ক্যাটেগরিঃ প্রযুক্তি কথা

মাসিক ৮৬৫ টাকায় প্রতি সেকেন্ড ৬৪ কিলোবাইট গতিতে বাসায় ইন্টারনেট ব্যবহার করেন রাজশাহীর ঘোড়ামারার দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্র রিয়াদ। তা-ও ধীরগতির। একসঙ্গে ১৫-২০ জন ‘শেয়ারিং’ পদ্ধতিতে ইন্টারনেট সংযোগ নেওয়ায় প্রায়শই গতি ওঠানামা করে। একই চিত্র দেশের অধিকাংশ এলাকায়। অবশ্য ভিন্ন চিত্র রাজধানীতে।সরকার ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ স্লোগান দিয়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও রাজধানীর বাইরে এর তেমন প্রভাবই পড়েনি। উপরন্তু, বিভিন্ন সময়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্কুলগুলোয় উপহার হিসেবে দেওয়া কম্পিউটারগুলো ধুলোয় নষ্ট হচ্ছে। লোডশেডিং ও ইন্টারনেটের অতিরিক্ত খরচের কারণে এগুলো প্রায় অচল। এক-দুটি কম্পিউটার স্কুল পরীক্ষাগারে চালানো হলেও বাকিগুলোর খবর নেই। যদিও ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সরকারের অঙ্গীকার ‘জনগণের দোরগোড়ায় সুলভে ও সহজে ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়া’। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, বর্তমানে দেশের মাত্র ৪ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে।জাতীয় সংসদের ডাক ও টেলিযোগাযোগ-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি এ পর্যন্ত সাত-আটবার ব্যান্ডউইডথের দাম কমানোর সুপারিশ করেছে। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। সম্প্রতি সাবমেরিন কেবেলর বিকল্প হিসেবে টেরিস্ট্রিয়াল লিংক স্থাপনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে ‘ডিজিটাল ডিভাইড’ হ্রাসের বিষয়টি উপেক্ষিতই থেকে গেছে।রাজধানীর বাইরে ইন্টারনেটের অতিরিক্ত ব্যয়ের জন্য ইন্টারনেট ব্যবসায়ীরা দায়ী করেছেন ব্যান্ডউইডথের অতিরিক্ত দাম ও পরিবহন খরচকে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ব্যান্ডউইডথ সরবরাহ করে ইন্টারনেট সেবাদাতা (আইএসপি) প্রতিষ্ঠান বিডিকম। সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুমন আহমেদ বলেন, ‘ম্যাঙ্গো ও বিটিসিএল থেকে এক মেগাবাইট ব্যান্ডউইডথ কিনতে আইএসপি প্রতিষ্ঠানগুলোর খরচ হয় ১৮ হাজার টাকা (ভ্যাট ছাড়া)। রাজধানীর বাইরে এই ব্যান্ডউইডথ পরিবহনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ই-ওয়ান বাবদ খরচ হয় কমবেশি আরও ১১ হাজার টাকা। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) কর্তৃক নির্ধারিত বিভিন্ন রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় মিলিয়ে ঢাকার বাইরে এক মেগাবাইট পরিবহনের খরচ কম করে হলেও ৩০ হাজার টাকার বেশি।রাজশাহীর অনলাইন লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী জানালেন, নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে মূলত ভি-স্যাটের মাধ্যমে ব্যান্ডউইডথ ব্যবসা করেন তিনি। কিন্তু ভি-স্যাটের খরচ অনেক। প্রতি মেগাবাইটে খরচ পড়ে দেড় লাখ টাকার বেশি। সম্প্রতি ওয়াইম্যাক্স প্রযুক্তি আসায় প্রতি মেগাবাইটে খরচ হয় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা। কিন্তু প্রযুক্তিটি এখনো নতুন হওয়ায় ইন্টারনেট সরবরাহে প্রায়ই বিঘ্ন ঘটে। আর ঢাকা থেকে এক মেগাবাইট কিনে রাজশাহীতে নিয়ে যেতে ব্যান্ডউইডথের দামসহ পরিবহন খরচ হয় প্রায় ৯০ হাজার টাকা।আইএলডিটিএস নীতিমালা অনুযায়ী লাইসেন্সপ্রাপ্ত ম্যাঙ্গো টেলিকমিউনিকেশনস লিমিটেড এবং বিটিসিএল আইএসপি প্রতিষ্ঠানগুলোর চাহিদা অনুযায়ী ব্যান্ডউইডথ সরবরাহ করে। তারা খুচরা ও পাইকারি হিসেবে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় গ্রাহকদের কাছে ব্যান্ডউইডথ পৌঁছায়। আর বাইরের আইএসপি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ইন্টারনেট পৌঁছে দেয় মূলত রাজধানীর আইএসপি প্রতিষ্ঠানগুলোই। তবে ঢাকার বাইরে ব্যান্ডউইডথ পরিবহনে ই-ওয়ান সার্কিট ভাড়া দেয় বিটিসিএল, ম্যাঙ্গো, গ্রামীণফোন, বাংলালিংক ও সিটিসেল। এভাবে ইন্টারনেট পৌঁছে দিতে উপযুক্ত স্থাপনাসহ বিভিন্ন কারণে খরচ হয় দ্বিগুণেরও বেশি।বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিসিএল) সূত্র জানিয়েছে, প্রতি মেগাবাইট ব্যান্ডউইডথের জন্য বিটিসিএলের খরচ হয় ছয় হাজার থেকে সাত হাজার টাকা। কিন্তু তা বিক্রি করে ১৮ হাজার টাকায় (১৫ শতাংশ ভ্যাট বাদে)। নিজস্ব খরচ ও বিক্রির এই তারতম্য রয়েছে ম্যাঙ্গোর ক্ষেত্রেও। ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আইএসপিএবি) সভাপতি আখতারুজ্জামান মঞ্জু দাম কমানোর পাশাপাশি ব্যান্ডউইডথ থেকে ভ্যাট প্রত্যাহারের পরামর্শ দেন।এদিকে ভারতীয় সরকারি কোম্পানি বিএসএনএল থেকে টেরিস্ট্রিয়াল লিংক ভাড়া নেওয়ার সিদ্ধান্তকে ঐতিহাসিক বলে উল্লেখ করেছেন গ্রামীণফোনের প্রধান নির্বাহী ওডভার হেশজেডাল। তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যতে আমরা আরও অনেক টেরিস্ট্রিয়াল কেবল আইটি খাতে দেখতে চাই। তবে বিশ্বের আউটসোর্সিংয়ের বাজার ধরতে এবং এই খাতের উন্নয়নে অবশ্যই ব্যান্ডউইডথের দাম কমাতে হবে।’ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্রডব্যান্ড পেনিট্রেশন বাড়াতে ব্যান্ডউইডথের দাম কমানোর বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে ইতিমধ্যে সুপারিশ করা হয়েছে। সুপারিশে ইন্টারনেট গ্রাহকদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর স্বার্থ যাতে রক্ষা হয়, সে বিষয়টিও বিবেচনা করে দেখা হবে বলে জানান তিনি।