ক্যাটেগরিঃ কৃষি

 

সভ্যতার সূচনাই হচ্ছে কৃষি দিয়ে। তাই বলা হয় কৃষিই কৃষ্টির মূল। আগে কৃষিক্ষেত্র ছিল উপেৰিত। আজকাল এর ওপর বেশ জোর দেয়া হচ্ছে, বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে। আমাদের দেশও পিছিয়ে নেই। এটা ভালো লৰণ। বীজ হচ্ছে কৃষি উন্নয়নের অন্যতম উপকরণ। কৃষি কাজ বীজ ছাড়া কল্পনাই করা যায় না। ‘ভালো বীজে ভালো ফসল’ এ সেৱাগান আজ সবাই উপলব্ধি করতে পেরেছে। একদিকে যেমন আমাদের কৃষক ভাইয়েরা ভালো বীজের জন্য হন্যে হয়ে খুঁজছে অন্যদিকে বিভিন্ন বীজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদনের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। কিছুদিন আগেও বিদেশ থেকে আমদানির মাধ্যমে বীজের চাহিদার বিরাট অংশ পূরণ করা হতো।

বর্তমানে চাহিদা অনেকগুণ বেড়ে গেলেও বিদেশ থেকে বীজ আমদানি আনুপাতিক হারে অনেক কমে গেছে। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে আগের চেয়ে ভালো বীজের উৎপাদন বৃদ্ধিই এর মূল কারণ। দেশের বিভিন্ন কৃষি ও বীজ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কৃষি গ্রাজুয়েটদের ভূমিকা এখানে মুখ্য। বাংলাদেশে বীজ শিল্প হচ্ছে সরকারি ও বেসরকারি সেক্টরের সমন্বিত উদ্যোগ। বেসরকারি সেক্টরে সারাদেশে ১০০টিরও বেশি বীজ কোম্পানি এবং ৬ হাজারের বেশি রেজিস্টার্ড বীজ ডিলার নিয়োজিত রয়েছে। বিএডিসিকে পুনর্গঠনের মাধ্যমে আগের তুলনায় অনেকগুণ বেশি মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদনের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। বীজ প্রযুক্তির উন্নয়ন ও বীজ শিল্পের বিকাশ ওতোপ্রতভাবে জড়িত। বীজ প্রযুক্তি একটি আধুনিক বিষয় এবং এ বিষয়ে কোনো স্বয়ংসম্পূর্ণ শিৰা নেয়ার সুবিধা এখনও দেশে সৃষ্টি হয়নি।

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদ্যমান বীজ সম্বন্ধীয় যে পাঠ্যক্রম রয়েছে তা আধুনিক বীজ প্রযুক্তি বিষয়ে সার্বিক শিৰা প্রদানে পর্যাপ্ত নয়। অসম্পূর্ণ পাঠ্যক্রম পড়ে পাস করা ছাত্ররা অসম্পূর্ণ বীজ প্রযুক্তিগত শিৰা নিয়ে কর্মৰেত্রে প্রবেশ করছে। ফলে বীজ ব্যবস্থায় (শিক্ষ, গবেষণা, সমপ্রসারণ, উৎপাদন, বিপণন) এক ধরনের মৌলিক অদৰতা রয়েই গেছে।

জাতীয় বীজনীতি গ্রহণের ফলে বাংলাদেশের বীজ শিল্প অধিকতর বহুমুখী এবং গতিশীল হয়েছে। সরকার ইতোমধ্যে বীজ কর্মকাণ্ডকে শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেছে এবং বীজ সেক্টরকে গুর্বত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। বীজ শিল্প উন্নয়নের লৰ্যে বীজনীতিতে বিভিন্ন কাজের দিকনির্দেশনা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে বীজ সংগঠনগুলোর করণীয় সম্পর্কে পরিষ্কারভাবে উলেৱখ করা হয়েছে। বীজ শিল্প উন্নয়নের সঙ্গে বীজনীতির ১১নং অনুচ্ছেদে ৮টি সরকারি সংগঠনের কার্যাবলীর কথা বলা হয়েছে। সংগঠনগুলো হচ্ছে- জাতীয় বীজ বোর্ড, কৃষি মন্ত্রণালয়ের বীজ উইং, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন, বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি, জাতীয় কৃষি গবেষণা পদ্ধতি কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তর, কৃষি তথ্য সার্ভিস এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। এসব সংস্থার কার্যক্রম বর্ণনাকালে বেসরকারি পর্যায়ে বীজ শিল্প উন্নয়নের জন্য কি করতে হবে তার দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে। আর এসব সংগঠনের সফলতা নির্ভর করছে দৰ বীজ প্রযুক্তিবিদদের কার্যক্রমের ওপর। বীজনীতির আলোকে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় যেসব কার্যাবলী সম্পাদন করবে তা হচ্ছে।

