ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

বাংলাদেশে বর্তমানে লোকসংখ্যা কত তা সঠিক বলা না গেলেও বিভিন্ন সূত্র সমর্থন করে ১৬ কোটির উপরে হবে। বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হয় তখন ছিল সারে সাত কোটি, আর বর্তমান তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে  ১৬ কোটির উপরে। সেদিনও ছিল ঢাকায় একটিমাত্র হাইকোর্ট বর্তমানেও সেই একটিই আছে। ডিভিশন বেঞ্চ এর সংখ্যা কিছু বাড়লেও সর্বোচ্চ আপিল আদালত সেই একটিই আছে। ইতিমধ্যে ১৯টি জেলা থেকে ৬৪টি জেলা হয়েছে। ৪টি বিভাগ থেকে ৮টি হয়েছে, আরো ২টি প্রস্তাবিত রয়েছে। এরশাদ সাহেব একবার ডিভিশনাল হাইকোর্ট স্থাপন করার কথা বললেও, তা আর কখনো উত্থাপন হয়নি। তাই আজও এই ১৬ কোটি জনগণের বিচারের ভার শুধুমাত্র রাজধানীতে একটি মাত্র হাইকোর্ট এবং তার একটি মাত্র আপিল আদালত।

ইতিমধ্যে আমরা বড় দুই দলের দীর্ঘমেয়াদি মিশন ও ভিশন পেয়েছি সাথে সাথে অনন্যা ছোট ছোট দলেরও রয়েছে অনেক ভিশন ও মিশন। কিন্তু দেশের সবচেয়ে বড় গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ বিচার বিভাগ, তার বিষয়ে তেমন কোন গাইডলাইন নেই। আগামী ২০২১, ২০৩০, ২০৪১ ইত্যাদি সাল গুলোতে বাংলাদেশের লোকসংখ্যা কত হবে এবং একটি সুশৃঙ্খল বিচার ব্যবস্থা কি হবে? মিশন আর ভিশন পর্যালোচনা করলে যা বুঝা  যায়, তা হল, যেমন আছে তেমনই থাকবে। অর্থাৎ আমাদের একটিমাত্র হাইকোর্ট এবং তার একটিমাত্র আপিল আদালতেই দেশের বিচার ব্যবস্থা নির্ভর থাকবে। জনসংখ্যা যত বেড়ে যাক, তাতে কিছু যায় আসে না।

একটি বছরে আমাদের এই সর্বোচ্চ বিচার প্রতিষ্ঠানটি কতদিন কাজ করতে পারে? একটিমাত্র আপিল বিভাগ কতদিনই বা ফুল বেঞ্চ বসতে পারে? যতদিনই বা বসে, তার বেশিরভাগ সময়তো ব্যয় হয় রাজা-বাদশা, রাজনৈতিক  ও চাঞ্চল্যকর মামলা মোকদ্দমার কথা শুনতে। মহামান্য বিচারপতিগণ অবসরে গিয়েও অবসর পান না পেন্ডিং রায় লিখতে। ওই একটিমাত্র আপিল আদালতের সময় কোথায় দেশের সাধারণ মানুষের বিচারগুলো দ্রুত শেষ করতে? আসলেই কি কখনো সম্ভব, একটি মাত্র হাইকোর্ট ও তার একটি মাত্র আপিল আদালতের পক্ষে? এই বৃহৎ বর্তমান ১৬ কোটি, ভবিষ্যৎ অজ্ঞাত, যা অবশ্যই দিন দিন বৃদ্ধি পাবে, সাধারণ জনগণের বিচার কার্য সমাপ্ত করতে।

আমার ব্যক্তিগত হিসাব মতে একজন বিজ্ঞ আইনজীবী সাহেবের ওকালতি সনদ নিতে কমবেশি ত্রিশ বছর বয়স হয়ে যায়। তার জীবনের প্রথম একটি সিভিল মামলা দায়ের করে তা নিয়ে আপিল বিভাগে আসা বাংলাদেশের গড় আয়ুতে তিনি বেঁচে থাকলে কখনো সম্ভব না আপিল বিভাগ পর্যন্ত পৌঁছানো। বাদীর বয়স আমার পক্ষে হিসাব করা সম্ভব না, আর তাকে মামলার সর্বশেষ রায় ঐ বিজ্ঞ আইনজীবী সাহেব শুনিয়ে তার সম্পত্তি তাকে বুঝিয়ে দিয়ে যাবেন এমন কথা ভাবা খুবই দুরূহ। আমাদের মহামান্য প্রদান বিচারপতি সাহেব অহরহই বলছেন বিচার বিভাগ স্বাধীনতার প্রসঙ্গে। কেন আমরা শুনতে পাচ্ছি না সামগ্রিক বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কে?

