ক্যাটেগরিঃ কৃষি

পরিচিতি
বাংলাদেশের প্রকৃতি এবং জলবায়ু পাট ও পাট জাতীয় ফসল চাষাবাদের জন্য খুবই উপযোগী। পাটের আবাদী দুটি প্রজাতির মধ্যে “দেশী পাটের” উৎপত্তি আমাদের দেশে এবং “তোষার পাটের” উৎপত্তি আফ্রিকায় হলেও বিশ্বের সবচেয়ে উন্নতমানের দেশী এবং তোষা পাট একমাত্র বাংলাদেশেই উৎপাদিত হয়। তাই পাট বাংলাদেশের অতি প্রাচীন সোনালী ফসল। বর্তমানে বাংলাদেশ পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম পাট উৎপাদনকারী দেশ। সত্তর দশক পর্যন্ত এ দেশের অর্থনীতি ছিল মূলত: পাট নির্ভর। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই) ১৭টি দেশী, ১৬টি তোষা, ২টি কেনাফ এবং ১টি মেস্তার জাত উদ্ভাবন ও ছাড়করণ করেছে। পাটের ইংরেজী নাম Jute এবং বৈজ্ঞানিক নাম Corchorus capsularis (দেশী), Corchorus olitorius (তোষা)।

পুষ্টিমাণ
পাট শাক একটি উওমমানের পুষ্টিসমৃদ্ধ ফসল। পাট শাকে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, এ্যালকালয়েড, সোডিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, প্রোটিন, লিপিড, কার্বোহাইড্রেট, নিয়াসিন, ফলিক এসিড এবং ভিটামিন-সি রয়েছে। দেশীয় অন্যান্য শাকের তুলনায় পাট শাকে ক্যারোটিনের পরিমাণ অনেক বেশি। পাটের পাতা দিয়ে স্যুপ, নুড়-লস, ভেজিটেবল ক্যান্ডি তৈরি করা যায়।

ঔষধিগুণ
আফ্রিকা, মধ্যপূর্ব এবং দক্ষিণপূর্ব এশিয়াতেও পাট পাতা ওষুধী হিসাবে দীর্ঘদিন যাবৎ ব্যবহার হয়ে আসছে। জাপান ও বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা)-এর কয়েকজন বিজ্ঞানী প্রমাণ করেছেন যে, পাট পাতায় টিউমার ও ক্যান্সার প্রতিরোধক পুষ্টি উপাদান বিদ্যমান। তাছাড়া পাট পাতার রস বাত নিরোধক, ক্ষুধা বৃদ্ধিকারক, আমাশয়, উদরাময় ও অম্ল্বরোগের মহৌষধ। পাট শাকে ভিটামিন-সি ও ক্যারোটিন থাকায় মুখের ঘা, রাতকানা ও অন্ধত্ব দূরীকরণে সহায়তা করে। পাট শাক অর্জীনতা ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূরীকরণেও সহায়তা করে।

যে সব জায়গায় বেশি পরিমাণে চাষ হয়
ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, বৃহত্তর উত্তরবঙ্গ, যশোর, কুমিল্লা, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও পাবনা জেলায় প্রচুর পরিমাণে পাটের চাষ হয়।

জাত
বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট তাঁর প্রতিষ্ঠালগ্নের পর থেকে দেশী পাট, তোষা পাট, কেনাফ ও মেস্তা ফসলের উন্নতমানের বিভিন্ন জাত উদ্ভাবন করে আসছে। এ প্রতিষ্ঠানটি এ যাবৎ প্রায় ১৭টি দেশী, ১৬টি তোষা, ২টি কেনাফ এবং ১টি মেস্তার জাত উদ্ভাবন করেছে এবং তা কৃষক পর্যায়ে প্রচলিত আছে। নীচে মাঠ পর্যায়ে কৃষকের জন্য জনপ্রিয় জাতগুলির সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দেওয়া হলো:

১. সিভিএল-১
সনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য: গাছ সবুজ। সবচেয়ে জনপ্রিয় জাত। আঁশের মান ভাল, কাটিং কম ।
জমি: মধ্যম নীচু জমিতে
বপনকাল: ১৫ চৈত্র থেকে ৩০ বৈশাখ
প্রথম ফুল আসার সময়কাল: ১২০-১৩০ দিন
ফলন: সর্বোচ্চ ৫৬ মণ প্রতি একরে
মন্তব্য: ভাইরাস রোগ প্রতিরোধ মতা বেশি।

২. বিজেসি-৭৩৭০
সনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য: কাণ্ড সবুজ। পাতা চওড়া, বোঁটার উপরিভাগে হালকা তামাটে রং।
জমি: নীচু থেকে উঁচু জমি
বপনকাল: চৈত্রের ২য় সপ্তাহ থেকে ৩য় সপ্তাহ
প্রথম ফুল আসার সময়কাল: ১০৫-১১৫ দিন
ফলন: সর্বোচ্চ ৫৬ মণ প্রতি একরে
মন্তব্য: অকাল ফুল মুক্ত।

৩. বিজেসি-৮৩
সনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য: গাছের সব অংশ সবুজ। পাতা সরু ও কিনারা ঢেউ খেলানো এবং অগ্রভাগ চোখা।
জমি: নীচু থেকে উঁচু জমি
বপনকাল: ১৫ চৈত্র থেকে ৩০ চৈত্র
প্রথম ফুল আসার সময়কাল: ৯০-৯৫ দিন
ফলন: সর্বোচ্চ ৫১ মণ প্রতি একরে
মন্তব্য: অকাল ফুল মুক্ত।

৪. তোষা পাট (ও-৯৮৯৭)
সনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য: গাছ সম্পূর্ণ সবুজ। পাতা বেশি লম্বা ও চওড়া।
জমি: মধ্যম নীচু থেকে বেশি উঁচু জমি
বপনকাল: চৈত্রের ১ম থেকে শুরু করে বৈশাখের শেষ পর্যন্ত।
প্রথম ফুল আসার সময়কাল: ১৩০-১৫০ দিন
ফলন: সর্বোচ্চ ৫০ মণ প্রতি একরে
মন্তব্য: অধিক ফলনশীল

৫. তোষা পাট (ও-৭২)
সনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য: গাছ সম্পূর্ণ সবুজ। পাতা গোল আকারের। গাছ খুব দ্রুত বড় হয়।
জমি: মধ্যম নীচু থেকে বেশি উঁচু জমি
বপনকাল: ফাল্গুনের শেষ সপ্তাহ থেকে বৈশাখ মাস পর্যন্ত
প্রথম ফুল আসার সময়কাল: ১২০-১৩৫ দিন
ফলন: সর্বোচ্চ ৫৩ মণ প্রতি একরে
মন্তব্য: অধিক ফলনশীল

৬. কেনাফ (এইচসি-২)
সনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য: গাছ সবুজ। পরিণত বয়সে কাণ্ডের উপরিভাগ তামাটে রং দেখা যায়। পাতা গোলাকার, বয়স্ক পাতায় লালচে রং দেখা যায়।
জমি: মধ্যম নীচু এবং জমিতে পানি দাঁড়ানো অবস্থা সহ্য করতে পারে।
বপনকাল: চৈত্র মাস
প্রথম ফুল আসার সময়কাল: ১৫০-১৫৫ দিন
ফলন: সর্বোচ্চ ৭২ মণ প্রতি একরে
মন্তব্য: অধিক ফলনশীল

৭. মেস্তা (এইচ এস-২৪ )
সনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য: কাণ্ড ও পাতা সবুজ। বোঁটার উপরিভাগ এবং কাণ্ডের গীটায় লাল রং দেখা যায়। কাণ্ড মসৃণ।
জমি: উঁচু বেলে বা হালকা মাটি যেখানে পানি দাঁড়ায় না।
বপনকাল: ফাল্গুন থেকে চৈত্র
প্রথম ফুল আসার সময়কাল: ১৭০-১৮০ দিন
ফলন: সর্বোচ্চ ৫১ মণ প্রতি একরে
মন্তব্য: মেস্তা পাটের একমাত্র ছাড়করণকৃত জাত।

চাষের সুবিধা
•- রবি ফসল তোলার পর আমন পর্যন্ত জমি পতিত থাকে, ফলে সেই জমিতে পাট চাষ করা যায়;
•- পাট চাষ করলে জমি নরম থাকে এবং সেই জমিতে আমন ধান চাষ করলে আগাছা কম হয়;
•- পাট চাষের ফলে পাতা পড়ে জমিতে জৈব সারের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়;
•- ভাল আয় হয় ।

স্হান নির্বাচন
যেখানে পানি জমে না এবং উঁচু থেকে মধ্যম উঁচু জমি পাট চাষের জন্য নির্বাচন করতে হবে।

চাষের জন্য পরিবেশ ও মাটি
ফাল্গুন থেকে চৈত্র বেলে দো-আঁশ ও দো-আঁশ মাটি পাট চাষের জন্য খুবই ভাল।

জমি তৈরি
•- আড়াআড়ি চাষ ও মই দিতে হবে;
•- মাটি ঝুরঝুরা করে ৪-৫টি চাষ দিতে হবে। কারণ পাটের বীজ খুবই ছোট।
– বীজের পরিমাণ : সারিতে বপন করলে ২.৫ থেকে ৩ কেজি এবং ছিটিয়ে বপন করলে ৩.২ থেকে ৪ কেজি প্রতি একরে বীজের প্রয়োজন হয়।

রোপণ পদ্ধতি
পাট চাষের জন্য বীজ ছিটিয়ে ও সারিতে উভয় পদ্ধতিতে বীজ বপন করা যায়। সারিতে বপন করলে ২.৫ থেকে ৩ কেজি এবং ছিটিয়ে বপন করলে ৩.২ থেকে ৪ কেজি প্রতি একরে বীজের প্রয়োজন হয়।

