ে প্রতিনিয়ত। গত এক বছরে ঢাকা শহরের বাড়িওয়ালারা বিভিন্ন অযুহাতে বাড়িভাড়া বাড়িয়েছেন গড়ে কমপক্ষে দেড় গুণ। কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর সামপ্রতিক এক জরিপের তথ্যমতে, রাজধানীর ৮৩ শতাংশ বাসিন্দাই ভাড়া বাড়িতে থাকেন। আর প্রতিবছর তাদের দিতে হচ্ছে বর্ধিত ভাড়া। জরিপ রিপোর্টের তথ্যমতে, ১৯৯০ সালে ভাড়া বেড়েছে ২৫.৭৯%। ১৯৯১ সালে ২১.৭৫%, ১৯৯২ সালে ১৩.৪৩%, ১৯৯৩ সালে ১২.১৬%, ১৯৯৪ সালে ১৬.৪৪%, ১৯৯৫ সালে ২২.৬১%, ১৯৯৬ সালে ১৭.৮৬%, ১৯৯৭ সালে ১৫.০৩%, ১৯৯৮ সালে ১৪.০৯%, ১৯৯৯ সালে ১৮.২৪%, ২০০০ সালে ১৫.০৮%, ২০০১ সালে ১৭.০৪%, ২০০২ সালে ১৩.৪৯%, ২০০৩ সালে ৮.০৪%, ২০০৪ সালে ৯.৯৬%, ২০০৫ সালে ৭.৮৯%, ২০০৬ সালে ১৪.১৪% এবং ২০০৭ সালে ২১.৪৮% ভাগ। জরিপে আরো দেখানো হয়, ১৯৯১ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত দ্রব্যমূল্য বেড়েছে ১১৬.৯৬% শতাংশ। এই সময়ে বাড়িভাড়া বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি, অর্থাৎ ২৫৯.৪৫% শতাংশ। ২০০৮ সালে বাড়িভাড়া বৃদ্ধির হার অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। পাশাপাশি বেড়েছে দ্রব্যমূল্য। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি সমপ্রতি ঢাকায় এক গোলটেবিল বৈঠকে জানায়, ঢাকায় বর্তমানে দেড় কোটি মানুষ বাস করছে। এর মধ্যে এক কোটি ২৬ লাখ ভাড়াটিয়া আর মাত্র ২৪ লাখ মানুষের নিজের বাড়ি আছে। ভাড়াটিয়ারা আয়ের ৬০ শতাংশ ব্যয় করেন বাড়িভাড়ায়। গত ২২ বছরে বাড়িভাড়া বেড়েছে ৩২৫ শতাংশ। সরকারের পক্ষ থেকে এ সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেই। প্রতিবাদ করলেই চেপে বসে বাড়িওয়ালারা তখন ছেলেমেয়ে নিয়ে বসবাস করাও কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে যার কারণে বাধ্য হয়ে বাড়তি বাড়া দিয়েই থাকতে হয়।

বাড়ির মালিক ও ভাড়াটে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিছু পরিবর্তন এনে ১৯৬৪ সালের বাড়িভাড়া বিধিমালা অনুসরণ করেই ১৯৮৬ সালে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ জারি করে সরকার যার মেয়াদ ছিল মাত্র তিন বছর। বর্তমানে ১৯৯১ সালের বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ ৩ নম্বর আইন নামে পরিচিত যে আইনের বিধিবিধান যেমন কোনো বাড়িওয়ালা মানেন না, তেমনি ভাড়াটিয়ারাও জানেন না এর বিধানই বা কী? এই আইন দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে বাড়িভাড়ার নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা যে নীতিমালার কোনো প্রয়োগ নেই এবং কোনো মনিটরিংয়েরও ব্যবস্থা নেই। ভাড়াটিয়াদের স্বার্থরক্ষা করার চেষ্টা কেউ করে না। বাড়িভাড়া আদায়ের ক্ষেত্রে বাড়ির মালিকরা ঢাকা সিটি করপোরেশনের (ডিসিসি) নীতিমালা উপেক্ষা করে ইচ্ছেমাফিক নিয়মবহির্ভূতভাবে বাড়িভাড়া আদায় করছেন বছরের পর বছর যার দায় পোহাতে হচ্ছে খাওয়া মানুষকে। প্রতিকারের কোনো পদক্ষেপ নেই ডিসিসির।