আমাদের পার্শবর্তী দেশ ভারত, তার রয়েছে ২৪টি হাইকোর্ট।  ভারতে এই গত ২০১৩ সালেও প্রতিষ্ঠা হলো ৩টি নতুন হাইকোর্ট এবং ২০১৬ সালেও একটি (পাটনা হাইকোর্ট)। পাকিস্থানের মত দেশেও রয়েছে ৫টি হাইকোর্ট। মালয়েশিয়ার মত দেশ, যেখানে সবমিলে লোকসংখ্যা হবে ৩ কোটির মতো, সেখানে রয়েছে ২২টি হাইকোর্ট। আমরা কোথায়? আমাদের চিন্তা-ভাবনা কি নিয়ে? বিচার ব্যবস্থা যত দীর্ঘ হবে, তত লাভবান কে হবে? এই সহজ কথাটি আমরা সবাই জানি। আমরা এও জানি দ্রুত সুবিচার না পাওয়া গেলে রাষ্ট্রীয় কাঠামো কখনো শক্তিশালী হবে না। আর রাষ্ট্রীয় বিচার কাঠামো শক্তিশালী না হলে, সে জাতি কখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। অপরাধ ও দুর্নীতির উপর ভিত্তি করে কোন রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন কখনো শক্তিশালী হয় না, হতে পারে না, টিকে থাকে না। যার নমুনা সরকারের ক্ষমতা গেলেই তাদের অবস্থা সম্পূর্ণ না দেখতে পাওয়া গেলেও কিছু দেখা যায় এবং বুঝা যায়। আগামীতেও এর চেয়ে বেশি ভাল কিছু আশা করা যায় না।

আমি মনে করি বাংলাদেশের ২০৪০ সালের ভিশন ও মিশনে প্রতিটি জেলায় একটি করে হাইকোর্ট থাকা দরকার। অনেক আগেই প্রয়োজন ছিল অন্তত প্রতিটি বিভাগে একটি করে হাইকোর্ট, তাই এটাকে আগামী ভিশন ও মিশনে অন্তর্ভুক্ত না  করে আজই পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ নেয়া উচিৎ। একটি স্বাধীন, সার্বভৌম, সুষ্ঠ, নিরপেক্ষ ও যথাসম্ভম দ্রুত বিচার ব্যবস্থা একটি জাতির জন্য অতীব গুরুত্তপূর্ণ যা কেউ দ্বিমত করেন না। কিনতু যত বাধা বিচার বিভাগকে বিকেন্দ্রীকরণ ও স্বাধীন করতে। এক্ষত্রে যাদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি তারাই নিজেদের স্বার্থে কোনোদিন করবেন বলে মনে হয় না। তারাই মনে করেন, যে তারা চিরদিন বেঁচে থাকবে এবং এভাবেই তাদের জীবন চলে যাবে।

দেশের দশটি বিভাগে দশটি হাইকোর্ট থাকলে কি হবে? যা হবে, ঢাকার হাইকোর্টে আর এত মামলা আসবে না। ঢাকার মামলা গুলো বরং বিভাগ অনুযায়ী ভাগ হয়ে যাবে। কার স্বার্থ নষ্ট হচ্ছে তা মনে হয় একজন সাধারণ নাগরিকও বুঝতে পারছেন। আজ যেমন  একজন সরকারি ডাক্তার জেলা শহরে থাকতে চান না। কেন চান না, তাও যেমন সবার জানা। ঠিক বিচারের খেত্রেও তা। আমরা কি কখনও ভাবি আমাদের প্রতিদিন মুখে আহার জোগাড় করে দেয় সেই ব্যাক্তি করা? আমাদের প্রতিদিন বেঁচে থাকতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা কাদের? যখন আমরা  যে যার জায়গায় বড় হয়ে যাই, ভুলে যাই। তাদের অবহেলা ও অবজ্ঞার কোনো কমতি আমাদের মধ্যে নাই। ওই সব লোক গুলো যে কোন একটু অসুস্থ হয় তখন তাদের নূন্যতম সেবাটুকু করতে কত দ্বিধা।  তারা যখন বিভিন্ন মামলা মোকদ্দমায় জড়ায়ে সর্বশান্ত হয় তখন তাদের জন্য কিছুই করার নেই।