আন্তঃ পরিচর্যা
দুটি নিড়ানী দিতে হবে। চারা গাছ ঘন থাকলে পাতলা করতে হবে।

সেচ ব্যবস্থা
খুব খরা হলে প্রয়োজনমত সেচের ব্যবস্থা করতে হবে।

সারের পরিমাণ ও প্রয়োগ (একরপ্রতি)
গোবর ৪০০০-৫০০০ কেজি
ইউরিয়া ৭০-৮০ কেজি
টিএসপি ৪০ কেজি
এমপি ৫০-৫৫ কেজি
জিপসাম ৪০ কেজি
দস্তা সার ৪ কেজি
বোরাক্স ৩ কেজি

বি:দ্র: • জমিতে দস্তা ও গন্ধকের অভাব না থাকলে জিপসাম ও জিংক সালফেট ব্যবহার করার প্রয়োজন নাই। দস্তা ও টিএসপি একসাথে মিশিয়ে দেওয়া যাবে না।

সার প্রয়োগ পদ্ধতি
•- গোবর সার অবশ্যই বীজ বপনের ২-৩ সপ্তাহ পূর্বে জমিতে প্রয়োগ করতে হবে।
-• প্রয়োগকৃত গোবার সার চাষ ও মই দিয়ে মাটির সাথে ভালভাবে মিশিয়ে দিতে হবে।
•- বীজ বপনের দিন প্রয়োজনীয় পরিমাণের ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি, জিপসাম এবং জিংক সালফেট সার জমিতে শেষ চাষের সময় মই দিয়ে মাটির সাথে ভাল করে মিশিয়ে দিতে হবে।
•- দ্বিতীয় কিস্তির (৪৫ দিনে) ইউরিয়া সার প্রয়োগের সময় ল্য রাখতে হবে যেন মাটিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে রস থাকে।
-• দ্বিতীয় কিস্তির প্রয়োজনীয় পরিমাণের ইউরিয়া সার কিছু শুকনো মাটির সাথে মিশিয়ে জমিতে প্রয়োগ করা ভাল।
•- প্রয়োগকৃত ইউরিয়া সার ‘হো’ যন্ত্রের সাহায্যে অথবা প্রচলিত নিড়ানীর সাহায্যে ভাল করে জমিতে মিশিয়ে দিতে হবে।
•- ইউরিয়া সার প্রয়োগের সময় ল্য রাখতে হবে যেন প্রয়োগকৃত সার গাছের কচি পাতায় এবং ডগায় না লাগে।

পাটে ক্ষতিকারক পোকা মাকড় ও তাদের দমন পদ্ধতি
পাট গাছ চারা থেকে আরম্ভ করে পাট কাটা পর্যন্ত প্রত্যেক স্তরে বিভিন্ন পোকা মাকড় দ্বারা আক্রান্ত হয়। গাছের প্রত্যেকটি অংশ এমনকি ফুল এবং ফলও পোকার আক্রমণ থেকে রা পায় না। পোকা-মাকড়ের আক্রমণের ফলে ফলন শতকরা প্রায় ১২ ভাগ কমে যায় এবং আঁশের মানও খারাপ হয়। সময়মত পোকা মাকড় দমনের ব্যবস্থা করলে এ ব্যাপক তির হাত হতে পাট ফসলকে রা করে উন্নত মানের আঁশ উৎপাদন করা সম্ভব।

বিভিন্ন রকম ক্ষতিকারক পোকামাকড় ও দমন করার কার্যকরী এবং উপযোগী পদ্ধতি

উড়চুঙ্গা পোকা
– চারা পাটে অর্থাৎ চৈত্রের মাঝামাঝি হতে জৈষ্ঠ্যের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত উড়চুঙ্গার আক্রমণ দেখা যায়। পূর্ণ বয়স্ক পোকা কালো বাদামী রংঙের। এদের মুখ দেখতে ফড়িং এর মত, পেছনের পা জোড়া বেশ মোটা এবং পায়ে সারি সারি কাঁটা আছে। শুকনো ক্ষেতে খরার সময় উড়চুঙ্গার আক্রমণ বেশি হয়। সাধারণত: এরা বেলে ও বেলে দো-আঁশ মাটিতে সুড়ঙ্গ তৈরি করে বাস করে। সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে বিভিন্ন প্রকোষ্ঠে স্ত্রী পোকা ডিম পাড়ে। ডিম থেকে বাচ্চা বের হওয়ার পর বাচ্চাগুলো সুড়ঙ্গ হতে বের হয়ে সারা মাঠে ছড়িয়ে পড়ে এবং নতুন গর্ত তৈরি করে।

– দিনের বেলায় এর গর্তের ভিতরে থাকে এবং সন্ধ্যা বেলায় গর্ত থেকে বের হয়ে চারা পাট গাছের তি করতে থাকে। পূর্ণবয়স্ক পোকা পাটের শিকড় ও কাণ্ডের গোড়ার অংশ খায়। বাসা বাঁধা ও খাওয়ার জন্য তারা গাছের গোড়া কেটে ফেলে। ফলে উড়চুঙ্গা আক্রমণে গাছের সংখ্যা কমে যায়। ৫ থেকে ১২ সেন্টিমিটার বা ২ থেকে ৫ ইঞ্চি লম্বা চারা পাট গাছ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১. যে সব জায়গায় উড়চুঙ্গার আক্রমণ বেশি হয় সেখানে সাধারণ পরিমাপের চেয়ে ২০% বেশি হারে বীজ বপন করা ভাল; যেন প্রাথমিক অবস্থায় চারার সংখ্যা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে এবং উড়চুঙ্গার আক্রমণে যে তি হয় তা পুষিয়ে নেয়া যায়।

– আক্রান্ত জমিতে গাছের উচ্চতা ২০ সেমি বা ৮ ইঞ্চি হওয়ার পর বাড়তি চারা বাছাই করা যেতে পারে। যে সমস্ত স্থানে উড়চুঙ্গার আক্রমণে চারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে চারা অস্বাভাবিক পাতলা হয়ে যায় সেখানে উপযুক্ত সময়ে রোয়া করে তে ভরে ফেলতে হয়।

– যে সব জমি প্রতি বছর উড়চুঙ্গা দ্বারা আক্রান্ত হয়, সে সব জমিতে সম্ভব হলে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে সপ্তাহ দুই দেরীতে বীজ বপন করলে ফসলের তি কম হয়।

– বিষ টোপ ব্যবহার করেও উড়চুঙ্গা দমন করা যায়। তবে দিনের বেলা বিষাক্ত টোপ ব্যবহার করা ঠিক নয়।

– আক্রমণের মাত্রা বেশী হলে রিপকর্ড ওষুধ অনুমোদিত মাত্রায় প্রয়োগ করা যেতে পারে।

বিছা পোকা বা শুয়ো পোকা
– বিছা পোকার আক্রমণে পাতা সাদা হয়ে যাবে। বিছা পোকা ফসলের অন্যতম প্রধান শত্রু। বৈশাখের মাঝামাঝি হতে এদের আক্রমণ শুরু হয় এবং ভাদ্রের প্রথম পর্যন্ত স্থায়ী হয়। বিছা পোকা বাচ্চা অবস্থায় সাধারণত: হালকা সবুজ বা হলুদ রঙের হয় এবং পূর্ণতাপ্রাপ্ত কীড়া প্রায় ৪ সেমি বা ১.৫ ইঞ্চি লম্বা, কমলা বা গাঢ় হলুদ রঙের হয়।

– দলবদ্ধভাবে থাকা অবস্থায় কীড়াগুলো পাতার উল্টো পিটের সবুজ অংশ খেয়ে পাতাকে সাদা পাতলা পর্দার মত করে ফেলে। এ অবস্থায় আক্রান্ত পাতাগুলো দূর থেকে সহজেই চেনা যায়। বড় হওয়ার সাথে সাথে এরা সারা মাঠে ছড়িয়ে পড়ে এবং পুরো পাতা খেতে শুরু করে। আক্রমণ ব্যাপক হলে এরা কচি ডগা পর্যন্ত খেয়ে গাছকে পাতাশূন্য বা ডাঁটাসার করে ফেলে।

– কয়েক দিন একটানা আকাশ মেঘলা থাকলে এবং সে সাথে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হলে পোকার প্রকোপ মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়। ১. পাটের পাতায় ডিমের গাদা দেখলে তা তুলে ধ্বংস করলে শুয়ো পোকার উপদ্রব এড়ানো যেতে পারে।

– আক্রমণের প্রথম অবস্থায় কীড়াগুলো যখন পাতায় দলবদ্ধ অবস্থায় থাকে তখন পোকা সহ পাতাটি তুলে পায়ে মাড়িয়ে, গর্তে চাপা দিয়ে অথবা কেরোসিন মিশ্রিত পানিতে ডুবিয়ে মারা যায়।

– শুকনা ক্ষেতে পাট কাটার পর জমি চাষ দিলে মাটির নীচে বা ফাটলে যে সমস্ত পুত্তলী লুকিয়ে থাকে সেগুলো বেরিয়ে আসে। এতে পুত্তলী মারা যায় ও পাখী বা অন্যান্য প্রাণী পুত্তলীগুলো খেয়ে পরবর্তীতে পোকার সংখ্যা কমিয়ে দেয়।

– বিছা পোকা যাতে এক তে হতে অন্য ক্ষেতে ছড়াতে না পারে সে জন্য প্রতিবন্ধক নালা তৈরি করা যায়।

– আক্রমণের মাত্রা বেশী হলে রিপকর্ড ওষুধ শতক প্রতি ১০ লিটার পানির সাথে ২০ থেকে ২৫ মিলি মিশিয়ে প্রয়োগ করা যেতে পারে।

