ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

 

১৮৬২ সালের ১৫ই নভেম্বর উপমহাদেশের এ অংশে রেলওয়ে তার গৌরবময় যাত্রা শুরু করে। বাংলাদেশ রেলওয়ে উপমহাদেশের এ অংশে স্থাপিত রেলওয়ে নেটওয়ার্ক উত্তরাধিকার সূ্ত্রে প্রাপ্ত হয়েছে, যা কলকাতা শহরকে কেন্দ্র করে স্থাপিত হয়েছিল। ১৯৭১ সালে রক্তস্নাত স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ রেলওয়ে তার নেটওয়ার্ক পুনর্বিন্যস্ত করে সকল জেলা সদরকে রেলওয়ে নেটওয়ার্কের আওতায় আনার উপর গুরুত্ব আরোপ করে আসছে এবং এ লক্ষ্যে নিরন্তর কাজ করছে। অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ রেলওয়ে তুলনামূলকভাবে একটি ছোট (২৮৭৭.১০ কি:মি:) রেলওয়ে নেটওয়ার্ক, যার মধ্যে ৬৫৯.৩৩ কি:মি: ব্রড গেজ, ১৮০৮.০৫ কি:মি: মিটার গেজ ও ৪০৯.৭২ কি:মি: ডুয়েল গেজ রেল লাইন বিদ্যমান।

অফিসিয়াল রেকর্ড অনুযায়ী, ব্রিটিশ ভারত ২৬০৩.৯২-কিলোমিটার রুট মালিকানাধীন রেলের, ৬৯ বছর ধরে মাত্র ২৭৪ কিলোমিটার যোগ করতে পারে। রেকর্ড দেখায় যে ১৯৮৩ সালের পর থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত মহাপরিচালক-সহ-সম্পাদক হিসেবে প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীনে রেলওয়ের পরিচালিত হয়। ১৯৯৫ সালে, নয়টি সদস্যের বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়, যা ভাল কাজ করতে পারে না, সরকারকে ২০০৬ সালে নতুন সংস্কার চালু করার জন্য বাধ্য করা হয়। এর আগে, যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত ‘সড়ক ও রেল বিভাগ’ সর্বশেষ সংস্কার কর্মসূচির আওতায় সরকার বিআর’র লাইন লাইন ঘোষণা করেছে, মন্ত্রীকে ক্ষমতায়ন করার জন্য, ডিজি সচিবকে জবাবদিহি করছে। ৬০ জন কর্মীকে সুপারিশ করার চেয়ে মন্ত্রীর সংগঠন দ্বিগুণ হয়েছে।

এত ঐতিহ্যের বাংলাদেশ রেলওয়ে অর্জন, বছরে প্রায় ৯০০ কোটি টাকার উপরে লোকসান গুনছে। এই হিসাবকে ছোট্ট একটু পাটীগণিতিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় প্রতিদিন আড়াই কোটি টাকার কাছাকাছি, আবার প্রতি কিলোমিটারে প্রতি বছর প্রায় একত্রিশ লাখ টাকার উপরে লোকসান দিয়ে যাচ্ছে। তা হলে আমাদের রেলওয়ের অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যত কি? বাংলাদেশের জন্য সকল ধরণের পরিবহন খাত সর্বদাই অত্যান্ত লাভজনক, আর আর অন্যতম কারণ হলো অত্যান্ত জন ঘন বসতিপূর্ণ ছোট্ট একটি দেশ। শুধু মাত্র সব সেক্টরে সরকারি প্রতিষ্ঠান ছাড়া।

মাওয়া পদ্মা সেতুটি ঢাকা থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে। আর ঢাকা থেকে খুলনার দুরত্ত হলো প্রায় ২৮০ কিলোমিটার। অর্থ্যাৎ এই ২৮০ কিলোমিটার নতুন রেললাইন স্থাপন করতে পারলেই কেবল মাত্র পদ্মা সেতুর উপর রেল সংযোগ একটি গুরুত্তপূর্ণ ব্যাপার ছিল। যেমনটি ছিল যমুনা সেতুর ক্ষেত্রে। যার ওপারে ছিল ব্রড গেজ এপারে মিটার গেজ। একটি নতুন পাতই যথেষ্ট ছিল গোটা রেল ব্যবস্থাকে সমন্বয় করতে। কিনতু পদ্মা সেতুর ক্ষত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। সেতুর দুই পার থেকে রেল সংযোগ শুধু মাত্র অনেক দূরেই অবস্থানই বরং ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার।

