ক্যাটেগরিঃ কৃষি

ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগকে আমরা মাটি বলে থাকি। খনিজ পদার্থ, জৈব পদার্থ, বায়ু ও পানির সমন্বয়ে গঠিত হয় মাটি। কৃষির দৃষ্টিকোণ থেকে শস্য উৎপাদনের জন্য মাটির উপরিভাগের ১ মিটার সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ।

মানুষ মাটির ওপর নির্ভরশীল। মাটির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও তার সুষ্ঠু ব্যবহারও অনেকাংশে মানুষের ওপরই নির্ভরশীল। সভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই, উর্বর মাটি প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। মাটির সংরক্ষণ, ব্যবস্থাপনা ও পানি সেচের প্রতি যখন কোনো জাতি ঔদাসীন্য দেখিয়েছে তখন সে জাতির পতন হয়েছে।

মাটি আমাদের অমূল্য সম্পদ। মাটির ফসল উৎপাদন ৰমতাকে উর্বরতা বলা হয়। ফসলের ভালো ফলন মাটির উর্বরতার ওপর নির্ভরশীল। মাটিকে উৎপাদনশীল রাখতে হলে এর উর্বরতা বজায় রাখা ও উর্বরতা বৃদ্ধির জন্য আমাদের বেশ যত্নবান হতে হবে।
মাটির উর্বরতার শক্তি বজায় রাখতে হলে বা বৃদ্ধির জন্য যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত নিচে সেগুলো আলোচনা করা হলো।

১. সঠিক জমি তৈরি
সময়মতো ফসলের চাহিদা অনুসারে মাটিকে চাষাবাদ করে বীজ বপনের বা চারা লাগানোর উপযোগী করে তৈরি করতে হবে। লৰ রাখতে হবে যেন ভালোভাবে সমান হয়। বীজের সন্তোষজনক অঙ্কুরোদগম, চারাগাছের বৃদ্ধি, পানি সেচ ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার জন্য মাটিকে সমান করা অপরিহার্য। অনুমোদিত, উচ্চফলনশীল, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, রোগবালাই ও কীটমুক্ত প্রয়োজনীয় অঙ্কুরোদগম ক্ষমতাবিশিষ্ট বীজ ব্যবহার করা প্রয়োজন।
কৃষক ভাইদের অনেক বছরের অভিজ্ঞতা এবং গবেষণালব্ধ ফলাফলের আলোকে প্রত্যেক ফসলের জন্য বীজ বপনের এবং চারা লাগানো সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যেই বীজ বপন বা চারা লাগাতে হবে। লৰ রাখতে হবে যেন মাটিতে প্রয়োজনীয় পানি থাকে। দরকার হলে বীজ অঙ্কুরোদগমের বা চারা লাগানোর পর চাহিদা অনুসারে হালকা সেচ দেয়া যেতে পারে।

২. ফসলে সময়মতো সুষমসার প্রয়োগ
মাটির ভালো ব্যবস্থাপনার জন্য মাটি বিশ্লেষণ অপরিহার্য। মাটি পরীক্ষার মাধ্যমে বিরাজমান খাদ্য উৎপাদনের পরিমাণ নির্ণয়ের পর মাটিতে সার প্রয়োগ করা উচিত। সুষম সার ব্যবহারের জন্য মাটি পরীক্ষা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। মাটি পরীক্ষার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে প্রয়োজনীয় মাত্রার সার প্রয়োগ করলে ফসলের আশানুরূপ ফলন পাওয়া যাবে। এতে মাটির উর্বরতা ও উৎপাদনশীলতা রক্ষা করা যাবে। মাটিতে ফসলের খাদ্যসামগ্রীর পরিমাণ সীমিত। ফসলের চাষাবাদ করলে মাটিতে বিদ্যমান উপাদানগুলো কমতে থাকে এবং এই ঘাটতি পূরণ না করলে মাটি অনুর্বর হয়ে যায়।

