ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, স্বাধিকার চেতনা

শিশুকাল থেকেই ইন্দিরা গান্ধীর নাম এক ধরনের চরম সম্মোহনী ও আকর্ষণী শক্তি দিয়ে আমাকে টানতো । ইন্দিরা নামটি শুনলেই মনে হতো তিনি মা দুর্গার মতই যেন কোন মহিয়সী দেবী, যিনি অসুরকে বধ করে সমাজে শান্তিশৃঙ্খলা ও ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠা করবেন । বাস্তবেও তেমনই ছিলেন তিনি, অদম্য ইচ্ছে এবং প্রবল দাপটের সঙ্গে সকল প্রতিকূলতা, প্রতিবন্ধকতা ও বন্ধুরতাকে একের পর এক জয় করেছিলেন, দৃঢ়চেতা ও অদম্য সাহসী ইন্দিরা তাঁর চরম মানসিক শক্তি এবং কূটনৈতিক বুদ্ধিদীপ্ততায় সারা দুনিয়া আলোড়িত করে গিয়েছিলেন, ইতিহাস যে তাকে আয়রন লেডি বলে অভিহিত করেছে তা একেবারেই অযৌক্তিক নয়, লৌহসম দৃঢ় ব্যক্তিত্বে তিনি ভারত দাপিয়ে বেড়িয়েছেন, তৈরি করে দিয়ে গেছেন আরেকটি দেশ, আমাদের দেশ বাংলাদেশকে । ইতিহাস তাঁকে অমরত্ব দেবে আমাদের দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর অনবদ্য অসাধারণ এবং অনন্য ভূমিকার জন্য । অনন্য সৌন্দর্য ছিলো তাঁর মধ্যে, সেটি তাঁর ব্যক্তিত্বের সৌন্দর্য, তাঁর রুচিবোধ, তাঁর তেজস্বিতা , তাঁর ধীরস্থির হয়ে চমৎকারভাবে কথা বলার সৌন্দর্য, তাঁর বিচক্ষণতা এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞার সৌন্দর্য । কপালের ওপর ডায়েস করা একগোছা চুল, তাঁতের শাড়ি এবং দুই ফিতার স্যান্ডেলে তাঁকে খুবই মানাতো । শীতের দেশে গেলে ওভারকোট তাঁর ব্যক্তিত্বের উচ্চতাকে চরমভাবে ফুটিয়ে তুলতো, তাঁর চালচলন, স্বভাবচরিত্র এবং ব্যক্তিত্বে ছিল চরম নান্দনিকতা । এমন ব্যক্তির প্রতি সহজেই মন শ্রদ্ধাবনত হয়ে আসে, ইচ্ছে করে পুজোর অর্ঘ ঢেলে তাঁর প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা নিবেদন করতে।

মধ্যবিত্তের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ইন্দিরা গান্ধীর রাজনৈতিক দর্শন ছিল সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের। তিনি ১৯৭১ সালের সাধারণ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে ভারতে সমাজতান্ত্রিক ধারার অর্থনীতির প্রচলন করেন। তিনি ওই অর্থনৈতিক চিন্তাধারার মাধ্যমে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত খাতের হাত ধরে ভারতে ‘গরিবি হঠাও’ আন্দোলনের সূচনা করেন। ইতিহাসের এক বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক চরিত্রের অধিকারী ছিলেন তিনি। ভারতের ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত প্রধানমন্ত্রীও তিনি। সবকিছু ছাপিয়ে ইন্দিরা ছিলেন একজন ক্যারিশম্যাটিক রাজনীতিবিদ, যিনি একটি উন্নয়নশীল দেশের হাজারো সমস্যার মধ্যেও সফলভাবে সরকার পরিচালনা করেন এবং চরম প্রতিকূলতার মাঝেও আরেকটি দেশ – বাংলাদেশ সৃষ্টি করে দিয়ে যান। গোটা ভারত তাঁকে সব সময়ই শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রতিভূ হিসেবে, আমাদের দেশেও সচেতন জনগণের মানসে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন কেননা তিনি ছাড়া বিশ্বের মানচিত্রে এদেশের জন্ম হওয়া চাট্টিখানি ব্যাপার ছিলোনা । সুস্পষ্টভাবে, তিনি ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী। তিনি ছিলেন একজন ‘খাঁটি দেশপ্রেমিক’ নেত্রী, কিন্তু কখনোই উগ্রবাদী বা চরমপন্থী ন্যাশনালিস্ট মনোভাবাপন্ন ছিলেন না ।

একাডেমী অ্যাওয়ার্ড নমিনেটেড ‘মাদার ইন্ডিয়া’ চলচ্চিত্রটি আমার খুবই পছন্দের একটি চলচিত্র । মাদার ইন্ডিয়া নামটি চোখে পড়লেই বা শুনলেই আমার চোখে সেই অসামান্যা মহিয়সী নারী – সিংহসম হৃদয়ের অধিকারিণী ভারতের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী গান্ধীর ছবিই ভেসে ওঠে

পৃথিবীর ইতিহাসে ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী গান্ধীই ছিলেন সবচেয়ে বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করা নারী প্রধানমন্ত্রী (১৫ বছর) । ১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত তিনি টানা ৩ বার ভারতের লোকসভা নির্বাচনে বিজয়ী হন এবং প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন । ১৯৭৭ সালে ইন্দিরা সরকারের বিরুদ্ধে বিপক্ষ শক্তি প্রোপাগান্ডা চালালে সেই প্রোপাগান্ডার কারণে কংগ্রেসের কিছু নেতার ভুল পরামর্শে অনিচ্ছাসত্ত্বেও দেশের শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য এমারজেন্সি স্টেট জারী করেন এবং নির্বাচনে পরাজিত হন । তবে সেটিতে দোষ ইন্দিরা গান্ধীর ছিলোনা, ছিলো বিপক্ষ সাম্প্রদায়িক শক্তির এবং সেই সব কংগ্রেস নেতাদের যারা তাঁকে এমারজেন্সি স্টেট জারী করতে বাধ্য করেন, অচিরেই জনগণের ভুল ভেঙে যায়, মাত্র তিন বছরের মাথায় আবার নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ৪র্থ বারের মত ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন বিশ্বনন্দিত ক্যারিশম্যাটিক ব্যক্তিত্বের অধিকারিণী এই মহান রাজনৈতিক নেত্রী ।



ভারতের রাজনীতিতে সবচেয়ে প্রভাবশালী, ঐতিহ্যবাহী নেহেরু পরিবারে ১৯১৭ সালের ১৯ নভেম্বর জন্ম নেন শ্রীমতী ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী গান্ধী । তাঁর বাবা ছিলেন মহান ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম পুরোধা এবং স্বাধীন ভারতের সবচেয়ে বেশি সময় ধরে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু এবং মা ছিলেন নেহেরু পত্নী কমলা দেবী। দাদা ছিলেন স্বনামধন্য আইনজীবী, ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম ব্যক্তিত্ব তথা কংগ্রেস নেতা মতিলাল নেহেরু, যিনি এই ভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক পরিবারের সূচনা করেছিলেন ।

১৯৩৪-১৯৩৫ সালে বিদ্যালয় পাঠ সম্পন্ন করে ইন্দিরা গান্ধী কবিগুরু বলে খ্যাত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শান্তিনিকেতন বিদ্যালয়ে যোগদান করেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই ইন্দিরার ‘প্রিয়দর্শিনী’ নামটি রাখেন । অতঃপর তিনি ইংল্যান্ডে যান এবং অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন, কিন্তু ল্যাটিন বিষয়ে খারাপ করে অকৃতকার্য হন, কিছুদিন ব্রিস্টলের ব্যাডমিন্টন স্কুলে পড়াশোনা করেন এবং কৃতকার্য হন এবং অক্সফোর্ডের সমারভিল কলেজে তাঁর এনরোলমেন্ট সম্পন্ন হয়।


এই সময়ে তাঁর সঙ্গে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সে অধ্যয়নরত পারসিয়ান জরথ্রুষ্টবাদী ধর্মের অনুসারী ফিরোজ জাহাঙ্গীর গান্ধীর মন দেওয়া নেওয়া শুরু হয়, যাকে তিনি এলাহাবাদ থেকে চিনতেন। ১৯৪১ সালে তিনি দেশে ফিরে যান এবং ১৯৪২ সালে দুজনে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন । উল্লেখ্য ফিরোজ গান্ধীকে মহাত্মা গান্ধী দত্তক পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন এবং সেই থেকে নেহেরু কন্যার নাম হয়ে যায় – ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী গান্ধী

