ক্যাটেগরিঃ কৃষি

 

স্বাস্থ্য রক্ষা ও পরিচর্যায় ভেষজ উদ্ভিদ ব্যবহারের ইতিহাস মানব সভ্যতার ইতিহাসের মতোই সুপ্রাচীন ও ঘটনাবহুল। ভেষজ ওষুধের অবদান ও গুরুকে অস্বীকার করে আধুনিক চিকিৎসা ও ওষুধের বর্তমান অবস্থানকে কোনোভাবেই ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। কারণ সৃষ্টির শুরু থেকেই পৃথিবীতে মানুষের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে ভেষজ ওষুধ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর প্রায় সর্বত্রই যুগ যুগ ধরে বিভিন্নরূপে ও বিভিন্ন নামে মানুষের স্বাস্থ্য পরিচর্যায় ভেষজ ওষুধ ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলিত ও প্রযুক্তি বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষতার কারণে বর্তমান যুগে ভেষজ ওষুধের উপযোগিতা শেষ হয়েছে বলে অনেকে মনে করলেও সে ধারণা দিনে দিনে ভুল প্রমাণিত হচ্ছে। নব নব বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারে ভেষজ ওষুধ প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ হচ্ছে। ভেষজ ওষুধ অবশ্যই বিজ্ঞানসম্মত ও কার্যকরী ওষুধ। এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ বা বিতর্কের অবকাশ নেই। ভেষজ ওষুধের গুণাগুণ ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত সামগ্রিকভাবে ওষুধ বিজ্ঞান তথা আধুনিক অ্যালোপ্যাথিক ওষুধও সমভাবে প্রশ্নের সম্মুখীন হবে। কারণ এসব ওষুধের আদি ও মূল ভিত্তিও ভেষজ উদ্ভিদ এবং এখনো অসংখ্য আধুনিক অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ সরাসরি উদ্ভিজ্জ দ্রব্য এবং সেগুলোর নিষ্কাশিত রাসায়নিক উপাদান দিয়ে তৈরি হয়ে থাকে।

ভেষজ ওষুধ এখনো বিভিন্ন দেশে মানুষের সার্বিক স্বাস্থ্য সংরক্ষণে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের অগণিত মানুষ ভেষজ ওষুধের বদৌলতে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন। পৃথিবীর সার্ভিক জনগোষ্ঠীর প্রায় ৮০ শতাংশ ভেষজ ওষুধের ওপর নির্ভর করে তাদের রোগব্যাধির চিকিৎসা করে থাকেন। অর্থাৎ ভেষজ ওষুধ না থাকলে এই বিরাট জনগোষ্ঠী চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হতো। ভেষজ ওষুধ সম্পর্কিত এই সত্যটি অনুধাবন করেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডঐঙ) উন্নয়নশীল দেশগুলোর সবার জন্য স্বাস্থ্য নিশ্চিত করার লক্ষে ভেষজ ওষুধ ব্যবহার করার জন্য জোর সুপারিশ করেছে। ভেষজ ওষুধের ওপর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই গুরুত্বারোপ নিঃসন্দেহে এর কার্যকারিতার নিশ্চিত সাৰ্য বহন করে এবং ভেষজ ওষুধ যে যথেষ্ট বিজ্ঞানসম্মত, নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য তা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে।