সার প্রয়োগের মাধ্যমে মাটির উর্বরতা বজায় রাখা বা বৃদ্ধি করা যায়। জৈব ও অজৈব সার প্রয়োগ করে মাটিকে কাঙিত পর্যায়ে উর্বর করা সম্ভব। গোবর, খইল, কম্পোস্ট বা আবর্জনা সার, সবুজ সার ইত্যাদিকে জৈবসার বলা হয়। জৈবসারে ফসলের প্রধান খাদ্য সামগ্রী খুবই অল্প বা পরিমাণে কম থাকে। সর্বোপরি বিভিন্ন উপাদান আকাঙিত অনুপাতে থাকে না। সেজন্য শুধু জৈবসার ব্যবহার করে সুষম সার প্রয়োগ করা সম্ভব না। তবে জৈবসারের বিশেষ গুণ তা মাটির বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ অবস্থার উন্নতি সাধন করে থাকে এবং মাটির পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি করে। কোন সময়ে, ফসলের কোন পর্যায়ে এবং পদ্ধতিতে সার প্রয়োগ করলে সবচেয়ে বেশি কার্যকর হবে তাও উদ্ভাবন করা হয়েছে।

ফসলের চাহিদা অনুসারে খাদ্য উপাদানে সমৃদ্ধ পরিমিত সারগুলোর সমন্বয়কে সুষম সার বলা হয়। ফসলের মোট চাহিদার কিছু পরিমাণে জৈবসার থেকে এবং বাকি বৃহত্তর অংশ রাসায়নিক সার ব্যবহার করলে ভালো ফল পাওয়া যায় এবং এতে মাটির সার্বিক গুণাগুণের উন্নতি হয়। মাটির উর্বরতা কাঙিত পর্যায়ে রাখতে হলে এবং ভালো ফলনের জন্য সুষম সার সময়মতো এবং নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে মাটিতে প্রয়োগ করতে হবে।

৩. পর্যায়ক্রমে ফসলের চাষ
একটি নির্দিষ্ট সময়কালে জমিতে একজাতীয় ফসল উৎপাদন না করে বিভিন্ন ফসল চাষ করার প্রক্রিয়াকে পর্যায়ক্রমে ফসলের চাষ বলা হয়। বিভিন্ন ফসলের গাছের মূল মাটিতে একই গভীরতায় না প্রবেশ করার কারণে মাটির বিভিন্ন স্তর থেকে খাদ্য উৎপাদন অপসারিত হয়। এতে মাটির উর্বরতার ওপর কম চাপ পড়ে। এই শস্যচক্রে শিমজাতীয় একটি ফসল চাষ করলে বায়ুমণ্ডলের মুক্ত নাইট্রোজেন শিকড়স্থিত নডিউল ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে মাটিতে যুক্ত হয়। এই নাইট্রোজেন গাছ ব্যবহার করতে পারে।

৪. মাটির সংরক্ষণ ও ক্ষয়রোধ
ফসলের খাদ্য উপাদান সমৃদ্ধ মাটির ওপর স্তরকে সংরক্ষণ করতে হবে। বায়ুরবেগ বা জলের ধারা কর্তৃক মাটির যে ক্ষয় হয় তা রোধ করতে হবে। আচ্ছাদন জাতীয় ফসলের চাষ করে, বায়ু রোধকারী বৃক্ষ লাগিয়ে, ফালি ফালি চাষ করে, মালচিং করে, জৈবসার প্রয়োগ করে বায়ুবেগ জনিত মাটির ৰয়রোধ করা যায়। জলধারাজনিত মাটির ক্ষয়রোধের জন্য মালচিং, সমউচ্চতায় ফালি ফালি চাষ, ধাপে ধাপে চাষ, আচ্ছাদন ফসলের চাষ জৈবসার প্রয়োগ করতে হবে।