১৯৫০ সাল থেকে তিনি আনঅফিশিয়ালি তাঁর বাবা প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৪ সালে বাবার মৃত্যুর পর তিনি রাজ্যসভার সদস্য হন এবং লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর কেবিনেটে তথ্য এবং যোগাযোগমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন । ভারতরত্ন উপাধিপ্রাপ্ত তামিলনাডুর তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী তথা কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট কুমারাস্বামী কামরাজের প্রয়াসের ভিত্তিতে ১৯৬৬ সালে ইন্দিরা গান্ধী ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভারতের রাজনীতিতে আবির্ভূত হন । সে সময় ভারতের রাজনীতিতে কংগ্রেস দুটি দলে বিভক্ত ছিলো, ইন্দিরা গান্ধী সমাজতান্ত্রিক ব্লকের এবং মোরারজী দেশাই দক্ষিণপন্থী ব্লকের নেতৃত্ব দেন । এই সময়ে দক্ষিণপন্থী ব্লকের গোঁয়ার্তুমির কারণে কংগ্রেস কিছুটা বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয় এবং ১৯৬৭ সালের লোকসভা নির্বাচনে ৬০টি আসন হারিয়ে ফেলে ও ৫৪৫ আসনের মধ্যে ২৯৭টি আসনে জয়ী হয়। কংগ্রেসের অখণ্ডতা বজায় রাখতে সদাসচেষ্ট ইন্দিরা গান্ধী তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ মোরারজী দেশাইকে ডেপুটি প্রাইম মিনিস্টার এবং ফিন্যান্স মিনিস্টার পদে নিয়োগ দেন । কিন্তু তাতে বিশেষ লাভ হয়নি, মোরারজী দেশাই গ্রুপের রক্ষণশীল সংকীর্ণ মনোভাবের কারণে অবশেষে কংগ্রেস বিভক্ত হয়ে পড়ে । ১৯৬৯ সালে তিনি ব্যাংকগুলোকে রাষ্ট্রায়ত্ত করেন । পরবর্তী দুবছর ইন্দিরা গান্ধী প্রগতিশীল সমাজতান্ত্রিক এবং কম্যুনিস্ট পার্টিগুলোর সমর্থন পরিপুষ্ট হয়ে সরকারের দায়িত্ব পালন করেন ।

উনিশশো একাত্তর সালের ঘটনাপ্রবাহ ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী গান্ধীর জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় ।

পাকিস্তানের ১৯৭০ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ৩১৩ আসনের ১৬৭ আসনে জয়ী হয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে, কিন্তু শৃগালের ন্যায় ধূর্ত জুলফিকার আলি ভুট্টোর পেছনে থেকে ইন্ধনদানে জেনারেল ইয়াহিয়া খান শেখ মুজিবুর রহমানকে ক্ষমতায় বসতে না দিয়ে পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীকে লেলিয়ে দেন নিরস্ত্র অসহায় বাঙ্গালির ওপর । এদেশের ১ কোটি নিরীহ ভীত সন্ত্রস্ত জনগণ পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর নরপশুদের হাত থেকে জীবন বাঁচানোর আশায় জানপ্রাণ নিয়ে বন্ধুপ্রতিম ভারতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয় । আওয়ামী লীগ নেতা তাজউদ্দিন আহমেদ এবং ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম লুঙ্গি পরিহিত অবস্থায় ঢাকা থেকে পালিয়ে ভারতের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন । সীমান্ত অতিক্রম করার পর ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর মহাপরিদর্শক গোলক মজুমদার তাজউদ্দীন আহমদ ও ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামকে যথোপযুক্ত সম্মান প্রদর্শনপূর্বক তাদের নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেন। গোলক মজুমদারের কাছে সংবাদ পেয়ে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা মহাপরিচালক কেএফ রুস্তামজী তাদের আশ্রয়স্থলে তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করেন এবং পূর্ববাংলার সার্বিক পরিস্থিতি এবং বাঙালির স্বাধীনতা লাভের অদম্য স্পৃহা সম্পর্কে সম্যক অবগত হন এবং দিল্লীতে প্রয়োজনীয় বার্তা প্রেরণ করেন।

কথায় আছে, ‘দুর্দিনের বন্ধুই প্রকৃত বন্ধু’। একাত্তরে এদেশে এসেছিল সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্দিন। সেই চরম দুর্দিনে আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন মানবতার অগ্রদূত বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী। ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের সভানেত্রী এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি তখন নিজ দেশের নানা সমস্যা সত্ত্বেও এদেশের মুক্তির জন্য এদেশের মানুষকে যে সমর্থন, সহযোগিতা ও সাহায্য দিয়েছেন তার তুলনা নেই।

মাত্র একদিনের মধ্যে – ২৭শে মার্চ ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের প্রতি তাঁর পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেন এবং ভারতীয় সামরিক বাহিনীর প্রধানের মাধ্যমে কে এফ রুস্তমজীকে বাঙালি রিফিউজি ও গেরিলা যোদ্ধাদের জন্য বর্ডার খুলে দিতে এবং প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করার নির্দেশ দেন ।

যদিও অফিসিয়ালি ৯৮,৯৯৩০৫ জন রিফিউজির তালিকা রেজিস্টার্ড হয়, প্রকৃতপক্ষে এই সংখ্যা ছিলো এক কোটিরও ওপরে, তাছাড়া অজস্র শিশু এবং বৃদ্ধ অপুষ্টি ও অনাহারের শিকার হয়ে মারা যায় । ভারতের পশ্চিমবঙ্গে শরনার্থীর সংখ্যা ছিল সবচে বেশি, উল্লেখ্য আগরতলায় স্থানীয় জনগণের চেয়ে শরণার্থী সংখ্যা বেশি ছিলো। সেসময় পরম মমতা ও মাতৃস্নেহ নিয়ে ইন্দিরা গান্ধী বুভুক্ষু বাঙালি শরণার্থীদের পাশে দাঁড়ান এবং আর্ত মানবতার সেবায় পুরো ভারতবাসীকে এগিয়ে আসার জন্য আকুল আবেদন জানান। শুধু তাই নয় নিরস্ত্র বাঙ্গালীকে সাহস জোগানোর জন্য তিনি শরণার্থী শিবির ও হাসপাতালগুলো পরিদর্শন করেন ।

এরকম এক হাসপাতালের জয়বাংলা ওয়ার্ডে তখন চিকিৎসাধীন ছিলেন কিশোর মুক্তিযোদ্ধা বাহাউদ্দিন। সেই হাসপাতাল পরিদর্শনে এসে ইন্দিরা গান্ধী একটি কিশোরকেও যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে দেখে পরমআবেগে জড়িয়ে ধরেন কিশোর মুক্তিযোদ্ধা বাহাউদ্দিনকে। একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী এভাবে পরের দেশের একজন সাধারণ কিশোরকে চরম মাতৃস্নেহে এভাবে জড়িয়ে ধরতে পারেন, সেটা কিশোর বাহাউদ্দিনের কাছে ছিলো কল্পনারও বাইরে, আনন্দ প্রকাশের কোনো ভাষাই খুঁজে পাচ্ছিলেন না বাহাউদ্দিন । তার কাছে মনে হয়েছিল তিনি যেন ঐ মুহূর্তেই আবার যুদ্ধক্ষেত্রে যেয়ে শত্রুবাহিনীকে একের পর এক খতম করে দিয়ে আসতে পারবেন ।

নামকরা কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন দিয়েছেন আরেকটি ঘটনার বিবরণঃ

Indira Gandhi talking with some of the refugees during her visit to Agartala Refugee Camps on 15 May 1971

এক শরণার্থীশিবির পরিদর্শন করতে এসেছেন ইন্দিরা গান্ধী। ১৯৭১ সালের কথা। বাংলাদেশে চলছে স্বাধীনতাযুদ্ধ। প্রায় এক কোটি লোক জীবন বাঁচাতে আশ্রয় নিয়েছে ভারতের বিভিন্ন এলাকায়। বড় রকমের একটা চাপ পড়েছে ভারতের অর্থনীতিতে। তবু তারা আশ্রয় দিয়েছে মানুষগুলোকে। পাকিস্তানি বর্বরদের হাত থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে বাঙালিকে। ইন্দিরা গান্ধী ভারতের প্রধানমন্ত্রী, বাংলাদেশের মানুষের প্রতি তাঁর গভীর মমত্বের দৃষ্টি। সেই শরণার্থীশিবির ঘুরে ঘুরে দেখছেন তিনি। নিরাপত্তাকর্মীরা আগলে রেখেছে তাঁকে। এই নিরাপত্তাবেষ্টনী ভেঙে শরণার্থীশিবিরের এক বৃদ্ধা কেমন কেমন করে পৌঁছে গেলেন ইন্দিরা গান্ধীর কাছে। বিনীতভাবে তাঁকে বললেন,

‘মা, আপনি আমাদের বাঁচান।’

ইন্দিরা গভীর মমতায় হাত রাখলেন সেই বৃদ্ধার কাঁধে। বললেন,

‘চিন্তা করবেন না। আপনারা আমাদের অতিথি। ভারতীয়দের কাছে অতিথি হচ্ছেন দেবতা।’

এভাবেই মহিয়সী নারী ইন্দিরা গান্ধী মায়ের সমান ভালবাসা ও স্নেহে নিপীড়িত নির্যাতিত অসহায় বাঙালি শরণার্থীদের মনে সাহস জুগিয়েছেন, তাদের অনুপ্রাণিত করেছেন ।

