ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

815812-Gender-1420136342

আজ এমন একটি সমস্যা নিয়ে লিখছি যে সমস্যা নিয়ে আমরা প্রায়ই বহু কথা বলে থাকি, বহু উপদেশ দিয়ে থাকি কিন্তু আমরা অনেকেই ভেবে দেখিনা যে সমস্যাটির শুরু আসলে কোথা থেকে! আজ তা নিয়েই সামান্য কিছু কথা। আমরা প্রায়ই বলে থাকি যে, আমাদের সমাজ কন্যা সন্তানের আগমনে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হয়, বাবা-মা যেন হতাশ হয়ে উঠে ছেলে সন্তান না হওয়ায়। এই প্রবনতার ফলে বেড়ে যায় কন্যাশিশুভ্রূণ হত্যার মত পাপকাজ। কিন্তু একবারও কি ভেবে দেখেছি যে এই প্রবনতার জন্য বাবা-মা কতটা দায়ি আর আমরা অর্থাৎ সমাজ কতটা দায়ি? সচেতন বিবেকে ভাবলে হয়তো আমাদের দোষটাই বেশি পাবো!

নিজেকে একবার প্রশ্ন করুন, বাবা-মা কেন তাদের নিজের অংশকে ভবিষ্যতে রূপ দেয়ার আগে তার লিঙ্গ পরিচয় নিয়ে ভাবে? যে আনন্দ তাকে পরিপূর্ণতা দিবে তা নিয়ে কেন করে তারা এত হিসাব নিকাশ? এই সমস্যায় বাবা-মা তখনই পড়ে যখন সন্তান জন্মের আগেই কতিপয় জ্ঞানী মুরুব্বি হবু মাকে বলে, ’বংশের বাতি আনতে পারবে তো?’ বলাই বাহুল্য যে, এই বাতি বলতে ফিলিপস লাইট নয় বরং ছেলে সন্তানকেই বুঝায়।

একটি হবু বাবা যখন দেখে  তার যে বন্ধু-ভাইটি পুত্র সন্তানের পিতা সে সকলের কাছে অন্য কোন একটি কন্যাসন্তানের পিতা অপেক্ষা অধিক গুরুত্ব পাচ্ছে, তখন সে মনের অজান্তেই আশা করে বসে একটি পুত্র সন্তানের । এভাবেই একটি নন্দিনী জন্মের আগেই পিতা-মাতার কাছে হয়ে উঠে অ-আদরনীয় ! যদিও বাবা-মা কন্যাসন্তানকে অবহেলা নাও করতে চান তবুও সমাজের কিছু নিষ্ঠুর নিয়মের কারণে তারা নিজের নন্দিনীকেই মনে করেন বোঝা ! কারণ শুধু কিছু কথা দিয়ে চাপ সৃষ্টি করেই সমাজ ক্ষান্ত হয়না বরং গর্ভাবস্থা থেকেই বিভিন্ন ভাবে বাবা-মা কে বুঝিয়ে দেয় যে কন্যা সন্তান হলে কত অসুবিধা ও পুত্র সন্তান হলে কত সুবিধা।

আদরের নন্দিনীকে নিয়ে মা’র প্রথম তিক্ত অভিজ্ঞতা হয় তার গর্ভাবস্থায়ই যদি আগে থেকে জানা যায় যে তার গর্ভস্থ সন্তানটি কন্যা ! কোথায় যেন উবে যায় শ্বশুরবাড়ির সব আদর! ভদ্র ও সুশিক্ষিত স্বামী যেন কেন দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে শেষ বয়সে কে দেখবে আমাদের? আর স্বামী প্রবরটি যদি দয়ামায়াহীন হয় তাহলে তো বলাই বাহুল্য! এই কারণেই কি একটি মা পুত্র সন্তান কামনা করে না যে শ্বশুরবাড়িতে তার অবস্থান দৃঢ় করবে? এখানে মায়ের দোষ কি খুব বেশি?

নন্দিনীকে নিয়ে বিব্রতকর অবস্থায় মা তখনও পরে যখন জন্মের পর সবাই তাকে দেখতে আসে এবং পরবর্তীতে পুত্র সন্তানের কামনা করে যায় । মা’র হয়তো তখন চিৎকার করে বলতে মন চায় ’আমার নন্দিনী কি অপাংক্তেয়? ওকে পৃথিবীতে আনতে কি আমার কম কষ্ট হয়েছে?’ কিন্তু মা তা বলতে পারে না! এই বলতে না পারার কষ্ট যখন কুঁড়ে কুঁড়ে মাকে দংশন করে তখন মা তার সমস্ত কষ্ট তার নন্দিনী’র উপরই ঝাড়ে ! এতে কি শুধুই মা’র দোষ? সে তো নিজের কষ্ট সহ্য করতে না পারার দূ:খে তার আদরের নন্দিনীকে অবহেলা করছে, যে কষ্ট সমাজ তাকে দিচ্ছে!

বাবা-মা তাদের আদরের নন্দিনীকে নিয়ে জীবনের প্রতি পদে পদে সমস্যায় পড়ে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই একবার চিন্তা করে দেখুন কেন বাবা-মা এমন সমস্যাজনক (?!) সন্তান কামনা করবে?! আমরা কি পারছি বাবা-মা’র সমস্যা সমাধান করতে? বাবা-মা আজ যখন স্কুলের মত পবিত্র স্থানে তার নন্দিনীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছেন না তখন কি তারা তাদের অজান্তেই দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন না?! তারা কি ভাবেন না এর চেয়ে বরং ভালো হত যদি তাদের সন্তানটি ছেলে হত!? একটি বাবা যখন শিশু ধর্ষনের খবর পত্রিকায় পড়েন তখন কি নিজের নন্দিনীর জন্য ভয়ে তার বুক কেঁপে উঠেনা?!

উপরোক্ত সকল সমস্যা থেকে নিজের নন্দিনীকে আগলে রেখে বহুকষ্টে বাবা-মা যখন তাকে যোগ্য করে তুলেন, এই সমাজের সম্মানজনক স্থানে অধিষ্ঠিত করেন তখনও কি বাবা-মা পারেন প্রমান করতে যে তাদের নন্দিনী তাদের সমস্যা নয় বরং গর্ব?! এমনকি অনেকসময় মেয়েটিও পারে না বাবা-মা’র প্রতি তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে ! কারণ আবারো সেই সমাজ!

আমাদের সমাজের অলিখিত নিয়মগুলো এখানে আবারো বাঁধ সাধে। এত কষ্টে বড় করা মেয়ের জীবন এবং তার আয়ের উপর বাবা-মা’র যেন কোন অধিকারই থাকে না! মেয়ে যে তখন পরের বাড়ির বউ! মেয়ে যদি তার বাবা-মাকে আর্থিকভাবে সাহায্য করতে চায় তা যেন তখন সমাজের রোষানলে পড়ে ! বাবা-মা যদি মেয়ের থেকে আর্থিক সাহায্য নেয় তবে তারা শিকার হয় সমাজের ভ্রুকুটির! সম্পত্তি ভাগের সময় বহুদূর সম্পর্কের আত্মীয়রাও হয় পুলকিত কারণ সেই বাবাটির তো পুত্র সন্তান নেই আর নন্দিনীরা কি পৈত্রিক সম্পত্তি দেখশুনে রাখতে পারবে ! এমনকি বাবা-মা’র নূন্যতম খেয়াল রাখার জন্যও নন্দিনীকে নিতে হয় তার স্বামীর অনুমতি। এই সময়েই বাবা-মা ভাবে ইশ! যদি আজ আমাদের পুত্র সন্তান থাকতো তবে এই বৃদ্ধাবস্থায় আমাদের খেয়াল রাখতে! মা’র কানে বাজে স্বামী বা অন্য কারো বহুবছর আগে শোনানো কথা ’মেয়েরা তো পরের বাড়ি চলে যাবে,ছেলে থাকলে না বাবা-মা’কে দেখতে! এই ভাবনা’র জন্য কি বাবা-মা কি খুব বেশি দায়ি?

এই পর্যায়ে এসেই বৃথা হয়ে যায় বাবা-মা’র সারাজীবনের সংগ্রাম ও আদরের নন্দিনীকে নিয়ে তাদের স্বপ্ন! কারণ এই নন্দিনী যে এখন আর তাদের কেউ নয় ! বাবা-মা হয়ে যায় একা ও সমাজ পায় সুযোগ তাকে আবার কথা শোনানোর, ’ও আচ্ছা, তোমার তো ছেলে নেই’!

শুধুই নন্দিনী’র বাবা-মা’র দুরবস্থা তুলে ধরার জন্যই আমি এই লেখা লিখছি না । এই লেখার মাধ্যমে সমাজের কাছে, আপনার কাছে আমার একটাই চাওয়া যেন আমরা অন্তত সমাজের এই মানসিক দাসত্ব দূর করার জন্য চেষ্টা করতে পারি। যতদিন না আমরা নন্দিনীরা বাবা-মা’র শক্তিতে পরিণত হতে পারবো ততদিন সমাজের কিছু মানুষ বাবা-মা’র তথাকথিত আস্থা ও ভবিষ্যত নিরাপত্তার জন্য পুত্র সন্তানের কামনা করেই চলবে এবং নন্দিনীরা বাবা-মায়ের বোঝা হিসেবেই বিবেচিত হবে, শক্তি ও গর্ব হিসেবে নয়!