ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 
10_Woman+harassment_Protest_DU_0009

পহেলা বৈশাখ ১৪২২ উদযাপনে যে কলংকজনক ঘটনা আমার প্রিয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কলুষিত করেছে তা নিয়ে কিছু লিখব না ভেবেছিলাম । এই সিদ্ধান্তের প্রথম কারণ হচ্ছে – মাথা গরম অবস্থায় আমি আসলে কিছু লেখার মতো স্বাভাবিক অবস্থায় ছিলাম না এবং দ্বিতীয় কারণ ছিল এই বিষয়ে অনেকেই খুব সুন্দর করে প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং আমি তাদের সাথেই একাত্মতা জানিয়ে একটা সমাধানের আশায় ছিলাম বা এখনও হয়তো আছি ।

কিন্তু আজ আমি আমার ব্যক্তিগত কিছু অনুভূতি প্রকাশ করতে চাই যা ঐ অসুস্থ্য ও লজ্জাজনক ঘটনার প্রভাবে আমার জীবনে হচ্ছে।

আমি স্বভাবগতভাবে একটু কঠিন স্বভাবের এক নারী যার মধ্যে তথাকথিত লাজুক মেয়েলি স্বভাব নেই বলতে গেলেই হয় । আমি সহস্র মানুষের ভিড় ঠেলে খুব সহজেই নিজের পথে এগিয়ে যেতে পারি (পড়ুন পারতাম), তা যতই হোক নীলক্ষেত বা ফার্মগেটের মতো কোন জনবহুল এলাকা । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমার কাছে অত্যন্ত আপন এক স্থান, হয়তো বা নিজের বাসার পরে এই স্থানেই আমি সবচেয়ে বেশী নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ বোধ করি (পড়ুন করতাম) । কিন্তু উপরে উলে­খিত ঐ কলংকিত ঘটনার পরে আমার দৈনন্দিন জীবনে যেন ছন্দপতন হয়েছে, আমি যেন কেমন এক ভয়াল সময় পার করছি!

এটা আমি প্রথম বুঝতে পারি ৪ঠা বৈশাখ বিকালে যখন আমার প্রিয় কিছু মানুষের সাথে বাংলা একাডেমির বৈশাখী মেলায় যাই । রিকশা থেকে নেমে দাঁড়ানো মাত্রই মেলার গেটে দাড়ানো কিছু যুবক দেখে আমি যেন থমকে যাই! খুঁজতে থাকি আমার অর্ধাঙ্গকে। কিন্তু আমি তো এমন ছিলাম না ! তারা হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়েরই সাধারণ কিছু ছাত্র, তাদের দেখে আমি কেন ভয় পাব? আমি কেন আমার সবচেয়ে প্রিয় এলাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে এমন নিরাপত্তাহীনতা বোধ করলাম? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো আমার মন তখন বুঝতে পেরেছে কিন্তু আমার সচেতন বিবেক আমাকে তা স্বীকার করতে দেয়নি ।

সেই ভয় কাটিয়ে যখন মেলায় প্রবেশ করলাম তখন শুরু হলো আমার আরেক যন্ত্রণা। যেই স্টলেই ভিড় দেখি সেই স্টলই সচেতনভাবে এড়িয়ে যেতে লাগলাম। প্রথমে আমার অর্ধাঙ্গ মহাশয় বুঝতে পারলেন না কিন্তু কিছুক্ষণ পর যখন তিনি সেটা বুঝলেন তিনি তো চরম অবাক! বিষ্ময় কাটিয়ে শুধু বললেন, তুমি তো এমন ছিলে না, আজ কী হলো? কিভাবে তাকে বুঝাই যে আগে তো কখনও এমন নিরাপত্তাহীনতা বোধ করিনি!

প্রতিবছর যে বৈশাখী মেলায় খুব আগ্রহ নিয়ে ঘুরে বেড়াই সেই মেলায় যখন আমি স্বাচ্ছন্দবোধ করছিলাম না, ক্রমেই ভয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছিলাম তখন এক পর্যায়ে আমার উনি আমাকে মেলার বাইরে নিয়ে এলেন এবং বুঝাতে লাগলেন যে আমি অহেতুক ই ভয় পাচ্ছি! এই পর্যায়ে এসে আমি নিজের কাছে স্বীকার করলাম যে ১লা বৈশাখের সেই কলংকজনক ঘটনাই দায়ী আমার এই নিরাপত্তহীনতার পেছনে!

ফেরার পথে শুধুই ভাবতে লাগলাম আমার সাথে তো সেদিন কিছুই হয়নি, তবে আমি কেন এত ভয় পাচ্ছি? আমি কেন আমার স্বভাবজাত সাহসী মনোভাব দেখাতে পারছিনা? আমার মন তখন হঠাৎই বলে উঠলো, হয়তো নিরাপত্তহীনতা একটি সংক্রামক ব্যাধি যা আমার মনে এক দীর্ঘস্থায়ী ভয় ও অসুস্থ কিছু আশংকা তৈরী করেছে ! এবার আমার সচেতন বিবেক ও এই উত্তর মেনে নিল। সেইদিনের পর থেকে আজ প্রায় একটি সপ্তাহ আমি এই ভীতির সাথেই কাটাচ্ছি । প্রতিদিনের চলাচলও যেন আমার মনে আশংকার ঝড় উঠায়! নিশ্চয়ই আপনাদের অনেকের সাথেও এমনই ঘটছে। অস্বাভাবিক কিছু না কারণ ঐ যে বললাম, নিরাপত্তাহীনতা সংক্রামক!

তারপরও আশা করছি খুব তাড়াতাড়িই হয়তো এই ভীতি আমি এবং আপনারা কাটিয়ে উঠবো, কারণ এরকম অসুস্থ ভীতিকর জীবন মেনে নেওয়া সম্ভব নয় তাই এই ভীতি কাটিয়ে আমাদের স্বাভাবিক হতেই হবে। আবারো বলতে চাই, আমাদের স্বাভাবিক হতেই হবে! কারণ আমরা যে হেরে যেতে চাই না!

slide