আজ আমি শুধু ঢাকা থেকে মাওয়ার এই ৪০ কিলোমিটারের ছোট্ট একটু চিত্র দেখাব। ঢাকার জুরাইন থেকে অথবা কমলাপুর থেকেও সংযোগটি নেওয়া যেতে পারে কোনো সমস্যা নেই। তবে সবেচেয়ে প্রথম যে বিষয়টি বলব, তা হলো ঐ দিকে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশ রেলওয়ের এক ইঞ্চিও জমি নেই, মেনে নিলাম সরকার চাইলে যখন তখন যে কোনো লোকের জমি অধিগ্রহন করে নিতেই পারে। তবে তাকে অবশ্যই উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে। ঢাকা-মাওয়া এলাকায় এই ৪০ কিলোমিটার রেল লাইন এর জন্য যে পরিমান জমি অধিগ্রহন করতে হবে তার আনুমানিক মূল্য কত হবে, তা আজ মাওয়া মহাসড়কের দু’পাশের কৃষি জমিতে বিভিন্ন ডেভলোপার কোম্পানির সাইনবোর্ড গুলোর দিকে তাকালেই অনুমান করা যেতে পারে। যদিও বাংলাদেশে জমির মূল্য অনুমানের চেয়ে অনেক বেশি গতিতে এগিয়ে চলে।

মেনে নিলাম সরকারের সেই পরিমান টাকা আছে অথবা কেউ দিবে। সরকার অবশ্যই জানে যে মাওয়া যেতে হলে বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী পার হতে হবে তা ছাড়াও আরো অনেক ব্রিজ-কালভার্ট পার হতে হয়। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন যে ব্যাপারটা তা হলো ভৌগোলিক অবস্থা। গোটা এলাকাটিই পদ্মা অববাহিকায়, তাই প্লাবন নিত্য সঙ্গী। এ বিষয় যারা বিশেষজ্ঞ, তারা আমার মনে হয় এমন কোনো বাজেট করতে পারবেনা যে, তাতে শুধু এই ৪০ কিলোমিটার রেল লাইন সংযোগ বাড়াতে এবং রক্ষনাবেক্ষন করতে কয়েক পদ্মা সেতুর অর্থ লাগবেনা। অবশ্যই প্রয়োজন হবে, বাস্তব কথা হলো কখনো সম্ভব কিনা? আর গায়ের জোরে সম্ভব করা হলেও তা টিকে থাকার সম্ভাবনা কতটুকু, দেশ, জাতি ও জনগণ কতটুকু লাভবান হবে?

মাওয়ার ওপার নিয়ে আর তেমন কথা বলতে ইচ্ছে করছে না, কারণ তার দূরত্ব এবং ভৌগোলিক অবস্থা আরো ভয়াবহ, যা আমাদের সবারই কমবেশি জানা আছে। ওই পারে বেশির ভাগ এলাকাই ভাটির নিম্ন প্লাবন অঞ্চল, বিস্তির্ণ চর আর পার হতে হবে আরো অনেক নদী, শাখা নদী, খাল বিল ইত্যাদি। একই অবস্থা বাংলাদেশ রেলওয়ের এক ইঞ্চি জমিও সে পাড়ে নেই। তাই শত পদ্মা সেতুর চেয়ে বেশি অর্থ লাগবে এই নতুন ২৮০ কিলোমিটার রেল সংযোগ বসাতে। কে করল এ ধরণের প্রজেক্ট? এর অবদান কি?

বাংলাদেশ রেলওয়ের ইতিহাস বলে এই ধরণের পদক্ষেপ তাদের লোকসানকে আরো বহু গুনে বৃদ্ধি করবে, দেশ, জাতি ও গণ মানুষের জীবন যাত্রাকে উন্নতির পথে না নিয়ে, অবনতির পথকে সুগম করে দিবে। ভাবতে কষ্ট হয়, একটি পরিকল্পিত বাঁধের অভাবে যে দেশে লাখ লাখ মানুষের ক্ষেতের ফসল, গৃহপালিত পশুপাখি ধ্বংস হচ্ছে, সে দেশে এই ধরণের পরিকল্পনা। আমার মনে হয় সরকারের উচিৎ হবে সুস্পষ্ট অবস্থা তুলে ধরা কেন পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ করে প্রজেক্ট খরচ বৃদ্ধি, আর এই ২৮০ কিলোমিটার রেল সংযোগ করতে কত প্রজেক্ট খরচ, কবে হবে, কে অর্থ দিবে আর দেশ ও জাতি কি লাভবান হবে?

আসলে এই পরিকল্পনা একটি উম্মাদনা ছাড়া আর কিছু না….আপনি কী বলেন?