ভেষজ উদ্ভিদ চাষের যৌক্তিকতা
• ভেষজ ওষুধ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল বিভিন্ন ঔষধি উদ্ভিদ উৎস থেকে সংগ্রহ বা আহরণ করা হয়। সাধারণত বনে-জঙ্গলে প্রাকৃতিকভাবে জন্মে থাকা ঔষধি উদ্ভিদ থেকেই ভেষজ ওষুধের কাঁচামাল সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে জমিতে চাষকৃত উৎস থেকে ঔষধি উদ্ভিদ সংগ্রহ বাঞ্ছনীয়, নাহলে একসময় প্রকৃতি ভেষজ উদ্ভিদশূন্য হয়ে পড়বে। তাছাড়া চাষকৃত ভেষজ উদ্ভিদের গুণগতমান অনেক উন্নত হয়ে থাকে। চাষের আওতায় ঔষধি উদ্ভিদের উৎপাদন ও আহরণ পদ্ধতি নিয়ন্ত্রণ করে সঠিক সময়ে সঠিক পদ্ধতিতে তা সংগ্রহ করার সুযোগ থাকে। বন্য উৎস থেকে সংগৃহীত কাঁচামালের ক্ষেত্রে এ ধরনের নিশ্চয়তা থাকে না। এ ক্ষেত্রে ভুল উদ্ভিদ ও দ্রব্য আহরণের যেমন আশঙ্কা থাকে তেমনি অসময়ে আহরিত নিম্নমানের কাঁচামাল সরবরাহেরও প্রচুর সুযোগ থাকে। অসময়ে, অপ্রাপ্ত বয়সে ও ভ্রান্ত পদ্ধতিতে সংগৃহীত ঔষধি উদ্ভিদ দ্বারা ভেষজ ওষুধ তৈরি হলে তা কখনো গুণগত মানসম্পন্ন হয় না।

• ভেষজ উদ্ভিদ যথেষ্ট মাত্রায় পরিবেশবান্ধব। প্রায় সব ভেষজ উদ্ভিদেরই পরিবেশ বিশুদ্ধকরণের ৰমতা রয়েছে। ভেষজ উদ্ভিদ বাতাসে বিরাজমান বিভিন্ন রোগ জীবাণুকে প্রাকৃতিকভাবে বিনষ্ট করতে সক্ষম। তাই অধিকহারে ভেষজ উদ্ভিদের চাষ আমাদের ক্রমশ দূষিত হয়ে পড়া পরিবেশ বিশুদ্ধকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
• অধিকাংশ ভেষজ উদ্ভিদ চাষে কৃত্রিম কীটনাশক ও সার প্রয়োজন হয় না। অধিকাংশ ভেষজ উদ্ভিদ থেকে সারা বছর ধরে অথবা খুব অল্প সময়ে ফল বা প্রয়োজনীয় অংশ সংগ্রহ করা যায়। এ কারণে তুলনামূলকভাবে ভেষজ উদ্ভিদ চাষে বিনিয়োগ অনেক কম কিন্তু লাভ বেশি।
• মাশরুমসহ আরো বেশ কিছু ভেষজ উদ্ভিদ রয়েছে যা চাষে জায়গা খুবই কম লাগে, তাই ভূমিহীন বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ভেষজ উদ্ভিদ চাষ উপযোগী।
• আর্থিক বিশ্লেষণে ভেষজ উদ্ভিদের চাষ অন্য যেকোনো কৃষির চেয়ে অনেক বেশি লাভজনক।
• দেশে-বিদেশে ভেষজ উদ্ভিদের ব্যাপক চাহিদা থাকার কারণে ভেষজ উদ্ভিদ বিক্রি বা বাজারজাতকরণে কৃষককে তেমন বেগ পেতে হযনা। এ কারণে ভেষজ উদ্ভিদের ব্যাপক চাহিদা থাকার কারণে ভেষজ উদ্ভিদ বিক্রি বা বাজারজাতকরণে কৃষককে তেমন বেগ পেতে হয় না। এ কারণে ভেষজ উদ্ভিদ চাষে ঝুঁকি কম।
• ভেষজ উদ্ভিদ চাষ অপেক্ষাকৃত কম শ্রমসাধ্য। ভেষজ উদ্ভিদে খুব বেশি পরিচর্যা প্রয়োজন হয় না, তাই নারীর অংশগ্রহণে পারিবারিক পর্যায়ে ভেষজ উদ্ভিদের চাষ সম্ভব।
• দেশে ব্যাপকভাবে ভেষজ উদ্ভিদের চাষ সম্ভব হলে ভেষজ চিকিৎসা ও ভেষজ ওষুধ আরো বেশি সহজলভ্য হবে, ফলে দরিদ্র মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমবে।

বাংলাদেশে ভেষজ উদ্ভিদের বর্তমান অবস্থা ও গুরুত্ব :
বাংলাদেশে সর্বমোট ভেষজ উদ্ভিদের সংখ্যা কত তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। আমাদের দেশে এ পর্যন্ত তালিকাভুক্ত ভেষজ উদ্ভিদের সংখ্যা ৫৪৬টি উল্লেখ করা হলেও প্রকৃতপক্ষে এ সংখ্যা বহুগুণ বেশি। কারণ আমাদের দেশে অধিকাংশ উদ্ভিদ ও লতা-গুল্মেরই ভেষজ গুণ রয়েছে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার্য সবজি ও মসলাজাতীয় সবগুলো উদ্ভিদই উচ্চমাত্রার ভেষজ গুণসম্পন্ন।