ঘোড়া পোকা
– পাটের ঘোড়া পোকা ছটকা পোকা নামেও পরিচিত। বৈশাখের শেষ হতে শুরু করে শ্রাবণের শেষ পর্যন্ত এরা পাট গাছের তি করে। জৈষ্ঠ্যের মাঝামাঝি হতে আষাঢ়ের মাঝামাঝি সময়ে ঘোড়া পোকার সংখ্যা মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়। পূর্ণতাপ্রাপ্ত কীড়া লম্বায় প্রায় ৪ সেমি বা ১.৫ ইঞ্চি গায়ের রঙ সবুজ। কোন কোন সময় বাদামী রঙের হয় এবং গায়ে কালো ডোরা দাগ থাকে। এদের মাথা হলুদ রঙের। সামনের পাখায় ফোটা ও আঁকাবাঁকা কালো দাগ আছে।

– তিন-চার দিনের মধ্যে ডিম থেকে কীড়া বের হয় এবং কচি পাতা খেতে শুরু করে।

– মৌসুমের প্রথম দিকে বৃষ্টিপাত এবং পরে শুষ্ক আবহাওয়া ঘোড়া পোকার বংশ বৃদ্ধির সহায়তা করে।

– ঘোড়া পোকা পাট গাছের কচি ডগা ও পাতা আক্রমণ করে। বারবার কচি ডগাকে আক্রমণের জন্য গাছের আগা নষ্ট হয়ে যায় এবং শাখা-প্রশাখা বের হয়। এতে পাটের ফলন ও আঁশের মান কমে যায়।

– সাধারণত: এদের আক্রমণের ফলে একরপ্রতি ২ থেকে ৩ মন পর্যন্ত আঁশের ফলন কমে যায়। শতকরা ২০টি গাছ আক্রান্ত হলে কীটনাশক ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে। ১. পাট ক্ষেতে পোকার আক্রমণ দেখা দিলে কেরোসিন ভেজানো দড়ি গাছের উপর দিয়ে টেনে নিলে পোকার আক্রমণ কমে যায়।

– শালিক বা ময়না জাতীয় পাখি ঘোড়া পোকা খেতে পছন্দ করে। পাট ক্ষেতে বাঁশের কঞ্চি এবং গাছের ডাল পুঁতে এদের বসার ব্যবস্থা করলে পাখি ঘোড়া পোকা খেয়ে পোকার সংখ্যা কমিয়ে দেয়।

কাতরী পোকা
– চৈত্রের শেষ হতে আরম্ভ করে জৈষ্ঠ্যের শেষ পর্যন্ত পাট ক্ষেতে কাতরী পোকার আক্রমণ দেখা যায়। এরা কচি পাতার নীচের দিকে মুড়ে জাল বুনে থাকে। পূর্ণবয়স্ক কীড়া ঘন সবুজ রঙের, এরা প্রায় ২.৫ সেমি বা ১ ইঞ্চি লম্বা হয়। অল্প বয়স্ক কীড়া কুঁড়ি পাতার ভেতর লুকিয়ে থাকে বলে সচরাচর চোখে পড়ে না। তবে তির চিহ্ন স্পষ্ট দেখা যায়।

– আক্রান্ত চারা গাছের কচি পাতার উপর পোকার মলের ছোট ছোট কালো রংয়ের বড়ি এবং ডগার ঝাঁঝরা কচি পাতা দেখে এদের আক্রমণ সহজেই চেনা যায়।

– পূর্ণ বয়স্ক কীড়া গাছের মাথার সব পাতাই খেয়ে ফেলে এবং গাছের ডগা পাতাশূন্য করে ফেলে। এতে গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে ও গাছের উচ্চতা কমে যায়। ফলে ফলন কম হয়।

– এ পোকার আক্রমণে একর প্রতি দেড় থেকে দুই মণ পর্যন্ত পাটের ফলন কম হতে পারে। তাছাড়া চারা অবস্থায় অনেক দিন খরা থাকলে এবং আবহাওয়া শুকনো থাকলে এর আক্রমণ বৃদ্ধি পায়। ১. নিকসিয়ন ২৫% ইসি পৌনে এক কেজি অর্থাৎ ১২ লিটার পানিতে ১৭.৫ মিলি ছিটালে ভাল ফল পাওয়া যায়।

সাদা মাকড়
– বৈশাখের প্রথম হতে আশ্বিনের মাঝামাঝি পর্যন্ত এরা পাট গাছের তি করে। পাটের আঁশ ও বীজ উভয় ফসলেরই এরা তি করে। পূর্ণাঙ্গ মাকড় খুবই ক্ষুদ্র এবং খালি চোখে দেখা যায় না। কিন’ আক্রান্ত কচি পাতার উল্টো দিকে ভালমত পরীক্ষা করলে এদেরকে সাদা গুড়োর মত দেখা যায়।

– সাদা মাকড় পাট গাছের আগার কচি পাতা আক্রমণ করে পাতার রস চুষে খায়। এতে কচি পাতা কুকড়ে যায় এবং তামাটে রং ধারণ করে। আক্রমণের প্রকোপ বাড়লে পাতা ঝড়ে পড়ে ও গাছের ডগা নষ্ট হয়ে যায়, ফলে গাছ লম্বায় বাড়ে না ও পরে শাখা প্রশাখা বের হয়। এতে আঁশের ফলন কমে যায় এবং মানেরও অবনতি ঘটে।

– সাদা মাকড় ফুলের কুঁড়িকেও আক্রমণ করে। আক্রান্ত কুঁড়ি ঠিকমতো ফুটতে পারে না। ফুলের পাপড়ির রং হলদে থেকে কালচে রং এর হয়ে যায় এবং পরে ঝরে পড়ে। এতে বীজের ফলন কমে যায়। একটানা খরা/অনাবৃষ্টির সময় সাদা মাকড়ের আক্রমণ বেড়ে যায়।

চেলে পোকা
– পূর্ণবয়স্ক চেলে পোকা এক রকম ছোট কালো রং এর শুড় বিশিষ্ট পোকা। স্ত্রী পোকা তার শুড় দ্বারা গাছের ডগা, পূর্বে বা গিটে ছিদ্র করে ডিম পাড়ে। মাঠে যখন পাটের চারা ৫ ইঞ্চির মত লম্বা হয় তখন থেকে চেলে পোকার আক্রমণ শুরু হয়।

– পাট গাছের চারা অবস্থায় চেলে পোকা আলপিনের ছিদ্রের মতো করে পাতা খায়। তারপর ডিম পাড়ার জন্য স্ত্রীপোকা চারাগাছের কচি ডগায় আক্রমণ করে। ডিম থেকে বাচ্চা বের হয়ে ডগার ভিতর চলে যায় এবং সেখানেই বড় হতে থাকে। ফলে গাছের ডগা মারা যায় ও শাখা প্রশাখা বের হয়।

– গাছ যখন বাড়তে থাকে তখন চেলে পোকা পাট গাছের গিরায় গিরায় গাছের উপর ছাল ভেদ করে ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে কীড়া বের হয় এবং ক্রমে এগুলো গাছের মজ্জাতে প্রবেশ করে বড় হতে থাকে। আক্রান্ত স্থান থেকে এক প্রকার আঠা বের হয়ে আসে এবং কীড়ার মলের সাথে মিশে শক্ত গিটের সৃষ্টি করে, পাট পচানোর সময় সেই গিটে পচে না। এই গিটযুক্ত আঁশ বাজারে নিম্ন শ্রেণীর বলে বিবেচিত হয় এবং আঁশের মান ুণ্ন হয়। ফলে দামও কম পাওয়া যায়।

– পাট ক্ষেতের পাশে বনওকড়া গাছ এবং অন্যান্য আগাছা পরিষ্কার রাখলে এ পোকার আক্রমণ কম হয়।

– পাট মৌসুমের প্রথমে ডগা আক্রান্ত চারাগুলো তুলে ফেললে পরবর্তীতে এদের আক্রমণ কমে যায়।

ছাতরা পোকা
– সাধারণত: আষাঢ় মাসের শেষ হতে কেনাফ ও মেস্তা পাটে ছাতরা পোকার আক্রমণ দেখা যায়। এ পোকা দেখতে লম্বাটে গোল এবং হালকা গোলাপী রংয়ের, পোকাগুলো একসাথে থাকে ও এদের উপরিভাগ সাদা তুলার মতো গুড়ায় আবৃত থাকে।

– ছাতরা পোকা গাছের ডগায় দল বেঁধে বাস করে এবং কচি ডগা ও পাতার রস চুষে খায়। ফলে কচি ডগা ও পাতাগুলো কুঁকড়ে যায় এবং আক্রান্ত স্থান ফুলে উঠে। কোঁকড়ানো পাতাগুলো ঝরে যায় ও আক্রান্ত স্থান হতে শাখা প্রশাখা বের হয়। এতে গাছ লম্বায় বাড়ে না ও আক্রান্ত স্থান ভাল করে পনে না।

– পোকার আক্রমণের ফলে ফলন খুবই কম হয় এবং আঁশ নিম্নমানের হয়। বীজ ফসলে আক্রমণ হলে বীজের ফলন খুব কম হয়। মাঠে ২/১টি গাছে আক্রমণ দেখা দেওয়ার সাথে সাথে আক্রান্ত গাছগুলোর ডগা কেটে ফেলে পায়ে মাড়িয়ে বা পুড়িয়ে পোকা ধ্বংস করা যায়।

কেনাফ স্পাইরাল বোরার
– মে মাসের শেষ সপ্তাহ হতে গাছ কাটা পর্যন্ত এরা আক্রমণ করে। এদের রং উজ্জ্বল নীল। সাধারণত: ৪-৬ মিমি লম্বা। এদের মাথা ছোট, শরীর লম্বা। গাছের গোড়া হতে ৩ ফুট উচ্চতা পর্যন্ত কাণ্ডে এদের আক্রমণ সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।

