ক্যাটেগরিঃ দিবস প্রসঙ্গ

এক. ছোট মেয়েটিকে পাশের বাসায় রেখে বড় মেয়েকে আনতে মা স্কুলে গেলেন। প্রায়ই যান যখন বুয়া আসেনা। কিন্তু ইদানিং কেন যেন ছোট বাচ্চা মেয়েটি পাশের বাসায় থাকতেই চায়না! মাত্র এক ঘন্টা ঐ বাসায় থাকতে চার বছরের বাচ্চা মেয়েটির যে কি সমস্যা তা মা একদমই বুঝতে পারছেননা। গত পরশু অনেক বকা দিয়েও কাজ হলো না!

দুই. আনিলা গত তিন মাস ধরে স্কুলে যাচ্ছে। প্রথম দিকে খুব খুশি মনেই পাঁচ বছরের বাচ্চাটি স্কুলে যেত, কিন্তু কেন যেন গত এক সপ্তাহ ধরে স্কুলে যাওয়ার সময় হলেই সে কান্নাকাটি শুরু করে। জোর করলে কান্নার বেগ আরো বেড়ে যায়! একদিন তো কাঁদতে কাঁদতে অসুস্থই হয়ে গিয়েছিলো! আনিলার বাবা-মা খুব চিন্তিত হয়ে পড়েছেন।

তিন. ছয় বছরের বাচ্চা ছেলেটিকে আজ একটু বেশিই বকা দিয়ে ফেলেছেন রহমান সাহেব। কেন যে মেজাজটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেন না! উনিই বা কি করবেন! শিহাব উনার একমাত্র ছোট ভাই, উনার সাথেই থাকেন। কিন্তু কেন যেন তার ছেলে ইদানিং ছোট চাচা কে সহ্যই করতে পারছে না। শিহাব কত চেষ্টা করছে ভাতিজা কে খুশি রাখতে। চকলেট দিচ্ছে, কোলে নিচ্ছে এবং আরো কত কি! কিন্তু তার ছেলের ঐ এক জেদ, ছোট চাচা কে সে তার কাছেই ভিড়তে দিতে চায়না।

উপরের ঘটনাগুলো কি আপনার নিজের জীবনের সাথে মিলাতে পারছেন? অথবা চারপাশের জগতের সাথে?

উপরোক্ত তিনটি ঘটনা যদি আপনার ব্যাক্তিগত জীবনে না-ও দেখে থাকেন তা-ও আপনি কি জানেন যে বিশ্বব্যাপী এই রকম ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটছে? আপনার বা আমার বা অন্য কারো সাথে!

উপরের প্রতিটি ঘটনা ছোট বাচ্চাকে ঘিরে ঘটিত যা বাবা-মা কে করে তোলে চিন্তিত। কিন্তু এই চিন্তার মাঝে একবারো বাবা-মার মনে স্থান পায়না ‘খারাপ স্পর্শ’ দ্বারা হয়তো তার ছোট নিষ্পাপ বাচ্চাটি আক্রান্ত। কেনই বা এই ধারণা বাবা-মায়ের মনে স্থান পাবে? তাদের কাছে যে তাদের দেবশিশুটি ফুলের ন্যায়। কিন্তু একটি খারাপ স্পর্শ হয়তো একটি শিশুকে উপরের ঘটনাগুলোর মত ব্যবহার করতে বাধ্য করছে। বাবা-মা কি একবারো সন্তানের মনের এই নিভৃত অনুভূতির কথা জানতে চায়?

আমাদের সমাজে বাবা-মা কখনই এটা মেনে নিতে পারেনা যে তার সন্তানটি তারই পরিবারের বা প্রতিবেশি কোন সদস্য দ্বারা খারাপ স্পর্শের শিকার। হয়তো সন্তানটির মা-ও তার ছোটবেলায় এমন ঘটনার শিকার হয়েছে, কিন্তু তা-ও তার সন্তানের বেলায় সে এটা নিয়ে সন্তানের সাথে কথা বলতে চায়না। এটা কি শুধুই সামাজিক প্রেক্ষাপটে আমাদের মানসিক দাসত্ব নয়?