ইন্দিরা গান্ধী পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, আসাম, মেঘালয় এবং ত্রিপুরার সরকারদের স্ব স্ব স্থানে রিফিউজি ক্যাম্প এবং গেরিলা ট্রেনিং ক্যাম্প স্থাপন করার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেন। মাতৃভূমি থেকে নির্বাসিত পূর্ব পাকিস্তানী আর্মি অফিসার এবং ভারতের সেচ্ছাসেবীরা সেই নির্দেশ মোতাবেক তাৎক্ষণিকভাবে ক্যাম্প স্থাপনে রত হন এবং সেখানে রিফিউজির পাশাপাশি মুক্তিবাহিনী গেরিলাদের রিক্রুট করে নিয়ে এসে ট্রেনিং দেওয়া হয় । রিক্রুটেড ছাত্র, শিক্ষক, কৃষক, যুবক ও যুবতীরা গেরিলা প্রশিক্ষণ পায়, ঘুরে দাঁড়ায় বাঙ্গালী, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রশিক্ষণ পেয়ে তারা সশস্ত্র অবস্থায় বাংলাদেশে প্রবেশ করতো এবং একের পর এক অপারেশন চালাতো ।

শুধু তাই নয়, ইন্দিরা গান্ধী বিএসএফকে আনঅফিশিয়ালি নির্দেশ দেন বাংলাদেশী গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের মুক্তিসংগ্রামে যতটুকু সম্ভব সাহায্য করতে এবং তাদেরকে এ ব্যাপারে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়, সেই নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে কমান্ডো রেইড/ডেমোলিশনে দক্ষ ১০০ জন ব্যক্তি এবং কতিপয় অফিসার নিয়ে বিএসএফ কমান্ডো বাহিনী গঠন করে, যারা পূর্ব পাকিস্তানের ভেতরে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথেই পাকিস্তান বাহিনীর ওপর অতর্কিতে হামলা চালাতো এবং পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর কার্যক্রমকে শ্লথ ও নস্যাত করে দিতো।

১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বলেন

পূর্ব বাংলায় যা ঘটেছে, তাতে ভারত সরকার নীরব থাকবেনা

১৭ মে পশ্চিম বঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী আসেন এবং রাজ্য সরকারকে আশ্বস্ত করেন যে, শরনার্থী বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকার তাদের পাশে থাকবে । বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সাহায্য করার জন্য ইন্দিরা গান্ধী ভারতীয় সেনাবাহিনীকে দায়িত্ব দেন ৩০ এপ্রিলে । আগে থেকেই আনঅফিশিয়ালি ট্রেনিং চলছিল, আর ৯ মে থেকে সেই দায়িত্ব চলে যায় ভারতীয় সামরিক বাহিনীর হাতে, তাদের হাতে ন্যস্ত হয় মুক্তিযুদ্ধে যোগদানে ইচ্ছুক বাংলাদেশের তরুণদের সশস্ত্র ট্রেনিংদানের দায়িত্ব। এছাড়াও ইন্দিরা গান্ধী যুবকদের ট্রেনিংয়ের পাশাপাশি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের জন্য একটি ট্রান্সমিটার বরাদ্দ করেন।

বস্তুত, এপ্রিল মাসের প্রথম দিকে গুরুত্বপূর্ণ যে দুটি সিদ্ধান্ত ভারত সরকার গ্রহণ করেন, তার প্রথমটি ছিল ভারত সীমান্ত উন্মুক্ত করার এবং দ্বিতীয়টি ছিল বাংলাদেশ সরকারকে ভারতীয় এলাকায় রাজনৈতিক কর্মতৎপরতা চালাবার অধিকার দান করার। এই দুয়েরই তাৎপর্য ছিল সুদূরপ্রসারী। এই কারণে উভয় সিদ্ধান্ত সম্পর্কেই ভারতীয় মন্ত্রিসভার অভ্যন্তরে এবং উচ্চতর প্রশাসনিক মহলে-বিশেষত পাশ্চাত্যপন্হী অংশের পক্ষ থেকে জোরালো আপত্তি ওঠে। আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক শালীনতার বিষয় ছাড়াও উপরোক্ত দুই সিদ্ধান্ত ভারতের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ কিনা সে সম্পর্কে দক্ষিণপন্থীদের উত্থাপিত প্রশ্ন প্রকাশ্য বিরোধিতার রূপ নেবার আগেই দৃঢ়চেতা ইন্দিরা গান্ধী মূলত একক সিদ্ধান্ত আরোপ করেই সকল মতবিরোধের অবসান ঘটান।

৭১ এর মাঝামাঝি সময়ে বেলগ্রেডের রাজধানী বুদাপেস্টে বিশ্বশান্তি কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। এ সন্মেলনে ভারতীয় প্রতিনিধিরা বাংলাদেশ বিষয়ে সর্বাত্মক সহযোগিতার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। এক বার্তায় ইন্দিরা গান্ধী বলেন পূর্ববঙ্গের ঘটনায় ভারতের পক্ষে নীরব থাকা কঠিন এবং ইতোমধ্যে এক কোটি শরনার্থী ভারতে আশ্রয় নিয়েছে। এসব শরণার্থী যাতে সম্মানের সঙ্গে দেশে ফিরতে পারে সেজন্য পাকিস্তানকে বাধ্য করতে হবে। কুখ্যাত মার্কিন কূটনীতিক কিসিঞ্জার মুজিবের মুক্তি এবং সামরিক সাহায্য বন্ধের ব্যাপারে পাকিস্তানের অক্ষমতা ব্যক্ত করলে ইন্দিরা গান্ধী পাল্টা জবাব দিয়ে জানান

ভারতের পক্ষে ও মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সাহায্য বৃদ্ধি করা ছাড়া গত্যন্তর নেই

আমরা সাধারণ ভাবে জানি যে সে সময় আমেরিকা,চীন এবং সৌদি আরব ছাড়া আর কোন দেশ পাকিস্তানকে সমর্থন দেয়নি। শুধুমাত্র এই একলাইন বক্তব্যে পুরো ঘটনাচিত্র প্রকাশ পায় না। বস্তুত বাংলাদেশ প্রশ্নে আমেরিকা ও চীন সরাসরি পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল, তবে একমাত্র ভারত ছাড়া বাকি দেশগুলি্র অবস্থান,এমনকি আগষ্ট মাস পর্যন্ত রুশ ভূমিকাও ছিল অনেকটা নিরপেক্ষ। ভারত ছাড়া আসলে কেউই আমাদের সরকারি পর্যায়ে প্রকাশ্যে সমর্থন দেয়নি। রাশিয়া ফ্রান্স ইংল্যান্ড জার্মানির নিরপেক্ষতা, ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের দক্ষিণপন্থী ব্লকের অনাগ্রহ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মত দুই বৃহৎশক্তির সুস্পষ্ট বিরোধিতার কারণে ভারত সরকার দীর্ঘদিন আমাদের প্রকাশ্যে সামরিক সহায়তা দিতে কিছুটা ইতস্ততবোধ করছিল, কেননা এতে ভারতের বিপক্ষে চীন এবং আমেরিকা যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারতো এবং সেখানে যদি সোভিয়েত রাশিয়ার সহযোগিতা না পাওয়া যায় তবে ভারতের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়তো । যদিও এক ইন্দিরা গান্ধী মনেপ্রাণে সবসময় চাচ্ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হোক এবং তার দলের অন্যান্য সদস্যরাও সেটিকে পার্লামেন্টে সমর্থন করুক।


সেই উদ্দেশ্যে রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলোরে” দর্শনের মতই ইন্দিরা গান্ধী একাই বের হয়ে পড়েন বিশ্বসফরে, বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্র সফর করে তিনি বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন বয়ে আনার জন্য ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা চালান । ভারত দেশটিকে এক কোটি অতিরিক্ত মানুষের চাপের মধ্যে রেখেই ইন্দিরা গান্ধী ইউরোপ-আমেরিকায় পাড়ি দিলেন। বাংলাদেশে তখন যে বর্বর হত্যাকাণ্ড আর মানবিক বিপর্যয় ঘটছিল, সে ব্যাপারে নৈতিক সমর্থন আদায় করাই তাঁর উদ্দেশ্য। বেলজিয়াম, অস্ট্রিয়া ও ব্রিটেন হয়ে তিনি গেলেন আমেরিকায়। ইউরোপের দেশগুলো আদর-আপ্যায়ন ঠিকই করল, বাংলাদেশি শরণার্থীদের সম্পর্কে মৌখিক সহানুভূতি জানাল, আর্থিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিল; কিন্তু আসল সমস্যাটি এড়িয়ে গেল আমেরিকার কারণে। ভাবটা এ রকম যে তুমি তো আমেরিকা যাচ্ছই, সেখানেই সব শুনবে।


ওয়াশিংটন ডিসিতে আসার পর প্রেসিডেন্ট নিক্সন খাদ্য, স্বাস্থ্য, আবহাওয়া ইত্যাদি নিয়ে হালকা মেজাজে কথা চালিয়ে গেলেন ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে। আসল কথা তুললেনই না। ইন্দিরা একসময় সরাসরি প্রশ্ন করলেন,

পাকিস্তান সরকার সে দেশের পূর্বাঞ্চলে যে অত্যাচার চালাচ্ছে, সে বিষয়ে আপনি কি কিছু ভেবেছেন?

নিক্সন বললেন, ‘ভেবেছি। ভারত আর পাকিস্তানের মধ্যে যদি কোনো সমস্যার সৃষ্টি হয়, তাতে কি আমাদের নাক গলানো ঠিক হবে?’