– গাছ পচানোর পর গিরার স্থানের আঁশ ছাড়ানো যায় না অথবা ছিঁড়ে যায়, ফলে আঁশের মান ক্ষুন্ন হয় এবং ফলনও কম হয়। গাছের গোড়ার দিকে মাটির উপর থেকে ৩ ফুট পর্যন্ত অনুমোদিত কীটনাশক ছিটালে ভাল ফল পাওয়া যেতে পারে।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: পোকা দমনকারী প্রতিটি ওষুধ বিষাক্ত। ওষুধ ব্যবহার করার সময় ওষুধ যাতে নাকে মুখে প্রবেশ করতে না পারে সেদিকে ল্য রাখতে হবে। ওষুধ যাতে বাচ্চাদের নাগালের বাইরে থাকে সেদিকে নজর রাখতে হবে। ওষুধ ছিটানোর সময় যদি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা থাকে বা বাতাসের বেগ তীব্র থাকে তবে ওষুধ ছিটানো উচিত হবে না। বাতাসের বিপরীতে কখনও ওষুধ ছিটানো উচিত নয়।
পাটের রোগবালাই ও দমন পদ্ধতি
প্রতি বছর নানা প্রকার রোগের আক্রমণে পাটের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। ক্ষতির পরিমাণ ২০-৪০% পর্যন্ত হতে পারে। সময়মত রোগ নির্ণয় ও দমনের ব্যবস্থা করে পাটকে রক্ষা করা যেতে পারে। ছত্রাক, ভাইরাস দ্বারা বিভিন্ন পর্যায়ে পাট গাছ আক্রান্ত হয়ে রোগ সৃষ্টি হয়।

রোগের নাম লক্ষণ প্রতিকার

চারা মড়ক
– বীজ বপনের পর প্রথম অবস্থায় যে রোগ দেখা দিতে পারে তা হচ্ছে চারা মড়ক। গাছের মোটামুটি ৩০ দিন বয়স পর্যন্ত চারা অবস্থায় ধরা হয়।
– পাট গাছ যখন ১ ইঞ্চি থেকে ৪-৫ ইঞ্চি লম্বা হয় তখন এ রোগ দেখা দিতে পারে।
– আক্রান্ত চারার গোড়ায় কালো দাগ ধরে চারা মারা যায়। ১. চারা মড়কের কবল থেকে রা পাওয়ার প্রধান উপায় বীজ শোধন। বীজ বপনের আগে ভিটাভেট-২০০ (০.৪%) দিয়ে বীজ শোধন করে নিলে চারা মড়কের হাত থেকে রা পাওয়া যায়।
– যদি রোগ ব্যাপকহারে দেখা দেয় তবে মরা চারা উঠিয়ে ফেলে জমিতে ডাইথেন এম-৪৫ প্রতি ১০ লিটার পানিতে ১০ গ্রাম মিশিয়ে সেই পানি চারা গাছে ছিটিয়ে দিতে হবে।
– পটাশ সার প্রয়োগ করে জমি ভালোভাবে নিড়িয়ে দিলে রোগ কম হয়।
– জমি যেন ভিজা স্যাঁতসেঁতে ও তাতে পানি জমে না থাকে সেদিকে ল্য রাখতে হবে।

ঢলে পড়া
– এ রোগে গোটা পাট গাছ ঢলে পড়ে ও মরে যায়। দেশী পাটে এ রোগ তোষার চেয়ে কম দেখা যায়।
– ছোট ও বড় উভয় অবস্থায় পাট গাছ এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে। ৩. ফুল আসার সময় থেকে তোষা পাটে এ রোগ বেশি হয়। ১. আক্রান্ত জমিতে পানি থাকলে তা সরিয়ে ফেলতে হবে।
– গাছের গোড়া আবর্জনামুক্ত রাখতে হবে।
– আক্রান্ত ক্ষেতে ২-৩ বছর তোষা পাটের আবাদ না করে দেশী পাটের আবাদ করা যেতে পারে।
– পাট কাটার পর গাছের গোড়া, শিকড় ও অন্যান্য পরিত্যক্ত অংশ সংগ্রহ করে পুড়িয়ে ফেলতে হবে।

কাণ্ড পচা
– চারা যখন ৬ থেকে ৮ ইঞ্চি লম্বা হয় তখন থেকে শুরু করে পূর্ণবয়স পর্যন্ত পাট গাছ এ রোগে আক্রান্ত হয়।
– পাতা ও কাণ্ডে গাঢ় বাদামী রং-এর দাগ দেখা দেয়। এ দাগ গোড়া থেকে গাছের আগা পর্যন্ত যে কোন অংশে দেখা দিতে পারে।
– ভালোভাবে লক্ষ্য করলে দাগী জায়গাগুলোতে অসংখ্য কালো বিন্দু দেখা যায়। এ কালো বিন্দুগুলোতে ছত্রাক জীবাণু থাকে, এরা বাতাসে বা বৃষ্টির পানির মাধ্যমে আশে পাশের গাছে সংক্রমিত হয়।
– কখনো কখনো আক্রান্ত স্থানে গোটা গাছই ভেঙ্গে পড়ে। ১. পাট কাটার পর জমির আগাছা, আবর্জনা ও পরিত্যক্ত গাছের গোড়া উপড়িয়ে পুড়ে ফেলতে হবে।
– বীজ বপনের আগে বীজ শোধন করতে হবে। বীজ শোধনের জন্য ভিটাভেট-২০০ (০.৪%)-এর ব্যবহার যথেষ্ট সুফল দেয়। এছাড়া কাঁচা রসুন বাটা দ্বারা বীজ শোধন করা যায়। (১২৫ গ্রাম বাটা রসুন ১ কেজি বীজে ভালোভাবে মিশ্রিত করে উত্তমরূপে শুকিয়ে নিতে হবে।) পাটের প্রধান ছত্রাক জনিত রোগগুলো বীজ এবং মাটিবাহী। বপনের আগে বীজ শোধনের ফলে রোগের প্রকোপ অনেক কমে যায়। শোধন করা সম্ভব না হলে বপনের আগে বীজ কড়া রোদে শুকাতে হবে।
– জমিতে চারা অবস্থা থেকে শুরু করে পূর্ণ অবস্থা পর্যন্ত যখনই রোগের প্রকোপ দেখা দিবে তখনই রাসায়নিক ওষুধ ছিটানোর ব্যবস্থা করতে হবে। প্রথমে রোগাক্রান্ত গাছ উঠিয়ে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। পরে প্রতি ১০ লিটার পানিতে ৩০ গ্রাম ডাইথেন এম-৪৫ গুলে ৩-৪ দিন পরপর ২-৩ বার করে জমিতে ছিটাতে হবে। গাছের বয়স অনুসারে প্রতিবারে একরপ্রতি ৩৫০-৪৫০ লিটার ওষুধ মিশানো পানি ছিটানো যেতে পারে।
– নীরোগ পাট গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করতে হবে। গাছের অর্ধেক ফল পাকলেই বীজ কেটে ফেলতে হবে। দেরী করলে ফলে ছত্রাক সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
– জমিতে সর্বদা পানি বের করে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

শুকনা ক্ষত
– এ রোগ শুধু দেশী পাটে দেখা যায়। চারা অবস্থায় এ রোগ চারা মড়কের সৃষ্টি করে।
– বড় গাছে কাণ্ডে কালচে দাগ পড়ে। আক্রান্ত স্থান ফেটে যায়। ফাটা অংশ থেকে কখনও কখনও আঁশ ছিবড়ের মতো বের হয়ে আসে।
– ক্ষতস্থানে জীবাণু সৃষ্টি হয়। এ জীবাণুগুলো বাতাসে উড়ে ফল আক্রমণ করে। আক্রান্ত ফল কালো ও আকারে ছোট হয়। এ রোগে গাছ মরে না, তবে আক্রান্ত অংশ শক্ত হয়। তাই পাট পচানোর পরেও আক্রান্ত স্থানের ছাল পাট কাঠির সাথে লেগে থাকে। এর ফলে আঁশ নিম্নমাণের হয়।
– তোষা পাটে এ রোগ হয় না বলে বীজ পাটের জমিতে পর্যায়ক্রমে তোষা ও দেশী পাটের চাষ করলে এ রোগের প্রকোপ অনেক কমে যায়।
– পাট কাটার পর জমির আগাছা, আবর্জনা ও পরিত্যক্ত গাছের গোড়া উপড়িয়ে পুড়ে ফেলতে হবে।
– বীজ বপনের আগে বীজ শোধন করতে হবে। বীজ শোধনের জন্য ভিটাভেঙ-২০০ (০.৪%)-এর ব্যবহার যথেষ্ট সুফল দেয়। এছাড়া কাঁচা রসুন বাটা দ্বারা বীজ শোধন করা যায়। (১২৫ গ্রাম বাটা রসুন ১ কেজি বীজে ভালোভাবে মিশ্রিত করে উত্তমরূপে শুকিয়ে নিতে হবে।) পাটের প্রধান ছত্রাক জনিত রোগগুলো বীজ এবং মাটিবাহী। বপনের আগে বীজ শোধনের ফলে রোগের প্রকোপ অনেক কমে যায়। শোধন করা সম্ভব না হলে বপনের আগে বীজ কড়া রোদে শুকাতে হবে।
– জমিতে চারা অবস্থা থেকে শুরু করে পূর্ণ অবস্থা পর্যন্ত যখনই রোগের প্রকোপ দেখা দিবে তখনই রাসায়নিক ওষুধ ছিটানোর ব্যবস্থা করতে হবে। প্রথমে রোগাক্রান্ত গাছ উঠিয়ে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। পরে প্রতি ১০ লিটার পানিতে ১৮.৫ গ্রাম ডাইথেন এম-৪৫ গুলে ৩-৪ দিন পরপর ২-৩ বার করে জমিতে ছিটাতে হবে। গাছের বয়স অনুসারে প্রতিবারে একরপ্রতি ৩৫০-৪৫০ লিটার ওষুধ মিশানো পানি ছিটানো যেতে পারে।
– নীরোগ পাট গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করতে হবে। গাছের অর্ধেক ফল পাকলেই বীজ কেটে ফেলতে হবে। দেরী করলে ফলে ছত্রাক সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
– জমিতে সর্বদা পানি বের করে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