বাংলাদেশে ভেষজ উদ্ভিদের ব্যবহার
বাংলাদেশে বার্ষিক কী পরিমাণ ভেষজ উদ্ভিদ ব্যবহৃত হয় তার কোনো সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। তবে আমাদের দেশে বর্তমানে প্রায় ৩ শতাধিক ইউনানী ও ২ শতাধিক আয়ুর্বেদিক ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ ছাড়াও রয়েছে বহু ভেষজ প্রসাধনী প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানে বছরে ২০ হাজার টনেরও বেশি ভেষজ কাঁচামালের চাহিদা রয়েছে বলে জানা যায়। বাংলাদেশে প্রতি বছর সাড়ে ৩০০ থেকে পৌনে ৪০০ কোটি টাকার ভেষজ সামগ্রী আমদানি করা হয়। এগুলো সাধারণত ভেষজ ওষুধ ও প্রসাধন সামগ্রী তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

ওষুধ ও ভেষজ প্রসাধনী তৈরির কারখানা অনেক বেড়েছে, আর সঙ্গতকারণে উল্লিখিত ভেষজের চাহিদাও বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া শহরে এবং গ্রামে অলিতে-গলিতে বিক্রি হয় অনেক ভেষজ উদ্ভিদ। সমগ্র বাংলাদেশে বিভিন্ন কবিরাজ, টোটকা চিকিৎসক ও উপজাতি এবং আদিবাসী সমপ্রদায় প্রতিদিন ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ ভেষজ উদ্ভিদ, যার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। ওপরে যেসব ভেষজ উদ্ভিদের উল্লেখ করা হয়েছে এগুলো বহুল ব্যবহৃত, এর বাইরেও অনেক ধরনের ভেষজ উদ্ভিদের চাহিদা রয়েছে উল্লিখিত শিল্পগুলোতে।

আমাদের দেশে অনায়াসে চাষাবাদযোগ্য কয়েকটি উল্লেখযোগ্য এবং লাভজনক ভেষজ উদ্ভিদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে-অর্জুন, অশোক, আতা, ডালিম/আনার, আমলকী, কুটজ/কুরচি, কয়েতবেল/কটফল, কাঁঠাল, কাগজি লেবু, কাঞ্চন, কামরাঙা, কুচিলা, খয়েরখদির, গনিয়ারী, গাব, গামার/গাম্বারী, গোড়া লেবু/জামির, চন্দন, চাপা/চম্পক, চালতা, চালমুগরা, ছাতিম, জয়ন্তী, জাম, তেজপাতা, তেঁতুল, দার্বচিনি, ধাইফুল, নিম, নিশিন্দা, পলাশ, পার্বল, পেয়ারা, বহেরা, বাতাবি লেবু, বেল, মহুয়া, রক্ত চন্দন, র্বদ্রাৰ, রোহিতকা, শিমুল, সোনা, সজনে, সোনালু, হরিতকি, আগর/অগুর্ব, কর্পুর, ঘোড়ানিম, নাগেশ্বর, অনন্তমূল, আঙুর, আত্মগুপ্তা/ আলকুশী, গন্ধভাদুলে, গুড়ুচী, গুলঞ্চ, চই, পটল, পূর্ণনবা, ভৃঙ্গরাজ, শতমূলী, অর্শ্বগন্ধ্যা, এরন্ড, ওলোট কম্বল, কালকাসুন্দে, কালমেঘ, গোলাপ, ঘৃতকুমারী, চিতা (সাদা/লাল), সর্পগন্ধ্যা, জবা, তুলসী, বলা, বামুনহাটি, বাসক, বাবুই মেহেদী, শালপনি, তোকমা এসব।