ইন্দিরা গান্ধী বললেন,

সমস্যা ভারত-পাকিস্তানের নয়, পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ। পূর্ব পাকিস্তানে নৃশংস গণহত্যা চলছে । পাকিস্তানের সাংবাদিক অ্যান্টনি ম্যাসকারেনহাস এ বিষয়ে ‘দ্য রেপ অব বাংলাদেশ’ নামে বই লিখেছেন, সেখানে জেনারেল ইয়াহিয়ার সেনাবাহিনীকে হিটলারের নাৎসি বাহিনীর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। এ বিষয়ে আপনাদের উদ্যোগ নেওয়া উচিত, শেখ মুজিবকে মুক্তি দেওয়ার জন্য আপনারাই চাপ দিতে পারেন।

এ ব্যাপারে নিক্সন সাহেব ইন্দিরা গান্ধীকে কোনো প্রতিশ্রুতিই দিলেন না। শরণার্থীদের জন্য সাহায্য বাড়িয়ে দেবেন বললেন। ইন্দিরা বললেন,

আমি আপনার কাছে ভিক্ষার পাত্র নিয়ে আসিনি। আমি চাইছি সমস্যাটির সমাধান। একদিকে আপনারা শরণার্থীদের জন্য সাহায্য পাঠানোর কথা বলছেন, আর অন্যদিকে পাকিস্তানি বর্বর সেনাদের হাতে আরো অস্ত্র তুলে দেবেন-এ কেমন নীতি?

আমেরিকার মিডিয়ায় জোরালোভাবে বাংলাদেশের পক্ষে বক্তব্য দিলেন তিনি। সে দেশের সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে গেল তাঁর বক্তব্য। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বক্তৃতায়ও একই সুর তাঁর। আমেরিকা থেকে প্যারিসে এলেন। ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী জর্জ পঁপিদু ইন্দিরার বাবা নেহরুর বন্ধু। ইন্দিরা সুইজারল্যান্ডে থাকার সময় ফরাসি ভাষা শিখেছিলেন। তাঁর কোনো দোভাষী লাগল না। পঁপিদুর সঙ্গে ফরাসি ভাষায়ই কথা বলে গেলেন। পঁপিদুও তাঁকে বাংলাদেশের ব্যাপারে তেমন কোনো আশ্বাস দিতে পারলেন না। কারণ মাথার ওপরে আছে আমেরিকা।

মুক্তিযুদ্ধের মোড় ঘোরাতে সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট ছিল ভারতের পক্ষে সোভিয়েত রাশিয়ার সরাসরি সমর্থন প্রদান। ইন্দিরা গান্ধী সোভিয়েত রাশিয়া সফর করে তাদের সঙ্গে ২২ বছরের শান্তি চুক্তি করেন, সেই চুক্তির জের টেনে চমৎকার কূটনৈতিক দক্ষতায় বাংলাদেশ ও তার স্বাধীনতার প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন । তিনি সোভিয়েত সরকারকে বোঝান যে,

ভারতের মতই বাংলাদেশ রাষ্ট্র হবে একটি সমাজতান্ত্রিক এবং ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়নও সেই একই সমাজতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শে বিশ্বাসী

পৃথিবীর সেসময়ের শীর্ষশক্তি সোভিয়েত সরকার ইন্দিরা গান্ধীর বুদ্ধিদীপ্ত কূটনৈতিক দাবিকে অগ্রাহ্য করতে পারেননি, এখানেই ইন্দিরা গান্ধী তার বুদ্ধি দিয়ে পুরো যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেন । রুশ ছত্রছায়ার ফলেই ভারত চীনের হুমকি থেকে মুক্ত হয়ে আমাদেরকে সক্রিয়ভাবে সামরিক সাহায্য দেওয়া শুরু করে শুধু তাই নয়, ডিসেম্বর মাসে পাক-ভারত যুদ্ধ শুরু হবার আগে থেকেই সীমান্তের কাছাকাছি অনেক এলাকাতেই তারা মুক্তিবাহিনীর সাথে একত্রিত হয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঢুকে যুদ্ধ করত। পরের দেশের জন্য কেউ যুদ্ধ করছে – ইতিহাসে এমন নজির বিরল

রুশ-ভারত চুক্তির ফলে কাপুরুষ ইয়াহিয়া খান হয়ে পড়ল চরম ভীতসন্ত্রস্ত, সে চাইলো পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী বঙ্গবন্ধুকে দ্রুত বিচারের নামে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিতে। তাজউদ্দিন আহমেদ বঙ্গবন্ধুর জীবন নিয়ে ইয়াহিয়ার হুমকি-ধমকিতে বিশেষভাবে চিন্তিত হয়ে পড়লেন। চরম বুদ্ধিমান ইন্দিরা গান্ধী তখন ইয়াহিয়া খানের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন, পাকিস্তান সরকার নিশ্চিতভাবেই শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করেছে এবং এই হত্যাকাণ্ডের জন্য আমরা দুনিয়ার বৃহৎ শক্তিগুলো এবং জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক আদালতের কাছে বিচার চাই । কাপুরুষ ও মাথামোটা ইয়াহিয়া ইন্টারন্যাশনাল আদালতে বিচারের সম্মুখীন হবেন এই ভয়ে বোকার মত ফাস করে ফেললেন-“ শেখ মুজিবকে ফাঁসি দেওয়া হয়নি, তাকে সসম্মানে পাকিস্তানে বন্দী রাখা হয়েছে” । এই বক্তব্য দেওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধারা উল্লাসে ফেটে পড়েন, তাদের প্রাণপ্রিয় নেতা শেখ মুজিব জীবিত আছেন দেখে তাদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নতুন আত্মবিশ্বাস এবং স্পৃহার জন্ম নেয়, আর এহেন বক্তব্য দেওয়ার পর দেওয়ালে ইয়াহিয়া খানের পিঠ ঠেকে যায় কেননা বক্তব্য দেওয়ার পর সেটিকে পরিবর্তন করে এখন চাইলেই তিনি শেখ মুজিবকে ফাঁসি দিতে পারেন না । ইন্দিরা গান্ধী, ইয়াহিয়া খানের জন্য শুধু এই টোপ ফেলেনই ক্ষান্ত হননি, বরং তৎকালীন সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট পদগোর্নীকে অনুরোধ করেন ইয়াহিয়াকে ব্যক্তিগতভাবে শাসিয়ে দেন যাতে বঙ্গবন্ধুর ফাঁসি দেওয়া না হয় ।

ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেবার জন্য ভারতকে অক্টোবর মাসের ১৫ তারিখ একটি চিঠিতে অনুরোধ জানানো হয়। সে সময় ভারত যে পূর্নাঙ্গ যুদ্ধে জড়াবে তা অনেকটা নিশ্চিত। ১৬ই নভেম্বরে ইন্দিরা গান্ধীর আমন্ত্রণ ক্রমে সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং তাজউদ্দিন আহমদ দিল্লীতে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। এই বৈঠকে ইন্দিরা গান্ধীর সাম্প্রতিক সফরের অভিজ্ঞতা, বিশেষত বাংলাদেশ প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও পশ্চিম জার্মানীর মনোভাব, অধিকৃত অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধের অবস্থা, সীমান্ত অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান সংঘর্ষ, কাশ্মীর সীমান্তে পাকিস্তানের সম্ভাব্য অভিযান, ভারতের পাল্টা অভিযানের প্রস্তুতি প্রভৃতি বিষয় আলোচিত হয় ।

নিদারুণভাবে কোনঠাসা ইয়াহিয়া খান ডিসেম্বর মাসের ৩ তারিখ বিকেল বেলা পাক-ভারত যুদ্ধ বাধাবার তালে পাক বিমান বাহিনীকে ভারতের বেশ কটি বিমান ঘাটিতে বিমান আক্রমণ চালানোর নির্দেশ দেন । সেদিন ইন্দিরা গান্ধীর কলকাতায় এক জনসভায় ভাষণ দিচ্ছিলেন। তিনি কলকাতা থেকে তৎক্ষণাৎ দিল্লী ফিরে লোকসভায় ঘোষণা করেন –


মাননীয় স্পিকার, আজ সকালে প্রাপ্ত সংবাদ অনুযায়ী, পশ্চিম পাকিস্তানের সরকার আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। গতকাল সন্ধ্যায় পশ্চিম পাকিস্তান বিমানবাহিনী আমাদের আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছে এবং আমাদের বেশ কয়েকটি বিমান ক্ষেত্রের ওপর আক্রমণ চালিয়েছে। সমান্তরালভাবে তাদের স্থল বাহিনীগুলো পশ্চিম সীমান্তজুড়ে আমাদের অবস্থানের ওপর গোলাবর্ষণ করেছে। তাদের প্রচারযন্ত্র সম্পূর্ণ ভিত্তিহীনভাবে এই অভিযোগ প্রচার করছে যে ভারত তাদের ওপর আক্রমণ ও আগ্রাসন শুরু করেছে।

খবরটি আমার কাছে পৌঁছায়, ঠিক যখন আমি কলকাতা ত্যাগ করছিলাম। [দিল্লিতে] ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে আমি আমার সহকর্মী ও বিরোধীদলীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে তাঁদের পরামর্শ গ্রহণ করেছি। আমরা সবাই একমত এবং এই সংকল্পে ঐক্যবদ্ধ হয়েছি যে জাতির স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে এবং সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে আগ্রাসী আঘাতকারী শক্তিকে প্রত্যাঘাত করতে হবে।