সিটি করপোরেশনের আওতায় শহরকে ১০টি জোনে ভাগ করে বাড়িভাড়ার ক্ষেত্রে তিন স্তরের বাড়িভাড়া নির্ধারণ করেছে সেগুলো হচ্ছে_মূল রাস্তার (মেইন রোড) পাশে, গলির ৩০০ ফুটের মধ্যে এবং গলির ৩০০ ফুটের বাইরে। বাড়ির ক্ষেত্রেও তিনটি স্তর রয়েছে। এগুলো হচ্ছে_পাকা, সেমিপাকা এবং কাঁচা বাড়ি।

মেইন রোডের পাশে পাকা বাড়ির প্রতি বর্গফুট ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৬.৫০ টাকা, সেমিপাকা ৪.৫০ টাকা, কাঁচা ৪ টাকা, গলির ভেতরে ৩০০ ফুটের বাইরে পাকা ৫.৫০ টাকা, সেমিপাকা ৪.৫০, কাঁচা ৪ টাকা। ধানমণ্ডি এলাকায় মেইন রোডে প্রতি এক হাজার বর্গফুট বাড়ির ভাড়া হওয়ার কথা ১২ থেকে ১৪ হাজার টাকা। বর্তমানে পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস বিল ছাড়াই আদায় করা হচ্ছে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত। কিন্তূ ডিসিসির নির্ধারিত ভাড়ার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি পার্থক্য লক্ষ করা যায় বর্তমান আদায়কৃত ভাড়া। এসব ক্ষেত্রে চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স নেই।

বাড়িভাড়া আইনের ১৩ ধারামতে
১. ভাড়াটিয়া কর্তৃক ভাড়া পরিশোধ করা হইলে বাড়ির মালিক তৎক্ষণাৎ ভাড়া প্রাপ্তির রসিদ বিধি দ্বারা নির্ধারিত ফরমে স্বাক্ষর করিয়া ভাড়াটিয়াকে প্রদান করিবেন।
যেটি আদৌও হচ্ছে না। প্রায় সবক্ষেত্রেই বাড়ির মালিক ইচ্ছাকৃতভাবে ভাড়াটিয়াকে ফ্যাসাদে ফেলার জন্য ভাড়াটিয়ার সরলতার সুযোগে তাৎক্ষণিক কোনো রসিদ প্রদান না করে পরে বা পরবর্তী মাসের ভাড়ার গ্রহণকালীন একত্রে রসিদ প্রদানের অঙ্গীকার বা কখনো কোনো রকম দায়িত্ব ছাড়াই রসিদ প্রদান করেন না। মিথ্যা অজুহাতে ভাড়া নিয়ন্ত্রকের কাছে ভাড়াটিয়াকে খেলাপি বলিয়া সাব্যস্ত করার চেষ্টাও করে থাকেন।

২. বাড়ির মালিক ভাড়ার রসিদের একটি চেকমুড়ি সংরক্ষণ করিবেন। বাড়ি মালিক যখনই ভাড়া গ্রহণ করিবেন তখনই উহার রসিদ প্রদানে বাধ্য থাকিবেন। অন্যদিকে বিনা রসিদে কেউ কোনো ভাড়া প্রদান করিয়া থাকিলে ভাড়াটিয়া কোনো মজুরা পাইবেন না। ভাড়া আদায়ের রসিদ বিধি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নির্ধারিত ফরমে বা ছকে ছাপাইতে হইবে।

বর্তমানে সিনিয়র সহকারী জজের পদমর্যাদার জজ নিয়ন্ত্রক হিসেবে দায়িত্বে আছেন যাকে ভাড়াটিয়াররা বাড়িভাড়া আইনের ১৩ ধারা অনুযায়ী আবেদন করতে পারেন। তিনি অভিযোগ তদন্ত করে মালিকের বিরুদ্ধে দণ্ড আরোপের রায় দিতে পারেন। কিন্তূ উল্টা বাড়িওয়ালা ভাড়াটিয়াদের বিরুদ্ধে সাধারণত উচ্ছেদ মামলা, নিষেধাজ্ঞা মামলা, ক্ষতিপূরণ ইত্যাদি মামলা করে থাকে। এসব মামলা করতেও হয়রানির শিকার হতে হয় ভাড়াটিয়াদের। বছরের পর বছর ঝুলতে থাকে মামলাগুলো। সিটি করপোরেশন তাদের দায়িত্ব পালন করলে ভাড়াটিয়াদের হয়রানি কমত বলেই মনে করে সংশ্লিষ্টরা।