বিশ্ববাজারে ভেষজ উদ্ভিদের চাহিদা
সমগ্র বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ৪৩ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ভেষজ উদ্ভিদের চাহিদা রয়েছে। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই প্রতি বছর ১.৩ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ভেষজ ওষুধ বিক্রি হয়। ১৯৮০ সনে যুক্তরাষ্ট্রে আধুনিক চিকিৎসায় যেসব অ্যালোপ্যাথি ওষুধ ব্যবহৃত হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে ৮ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ভেষজ উদ্ভিদ ব্যবহৃত হয়। জার্মানিতে এ চাহিদা বার্ষিক ৪ বিলিয়ন ডলার। ২০০২ সনে বাংলা একাডেমী কর্তৃক প্রকাশিত ‘ভেষজ ওষুধ’ বইতে ড. আবদুল গনি এ তথ্য উপস্থাপন করেছেন। ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাপী ভেষজ উদ্ভিদের চাহিদা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তা উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে।
পৃথিবীতে উন্নত দেশগুলোতে যেসব অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ তৈরি করা হয় তার প্রায় ৩৩ শতাংশ ভেষজ রাসায়নিক থেকে প্রস্তুত করা হয়। রাশিয়ায় প্রস্তুত ও ব্যবহৃত অ্যালোপ্যাথি ওষুধের শতকরা ৪৭ শতাংশেরও বেশি ভেষজ থেকে প্রস্তুত করা হয়। অনুজীব উদ্ভূত ৬০ শতাংশ অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ প্রস্তুত হয় ভেষজ থেকে। ফ্রান্স-জার্মানিতে প্রায় ৩০-৪০ ভাগ চিকিৎসক তাদের চিকিৎসাসেবা প্রদান কাজে ভেষজ ওষুধের ওপর নির্ভর করে থাকেন।
বিশ্ব খাদ্য সংস্থার হিসাব মতে, বর্তমানে সারা বিশ্বে ভেষজ উদ্ভিদের ৬২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাজার রয়েছে। প্রতি বছর এই চাহিদা ১০.১৫ শতাংশ হারে বাড়ছে। বর্তমানে এই বিশাল বাজারের অধিকাংশই ভারত ও চীনের দখলে। ভেষজ উদ্ভিদের প্রধান আমদানিকারক দেশ হচ্ছে- যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান, মালয়েশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ। এ ছাড়াও পাকিস্তান, সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, আবুধাবি, কোরিয়া, থাইল্যান্ডসহ অনেক দেশে ভেষজ উদ্ভিদের ব্যাপক ব্যবহার ও চাহিদা রয়েছে। অপরদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে, বর্তমান বিশ্বে প্রায় ৪০০ কোটি মানুষ কোনো না কোনো ভাবে ভেষজ ওষুধ ব্যবহার করছে। ভেষজ ওষুধ ব্যবহারকারী সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে, আর সাথে সাথে প্রতিদিন বিশ্বব্যাপী বাড়ছে ভেষজ উদ্ভিদের চাহিদা। আমাদের দেশ থেকে বর্তমানে বহির্বিশ্বে যে পরিমাণ নিমচারা রপ্তানি হচ্ছে তা মোট চাহিদার ১ শতাংশেরও কম।

ভেষজ উদ্ভিদ চাষের অর্থনৈতিক গুরুত্ব
ভেষজ উদ্ভিদ চাষ অন্য যেকোনো ফসল চাষের চেয়ে বহুগুণ বেশি লাভজনক এবং নিরাপদ। সমগ্র বিশ্বে ভেষজ উদ্ভিদের বিপুল চাহিদা রয়েছে। ভেষজ উদ্ভিদ রপ্তানি করে চীন প্রতি বছর আয় করে ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, ভারত আয় করে ৬ বিলিয়ন ডলার এবং দক্ষিণ কোরিয়ার আয় ২.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। শতভাগ রপ্তানি সম্ভাবনা ছাড়াও ভেষজ উদ্ভিদের চাষ করে কৃষক তুলনামূলক অধিক লাভ করতে পারেন। অধিকাংশ ভেষজ উদ্ভিদের চাষ প্রক্রিয়া অত্যন্ত সহজ। ভেষজ উদ্ভিদ চাষের ৰেত্রে সার ও কীটনাশকের ভূমিকা অত্যন্ত গৌণ, এ কারণে কৃষকের উৎপাদন খরচ তুলনামূলকভাবে অনেক কম। গুল্মজাতীয় ভেষজ প্রায় বিনা পরিচর্যা ও বিনা খরচে উৎপাদন সম্ভব, অথচ এসব উদ্ভিদের বাজারদর বেশ চড়া।