৫. পানি সেচ ও নিষ্কাশনের ব্যবস্থা
ফসল উৎপাদনে পানি সেচের ব্যবস্থাপনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মাটিতে বিদ্যমান খাদ্যসামগ্রী ও সারের মাধ্যমে প্রয়োগকৃত উপাদানগুলো ফসলের গ্রহণযোগ্য পর্যায় তৈরির জন্য পানি একান্ত প্রয়োজন। কাজেই চাহিদা অনুসারে সময়মতো ও পরিমিত পানি সেচ দিতে হবে। ফসলের প্রয়োজনে অধিক পানি জমি থেকে নিষ্কাশন করতে হবে।

৬. আগাছা দমন
চাষাবাদের সূচনা থেকেই মানুষ শস্য ক্ষেত্রে কতগুলো অবাঞ্ছিত গাছের ক্ষতিকর প্রক্রিয়া লক্ষ করে আসছে। এ জাতীয় গাছকে আগাছা বলা হয়। আগাছা তার পুষ্টি ও বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় পানি, খাদ্যসামগ্রী ও আলোবাতাসের জন্য ফসলর সাথে প্রতিযোগিতা করে থাকে এবং ফসলের খাদ্যে ভাগ বসায়। ফসলের ভালো ফলন ও মাটির উর্বরতা সংরক্ষণের জন্য জমিকে আগাছামুক্ত রাখতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে মাটির ব্যবস্থাপনা ব্যাহত হবে। ফসল উৎপাদনের বেশ ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হবে। পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকেই জলবায়ু পরিবর্তন অব্যাহত রয়েছে। অতীতের জলবায়ু পরিবর্তন ছিল খুব ধীর প্রকৃতির, কিন্তু বর্তমানে এই পরিবর্তনের হার অস্বাভাবিকভাবে বেশি। বর্তমানে মানুষ কর্তৃক সৃষ্ট কার্যকলাপ বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তন ত্বরান্বিত করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সামগ্রিকভাবে ভূপৃষ্টের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্থলভাগের তুলনায় সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার বেশি হবে। আশঙ্কা করা যাচ্ছে, উপকূলীয় কৃষি জমির অংশবিশেষ একেবারে হারিয়ে যাবে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতার কারণে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি দেশের ভেতরে প্রবেশ করবে এবং কৃষি জমির বড় অংশে লবণাক্ততা বাড়বে।

প্রচলিত ফসলগুলো চাষাবাদের যোগ্যতা হারাবে অথবা ফসলের উৎপাদনশীলতা কমে যাবে। এই অবস্থায় কৃষি উৎপাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হবে। অপরদিকে এর কারণে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা ইত্যাদি ভীষণরূপ ধারণ করতে পারে। কৃষির ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া ঠেকানো কিংবা কমানোর তেমন কোনো কৌশল/প্রযুক্তি এ পর্যন্ত উদ্ভাবিত হয়নি। অতিবৃষ্টি, বন্যা, তাপ, খরা, লবণাক্ত সহিষ্ণু ফসলের জাত উদ্ভাবন ও চাষাবাদ করা অভিযোজনের অংশ হতে হবে। জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে অতিবৃষ্টি, ভূমি ক্ষয় বৃদ্ধি করবে। অধিক তাপমাত্রা জৈব পদার্থের পরিমাণ কমিয়ে দেবে। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মাটির অভ্যন্তরীণ পরিবেশের ভারসাম্য বিঘ্নিত হবে এবং ফসল গাছ মাটি হতে প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদান সংগ্রহ করতে পারবে না। এর ফলে ফসল ও ফলন কমে যাবে এবং দেশের সার্বিক খাদ্য উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দেবে।

আর দেরি না করে এখন থেকে জলবায়ু পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে কৃষি গবেষণার মাধ্যমে আমাদের দেশে অভিযোজন ক্ষমতাসম্পন্ন কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও অবস্থাভেদে ব্যাপক চাষাবাদের প্রচলন অপরিহার্য। এই ব্যবস্থার ফলে দুর্যোগ মোকাবেলায় অবদান রাখতে পারবে বলে আমাদের ধারণা।

তথ্যসূত্র: কৃষিবিদ মো. হাবিবুর রহমান, প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (অবসরপ্রাপ্ত), বারি, গাজীপুর।