নয় মাসেরও বেশি সময় ধরে পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক সরকার বর্বরোচিতভাবে দলিত করে চলেছে বাংলাদেশের জনগণের মুক্তি ও মৌলিক মানবাধিকার। তাদের হানাদার বাহিনী যেসব অপরাধ করে চলেছে, প্রতিহিংসা প্রসূত হিংস্রতার দিক থেকে সেগুলো তুলনাবিহীন। লাখ লাখ মানুষকে বাস্তুচ্যুত করা হয়েছে, আমাদের দেশে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এক কোটি মানুষকে। পুরো একটি জাতির এই নিশ্চিহ্ন করণ অভিযানের প্রতি এবং আমাদের নিরাপত্তার ওপর এই হুমকির প্রতি আমরা বারবার বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। সবখানেই মানুষ সহানুভূতি প্রকাশ করেছে, ভারতের ওপর অর্থনৈতিক ও অন্যান্য বোঝা এবং তার বিপদ উপলব্ধি করেছে।

পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ক্রোধান্ধ হয়ে উঠেছে, কারণ বাংলাদেশের জনগণ এমন কিছু মূল্যবোধের জন্য উঠে দাঁড়িয়ে আন্দোলন-সংগ্রামে নিবেদিত হয়েছে, যেসব মূল্যবোধ উপলব্ধি করতে সামরিক বাহিনী অক্ষম; এবং সেই সব মূল্যবোধ তারা দলিত করে চলেছে পাকিস্তানের প্রতিটি প্রদেশেই।

মুক্তিবাহিনীর যুদ্ধ-তৎপরতার সাফল্য যতই বেড়েছে, পাকিস্তানি বাহিনী ততই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। আমাদের ঐতিহ্য নিপীড়ক স্বৈরাচারীদের পাশে দাঁড়ানো নয়, বরং নিপীড়িতদের পাশে দাঁড়ানো; এবং সে কারণেই তাদের রোষানল এখন বর্ষিত হচ্ছে আমাদের ওপর।

বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পরিচালিত আগ্রাসনকে পাকিস্তান বিস্তৃত করেছে ভারতের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ রূপে।..আমরা শান্তির পক্ষে, কিন্তু আজ শান্তিই বিপন্ন: শান্তি রক্ষা করতে হবে। আজ আমরা লড়াই করছি জাতীয় ভূখণ্ডের অখণ্ডতা ও জাতীয় মর্যাদা রক্ষার লক্ষ্যে। সর্বোপরি আমরা লড়ছি আমাদের লালিত আদর্শ ও শান্তি রক্ষার স্বার্থে।

[সূত্রঃ বাংলাদেশ ডকুমেন্টস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত, ঈষৎ সংক্ষেপিত]

তিনি আরো ঘোষনা দেন যে,

এতদিন ধরে বাংলাদেশে যে যুদ্ধ চলে আসছিল,তা এখন ভারতের বিরুদ্ধে পরিণত হয়েছে

রাতে আকাশবাণীতে সেটি প্রচার করা হয়। ইয়াহিয়ার আশা ছিল সম্ভবত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে পৃথিবীর দৃষ্টি পাক-ভারত যুদ্ধে সরানো গেলে জাতিসংঘের সহায়তায় কিছুদিন পরে যুদ্ধ বিরতি ঘোষিত হবে। এতে ভারতকে সীমান্ত থেকে তার সৈন্য প্রত্যাহার করতে হবে, জাতিসংঘ বাহিনী এসে নিয়ন্ত্রণ নেবে, ঠেকানো যাবে পাকিস্তান বিভক্তি। তবে তার হিসেব ভুল হয়েছিল সোভিয়েত রাশিয়ার কারনে। হিসেবে আরো ভুল হয়েছিল যৌথ বাহিনীর রণকৌশল সম্পর্কে ভুল ধারণার কারণে। তার হিসেব মত যৌথবাহিনী বাংলাদেশ সীমান্তে ঢুকে যুদ্ধ করে ঢাকা পর্যন্ত আসতে বহুদিন লাগবে, এই সুযোগে আমেরিকা ও চীন জাতিসংঘে যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব পাশ করাবে, সেটা সম্ভব না হলেও অন্তত সরাসরি যুদ্ধে তাদের পাশে এসে দাঁড়াবে। তবে ভারতীয়রাও এই কৌশল আন্দাজ করে সম্ভাব্য সবচেয়ে কম সময়ে ঢাকা দখলের সিদ্ধান্ত নেয়, এই জন্য ভারতীয় হাই কমান্ড সীমান্তে পাকিস্তানীদের বড় বড় ঘাঁটিগুলি এড়িয়ে ঢাকামুখী অগ্রাভিযান চালাবার রণকৌশল নেয়। এর পর থেকেই ভারত ও বাংলাদেশ বাহিনী মিলিত ভাবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে এবং একে একে পাকবাহিনী বিভিন্ন রণাঙ্গনে পরাজিত হতে থাকে।


মুক্তিযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করার জন্য ৬ ডিসেম্বর ইন্দিরা সরকার বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দান করেন। সেদিন লোকসভায় দাঁড়িয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বলেন, ‘স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে বিশাল বাধার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণের সংগ্রাম এক নতুন অধ্যায় রচনা করেছে। সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করার পর ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’ ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বক্তব্য শেষ না হতেই ভারতের সংসদ সদস্যদের হর্ষধ্বনি আর ‘জয় বাংলাদেশ’ ধ্বনিতে ফেটে পড়েন তারা।

ভারতের পার্লামেন্টে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে ইন্দিরা গান্ধীর চিঠি

নয়াদিল্লি
ডিসেম্বর ৬, ১৯৭১

প্রিয় প্রধানমন্ত্রী,
৪ঠা ডিসেম্বর তারিখে মাননীয় ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং আপনি যে বার্তা পাঠিয়েছেন তা পেয়ে আমি ও ভারত সরকারের আমার সহকর্মীবৃন্দ গভীরভাবে অভিভূত হয়েছি। বার্তাটি পেয়ে ভারত সরকার আপনার নিবেদিতপ্রাণ নেতৃত্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানের জন্য আপনার অনুরোধ পুনর্বিবেচনা করেছে। আমি আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বিদ্যমান বর্তমান পরিস্থিতির আলোকে ভারত সরকার স্বীকৃতি প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। আজ সকালে এ বিষয়ে পার্লামেন্টে আমি একটি বিবৃতি প্রদান করেছি। অনুলিপি প্রেরণ করা হলো।

বাংলাদেশের জনগণকে প্রচুর দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। আপনাদের যুবসম্প্রদায় স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের জন্য এক আত্মোৎসর্গীকৃত সংগ্রামে লিপ্ত রয়েছে। ভারতের জনসাধারণও অভিন্ন মূল্যবোধের প্রতিরক্ষায় যুদ্ধ করছে। আমার কোনো সন্দেহ নেই যে মহান উদ্দেশ্য সাধনের জন্য এই সহমর্মিতা প্রচেষ্টা ও ত্যাগ দুই দেশের মৈত্রীকে আরও সুদৃঢ় করবে। পথ যতই দীর্ঘ হোক না কেন এবং ভবিষ্যতে দুই দেশের জনগণকে যত বড় ত্যাগ স্বীকারই করতে বলা হোক না কেন আমি নিশ্চিত যে জয় আমাদের হবেই।

এই সুযোগে আপনাকে, আপনার সহকর্মীগণকে এবং বাংলাদেশের বীর জনগণকে আমার প্রীতিসম্ভাষণ ও শুভকামনা জ্ঞাপন করছি।

আমি এই সুযোগে আপনার মাধ্যমে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মহামান্য ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের প্রতি আমার সর্বোত্তম শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি।

আপনার একান্ত
(ইন্দিরা গান্ধী)

জনাব তাজউদ্দীন আহমদ
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মুজিবনগর

[সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র]

সেদিন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে জাতির উদ্দেশে এক ভাষণে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম মিত্ররাষ্ট্র ভারতের জওয়ানদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, ‘ভারতের সৈন্যবাহিনীর জওয়ানরা আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বাংলাদেশের মাটি থেকে হানাদার শত্রুদের নির্মূল করার জন্য আজ যুদ্ধ করে চলেছে।’ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ায় পাকিস্তান ভারতের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। ভারতে মার্কিন অর্থনৈতিক সাহায্য বন্ধ হয়ে যায় ।

উত্তর ভিয়েতনামে যুদ্ধরত দক্ষিণ চীন সাগরে অবস্থিত মার্কিন ৭ম নৌবহরকে বঙ্গোপসাগরের দিকে যাত্রার নির্দেশ দেয়া হয় । ইন্দিরা গান্ধী সোভিয়েত রাশিয়াকে ৭ম নৌবহরের ব্যাপারে ইঙ্গিত করলে সোভিয়েত ইউনিয়ন আমেরিকাকে যুদ্ধের হুশিয়ারী দিয়ে সতর্ক করে দেয়, বাংলাদেশ অভিমুখে এগোলে পরিণতি হবে ভয়াবহ । সেই হুশিয়ারি কাজে দেয়, পাকিস্তানের জন্য আমেরিকা, সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াতে চায়না , তাই ৭ম নৌবহর আর এগোয় না, যতদূর এগিয়েছিল ঠিক সেখানে থেমে যায় । রনাঙ্গনে ততক্ষণে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী পলায়ন শুরু করেছে ।

দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ এবং ৩০ লক্ষ শহীদ এবং ২ লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে ১৬ ডিসেম্বর’৭১ মাসে আমরা এ বিজয় অর্জন করি। উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রায় ২০০০০ ভারতীয় সৈন্যও শহীদ হয়েছেন। “তারা সবাই ঈশ্বরের সন্তান” শীর্ষক একটি লেখায় মাদার তেরেসা বাংলাদেশের এক কোটি শরণার্থীকে সেবাযত্ন করায়, তাদের খাদ্য-বস্ত্র-আশ্রয়-চিকিৎসা ব্যবস্থা করার জন্য ইন্দিরা গান্ধীর এ কাজকে যীশু খ্রিষ্ট্রের কাজের সাথে তুলনা করেন।

১৯৭১ সালে পাকিস্তানি আর্মি বাংলাদেশে যে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ ও নির্যাতন চালায়, তা বিশ্ববাসীর কাছে জানাতে স্বাধীনতা যুদ্ধর সময় জহির রায়হান স্টপ জেনোসাইড নামক বিখ্যাত প্রামান্যচিত্রটি তৈরী করেন। ভারতীয় বন্ধুদের ব্যাক্তিগত আর্থিক সহায়তায় তিনি সিনেমাটি নির্মান করেন। পাকিস্তানী বাহিনীর বীভৎস নৃশংস হত্যাযজ্ঞ দেখে ইন্দিরা গান্ধীর হৃদয় এতটাই নড়ে উঠেছিলো যে তিনি তার ফিল্ম ডিপার্টমেন্টকে সিনেমাটির স্বত্ব কিনে নিয়ে সেটিকে সারাবিশ্বে প্রচারের নির্দেশ দেন।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মহান বন্ধু ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ভারত এবং নাস্তিক্যবাদী রাষ্ট্র রাশিয়া। আর স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রত্যক্ষ ও সরাসরি শত্রুর ভূমিকায় ছিল সুবিধাবাদী যুক্তরাষ্ট্র, ধর্মান্ধ পাকিস্তান, কনফুসীয়বাদে বিশ্বাসী চীন এবং সৌদি আরবসহ সকল মুসলিম রাষ্ট্র । ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং রাশিয়ার নেতা কোসিগিন, ব্রেজনেভ ও পদগোর্নির সহযোগিতা ছাড়া নয় মাসের যুদ্ধ কেন, নয় বছরেও বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভে সক্ষম হতো কিনা সন্দেহ! পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর তাড়িয়ে দেয়া এক কোটি শরণার্থীকে ভারত আশ্রয় দিয়েছিল। সোজা কথা, ভারত আশ্রয়-প্রশ্রয়, অস্ত্র এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ না দিলে হাজার বছরেও বাংলাদেশের স্বাধীনতা হয়তো অধরা থেকে যেত। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণার উৎস ছিলেন শেখ মুজিব। একাত্তরের আগস্ট পাকিরা বঙ্গবন্ধুর বিচারের ঘোষণা দিলে উদ্বিগ্ন ইন্দিরা গান্ধী এই মহান নেতার জীবন বাঁচাতে বিশ্ব নেতাদের কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন। ২৫ মার্চ রাতে নিরস্ত্র বাংলার মানুষের ওপর পাকিস্তান যুদ্ধ চাপিয়ে দিলে ৩১ মার্চ ভারতের লোকসভায় বিবৃতি দিয়ে বাংলার গণহত্যার প্রতিবাদ করেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী।

সর্বোপরি মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে ভারতের সৈন্যরা যোগ না দিলে এককভাবে মুক্তিবাহিনীর পক্ষে পাকিস্তানকে যুদ্ধে পরাজিত করা ছিল দুরূহ ব্যাপার। মিত্র বাহিনীর যুদ্ধে যুক্ত হওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের পক্ষে জনমত সৃষ্টির জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সফর করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বার্থেই ১৯৭১-এর ৯ আগস্ট ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বলা যায়, এই চুক্তিই ১৬ ডিসেম্বরের বিজয় ত্বরান্বিত করে। তাছাড়া আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের প্রায় ২০০০০ অফিসার-জোয়ান শহীদ নিহত হন, আহত হন ৪ হাজার ৫৮ জন । ‘৭১-এর ৪ ও ৫ ডিসেম্বর জাতিসংঘে আমেরিকা উত্থাপিত ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাবে রাশিয়া দুই দুইবার ভেটো না দিলে আজও বাংলাদেশের স্বাধীনতা হতো কিনা সন্দেহ।


আরেকটি ভিডিওঃ

http://www.facebook.com/video/video.php?v=453921883895

১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারত-বাংলাদেশের যৌথ বিজয় অর্জিত হওয়ার পরও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী । ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধুকে সেখান থেকে মুক্ত করে স্বাধীন দেশে ফিরিয়ে আনতে আবার তার ক্যারিশম্যাটিক বুদ্ধিদীপ্ততার প্রয়োগ ঘটান। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ও জাতিসংঘের কাছে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির বিষয়ে জোর কূটনৈতিক তৎপরতা চালান, পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর ৯৩৪৯০ জন সৈন্যরা তখন ভারতের কবজায়, তাদের জের টেনে ইন্দিরা গান্ধী জুলফিকার আলী ভুট্টোকে বাধ্য করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সসম্মানে মুক্তি দিতে । শেখ মুজিব মুক্তি পেয়ে লন্ডন থেকে দিল্লী মারফত স্বাধীন দেশের রাজধানী ঢাকায় ফিরে আসেন । এখানেও ইন্দিরা গান্ধীর কৃতিত্ব ।

সিআইএর গোপন দলিলঃ বাংলাদেশে দলীয় নয়, জাতীয় সরকার চান বিচক্ষণ ইন্দিরা গান্ধী

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বিজয় ঘনিয়ে আসার দিনগুলোতে বাংলাদেশের নতুন সরকার কিরূপ হবে তা নিয়ে ইন্দিরা গান্ধীর বিচক্ষণ কিছু প্রস্তাব ছিলো । বাংলাদেশে যাতে ক্ষমতা নিয়ে আভ্যন্তরীণ কলহ বা অন্তর্কোন্দল সৃষ্টি না হয় সেজন্য তিনি চেয়েছিলেন বাংলাদেশে যেন একদলীয় সরকারের পরিবর্তে একটি জাতীয়ভিত্তিক সমঝোতার সরকার গঠিত হয় । তিনি এ ধরনের একটি সরকার গঠনের বিষয়ে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের সর্বদলীয় উপদেষ্টা পরিষদের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয়ের দিন এই গোপন প্রতিবেদন দিয়েছিল ।

উক্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, ভারত সরকার বাংলাদেশে বর্তমান অস্থায়ী (প্রোভিশনাল) সরকারের মতো একদলীয় (আওয়ামী লীগের) সরকার না করে একটি জাতীয়ভিত্তিক সরকার গঠনের ওপর জোর দেবে। আওয়ামী লীগ বিষয়টি নিয়ে কিছুটা বিব্রত; তবে, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ৯ সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদের সঙ্গে একটি ঐকমত্যে (এগ্রিমেন্ট) পৌঁছেছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। ওই উপদেষ্টা পরিষদ কয়েক মাস আগেই গঠিত হয় এবং এতে মস্কোপন্থী চীনপন্থী উভয় পন্থী কমিউনিস্টরা রয়েছেন । ঐ এগ্রিমেন্ট অনুযায়ী, নতুন বাংলাদেশ সরকারের নিউক্লিয়াস গঠন করবে উপদেষ্টা পরিষদ। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, বর্তমান সরকারের (বাংলাদেশ) সদস্যদের ক্ষেত্রে কী ঘটবে তা স্পষ্ট নয়।

উল্লেখ্য যে, ওই উপদেষ্টা পরিষদে বামপন্থী রাজনীতিকদের মধ্যে ছিলেন মস্কোপন্থী হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কমরেড মনি সিংহ, ন্যাপের অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ এবং পিকিংপন্থী হিসেবে পরিচিতি ন্যাপ অপরাংশের মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী।

সিআইএর এ রিপোর্টটি ২০০২ সালের ১৩ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি আর্কাইভে উন্মুক্ত (ডিক্লাসিফাইড) করা হয়। পাঁচ পৃষ্ঠার রিপোর্টটিতে আরো বলা হয়, মুক্তিবাহিনী নতুন সরকারের জন্য কোনো সমস্যা সৃষ্টি করছে না -এ বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে তবেই ভারতীয় সৈন্যদের বাংলাদেশ থেকে সরিয়ে নেওয়া হবে।