দারিদ্র্য বিমোচন ও স্বাস্থ্য রক্ষায় পারিবারিক ভেষজ বাগান
আমাদের দেশে প্রচুর লতা-গুল্মজাতীয় ভেষজ উদ্ভিদ রয়েছে, যা গ্রামেগঞ্জে, পতিত জমিতে বিনা পরিচর্যায় জন্মায়। আমরা যদি পরিকল্পিতভাবে অতি প্রয়োজনীয় এবং সহজলভ্য ভেষজ উদ্ভিদের পারিবারিক বাগান গড়ে তুলতে পারি, তবে একদিকে যেমন আমরা ছোটোখাট রোগব্যাধিতে বিনা পয়সায় ওষুধ পাব তেমনি এসব ভেষজ পরিবারে বাড়তি অর্থের জোগান দিতে পারে। পারিবারিক পর্যায়ে ভেষজ বাগান গড়ে তুলতে বিশেষ কোনো যত্ন বা ব্যয়ের প্রয়োজন নেই, বাড়ির আনাচে-কানাচে এবং পরিত্যক্ত জমিতে অনায়াসেই এসব উদ্ভিদের চাষ করা যায়। বাড়ির নারী সদস্যরাই এসব বাগান পরিচর্যা করতে পারেন। ভেষজ উদ্ভিদ চাষে যেহেতু তেমন কোনো সার বা কীটনাশক প্রয়োজন হয় না। তাই এই বাগান সৃজনে ব্যয় খুবই কম। এভাবে কৃষক পর্যায়ে প্রতিটি বাড়িতে গড়ে ওঠা ভেষজ বাগান আমাদের ভেষজ কৃষিতে অনবদ্য অবদান রাখতে পারে। নাটোরের আফাজ উদ্দিন (পাগলা আফাজ) এ ধরনের একটি সফল উদ্যোগ নিয়ে সমপ্রতি সরকারি স্বীকৃতি অর্জন করেছেন। তিনি একক প্রচেষ্টায় নাটোরের লক্ষ্মীপুর, পিজ্জিপাড়া, ইব্রাহিমপুর, সোনাপুর, চানপুর, দক্ষিণপুর, দোয়াতপাড়া, সুলতানপুরসহ বেশ কিছু গ্রামজুড়ে গড়ে তুলেছেন দেশের একমাত্র ‘ঔষধি গ্রাম’। এভাবে দেশজুড়ে অসংখ্য ‘ঔষধি গ্রাম’ সৃজন সম্ভব হলে আমাদের দেশের কৃষি ৰেত্রে নব দিগন্ত সূচিত হতে পারে। ঔষধি গাছ শুধু মানুষেরই রোগ সারায় না, এটি পরিবেশ রৰা এবং বাতাসে ভাসমান নানা অদৃশ্য রোগজীবাণু ধ্বংসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তাই ব্যাপকভাবে ঔষধি বৃক্ষ চাষের ফলে মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং পরিবেশ রক্ষা দুটোই সম্ভব।

ভেষজ উদ্ভিদের বহুমুখী ব্যবহার
এমন কিছু ভেষজ উদ্ভিদ রয়েছে যেগুলো থেকে ওষুধ ছাড়াও ভেষজ কীটনাশক তৈরি করা সম্ভব যেমন- মেহগনি গাছের ফল এবং নিম থেকে তৈরি অত্যন্ত কার্যকর ভেষজ কীটনাশক ব্যবহার করে আমরা একদিকে যেমন কীটনাশক আমদানি ব্যয় হ্রাস করতে পারি তেমনি পরিবেশ রক্ষায় ও তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।ওষুধ ও প্রসাধনী সামগ্রীর বাইরে আমাদের দেশে এমন অনেক উদ্ভিদ আছে, যা থেকে মূল্যবান ঔষধিগুণসম্পন্ন পরিপূরক খাদ্য তৈরি করা সম্ভব। উদারহরণ হিসেবে ‘পানিফল’ বা ‘সিঙ্গাড়া’ ফলের কথা বলা যায়। নিতান্ত অবহেলায় পরিত্যক্ত জলাশয়ে জন্ম নেয়া এই ফলের রয়েছে অসামান্য পুষ্টিগুণ। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে পানিফলকে বলবর্ধক ও যৌবনদায়ী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সুন্দরবন অঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেয় বিপুল পরিমাণ কেওড়া ফল, যা’ যথেষ্ট ভিটামিন ও পুষ্টিসমৃদ্ধ।