আমি বলছি না যে আপনার কোমলমতি শিশুকে আপনি এখনি সমাজের এই নোংরা কদর্য রূপটি চেনান। কিন্তু একবার অন্তত নিজের বিবেককে আমাদের জিজ্ঞেস করা উচিত যে, ছোট মেয়েটি পাশের বাসায় খেলতে যেতে চাচ্ছেনা, সে কি ঐ বাসার কোন বিকৃত মানসিকতার সদস্য দ্বারা খারাপ স্পর্শের শিকার? হয়তো ঐ স্পর্শ তার শরীরে খারাপ লাগা তৈরি করছে এবং মানসিকভাবে তাকে ভীত করে তুলছে সেখানে যেতে। হয়তো দ্বিতীয় ঘটনায় আনিলা স্কুলের কারো দ্বারা খারাপ স্পর্শের শিকার হচ্ছে যা তার মনে স্কুলের প্রতি ভীতি তৈরি করেছে? হয়তো রহমান সাহেবের ছোট ভাই যখন রহমান সাহেবের ছেলেকে আদর করে তখন তাতে স্নেহ নয় বরং কদর্য থাকে?

এই প্রশ্নগুলো কেন আমাদের অর্থাৎ বাবা-মাদের মনে আসেনা? কেন আমরা সমাজের এই রূপটা স্বীকার করতে চাইনা? আমাদের এই নিয়ে কথা না বলার যে মানসিকতা তা কি আমাদের সন্তানদের আরো বড় বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে না?

বাংলাদেশ শিশু একাডেমি ফোরাম এর তথ্য অনুযায়ি প্রতি মাসে বাংলাদেশে গড়ে ৪৯ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয় এবং এর মধ্যে ২৮ জন শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। আরো ভয়াবহ পরিসংখ্যানের দিকে না হয় না-ই গেলাম।

তাহলে উপায় কি এই ভয়াবহতা থেকে মুক্তির? সমাজের মানুষরূপী জানোয়ারদের হয়তো আমরা একবারে পরিবর্তন করতে পারবো না, কিন্তু নিজের সন্তানকে তো অন্তত একবার বুঝিয়ে বলতে পারি যে, সে তার পরিবার বা প্রতিবেশি বা যে কারো খারাপ স্পর্শের শিকার হতে পারে এবং সেই সময় আপনি হবেন তার বন্ধু যাকে সে তার সমস্যা বা খারাপ লাগাটা বলতে পারবে। আজ যদি আমরা ভাবি যে সন্তান কে সমাজের এই রূপটা দেখানো উচিত হবে না, সে ভীত হয়ে পরতে পারে নিজের পরিবার বা সমাজের যে কোন ভালো ব্যক্তির আন্তরিক স্পর্শের প্রতিও, তাহলে এই মুহূর্তে নিজের এই মানসিকতা ঝেড়ে ফেলুন।

আপনি যদি আপনার সন্তানকে একবার ভালো স্পর্শ এবং খারাপ স্পর্শের পার্থক্য বুঝিয়ে বলেন, তাকে বিশ্বাস করান যে আপনি আছেন তার সাথে তার কথা শোনার জন্য, তার ভালো-মন্দ সকল অনুভূতি অনুভব করার জন্য, তাকে রক্ষা করার জন্য, তাহলে অন্তত আপনার সন্তানটি হয়তো কোন খারাপ স্পর্শের শিকার হলেও সাথে সাথে তা বুঝতে পারবে এবং তা প্রতিরোধ করার চেষ্টা করবে। তাহলে সে আর নিজের মধ্যে গুটিয়ে গিয়ে অন্যায়কে মেনে নিবে না, পরিণত বয়সে হয়ে উঠবে না এক দুর্বল ব্যক্তি। আপনার সন্তান হয়ে উঠবে সাহসী, প্রতিরোধ করবে সব খারাপ স্পর্শকে এবং উপভোগ করবে একটি নিরাপদ ও সচেতন শৈশব।

তাই এই আন্তর্জাতিক নারী দিবসে চলুন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই, সন্তানকে শুধুই ভালো নয় বরং ভালো ও খারাপের পার্থক্য বুঝাবো আন্তরিক স্পর্শ ও কদর্য স্পর্শের পার্থক্য বুঝিয়ে। বিশ্বাস করুন আপনার এই একটি পদক্ষেপ আপনার সন্তানকে শিখাবে অন্যায় প্রতিরোধ করা এবং সে ভবিষ্যতে হয়ে উঠবে একজন সাহসী ও ব্যাক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ, যে নিজেকে সম্মান করবে, সেই সাথে অন্যকেও। সন্তানকে ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝিয়ে আমাদের সন্তানের সুরক্ষা যে নিশ্চিত করতে হবে আমাদেরকেই।