দুটি বিষয়ই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ –

ক) জাতীয় ঐক্যমতের সরকার হলে পিকিংপন্থী কম্যুনিস্ট ব্লক অসন্তুষ্ট হতো না, অন্ধভাবে মুজিব বিরোধী হতো না, দেশে অরাজকতা এবং সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম হতো না, একদলীয় সরকার হওয়ার ফলে আওয়ামী লীগের মধ্যে ঢুকে থাকা ব্ল্যাক শিপগুলো চরম শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তাদের সীমাহীন দুর্নীতির কারণে বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিব বদনাম হন, আওয়ামী লীগ হয় কলঙ্কিত । এর পুরো সুযোগ লোটে সুবিধাবাদী চরমপন্থী পিকিংপন্থী কম্যুনিস্ট ব্লক, একদল করে দুর্নীতি লুটপাট (আওয়ামী লীগের সেই কুলাঙ্গারেরা), আরেকদল করে সন্ত্রাস অরাজকতা বিশৃঙ্খলা ( চরমপন্থী চৈনিক কমিউনিস্টরা ) । এই সমস্যাগুলো ভবিষ্যতে হতে পারে (যেটি আসলেই হয়েছিল) ভেবে ইন্দিরা গান্ধী এই জাতীয় ঐক্যমতের সরকারের ওপর জোর দেন ।

খ) মাত্র তিন মাসের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন ১৭ই মার্চের শুভদিনে ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সৈন্যদের ফিরিয়ে নিয়ে আসেন । অর্থাৎ, বাংলাদেশের ধর্মভিত্তিক দলগুলো এবং পিকিংপন্থী কম্যুনিস্ট ব্লক যাতে আওয়ামী সরকারকে ভারতের তাঁবেদার বলে অভিযুক্ত করতে না পারে সেজন্যে ইন্দিরা গান্ধী দেরী না করে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার করে নেন । আওয়ামী লীগ এবং ভারতের মধ্যে কখনোই এমন সম্পর্ক ছিলো না, ছিলো বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, কিন্তু স্বাধীনতা বিরোধী সাম্প্রদায়িক শক্তি ধর্মকে পুঁজি করে, ধর্মের নামে এই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে তাঁবেদারি বলে চালানোর অপচেষ্টা করে ।

কতিপয় প্রশ্নের উত্তরঃ

প্রশ্নঃ তাদের দেশের ব্যক্তি আমাদের দেশে সম্মাননা পায়, আমাদের দেশের ব্যক্তিরা পায় কি ?

উত্তরঃ ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষের অনেক বাঙালিই ভারতে সম্মান ও মর্যাদা পেয়েছেন । ভারতের জাতীয় সঙ্গীত বাঙালি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের রচিত “জনগণমন অধিনায়ক জয় হে ভারত ভাগ্যবিধাতা” । কবি নজরুলের সম্মান রয়েছে । মুহাম্মদ ইউনূস এবং শেখ হাসিনা – দুজনেই ভারত সরকার কর্তৃক পুরস্কৃত হয়েছেন । তবে ইন্দিরা গান্ধীর ন্যায় কোন বাংলাদেশীরই ভারত স্বাধীনতার পক্ষে অবদান নেই । যারা এমন অভিযোগ করেন তাদের বোঝা উচিত যে, ভারত সৃষ্টির আগ পর্যন্ত আমরাও ভারতীয়ই ছিলাম ।

প্রশ্নঃ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভারত তাঁর নিজস্ব স্বার্থসিদ্ধির জন্য আমাদেরকে সহায়তা করেছিল, কথাটি সত্য নয় কি ?

উত্তরঃ ক)পাকিস্তানপন্থী রাজাকার মনোবৃত্তিসম্পন্ন ইসলামিক এবং উগ্র জাতীয়তাবাদী দলগুলো এবং খ) ধর্মীয়ভাবে গোড়া পরধর্মবিদ্বেষী ও জাতিবিদ্বেষী অকৃতজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ এমন কথা বলে থাকেন । এখানে কয়েকটি আলাদা আলাদা বিষয়ের মাধ্যমে প্রশ্নের উত্তর দেব –

১) ভারতের স্বার্থ যদি থেকেও থাকে, সেটি অসঙ্গত কিছু নয় কেননা, পৃথিবীতে এমন কোন দেশ নেই যার দুপাশে একই রাষ্ট্র কিন্তু বর্ডার দ্বারা বিচ্ছিন্ন । যেখানে পাকিস্তান চিরকালই ভারতের সঙ্গে অন্যায় যুদ্ধ করেছে, সেখানে ভারত তার আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার বিষয়টি তো ভাববেই । ভারতের স্থানে আমরা থাকলে আমরাও সেরূপ চিন্তা করতাম, প্রকৃতপক্ষে সকল দেশই নিজের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপোসহীন ।

২) ভারতের স্বার্থের চেয়েও বড় ছিলো আমাদের স্বার্থ, আর এই যুদ্ধে যোগ না দিলে ভারত তার ২০০০০ সৈন্য হারাতো না, সেসময় ৮০ কোটি জনগণের ভারে ন্যুব্জ চরম দরিদ্র দেশ ছিলো ভারত, তার পক্ষে নিজের দেশের জনগণের মৌলিক চাহিদা মেটানোই কষ্ট, সেই অবস্থাতেও বাংলাদেশ থেকে ১ কোটি শরণার্থীকে তারা আশ্রয় দিয়েছে, খাদ্য বস্ত্র এবং চিকিৎসা সুবিধা দিয়েছে । কলকাতার বাঙালিরা রাস্তায় নেমে আমাদের জন্য থালা হাতে ভিক্ষা করেছে, আজকে সেই কোলকাতাকে আমরা মালু বলে গালি দেই ।

শুধু তাই নয় প্রখ্যাত ভারতীয় ব্যক্তিরা আমাদের মুক্তিজুদ্ধের জন্য বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করেছে। বিশ্বখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী জর্জ হ্যারিসন ছিলেন চরমভাবে ভারতপ্রেমী এবং তিনি হিন্দুধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন, তিনি আমাদের জন্য গেয়েছেন গান, তবে সবার ওপরে সেই পণ্ডিত রবি শংকর যিনি জর্জ হ্যারিসন, বব ডিল্যানদের কনসার্টটির মূল পরিকল্পক এবং আয়োজক ।

পুলিশ লাইন থেকে লুট করা সামান্য কিছু ৩০৩ রাইফেল দিয়ে আনকোরা সাধারণ জনতার মাধ্যমে অত্যাধুনিক অস্ত্র এবং রণকৌশলে সুশিক্ষিত পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর মোকাবেলা করে জয়লাভের চিন্তা বস্তুগত দিক থেকে শিশুসুলভ । অস্ত্রচালনা এবং সমরবিদ্যায় আনকোরা জনতাকে ভারতই ট্রেনিং দিয়েছে, তাদেরকে অস্ত্রশস্ত্রের যোগান দিয়েছে, তাদের সঙ্গে ভারতের সেনাবাহিনী এবং বিএসএফকে নিয়োজিত করেছে । অন্যথায় হাজার বছরেও আমরা যুদ্ধে জিততাম না, এটা ধ্রুব সত্য । যারা এখানে অস্পষ্টভাবে বলার চেষ্টা করেন যে হয়তো কিছু দেরী হতো কিন্তু আমরা জিততাম – তারা ক) চরম বাস্তবতা বিবর্জিত খ) সংকীর্ণ ও হীনমন্য

উপরন্তু মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপক্ষে ইন্দিরা গান্ধীর বিদেশ ভ্রমণ এবং সেই প্রেক্ষিতে বিভিন্ন সামরিক-সাংস্কৃতিক ও প্রচারের আর্থিক ব্যয়ভারে ভারত অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিলো, তা সহজেই অনুমেয় । আবার ভারতের ২০০০০ সৈনিক এই যুদ্ধে শহীদ হন। এতেই বা ভারতের স্বার্থ কি ?

গ) ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের উগ্র জাতীয়তাবাদী দক্ষিণপন্থী অংশ পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ মামলায় জড়ানোর জন্য ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি বারবার চাপ প্রয়োগ করছিলো কেননা এতে ভারতের খরচ ও আর্থিক ব্যয়ভার চরমভাবে বেড়ে যাচ্ছিলো তথা ভারতের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছিলো । তবুও বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু ইন্দিরা গান্ধী শত প্রতিকূলতায় অটল থেকে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে গেছেন এবং বাংলাদেশের জয় ছিনিয়ে এনে পার্লামেন্টে তৃপ্তির হাসি হেসেছেন, কংগ্রেসের সদস্যরা তীব্র উল্লাসে পার্লামেন্ট ভবন কাপিয়েছে জয় বাংলাদেশ জয় ইন্দিরা গান্ধী বলে ।

প্রশ্নঃ কেন ইন্দিরাকে মাদার বাংলাদেশ বলে সম্মাননা জানানো উচিত ?