বাড়ির মালিক ও ভাড়াটে দ্বন্দ্বের প্রধান কারণ হলো, আইনসম্মত কোনো চুক্তিপত্র না থাকা। আবার অনেক বাড়ির মালিকতো বেশি সুবিধা নেওয়ার জন্য লিখিত চুক্তিই করেন না। আনেক সময় দেখা যায় উভয় পক্ষের মধ্যে চুক্তিপত্র থাকলেও তা হয় ত্রুটিপূর্ণ যা আইনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। তাঁদের ধারণা, লিখিত চুক্তি না থাকলে ভাড়াটেকে অনেক সহজে উচ্ছেদ করা যায়। অনেক সময় দেখা যায়, বাড়ির মালিক ভাড়াটেকে উচ্ছেদের জন্য জরুরি সেবা_বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন, যা সম্পূর্ণ বেআইনি ও অমানবিক।

আইনের ১০ ধারায় মতে বাসা, দোকান, অফিস, চেম্বার বা গুদামের ক্ষেত্রে বাড়ির মালিক এক মাসের অতিরিক্ত ভাড়ার টাকা বা অগ্রিম জামানত গ্রহণ করতে পারবেন না এবং নিয়ন্ত্রকের পূর্বানুমোদন ব্যতিরেকে অতিরিক্ত টাকা গ্রহণ করতে পারবেন না। ভাড়া নিয়ন্ত্রকের অনুমতি ব্যতিরেকে যদি কোনো অতিরিক্ত ভাড়ার টাকা বা অগ্রিম জামানত গ্রহণ করেন, তা হবে অবৈধ। কিন্তূ ঢাকার আধিকাংশ এলাকার বাসাবাড়িতে অতিরিক্ত ভাড়ার টাকা বা অগ্রিম জামানত গ্রহণ করা হয়।

বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত আইন ও বিধিবিধান কার্যকর করতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানাতে সরকারের প্রতি হাইকোর্ট রুল জারি করেন ২০১০ সালের ১৭ মে। চার সপ্তাহের মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব, সংসদ সচিবালয় সচিব, আইনসচিব ও ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়রসহ সংশ্লিষ্টদের রুলের জবাব দিতে বলা হয়।

এর আগে ২৫ এপ্রিল বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন-১৯৯১ কার্যকরের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করে মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ। রিটে অভিযোগ করা হয়, বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনে ভাড়ার রসিদ ও বাড়ি ছাড়ার জন্য নোটিশ দেওয়াসহ বিভিন্ন বিধান থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে বাড়ির মালিকরা তা মানছেন না। তাঁরা আইনের বিধান ভেঙে ইচ্ছামতো ভাড়া বৃদ্ধি ও ভাড়াটিয়াদের যখন-তখন বাড়ি ছাড়তে বাধ্য করছেন। এমনকি ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা অনুসারেও ভাড়া আদায় করা হচ্ছে না। এ ছাড়া বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন অনুসারে এর অধীনে বিধি প্রণয়নের বিধান থাকলেও আজ পর্যন্ত তা করা হয়নি।

এই রিটের মীমাংসা এখনো হয়নি। তবে এই রিট আবেদনে এটা স্পস্ট হয়ে উঠেছে যে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণে আইন থাকলেও সংশ্লিষ্ট বিভাগ, বাড়িওয়ালারা এ আইনের তোয়াক্কা না করে বরং যা খুশি তা-ই করছেন বাড়ির মালিকরা। বাড়িভাড়ার অতিরিক্ত টাকা গুনতে গিয়ে পারিবারিক ও সামাজিক সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে ভাড়াটিয়াদের। বাড়িভাড়ার আইন থাকলেও এর কোনো প্রয়োগ না থাকায় মালিকরা দিন দিন স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠেছেন যা জন্ম দিচ্ছে অনেক সমস্যার। ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাসকারী নিম্নবিত্ত মানুষ অনেকেই দিশেহারা হয়ে যাচ্ছে। এ নির্যাতন সব নির্যাতনকে হার মানায়। বাড়িভাড়া আইন না মানার শাস্তির বিধান করা না হলে এ সমস্যা মহামারিতে রূপ নেবে। এ কারণে ফৌজদারি আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন। নির্যাতনকারী বাড়িওয়ালাদের ফৌজদারি আইনের আওতায় আনা সম্ভব হলে অন্তত শহরের বসবাসরত নির্যাতীত ভাড়াটিয়ারা উপকৃত হতো।