কালো পট্টি রোগ
– কালো পট্টি রোগের লণ প্রায় কাণ্ড পচা রোগের মতই। তবে এতে কাণ্ডে কালো রং এর বেস্টনীর মত দাগ পড়ে।
– আক্রান্ত স্থানে ঘষলে হাতে কালো গুড়ার মত দাগ লাগে। সাধারণত: গাছের মাঝামাঝি বয়স থেকে এ রোগ বেশি দেখা যায়।
– এ রোগে গাছ ভেঙ্গে পড়ে না তবে গোটা গাছটি শুকিয়ে মরে যায়, ফলে আঁশ নিম্নমাণের হয় ও ফলন কম হয়।
– পাট কাটার পর জমির আগাছা, আবর্জনা ও পরিত্যক্ত গাছের গোড়া উপড়িয়ে পুড়ে ফেলতে হবে।
– বীজ বপনের আগে বীজ শোধন করতে হবে। বীজ শোধনের জন্য ভিটাভেঙ-২০০ (০.৪%)-এর ব্যবহার যথেষ্ট সুফল দেয়। এছাড়া কাঁচা রসুন বাটা দ্বারা বীজ শোধন করা যায়। (১২৫ গ্রাম বাটা রসুন ১ কেজি বীজে ভালোভাবে মিশ্রিত করে উত্তমরূপে শুকিয়ে নিতে হবে।) পাটের প্রধান ছত্রাক জনিত রোগগুলো বীজ এবং মাটিবাহী। বপনের আগে বীজ শোধনের ফলে রোগের প্রকোপ অনেক কমে যায়। শোধন করা সম্ভব না হলে বপনের আগে বীজ কড়া রোদে শুকাতে হবে।
– জমিতে চারা অবস্থা থেকে শুরু করে পূর্ণ অবস্থা পর্যন্ত যখনই রোগের প্রকোপ দেখা দিবে তখনই রাসায়নিক ওষুধ ছিটানোর ব্যবস্থা করতে হবে। প্রথমে রোগাক্রান্ত গাছ উঠিয়ে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। পরে প্রতি ১০ লিটার পানিতে ৩০ গ্রাম ডাইথেন এম-৪৫ গুলে ৩-৪ দিন পরপর ২-৩ বার করে জমিতে ছিটাতে হবে। গাছের বয়স অনুসারে প্রতিবারে একরপ্রতি ৩৫০-৪৫০ লিটার ওষুধ মিশানো পানি ছিটানো যেতে পারে।
– নীরোগ পাট গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করতে হবে। গাছের অর্ধেক ফল পাকলেই বীজ কেটে ফেলতে হবে। দেরী করলে ফলে ছত্রাক সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
– জমিতে সর্বদা পানি বের করে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

আগা শুকিয়ে যাওয়া
– সাধারণত: তোষা ও কেনাফ পাটে এ রোগ দেখা যায়।
– ঝড়ে বা অন্য কোন কারণে গাছে আঘাত লাগলে এ রোগ বেশি হতে পারে।
– রোগে আক্রান্ত অংশ বাদামী-রং এর হয় এবং আগা থেকে নীচে শুকাতে থাকে।
– ফুল আসার পর সচরাচর এ রোগ দেখা দেয়। তোষা পাটে এ রোগ বেশি হয়। রোগ দেখা দিলেই ডাইথেন এম-৪৫ নামক ছত্রাকনাশক ওষুধ ১৮.৫ গ্রাম প্রতি ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে ২/৩ দিন পরপর অন্তত: ২ বার গাছে স্প্রে করতে হবে।

পাতায় সাদা গুড়া পড়া
– পাতার উপর হাল্কা পাউডারের মত অসংখ্য ছাতা রোগের জীবাণু থাকে।
– এ রোগ পাট মৌসুমের শেষে বীজ সংগ্রহের জন্য রাখা পাট গাছে দেখা যায়। দেশী পাটে এ রোগের প্রকোপ বেশি। রোগের লক্ষণ দেখা মাত্রই থায়োভিট বা কোন গন্ধক জাতীয় ওষুধ ৩২.৫ গ্রাম প্রতি ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে ছিটাতে হবে।

পাতায় হলদে ছিট পড়া রোগ বা মোজাইক
– মোজাইক আক্রান্ত পাট গাছের সংগৃহীত বীজ বপনের ফলে এ রোগ হয়ে থাকে।
– গাছ বড় হওয়ার সাথে সাথে পাতায় হলুদ-সবুজ ছিট দাগ পড়ে, আক্রান্ত গাছের বাড় কমে যায় এবং আঁশের পরিমাণ শতকরা ৫০% পর্যন্ত কমে যাওয়ার আশংকা থাকে।
– প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবে নীরোগ গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করা উচিত।
– জমিতে আক্রান্ত চারা দেখামাত্র তা তুলে ফেলতে হবে।
– কোনক্রমেই হলদে সবুজ ছিট পড়া আক্রান্ত গাছকে সুস’ গাছের আশে পাশে বাড়তে দেয়া ঠিক নয়।
– সাদা মাছি মারার জন্য মাঝে মাঝে পাট ক্ষেতে ডায়াজিনন প্রতি ১০ লিটার পানিতে ১৫ মিলি পরিমাণ ওষুধ মিশ্রণ তৈরি করে ৩০-৪০ দিন বয়সের গাছে ৭ দিন পর পর ২-৩ বার ছিটানো উচিত।
– পাট গছের মাঝামাঝি বয়সে বাড়ন্তকালে যদি এ রোগ ব্যাপকভাবে দেখা দেয় তাহলে ঐ ক্ষেতের পাট গাছ থেকে আঁশ সংগ্রহ করা চলতে পারে কিন’ বীজ সংগ্রহ করা একেবারেই নিষিদ্ধ।
– আক্রান্ত গাছের বীজ সংগ্রহ করে বপন করলে পরবর্তী বছর ব্যাপকভাবে এ রোগ দেখা দেবে।

গোড়া পচা
– এ রোগের ফলে গাছের গোড়া পচে যায় এবং গাছ ভেঙ্গে পড়ে। ১. জমিতে এ রোগ দেখা দিলে গাছ কেটে আঁশ সংগ্রহ করতে হবে।
– এ রোগের প্রতিকারের জন্য জমি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং আবর্জনামুক্ত রাখতে হবে।
– পানি বের করার উপযুক্ত ব্যবস্থা করতে হবে।
– ডাইথেন এম-৪৫ প্রতি ১০ লিটার পানিতে ৩৫-৪০ গ্রাম মিশিয়ে গাছের গোড়ায় পর পর দু’দিন প্রয়োগ করা যেতে পারে।

শিকড়ে-গিট রোগ
– এ রোগে আক্রান্ত গাছের শিকড়ে ছোট বড় অনেক গিট দেখা যায়। এ গিটের ভিতর এক প্রকার কৃমিকীট (নেমাটোড) অবস্থান করে এবং গাছের তি সাধন করে।
– এরা বিশেষ করে গাছের শিকড়ে ছত্রাক আক্রমণের অনেক সুবিধা করে দেয়।
– গাছের বাড় কমে যায় এবং ফুল কম ধরে।
– যে সব জমির পাটে এ রোগ দেখা দেয়, পরবর্তী রবি মৌসুমে ঐ সব জমিতে সরিষা, গম, যব, ভুট্টা, চিনাবাদাম প্রভৃতি এবং খরিফে ধান, কাওন, শন, জোয়ার ইত্যাদি বপন করা হলে রোগ জীবাণু কমতে থাকে।
– কার্বো ফুরান গ্রুপের রাসায়নিক ওষুধ প্রতি একরে ১৬ কেজি প্রয়োগ করে নিড়ানী এবং চূড়ান্তভাবে গাছ পাতলা করে দিতে হবে।
– সম্ভব হলে জমি পতিত বা পর্যায়ক্রমে মেস্তা পাটের চাষ করা যেতে পারে ।
– বপনের বেশ কিছু দিন আগে চাষ করে জমি রোদে ফেলে রাখতে হবে।
– আক্রমণের মাত্রা বেশী হলে কার্বোফুরান গ্রুপের ওষুধ অনুমোদিত মাত্রায় প্রয়োগ করা যেতে পারে।

বীজ পাটের রোগ হলে করণীয়
– বীজ পাটের ফসলে কাণ্ড পচা, শুকনো ত, কালপট্টি, পাতায় গুঁড়ো পড়া প্রভৃতি ছত্রাক জাতীয় রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। ১. ফল ধরার পর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ডাইথেন এম ৪৫ প্রতি ১০ লিটার পানিতে ১৮.৫ গ্রাম ওষুধ মিশিয়ে তিন দিন পরপর দু’তিন বার স্প্রে করতে হবে।
– পাতায় এবং ফলে সাদা গুঁড়ো পড়লে থায়োভিট নামক ওষুধ প্রতি ১০ লিটার পানিতে ৩২.৫ গ্রাম মিশিয়ে গাছের পাতায় এবং ফলে স্প্রে করতে হবে।
– ফুল ধরার সময় কোন ওষুধ স্প্রে করা ঠিক নয়।
– কেনাফ ও মেস্তা পাটেও অনুরূপ ব্যবস্থা নিতে হবে।
– বীজ পাটের ফসলে সব স্তরেই মোজাইক আক্রান্ত গাছ উঠিয়ে ফেলতে হবে।