উত্তরঃ মা যেমন নিজের কষ্ট ও বিপদের কথা না ভেবে নিঃস্বার্থভাবে সন্তানকে জন্ম দেন, মা যেমন তাঁর বুকের আচল দিয়ে সন্তানকে সকল অনিষ্ট থেকে রক্ষা করেন, ইন্দিরা গান্ধীও তেমনি একাই বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের জন্য জানপ্রাণ দিয়ে কাজ করেন, এদেশ থেকে ওদেশে ছুটে বেড়ান বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য, বাংলাদেশের অসহায় নিপীড়িত নির্যাতিত মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য । তিনি আমেরিকা ও চীনের মত শক্তিকেও পরোয়া করেননি, আয়রন লেডির মতই কঠিন এবং ধীরস্থিরভাবে তাঁর চূড়ান্ত লক্ষ্য আদায় করে নিয়েছেন, বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠিত করেছেন বাংলাদেশের নাম । জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকেও নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছেন, স্বাধীন দেশে তার সন্তানদের কাছে ফিরিয়ে এনেছেন । এই না হলে মায়ের মত কাজ ! দিল্লী এয়ারপোর্টে যখন মুক্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ইংরেজিতে ভাষণ দিতে উদ্যত হয়েছিলেন, তখন ইন্দিরা গান্ধী তাঁর কানের কাছে ফিসফিস করে বলেন ” বাংলা কহিঁয়ে ” । শেখ মুজিবুর রহমানের মনে ছিলোনা, কিন্তু ইন্দিরা গান্ধীর ঠিকই মনে ছিলো । বস্তুত ইন্দিরা গান্ধী মনেপ্রাণে শুধু ভারতীয় ছিলেন না, ছিলেন বাংলাদেশী-বাঙালিও, রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরম স্নেহে তাঁর মধ্যে বাঙালির প্রতি চরম ভালবাসা এবং শ্রদ্ধা তৈরি হয়েছিল ।

আর ভারতে জন্মগ্রহণকারী কবিগুরু রবীন্দ্রানাথ ঠাকুরের আমার সোনার বাংলা যদি আমাদের দেশের জাতীয় সঙ্গীত হয়, ভারতে জন্মগ্রহণকারী কবি কাজী নজরুল ইসলাম যদি আমাদের জাতীয় কবি এবং রণ সঙ্গীত ” চল চল চল ” তাঁর রচিত হয়, সহস্র বছরের শ্রেষ্ঠ বাংলা গানটি যদি ভারতীয় সঙ্গীতশিল্পী ভূপেন হাজারিকার গাওয়া হয়, তবে বস্তুগত দিক থেকে সেই দেশের স্বাধীনতার প্রধান রূপকার ইন্দিরা গান্ধী কোন যুক্তিতে মাদার বাংলাদেশ বা বাংলাদেশের জননী বলে স্বীকৃতি পাবেনা ?

হোক তিনি ভারতীয়, কিন্তু বাংলাদেশের জন্য পরের দেশের নাগরিক হয়ে যা করেছেন, পৃথিবীর ইতিহাসে এমন অসামান্য অসাধারণ অনন্য নজির আর নেই । চে গুয়েভারা আর্জেন্টিনায় জন্ম নিয়ে ল্যাটিন আমেরিকা এবং কিউবায় কম্যুনিস্ট বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন, তাঁর সম্মানস্বরূপ কিউবার প্রেসিডেন্ট ফিদেল ক্যাস্ট্রো তাঁকে কিউবার নাগরিকত্ব দিয়ে তাঁর মন্ত্রীপরিষদে অন্তর্ভুক্ত করেন । কিউবার জন্য চে গুয়েভারা যা করেছিলেন তাঁর চেয়েও তো তুলনামূলক বিচারে বাংলাদেশের জন্য ইন্দিরা গান্ধীর অবদান অনেক অনেক বেশি, তাহলে তাঁকে কেন মাদার বাংলাদেশ বলে সম্মানিত করা হবেনা ?

এদেশের মানুষ অকৃতজ্ঞ বা কৃতঘ্ন নয়, এদেশের মানুষ হীনমনা বা সংকীর্ণমনা নয়, এদেশের মানুষের হৃদয় ছোট নয়। এদেশের মানুষ উপকারীর উপকারের কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার আমাদের বিপদের দিনের পরম সুহৃদ ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি মরণোত্তর এই যে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননার ব্যবস্থা নিয়েছে, এতে শুধু প্রয়াত ইন্দিরা গান্ধীর অবদানের কথাই স্বীকার করা হবে না, তাঁর স্মৃতির প্রতি শুধু আন্তরিক শ্রদ্ধা নিবেদনই করা হবে না, এতে বিশ্বের দরবারে গোটা বাংলাদেশের মুখকে উজ্জ্বল করা হবে। এদেশের মানুষের মনের ইচ্ছার সঠিক ও সুন্দর বাস্তবায়ন ঘটবে এতে। ইন্দিরা গান্ধীকে এদেশে স্মরণীয় করে রাখার জন্য তাঁর নামে কোন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, স্থাপনা বা স্মারকের ব্যবস্থা করলে সেটা হবে মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদানকে সব সময় স্মরণ করিয়ে দেয়ার মতোই,সরকার সেই উদ্যোগও নিচ্ছে বলে জানা গেছে ।

আমাদের দুর্যোগের দিনের অপরাপর বন্ধু অন্য বিদেশীদের সম্মাননা জানানোর যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে আমরা সে উদ্যোগকেও আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাই। এদেশের মানুষ দরিদ্র হতে পারে, তবে মনের দিক থেকে আমরা দুনিয়ার অন্য কারও চেয়ে ছোট নই, মনের দিক থেকে আমরা দরিদ্র নই। হৃদয় ও মন যে আমাদের অনেক বড়, সরকারের এই উদ্যোগে সেটাই প্রমাণিত হবে দুনিয়ার সামনে।

আজ বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সর্বোচ্চ সম্মাননা দেয়া হচ্ছে ভারতের তৃতীয় প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীকে। গত মঙ্গলবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘বাংলাদেশ স্বাধীনতা সম্মাননা’ দেয়া হবে। পদক গ্রহণ করবেন ভারতের ক্ষমতাসীন কংগ্রেস দলের সভানেত্রী, ইন্দিরা গান্ধীর পুত্রবধূ সোনিয়া গান্ধী। আজ ঢাকায় বিকেল ৫.৩০ মিনিটে রাষ্ট্রপতি মোঃ জিলস্নুর রহমান সোনিয়া গান্ধীর হাতে এই পদক তুলে দেবেন।

সরকারের এই সিদ্ধান্ত যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রয়োজনীয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কাজটি অনেক আগেই করা উচিত ছিল। কিন্তু সম্ভব হয়নি। কারণ ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর নানা বিরূপ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে দেশকে এগোতে হয়েছে, যে কারণে এ ধরনের কাজ যে করা যায়নি সেটাও বলার অপেক্ষা রাখে না। তবুও ৪০ বছর পরে হলেও যে এমন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এবং সরকার বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে সেটা নিঃসন্দেহে অনেকখানি স্বস্তির কথা, জাতির আজ কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দিন, ইন্দিরা গান্ধীর প্রাপ্য সম্মান প্রতিষ্ঠিত করার দিন ।

***
তথ্যসূত্রঃ
দ্য লিবারেশন টাইমসের মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১ এক্সক্লুসিভ
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রথম আলো এক্সক্লুসিভ
জেনোসাইড বাংলাদেশ এক্সক্লুসিভ
ইন্দিরা গান্ধীকে ভোলেনি বাংলাদেশ – ইমদাদুল হক মিলন
সৎ ও নিষ্ঠাবান সাংবাদিক পীর হাবিবুর রহমানের আর্টিকেল
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ইন্দিরা গান্ধীর অবদান -অমূল্য চন্দ্র বৈদ্য
আক্রমণকারীকে প্রত্যাঘাত করতে হবে
১৯৭১ সালের অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার
মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে ফিরিয়ে দাও
একজন তাজউদ্দিন ও একটি আত্মবিস্মৃত জাতি-৪
তাজউদ্দিনকে লেখা ইন্দিরা গান্ধীর চিঠি
ইন্দিরা গান্ধী আবেগে জড়িয়ে ধরেন কিশোর যোদ্ধা বাহাউদ্দিনকে
বাংলাদেশে জাতীয় সরকার চান ইন্দিরা গান্ধী
মাদার তেরেসার ও ইন্দিরা গান্ধীর ভূমিকা
প্রোফাইল অব বেঙ্গল
দ্য হিন্দু পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্ট
বাংলাদেশ থেকে শেখ মুজিবের ইচ্ছেনুযায়ী দ্রুত ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার
৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ -নুরুজ্জামান মানিক
৭১ এর দশ মাস, রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদী
মুক্তিযুদ্ধ ও মিত্রবাহিনী – আসাদুজ্জামান আসাদ
বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১ এইচ টি ইমাম
মূলধারা ‘৭১ – মঈদুল হাসান
ছোটদের বঙ্গবন্ধু – কালিপদ দাস
মুক্তিসংগ্রাম – আবুল কাসেম ফজলুল হক
বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ – মুনতাসীর মামুন
বাংলাদেশ স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র
বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১ – এইচ টি ইমাম
মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তির অবস্থান – এ এস এম শামছুল আরেফিন
আমার ছোটবেলা, ১৯৭১ এবং বাবা তাজউদ্দিন আহমদ – সিমিন হোসেন রিমি
আমি বিজয় দেখছি – এম আর আখতার মুকুল।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১ – নারী, সুকুমার বিশ্বাস সম্পাদিত, মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্র
Witness to Surrender – Siddiq Salik
Figures from the fall of Dacca by Jagjit Singh Aurora in the Illustrated weekly of India, 23 Dec 1973
Mathew Whites, Death tolls for the major wars and atrocities of the twenteeth century
Bangladesh at War, MJ K.M. Safiullah
A Tale of Millions, Rafiqul Islam BU
Contribution of India in the war of Liberation of Bangladesh, Salam Azad
Not The Whole Truth: East Pakistan Crisis (March-December 1971) Role of the Foreign Press” published by the Centre For South Asian Studies, University of the Punjab, Lahore.

***
ফিচার ছবি: http://www.outlookindia.com