বিকল্প শিশুখাদ্য হিসেবে আমাদের দেশে প্রাচীনকাল থেকে শটিমূলের ব্যবহার হয়ে আসছে। প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেয়া শটিগাছের মূল থেকে এ খাদ্য সংগ্রহ করা হয়, যা প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, ভিটামিন ও খনিজ পদার্থসমৃদ্ধ। শটিমূল শোধন করে তা পাউডার আকারে টিন অথবা প্যাকেটজাত অবস্থায় বাজারজাত করা সম্ভব। এর ফলে একদিকে যেমন শিশুর স্বাস্থ্য সুরৰা হবে অপরদিকে ক্ষতিকারক টিনজাত দুধ আমদানি হ্রাস পাবে। শটিচাষ অত্যন্ত লাভজনক হওয়া সত্ত্বেও উপযুক্ত প্রচার ও প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাবে কৃষকরা আগ্রহী হয়ে উঠছে না। এসব অবহেলিত ফল-উদ্ভিদ প্রক্রিয়াজাত করে বাজারজাত করতে পারলে আমাদের কৃষিবাণিজ্যে নতুন মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হবে।

ভারত, শ্রীলঙ্কা এবং চীন ভেষজ উদ্ভিদ, ভেষজ ওষুধ ও ভেষজ পণ্য উৎপাদনে এতটা অগ্রসর হওয়ার পেছনে মূল কারণ হলো রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা। ওই সব দেশে ভেষজ উদ্ভিদ চাষে যথেষ্ট সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে। ঋণ সুবিধা, প্রযুক্তিগত এবং বাজারজাতকরণ সুবিধাসহ সেসব দেশের সরকার এই খাতে যথেষ্ট সহযোগিতা প্রদান করে থাকে। দুঃখের বিষয় আমাদের দেশের কৃষি বিভাগের কাছেও এ সংক্রান্ত পর্যাপ্ত তথ্য ও প্রযুক্তি নেই। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ আরো কিছু দাতাসংস্থা এই খাতে আমাদের দেশে উল্লেখযোগ্য আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করে থাকে। আমাদের দেশে এ ৰেত্রে সরকারি উদ্যোগ বলতে নামমাত্র কয়েকটি প্রদর্শনী খামার চোখে পড়ে।

বেসরকারি ও ব্যক্তি উদ্যোগেও বাণিজ্যিক আকারে ভেষজ উদ্ভিদের চাষ শুরু হয়নি। এর অন্যতম কারণ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব। বর্তমানে আমাদের দেশে কৃষি ব্যবস্থায় যথেষ্ট আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছে, সে ক্ষেত্রে ভেষজ উদ্ভিদ চাষ যেটুকু হচ্ছে তা মান্ধাতা আমলের মতো অথবা প্রাকৃতিকভাবেই হচ্ছে। ভেষজ উদ্ভিদ চাষে সংশ্লিষ্ট মহলকে আরো আন্তরিক হতে হবে। না হলে যথেষ্ট সম্ভাবনা এবং সুযোগ থাকার পরও আমাদের ভেষজ সম্ভাবনা অন্যান্য সম্ভাবনার মতোই মুখ থুবড়ে পড়বে। আমাদের দেশেও পর্যাপ্ত সরকারি এবং বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আমরা অবশ্যই বিশ্বে ভেষজ উদ্ভিদ রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে প্রথম স্থান অধিকার করতে পারব, কারণ আমাদের রয়েছে ভেষজ উদ্ভিদ চাষ ও ব্যবহারের বংশ পরম্পরা ঐতিহ্য।

তথ্যসূত্র: ড. মো. সাইফুল ইসলাম চৌধুরী, চিকিৎসক, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান ‘দেশ’-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি