ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

মাতৃত্ব! অদ্ভূত এক অনুভূতি। একজন নারী যেন পূর্ণতা পায় সন্তান জন্মদানের মাধ্যমে। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি যে এ যেন নারীর এক নতুন জন্ম যা তাকে দেয় সৃষ্টির আনন্দ, সন্তানের হাসিতে হারিয়ে যাওয়ার সুখ এবং জীবন ও পৃথিবী কে নতুনভাবে উপলব্ধি করার ঐশ্বরিক এক ক্ষমতা। কিন্তু সমাজের কিছু অংশ কেন যেন মা’র এই আনন্দকে দ্বন্দময় করে তোলে।

দ্বন্দময় মাতৃত্বের শুরু হয় সন্তান জন্মদানের পূর্বেই যখন মা’র সুবিধা-অসুবিধা চিন্তা না করেই কিছু মানুষ মনগড়া কিছু নিয়ম চাপিয়ে দেয় বা দিতে চায়। গৃহিনী মা যদি অবেলায় একটু বিশ্রাম নিতে চায় তাহলেও যেমন তাকে শুনতে হয় এসময়ে বেশী বিশ্রাম নিলে সন্তান অলস হবে তেমনি কর্মজীবি মায়েদেরও আবার শুনতে হয়, “শুধু টাকার চিন্তা না করে এইবার একটু বাচ্চার বিশ্রামের কথা ভাবো, চাকরি টা ছাড়ো।” এই কথাগুলো যে হবু মা’ টির মনে কি এক দ্বন্দ্ব, কি এক অশান্তি তৈরী করে তা সেই মানুষগুলো বুঝেনা, বা বুঝতে চায়না। সেই হবু মা শুধুই ভেবে মরে যে আসলেই কি আমি আমার অনাগত সন্তানের যত্ন করতে পারছি না? এই ধরনের বহু দ্বন্দ্ব ম্লান করে দেয় অনাগত সন্তান কে নিয়ে মা’র আনন্দ আর উচ্ছ্বাস।

15068467_550580955138068_3040599928908503143_o

সন্তান জন্মদানের পর এই দ্বন্দ্ব যেন মা কে আরো আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে। মা যখন তার নাড়িছেড়া ধন কে বুকের দুধ খাইয়ে স্বাস্থ্য নিশ্চিত করার চেষ্টা করে, সন্তানের প্রতি তার প্রথম হক আদায় করে তখন কিছু মানুষ আবারও তার মনে দ্বন্দ্ব ঢুকিয়ে দেয় যে, “শুধু বুকের দুধে কি আর বাচ্চার পেট ভরে? পুষ্টি হয়? দুধ ঠিকমতো পাচ্ছেনা দেখেই তো বাচ্চা এত কাঁদছে! একটু ফিডারে করে কৌটার দুধ দাও না কেন?” এই মানুষগুলো কেন যে বুঝেনা যে একটি বাচ্চা ক্ষুধা ছাড়াও নানা কারণে কাঁদতে পারে!

এর উল্টো রূপও আছে। কিছু মা আবার সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াতে চান না। এর নেপথ্যেও কাজ করে তার কিছু মানসিক দ্বন্দ্ব যা তৈরী হয় সেই সমাজেরই কারণে! যেহেতু সমাজের চোখে তথাকথিত সুন্দরী (!) থাকতে হবে, ফিগার মেইন্টেইন করতে হবে তাই হয়তো সেই মা’টি সন্তান কে দুধ না খাওয়ানোর সিদ্ধান্ত নেন (আমি অবশ্যই সেইসব মা’র কথা বলছি না যারা কোন শারীরিক সমস্যার কারণে বাচ্চা কে দুধ খাওয়াতে পারেন না)। এখানে সেই মা’র থেকে আমি মনে করি সমাজের তথাকথিত মানদণ্ড বেশী দায়ী যা সেই মা’র মনে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করে তার সন্তান ও তার নিজস্ব সৌন্দর্য্যকে নিয়ে।

এরকম আরো বহু অযাচিত ও ভিত্তিহীন সামাজিক উপদেশ নতুন মা কে করে বিষন্ন, যা “প্রসব পরবর্তী বিষন্নতা” যা “বেবী ব্লু” হিসেবে পরিচিত।

মাতৃত্বের এই দ্বন্দ্ব যেন শেষ হওয়ার নয়! উপরে তো কিছু উদাহরণ মাত্র! মাতৃত্বের যাত্রাপথে হাজারো প্রশ্নের আর ভ্রুকুটির সামাল দিতে হয় একজন মা কে। এটা কেন খাওয়াচ্ছো? ওটা কেন খাওয়াচ্ছো না? এভাবে কেন কোলে নিলে? ঐভাবে কেন চুল কাটালে? এই জামা কেন পরালে? ঐখানে কেন নিয়ে গেলে? মায়ের চেয়ে বেশী চিন্তা বাকী সবার! আর এই সবকিছুর ফলাফল মায়ের মনে অগণিত দ্বন্দ্ব!

আর কিছু মায়ের জীবনে এর সাথে যুক্ত হয় স্বামীর সাথে দূরত্ব। সেই স্বামীটিও তখন অন্য নারীর প্রতি আকর্ষণ (প্রেম/শারীরিক সম্পর্ক/মানসিক সম্পর্ক নাও হতে পারে! বেশীরভাগ সময়েই তা শুধুই সময় কাটানো হয়তো) বোধ করার আগে ভাবেনা যে তার স্ত্রী তো তার সন্তানের জন্যই হয়তো তাকে সময় দিতে পারছে না। কোন মা তার স্বামীর এই সুকীর্তির কথা জেনে যায়, আর কেউ হয়তো কখনো জানতেই পারে না। যে নারী জানতে পারে না সে তো মহা সুখী, কিন্তু যে নারী জানতে পারে সেও কি পারে সমাজের সামনে তা স্বীকার করতে?

সেই স্বামী প্রবরটি কিন্তু খুব দ্রুতই ফিরে আসে সেইসব সাময়িক সম্পর্ক থেকে তার সুখের সংসারে কিন্তু সেই নারী’র মনে রয়ে যায় আজীবনের এক অসহ্য কষ্ট যা সে বয়ে চলে আজীবন, নীরবে। কয়জন নারী প্রকাশ করতে পারে এই যন্ত্রণা? সমাজের সামনে, সন্তানের জন্য হাসিমুখে সংসার করে যেতে হয়। সংসার ছেড়ে যাওয়া হয়না কারণ স্বামী তো বলেছে যে না বুঝে একটু ভুল করে ফেলেছিলো কিন্তু এটা তেমন কিছুই ছিলনা! সে শুধু তার স্ত্রীকেই ভালোবাসে। কিন্তু মা হওয়ার সময়ের এই কষ্ট আজীবনের জন্য সেই নারী’র মনে রয়ে যায় ক্ষত হয়ে! মাতৃত্বের ও নারীত্বের এ কেমন দ্বন্দ্ব?

চাকরিজীবি মা’দের কথা তো বলাই বাহুল্য! সন্তানের প্রতি তার তো কোন মায়াই নেই। কেউ বোঝার চেষ্টাও করে না যে, সন্তান কে বাসায় বা ডে-কেয়ার সেন্টারে রেখে যাওয়ার সময় মেই মায়ের মনে কি ঝড় চলে! মা কে শুধুই শুনতে হয়, মা চাকরি করলে কি আর সন্তানের যত্ন হয়!

কিন্তু কেন এ দ্বন্দ্বময় মাতৃত্ব? কেন আমরা একজন মা’কে এটা উপলব্ধি করাতে বদ্ধপরিকর হয়ে যাই যে সে একজন যোগ্য মা নয়? যে মা একটা প্রাণ কে পৃথিবীর আলো দেখায় আমরা তার যোগ্যতা যাচাই করি! তাকে স্ত্রী হিসেবে বঞ্চিত করি? হতে পারে যে সেই মায়ের সন্তান লালন-পালনের ধরন বা সন্তান কে নিয়ে তার ইচ্ছা হয়তো আপনার বা আমার বা সমাজের অন্য কারো সাথে মিলেনা, তাই বলে কি আমরা তার সন্তানের প্রতি তার মমত্ববোধ বা দায়িত্বশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবো? তার স্বামী আরেকজন নারীর সঙ্গ উপভোগ করবে? কেন এই সমাজ একজন মায়ের মমতা কে দ্বন্দ্বময় করে তোলে?

আমি জানি না আপনি পাঠক নারী না পুরুষ। কিন্তু আমি এটা জানি যে যদি আপনি নারী হন, মা হন তাহলে অবশ্যই এখন আপনি আপনার মাতৃত্বের সময়ের স্মৃতি রোমন্থন করছেন। আপনার মনে ভেসে উঠছে আপনার মনের তখনকার দ্বন্দ্ব। কারণ বেশীরভাগ মা’কেই বোধ হয় এই সময়ে এরকম কিছু না কিছু সমাজ কর্তৃক তৈরী মানসিক দ্বন্দের সম্মুক্ষীণ হতে হয়। কেউ মনের কষ্ট মনেই চেপে রাখে, কেউ সমঝোতা করে, কেউ কষ্ট মনে রেখেও অস্বীকার করে কারণ কেউ যেন না জানে যে তথাকথিত শিক্ষিত এই নারীটিও পরোক্ষভাবে নির্যাতিত, আবার অনেকেই দ্বন্দ্বগুলো সমাধানে সফল হয়, কিন্তু এই পর্যায়টা আসেই সব মায়ের জীবনে।

কিন্তু আমার আবারও প্রশ্ন, কেন?

একজন মা’কে আমরা পরামর্শ দিতে পারি, আমাদের শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার আলোকে। কিন্তু কখনোই তার মনে কষ্ট দিয়ে নয়। তাকে ছোট করে নয়। সেই ময়ের হয়তো তখন প্রয়োজন আপনার একটু স্নেহমিশ্রিত পরামর্শ তার নতুন জীবন কে সাজিয়ে তোলার জন্য, তার মাতৃত্বের যাত্রাপথ মসৃণ করার জন্য। আমরা কি পারি না তাদের একটু সাহস দিতে? সন্তান কে নিয়ে তার হাজারো দ্বন্দ্বের মাঝে তাকে একটু সান্তনা দিতে? তার কিছু সাহায্য করে তাকে নিজেকে ভালোবাসা’র সময় দিতে?

অনেক তো প্রশ্ন হলো, অনেক! এখন চলুন না আমরা একটু প্রতিজ্ঞা করি নিজেদের কাছে যে, আমরা নিজেরা অন্তত উপরের সমস্যাগুলো কোন মায়ের মনে সৃষ্টি করবো না। একজন মায়ের মাতৃত্ব কে দ্বন্দ্বময় নয় বরং উচ্ছসিত করে তুলবো। শুধু এই লেখার পাঠকেরাও যদি এ বিষয়ে সচেতন হন এবং অন্তত নিজে একজন মায়ের প্রতি কিছু সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন তাহলেও আমি নিজেকে সার্থক মনে করবো।

আর মায়েদের বলছি, সন্তানের প্রতি নিজের প্রতিটি হক আদায় করুন, নিজের সন্তানের বিষয়ে নিজের ইচ্ছা কে প্রাধান্য দিন। তথাকথিত ভালো স্ত্রী, ভালো বউ, ভালো কর্মী হতে গিয়ে নিজের সন্তানের বিষয়ে সমঝোতা করবেন না। তারচেয়েও বড় কথা, নিজে ভালো থাকুন। মা উচ্ছসিত, আনন্দিত থাকলেই সে সন্তান কে সুস্থভাবে ও সুন্দরভাবে বড় করতে পারবে। সব দ্বন্দ্ব ভুলে নিজের ও সন্তানের জন্য বাঁচুন ও জীবন কে ভালোবাসুন। মাতৃত্ব কে উপভোগ করুন।