বীজ শোধন পদ্ধতি
একটা ঢাকনাওয়ালা কাচের, প্লাস্টিকের বা টিনের পাত্রে প্রতি ১ কেজি বীজের জন্য ৪ গ্রাম ভিটাভেট-২০০ (০.৪%) বীজের সঙ্গে মিশাতে হবে। পাত্রের মুখ বন্ধ করে রাখতে হবে। তারপর সমানে না মেশা পর্যন্ত পাত্রটি ঝাঁকাতে হবে। শোধিত বীজ এমন পাত্রে রাখতে হবে যাতে বাতাস যেতে না পারে।

ফসল সংগ্রহ ও সংগ্রহের পর করণীয়
পাট আঁশ কল-কারখানায় ব্যবহার করা হয়। কাজেই আঁশের মান ঠিক না থাকলে এর কোন মূল্য থাকে না। বীজ বপন থেকে পাট শুকানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে যত্নশীল হলে অল্প জমিতে অধিক পরিমাণ উন্নত আঁশ পাওয়া যায়, যা আপনাকে অধিক মুনাফা এনে দেবে। যে জমি ভাল নয় অথবা ধারে কাছে পচানোর উপযুক্ত পানির উৎস নেই, সেখানে পাট চাষ করার আগে বারবার ভাবুন।

ফসল সংগ্রহ
১২০ দিন বয়স পার হলে যখন ফুল আসে তখন সংগ্রহের উপযুক্ত সময়।

ফসল সংগ্রহের পর করণীয়
•- পাটের গাছ লম্বা, মোটা ও চিকন গুলো বাছাই করতে হবে;
•- ১০ কেজি করে আঁটি করতে হবে;
•- আঁটিগুলো বেশি শক্ত করা যাবে না;
-• জাগের সময় মাটি, মাটির ঢেলা, ঝিগার গাছ, কলা গাছ ব্যবহার করা যাবে না;
-• জাগের সময় মাটি, মাটির ঢেলা, ঝিগার গাছ, কলা গাছ ইত্যাদি ব্যবহার করা হলে আঁশের রং কালো হবে;
•- জাগের সময় সিমেন্টের স্লাব ব্যবহার করা যেতে পারে;
•- জাগ দেওয়ার আগে পাট গাছের গোড়া থেতলিয়ে দিতে হবে।

আঁশ সংগ্রহ
– পাটের আঁশ গাছের বাকল থেকে উৎপন্ন হয়। বাকল থেকে আঁশ সংগ্রহ করার জন্য কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করতে হয়, যেমন- পচন, আঁশ ছাড়ান, ধৌতকরণ।
– উন্নত গুণাগুণ সম্পন্ন জাতের বীজ বপন করে উপযুক্ত পরিচর্যায় ফসলকে আবাদ করা হলেও আঁশ সংগ্রহ প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপের প্রতি নজর দেয়া না হলে আঁশের মান নিকৃষ্ট থেকে নিকৃষ্টতর হয়ে থাকে।
– পক্ষান্তরে, নিকৃষ্ট মানের জাত বপন করেও সংগ্রহ প্রক্রিয়াগুলো ভালোভাবে প্রয়োগ করা হলে আঁশের মান বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়। সে প্রেক্ষিতে পাট বীজ বপন থেকে শুরু করে পাট বাজারজাতকরণ পর্যন্ত যে কাজগুলো করতে হয় তার মধ্যে আঁশ সংগ্রহকরণ প্রক্রিয়াকে সবচেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

আঁশ পচন প্রক্রিয়া
পানি এবং পানিতে বসবাসকারী অসংখ্য জীবাণুর মিলিত প্রচেষ্টায় পাট গাছের বাকল থেকে আঁশ পৃথক হওয়ার প্রক্রিয়াকে পচন প্রক্রিয়া বলা হয়। বাংলাদেশের ব্যাপক এলাকায় পাট চাষ করা হয়। এর মধ্যে কোথাও কোথাও পাট গাছ কাটার সময় পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যায় আবার কোথা কোথাও পাট পচানোর সময় পানি থাকে না বা থাকলেও খুবই অপর্যাপ্ত এবং ঘোলা থাকে। এ প্রেক্ষিতে দুটি উপায় অবলম্বন করলে এদেশের উৎপাদিত সকল পাটই উন্নত মানের হতে পারে।

পর্যাপ্ত পানি থাকা অঞ্চল : পর্যাপ্ত পানি থাকা অঞ্চলের জন্য পাট পচন প্রক্রিয়াকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হযেছে, যেমন-

ক. বাছাইকরণ : পাটের জমিতে ছোট, বড়, চিকন, মোটা নানা রকমের পাট গাছ হয়। ছোট ও চিকন গাছ মোটা ও বড় গাছের আগে পচে। কাজেই পাট কাটার পর মোটা ও চিকন গাছকে পৃথক করে আলাদা আলাদা আঁটি বাঁধতে হবে। এ ধরনের একটি আঁটির ওজন ১০ কেজির হবে। ছোট ও চিকন এবং মোটা ও বড় পাটের গাছগুলোকে পৃথক পৃথকভাবে জাগ দিতে হবে। পাটের আঁটি কখনও খুব শক্ত করে বাঁধা যাবে না। এতে পাট পচতে বেশি সময় লাগে। কারণ শক্ত আঁটির মধ্যে পানির পচনকারী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়া বা জীবাণু ভালভাবে প্রবেশ করতে পারে না।

খ. পাতা ঝরান : আঁটি বাঁধা শেষ হলে সেগুলোকে ৩-৪ দিন জমির উপর স’প করে রাখতে হবে। এই সময়ের মধ্যে পাতা ঝরে যাবে এবং গাছগুলো কিছুটা শুকিয়ে যাবে। পাতাগুলোকে জমির উপরে ছড়িয়ে দিতে হবে। এইগুলো ভাল সার। পাট গাছগুলো কিছুটা শুকানোর ফলে পানিতে ডুবানের পর গাছের ভিতর তাড়াতাড়ি পানি প্রবেশ করতে পারে।

গ. গোড়া ডুবান অথবা গোড়া থেতলান : আঁশ শুকানোর পর দেখা যায় গোড়ার দিকে কিছু কিছু অংশ ছাল যুক্ত অবস্থায় রয়ে গেছে। এই ছাল যুক্ত অংশকে কাটিং বলে। দুই উপায়ে এই কাটিং সমস্যা দূর করা সম্ভব- ১. পাতা ঝরার পর পাট গাছের গোড়ার দিকে প্রায় ৪৫ সেন্টিমিটার বা দেড় ফুট পরিমাণ অংশ ৩-৪ দিন পানির নীচে ডুবিয়ে রাখতে হবে। এতে গোড়ার অংশ অনেক নরম হয়ে যাবে, ২. পাট গাছের গোড়ার প্রায় ৪৫ সেন্টিমিটার বা দেড় ফুট পরিমাণ অংশ একটি কাঠের হাতুড়ীর সাহায্যে সামান্য থেতলানোর পর আঁটিগুলোকে পানির নীচে ডুবিয়ে দিন। মনে রাখবেন এই দুইটি উপায়ের যে কোন একটি উপায় ব্যবহার করবেন। দুইটি একসঙ্গে কখনই নয়।

ঘ. পানি নির্বাচন : যে পানি খুব পরিষ্কার এবং তার মধ্যে অল্প স্রোত থাকে সেই পানি পাট পচনের জন্য সবচেয়ে ভাল। এ ধরনের পানি সাধারণত: বিল এবং কিছু কিছু খালের মধ্যে দেখা যায়। কোন নিকটবর্তী স্থানে এই ধরনের পানি থাকলে সেই পানিতে পাট পচনের ব্যবস্থা করুন।

ঙ. জাগ তৈরি ও ইউরিয়া ব্যবহার : জাগ তৈরির সময় পাটের আঁটিগুলোকে প্রথম সারিতে লম্বালম্বিভাবে সাজান। এভাবে জাগ তৈরি করলে পানি এবং পচন জীবাণু জাগের মধ্যে সহজে চলাফেলা করতে পারে।
বন্ধ পানিতে অর্থাৎ ছোট পুকুর বা ডোবায় পাট পচালে ইউরিয়া সার ব্যবহার করতে হবে। এতে পাট তাড়াতাড়ি পচে এবং আঁশের রং ও ভাল হয়। প্রতি ১০০ আঁটি কাচা পাটের জন্য প্রায় ১ কেজি ইউরিয়া ব্যবহার করা যেতে পারে। ইউরিয়া সার কোন পাত্রে গুলে পচনের পানিতে মিশিয়ে দিতে পারেন অথবা সরাসরি জাগের আঁটিতে ছিটিয়ে দিতে পারেন।

চ. পচন সমাপ্তি নির্ণয় : পাট পচনের শেষ সময় ঠিক করা অর্থাৎ পচন সমাপ্তি নির্ণয় অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। পাট খুব বেশি পচলে আঁশ নরম হয় আবার খুব কম পচলে আঁশের গায়ে ছাল লেগে থাকে। কাজেই এমন সময় পচন থামাতে হবে যখন আঁশগুলো একটার সাথে আর একটা না লেগে থাকে, কিন’ শক্ত থাকে। জাগ দেবার ৮-১০ দিন পর থেকে জাগ পরীক্ষা করা উচিত। ২-৩টি জাগ থেকে বের করে ধুঁয়ে আঁশ পরীক্ষা কররে পচনের শেষ সময় ঠিক করা যায়। পচা পাটের মধ্যে থেকে ১ ইঞ্চি বা আড়াই সেমি পরিমাণ ছাল কেটে ছোট শিশির ভিতর পানি দিয়ে ঝাঁকানোর পর শিশির পানি ফেলে আবার পরিষ্কার পানি দিয়ে ঝাঁকিয়ে যদি দেখা যায় যে আঁশগুলো বেশ পৃথক হয়ে গেছে তখন বুঝতে হবে যে পচন শেষ হয়েছে। মনে রাখবেন বেশি পচনের চেয়ে একটু কম পচন ভাল।