১. বীজ প্রযুক্তি বিষয়ে একটি পাঠ্যক্রম প্রতিষ্ঠা এবং শক্তিশালী করবে যাতে বীজ প্রজনন থেকে পরিবর্ধন এবং বিতরণ, বীজনীতি এবং বীজ উন্নয়ন পর্যন্ত বীজ সংক্রান্ত সব বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

২. এর বীজ পরীৰাগারটিকে জাতীয় বীজ পরীৰাগার হিসেবে উন্নীত করবে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিৰা কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বীজ সঙ্গনিরোধ প্রয়োজনীয়তা নিয়মিতভাবে পর্যালোচনা এবং সুস্থ বীজ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় বীজ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করবে।

৩. সরকারি এবং বেসরকারি উভয়খাতে শিমজাতীয় বীজের জন্য ইনোকুলাম প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং উৎপাদন ত্বরান্বিত করবে।

জাতীয় বীজ নীতেতে বীজ প্রযুক্তির ৰেত্রে মানবসম্পদ উন্নয়নের গুর্বত্ব পরিষ্কারভাবে উলেৱখ করা হয়েছে। এটা স্পষ্টত প্রতীয়মান, গবেষণা ও উন্নয়ন, বীজ উৎপাদন, মান নিশ্চয়তা এবং বিপণন কর্মসূচির আধুনিকায়নে উচ্চশিৰা ও গবেষণা এবং প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই।

এক্ষেত্রে গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বেশ এগিয়ে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০৫ সনে বীজ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে এমএস এবং পিএইচডি প্রোগ্রামে শিৰা ও গবেষণা কার্যক্রম চালু হয়। ইতোমধ্যে ৬ জন মাস্টার্স ডিগ্রি এবং একজন ছাত্র পিএইচডি অর্জন করেছেন, ১৫ জন পিএইচডি প্রোগ্রামে এবং ১২ জন এমএস প্রোগ্রামে অধ্যয়ন গবেষণারত। এখানে বীজ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়টি স্বয়ংসম্পূর্ণ বিভাগ হিসেবে স্বীকৃতি না পেলেও এখনো ইউনিটের অধীনে শিক্ষ ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। স্বয়ংসম্পূর্ণ বিভাগের আওতায় শিৰা ও গবেষণা কার্যক্রম যাতে পরিচালিত হয় বিষয়টি নিয়ে সংশিৱষ্ট সবাইকে গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। জানা গেছে, সদ্য প্রতিষ্ঠিত সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে বীজ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে একটি বিভাগ খোলা হয়েছে।

সুপারিশ
০ বীজ প্রযুক্তি বিষয়ে দৰ জনবল তৈরির ৰেত্রে উৎসাহ প্রদানে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মকর্তা/বিজ্ঞানীদের কোটাভিত্তিক বৃত্তির ব্যবস্থা করা এবং বীজ প্রযুক্তিগত আধুনিক জ্ঞান অর্জনের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে উচ্চশিৰা ও গবেষণার ৰেত্রে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে।
০ সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে উচ্চশিক্ষ ও গবেষণার জন্য আলাদা তহবিলের সংস্থান রাখা।
০ কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিটি প্রকল্প বর্ণিতখাতে আলাদা বাজেট বরাদ্দ রাখা এবং বীজ উইংকে কার্যকরি করার জন্য উদ্যোগী ভূমিকা নেয়া।
০ প্রতিটি সরকারি-বেসরকারি বীজ প্রতিষ্ঠানে গবেষণা ও উন্নয়ন চালু করা।

তথ্যসূত্র: কৃষিবিদ মো. শাফায়েত হোসেন, সিনিয়র সহকারী পরিচালক (বিএডিসি)