অপর্যাপ্ত পানি অঞ্চল
যে সকল অঞ্চলে পাট ফসল কাটার সময় প্রতি ঋতুতে পাট পচানোর জন্য প্রয়োজনীয় পানি থাকে না সে অঞ্চলকে অপর্যাপ্ত পানি অঞ্চল বলে ধরা হয়েছে। এ সকল স্থানের জন্য বাংলাদেশ পাট গবেষনা ইনস্টিটিউট দুটি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন : যথা- রিবন বা ছাল ছাড়ান পদ্ধতি এবং পলিথিন ট্যাংক পদ্ধতি।

রিবন পদ্ধতি : রিবন পদ্ধতি হলো কাচা থাকা অবস্থায় গাছ থেকে ছাল পৃথক করে নেয়া।

ছালগুলোকে তিনভাবে পচানো যায়
ক. বড় মাটির চাড়িতে ছালগুরোকে গোলাকার মোড়া বেঁধে সাজিয়ে রেখে পরিষ্কার পানি দিয়ে চাড়িটি ভরে দিতে হবে। একটি বড় চাড়িতে প্রায় ৩০ কেজি চাল পচানো যায়।
খ. যদি আশেপাশে ছোট ডোবা বা পুকুর বা খাল বা কম গভীরতা সম্পন্ন জলাশয় ঝুলিয়ে পানির মধ্যে ডুবিয়ে দিয়ে পচানো যাবে।
গ. বাড়ির আশে পাশে অথবা ক্ষেতের পাশে ১৫-১৬ ফুট লম্বা, ৬-৮ ফুট প্রস’ এবং ২ ফুট গভীর (পলিথিনের মাপ অনুসারে দৈর্ঘ্য, প্রস’ ও গভীরতা কম বেশি করা যেতে পারে) গর্ত খুঁড়ে গর্তের তলা ও কিনারা পলিথিন দিয়ে ঢেকে দিয়ে যে কোন স্থান থেকে পরিষ্কার পানি দিয়ে গর্তটি ভরে সেখানে ছালগুলো পচানো যায়। সম্ভব হলে কচুরী পানা দিয়ে ছালের মোড়াগুলো ঢেকে দেয়া যেতে পারে। এ পদ্ধতিকে পলিথিন ট্যাংক পদ্ধতি বলা হয়। এ গর্তে কিছু পাট পচানো পানি দিলে পচন দ্রুত এবং নিশ্চিত হয়।

ভাসমান পদ্ধতিতে পাট পচন
গুরুত্ব
১. একটি পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যসম্মত পাট পচন পদ্ধতি
২. অল্প পানিতে ও অল্প জায়গায় অধিক পরিমাণে পাট পচানো যায়।
৩. পাটের জাগ ডুবানোর জন্য কলাগাছ, কাদামাটি, মাটির ঢেলা ইত্যাদির প্রয়োজন হয় না।
৪. কাটিংস বিহীন (আঁশের গোড়া শক্ত ছালমুক্ত অংশ) উন্নত মানের আঁশ উৎপন্ন হয়।
৫. মাছ চাষের পুকুরেও পাট পচানো যায় এবং এতে মাছের কোন তি হয় না।

যে সমস্ত দ্রব্যাদির প্রয়োজন
১. দশ হাত লম্বা চারটি মুরুলী বা চিকন বাঁশ।
২. চারটি মাটির কলসি অথবা মুখ বন্ধ খালি কেরোসিনের টিন।
৩. কিছু নারিকেলের রশি অথবা পাটের রশি।
৪. ছাল করণের জন্য বাঁশের হুক।
৫. ছোট বাঁশের খুটি।
বি: দ্র: বাঁশগুলি এবং কেরোসিনের টিন আলকাতরা দিয়ে রং করে নিলে অনেক বৎসর ব্যবহার করা যাবে।

পচন উপায়
১. পাট গাছে ফুল আসতে শুরু করলেই বাঁশের হুকের সাহায্যে ছাল ছাড়িয়ে নিন। সারি করে বাঁশের হুক গেড়ে নিলে এক সঙ্গে দাঁড়িয়ে অনেক ছাল ছাড়ানো যাবে।
২. ছালগুলিকে গোলাকার মোড়ার মত করে বাঁধতে হবে।
৩. এই গোলাকার মোড়াগুলির মধ্যে দিয়ে উপরোক্ত চারটি বাঁশ ঢুকিয়ে মোড়াগুলিকে সুন্দর করে ঝুলিয়ে দিতে হবে।
৪. এবার চাটি বাঁশের প্রান্ত এমনবাবে বেঁধে নিতে হবে যেন এটি একটি ফ্রেমের মত দেখা যায়।
৫. ফ্রেমের চারটি কোণায় চারটি মাটির কলসি অথবা মুখ বন্ধ খালি কেরোসিনের টিন বেঁধে পানিতে ভাসিয়ে দিতে হবে।
৬. বেশি করে ছাল পচাতে চাইলে বাঁশের চারকোণা ফ্রেমের মধ্যে সমান্তরালভাবে এক হাত পরপর আরও বাঁশ বেঁধে গোলাকার ছালের মোড়াগুলি ঝুলিয়ে দিতে হবে।
৭. ফ্রেমের সঙ্গে কিছু নারিকেলের রশি অথবা পাটের রশি বেঁধে পচন পুকুরের কিনারায় একটি ছোট খুটি পুতে রশি খুটির সঙ্গে বেঁধে দিতে হবে যাতে করে প্রয়োজনমত ঐ রশি ধরে টেনে ভাসমান চালের জাকটিকে পুকুরের কিনারায় এনে ছালের পচন সমাপ্তি নির্ণয় করা এবং ছালগুলি ধুইয়ে আঁশ সংগ্রহ করা যায়।

বিশেষ সতর্কতা ও এই পদ্ধতির সুবিধা সমূহ
১. পাটের জাগ ঢাকার জন্য কোন দ্রব্যের বা জ্বলজ উদ্ভিদের প্রয়োজন নাই।
২. অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় পানিতে নেমে আঁশ ছাড়াতে হয় না।
৩. পাটের জাগ পানির উপরি ভাগে ভেসে থাকে বলে পাট তাড়াতাড়ি পচে।
৪. মাটির কলসি সামান্য আঘাতেই ভেঙ্গে যেতে পারে কিন’ মুখ বন্ধ কেরোসিনের টিন বহুবার ব্যবহার করা যায়- ভাঙ্গার সম্ভাবনা একেবারেই নেই।

আঁশ ছাড়ানো প্রক্রিয়া
পচন শেষ হলে পাট গাছ থেকে দুই প্রকারে আঁশ ছাড়ানো যেতে পারে : ১. শুকনা জায়গায় বসে একটা একটা করে আঁশ ছাড়ানো যেতে পারে অথবা, ২. পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে বাঁশের আড়ার সাহায্যে এক সঙ্গে অনেকগুলো গাছের আঁশ ছাড়ানো যেতে পারে। যে পদ্ধতিতেই আঁশ ছাড়ানো হোক না কেন আঁশ ছাড়াবার সময় গাছের গোড়ার অংশের পচা ছাল হাত দিয়ে টিপে টেনে মুছে ফেলে দিলে আঁশের কাটিংস এর পরিমাণ অর্থাৎ গোড়ার শক্ত অংশের পরিমাণ অনেক কম হয়। এ ছাড়া আঁশ ছাড়ার সময় পাট গাছের গোড়ার অংশ এক টুকরো শক্ত কাঠ বা বাঁশ দিয়ে থেতলে নিলে আঁশের কাটিংসের পরিমাণ অনেক কম হয়। দেখা গেছে গাছ থেকে একটা একটা করে আশ ছাড়ালে আঁশের গুণাগুণ ভাল হয়।

আঁশ ধোয়া
আঁশ ছাড়ানোর পর আঁশগুলোকে পরিষ্কার পানিতে ধুতে হবে। ধোয়ার সময় আঁশের গোড়া সমান করে নিতে হবে এমনভাবে আঁশ ধুতে হবে যেন কোন রকম পচান ছাল, ভাঙ্গা পাট-খড়ি, অন্য কোন ময়লা, কাদা ইত্যাদি আঁশের গায়ে লেগে না থাকে। কারণ এতে পাটের মান নষ্ট হয় এবং বাজারে এ সকল আঁশের চাহিদাও কমে যায়।

আঁশের শ্যামলা রং দূরীকরণ
অপরিষ্কার বা অনুপযুক্ত পানিতে আঁশ ধোয়ার পর যদি দেখা যায় আঁশের রং কালো বা শ্যামলা হয়ে গেছে তাহলে এক মণ পানিতে প্রায় ১ কেজি তেঁতুল গুলে সেই তেঁতুল-গোলা পানির মধ্যে আঁশগুলো ৪ মিনিট ডুবিয়ে রাখলেই আঁশের রং উজ্জ্বল হয়ে যাবে। তবে মনে রাখতে হবে, তেঁতুল এক প্রকার এসিড, তাই আঁশগুলোকে সাথে সাথে খুব ভাল করে পরিস্কার পানিতে ধুয়ে শুকিয়ে নিতে হবে যাতে তেঁতুলের রস আঁশের সঙ্গে লেগে না থাকে।

আঁশ শুকানো
আঁশ ধোয়ার পর খুব ভাল করে আঁশ শুকাতে হবে। আঁশ কখনও মাটির উপর ছড়িয়ে শুকানো ঠিক নয়, কারণ তাতে আঁশে ময়লা, ধুলো-বালি ইত্যাদি লেগে যায়। বাঁশের আড়ায়, ঘরের চালে, ব্রিজের রেলিং বা অন্য কোন উপায়ে ঝুলিয়ে ভালোভাবে আঁশ শুকাতে হবে। ভেজা অবস্থায় আঁশ কখনই গুদামজাত করা ঠিক নয়। কারণ এতে আঁশের মান নষ্ট হয়ে যায়।

বীজ
জাত ও জমি ভেদে তোষা পাটের বীজ উৎপাদনের ক্ষেত্রে একরে ৩০০ থেকে ৪০০ কেজি উন্নতমানের বীজ পাওয়া যায়।

বীজ শুকানো
ভালোভাবে গোবর দিয়ে লেপা শুকনো উঠান বা সিমেন্টের মেঝের উপর পাটের চট/ত্রিপল বিছিয়ে তার উপর বীজ শুকানো ভাল। উল্লেখ্য যে, পাট বীজ খুব ছোট বিধায় সরাসরি সিমেন্টের মেঝের উপর শুকালে বীজের ভ্রুণ নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বীজ ভালোভাবে শুকিয়েছে কিনা তা পরীক্ষার জন্য বীজ দাঁত দিয়ে চাপ দিলে যদি কট করে শব্দ হয় তবে বুঝতে হবে বীজ ভালোভাবে শুকিয়েছে। শুকানোর পর (৮% আর্দ্রতায়) বীজ ভালোভাবে ঝাড়াই করে সংরক্ষণ করতে হবে। শুকানোর পর (৮% আর্দ্রতায়) বীজ ভালোভাবে ঝাড়াই করে সংরক্ষণ করতে হবে।

বীজ সংরক্ষণ পদ্ধতি
পর্যাপ্ত শুকানো বীজ ঠাণ্ডা করে প্লাস্টিকের ক্যান, টিন ইত্যাদিতে ভরে মুখ ভালোভাবে বন্ধ করে ঘরের মধ্যে (ঠাণ্ডা স্থানে) সংরক্ষণ করলে বহু দিন ঐ বীজ ভাল থাকে। মাটির কলসী, হাড়ি বা মটকায় বীজ রাখলে অধিক দিন বীজ ভাল থাকে না। কোন উপায় না থাকলে মাটির পাত্রে বীজ রাখার আগে পুরু পলিথিন দিয়ে ভালোভাবে ঐ পাত্র মুড়ে নিয়ে বা আলকাতরা অথবা রঙের প্রলেপ দিয়ে বীজ রাখলে বেশ কিছুদিন বীজ ভাল থাকে। তবে মুখবন্ধ প্লাস্টিকের ক্যান বা টিনই ভাল। বীজের পরিমাণ বেশি হলে প্লাস্টিক বা টিনের ড্রামে রাখা যেতে পারে।

অধিক ফলনের জন্য পরামর্শ
পাট আঁশ কল-কারখানায় ব্যবহার করা হয়। কাজেই আঁশের মান ঠিক না থাকলে এর কোন মূল্য থাকে না। বীজ বপন থেকে পাট শুকানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে যত্নশীল হলে অল্প জমিতে অধিক পরিমাণ উন্নত আঁশ পাওয়া যায়, যা আপনাকে অধিক মুনাফা এনে দেবে। যে জমি ভাল নয় অথবা ধারে কাছে পচানোর উপযুক্ত পানির উৎস নেই, সেখানে পাট চাষ করার আগে বারবার ভাবুন।

কাটিংস এর পরিমাণ কমানোর উপায়
১. সঠিক সময়ে পাট কাটা
ভালমানের আঁশ উৎপাদনের জন্য পাট গাছে ফুলের কুড়ি আসা মাত্রই পাট কাটতে হবে। কারণ এর পর যতই দেরী হবে ততই কাটিংস এর পরিমাণ বাড়বে। চাষী ভাইদের এ ব্যাপারে আরও মনোযোগ হওয়া প্রয়োজন বিশেষ করে দো-ফসলী তোষা অঞ্চলের জন্য উপযুক্ত সময়ে পাট কাটার প্রতি নজর দেওয়া প্রয়োজন।

২. গোড়া ডুবান
পাট কাটার পর গাছগুলোর পাতা ঝরিয়ে অন্তত: দেড়হাত (৪৫ সেমি) পরিমাণ পানিতে ৩-৪ দিন দাঁড় করিয়ে রাখার পর জাগ দিতে হবে। এভাবে পচালে সম্পূর্ণ গাছটি সমানভাবে পচে, ফলে কাটিংস অনেক কম হয়। জাগ দেবার আগে পাটের গোড়ার দেড়হাত পরিমাণ (৪৫ সেমি) অংশ একটা শক্ত কাঠের হাতুড়ী দিয়ে সামান্য থেতলে দিলেও পাটের কাটিংস দূর করা সম্ভব।

৩. সঠিক সময়ে পচন সমাপ্তি নির্ণয়
পাট গাছের পচন কতদিনে শেষ হবে তা সঠিকভাবে বলা যায় না। পানি এবং পানির ভিতরকার অসংখ্য জীবাণুর সাহায্যে পাট পচন ক্রিয়া সম্পাদিত হয়। পানির গুণাগুণ, এই সব জীবাণুর সংখ্যা, ধরন, এবং পানির তাপের তারতম্যের জন্য পাট পচন সময়েরও তারতম্য হয়। পচন-ক্রিয়া আরম্ভ হওয়ার ৮-১০ দিন পর থেকে গাছ পরীক্ষা করে দেখতে হবে। যদি আঁশগুলো বেশ পৃথক পৃথক মনে হয় তখনই বুঝতে হবে যে, আঁশ ছাড়ানোর সময় হয়েছে।

৪. সঠিকভাবে আঁশ ছাড়ানো
বিভিন্ন প্রকারের আঁশ ছাড়ানো পদ্ধতি পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে, আঁশ ছাড়ানোর সময় গাছের গোড়ার অংশের পচা ছালগুলো যদি হাত দিয়ে ভাল করে ঘষে সরিয়ে ফেলা হয় এবং আঁশগুলোকে পরে ভাল করে ধোঁয়া হয় তবে কাটিংস-এর পরিমাণ কম হয়।

৫. চিকন ও মোটা গাছ পৃথকভাবে পচানো
পাটের জমিতে ল্য করলে দেখা যায় যে, কিছু গাছ মোটা এবং কিছু গাছ চিকন। চিকন গাছ তাড়াতাড়ি পচে এবং মোটা গাছ দেরিতে পচে। তাই গাছ কাটার সময় চিকন গাছগুলোকে প্রথমে কেটে আলাদাভাবে জাগ দিয়ে পচালে সুন্দর আঁশ পাওয়া যাবে যাতে অতিরিক্ত পচন এড়ানো যাবে, ফলনও বাড়বে, আর পৃথক করে মোটা গাছ জাগ দিলে কাটিংস কমান সম্ভব হবে।

৬. বেশি করে তোষা পাট চাষ করা
আমরা সাধারণত: দুই প্রকারের পাট চাষ করি, দেশী পাট ও তোষা পাট। তুলনামূলকভাবে তোষা পাটে কাটিংস অনেক কম হয়। আবার যা হয় সেটাও অনেক নরম। তোষা পাটের কাটিংস-এর দামও সাদা পাটের কাটিংস-এর চেয়ে অনেক বেশি। কাজেই সে সব জমিতে তোষা আবাদ না করাই ভাল। তদুপরি যে সব নীচু জমিতে দেশী পাট ছাড়া আবাদ সম্ভব নয় সে সব জমিতে পানি আসার পরপরই পাট কাটলে কাটিংস কম হয়।

৭. পাট গাছের ছাল পচানো
পাট গাছ না পচিয়ে যদি পাট গাছের ছাল পচানো হয় তবে পচন তাড়াতাড়ি শেষ হয় এবং আঁশগুলোতে মোটেই কাটিংস থাকে না। বাঁশের খুটির মাথায় ‘ইউ’-এর মত করে কেটে তার মাঝে পাট গাছ রেখে অতি সহজে গাছ থেকে ছাল ছাড়ানো সম্ভব। কাচা অবস্থায় এই ছালগুলোকে ছাড়িয়ে পানি দিয়ে সহজেই পচান যায়। চাড়িতে পচানোর সময় পচন পানিতে যদি ছালের ওজনের আনুমানিক শতকরা ০.০১ ভাগ ইউরিয়া সার মিশিয়ে দেয়া যায় তবে পচন আরো তাড়াতাড়ি হয়। যেখানে পানির অভাব সেখানে পাট গাছের ছাল ছাড়িয়ে অল্প পানিতে পচানো যায়।

৮. নীচু মানের ছালযুক্ত আঁশের মানোন্নয়ন
সঠিক পদ্ধতিতে পাট না পচানোর জন্য অথবা পচন পানির অভাব জনিত কারণে পাট আঁশ ছালযুক্ত ও নীচু মানের হলে কৃষক পর্যায়েই ঐ আঁশের মান উন্নয়ন করা সম্ভব। পাট আঁশের ওজনের ০.০১% ইউরিয়া (প্রতি ৩৭.৩২৪ কেজিতে ৫ গ্রাম ইউরিয়া) পানিতে মিশিয়ে আঁশের গোড়ায় ছালযুক্ত স্থানে ছিটিয়ে দিয়ে এক সপ্তাহ পলিথিন বা ছালা দিয়ে ঢেকে রেখে গোড়ার দিকটা পুনরায় ধুয়ে নিলেই আঁশ ছালমুক্ত হয় এবং আঁশের মানও ভাল হয়।

***
তথ্যসূত্র: রুরালইনফোবিডি