ক্যাটেগরিঃ কৃষি

 

বাঁশকে গরিবের কাঠ বলে। কারণ গ্রামে গরিব মানুষ বাঁশ দিয়ে ঘরবাড়ি নির্মাণ করে। বাঁশ গ্রামীণ কুটির শিল্পের প্রধান কাঁচামাল। বাঁশ কাগজ ও রেয়ন শিল্পেরও কাঁচামাল। দেশের অর্থনীতিতে বাঁশের গুরুত্ব অপরিসীম।

বাংলাদেশে প্রায় ৩৩ জাতের বাঁশ পাওয়া যায়। বন-জঙ্গলে মুলি, মিতিঙ্গা, ডলু ও নলি বাঁশ পাওয়া যায়। এসব বাঁশের ছিদ্র মোটা ও দেয়াল পাতলা। গ্রামে বরাক, বড়ুয়া, বেতুয়া, তল্লা, মাকলা, মরাল ইত্যাদি বাঁশ জন্মে। এসব বাঁশের ছিদ্র সরু ও দেয়াল মোটা।

বাঁশ চাষ
বাঁশের বীজ বা চারার অভাবে বাঁশ উৎপাদন ব্যাহত হয়। মোথার মূল্য বেশি এবং দুষপ্রাপ্যতার কারণে চাষিরা বাঁশ চাষে নিরুৎসাহিত হয়। নিচে বাঁশ চাষের কয়েকটি সহজ পদ্ধতি বর্ণনা করা হলো-
মোথা বা রাইজম পদ্ধতিতে বাঁশ চাষ

স্থান নির্বাচন সাধারণত ডোবা, নালা, খাল, পুকুর পাড় বা বসতবাড়ির আশপাশে প্রান্তিক জমিতে বাঁশ চাষ করা হয়। দো-আঁশ ও এঁটেল মাটিতে বাঁশ ভালো হয়।

গর্ত তৈরি : মোথা লাগানোর ১৫-২০ দিন আগে নির্বাচিত স্থানের মাটি গর্ত করতে হয়। এজন্য ৫০ সেন্টিমিটার গভীর এবং ৩০ সেন্টিমিটার চওড়া গর্ত করতে হবে।

সার প্রয়োগ : প্রতি গর্তে পচা গোবর ১৫ কেজি, ইউরিয়া ১০০ গ্রাম, টিএসপি ১০০ গ্রাম এবং এমপি ৫০ গ্রাম মাটির সাথে মিশিয়ে ১৫-২০ দিন রাখতে হবে।

মোথা সংগ্রহ : মধ্যম বয়সী একটি বাঁশকে মাটি থেকে এক মিটার উঁচুতে কাটতে হয়। মোথায় ২-৩টি সজীব চোখ থাকতে হবে। মোথাসহ বাঁশটি তুলে আনতে হবে।

মোথা রোপণ : বৈশাখ- জ্যৈষ্ঠ মাসে মোথা রোপণের উপযুক্ত সময়। আগে করা গর্তে সার মাটি সরিয়ে একটু কাত করে মোথা রোপণ করতে হবে। মোথা থেকে মোথার দূরত্ব ৫-৬ মিটার হলে ভালো হয়। মোথা লাগানোর পর গোড়ার মাটি ভালো করে চেপে দিতে হয়।

পরিচর্যা : মোথা রোপণের পর বাঁশের কাটা মাথা পলিথিন বা অন্য কিছু দিয়ে ঢেকে দিতে হয়। বৃষ্টি না থাকলে রোপণের পর কয়েক দিন পানি সেচ দিতে হবে।
বাঁশ উচ্চতায় এবং পরিধিতে প্রথম ৪-৫ মাসের মধ্যেই বেড়ে যায়। পরে শুধু বাঁশের পুরুত্ব বাড়ে। বাঁশ একবার রোপণ করার পর তা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়ে ঝাড়ে পরিণত হয়। প্রতি ঝাড়ে প্রায় ২৫-৫০টি বাঁশ হয়।

লেয়ারিং বা শোয়ানো পদ্ধতিতে বাঁশ চাষ

চারা তৈরি : এ ক্ষেতের এক থেকে দুই বছর বয়সে বাঁশকে দাবা কলমের মতো মাটিতে শুইয়ে দিতে হয়। বাঁশের গোড়া মাটির ভেতরে থাকবে। এরপর ঐ বাঁশের ওপর ভেজা মাটি চাপা দিতে হয়। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে শুইয়ে দিতে হয়। বাঁশের কিছু কিছু গিঁট থেকে নতুন শিকড় ও মোথার জন্ম হয়। সেখান থেকে নতুন বাঁশ বের হয়। বাঁশের চারা গিঁটসহ কেটে উপযুক্ত স্থানে রোপণ করতে হয়।

গর্ত তৈরি ও সার প্রয়োগ : চারা লাগানোর ১৫-২০ দিন আগে ৪০ সেমি. গভীর এবং ৪০ সেমি. চওড়া করে গর্ত করতে হবে। গর্তে ৫ কেজি গোবর, ২০ গ্রাম ইউরিয়া, ২০ গ্রাম টিএসপি ও ১৫ গ্রাম এমপি মাটির সাথে মিশিয়ে ১৫-২০ দিন রাখতে হবে।

চারা রোপণ : সার মিশ্রিত মাটি সরিয়ে সোজা করে গিঁটসহ চারা রোপণ করতে হবে। মোথা থেকে মোথার দূরত্ব ৫-৬ মিটার হলে ভালো হয়। চারা লাগানোর পর গোড়ার মাটি ভালো করে চেপে দিতে হয়।

পরিচর্যা : চারা রোপণের পর বৃষ্টি না থাকলে সেচ দিতে হবে। আগাছা পরিষ্কার করতে হবে। প্রতি বছর গোড়ায় মাটি দিতে হবে।

বীজ থেকে বাঁশের চাষ

চারার তৈরি : বাঁশে সারা জীবনে একবার মাত্র ফুল ফোটে। প্রজাতিভেদে ২০ থেকে ১০০ বছর পর বাঁশের ফুল ধরে। ফুল ধরলে বাঁশ ঝাড় মরে যায়। তখন বীজ সংগ্রহ করতে হয়। বীজ সংগ্রহ করে পলিব্যাগে বপন করে চারা উৎপাদন করতে হয়।

স্থান নির্বাচন : সাধারণত ডোবা, নালা, খাল, পুকুর পাড় বা বসতবাড়ির আশপাশে প্রান্তিক জমিতে বাঁশ চাষ করা হয়। দো-আঁশ, এঁটেল দো-আঁশ মাটিতে বাঁশ ভালো হয়।

গর্ত তৈরি : চারা রোপণের ১৫-২০ দিন আগে নির্বাচিত স্থানে মাটি গর্ত করতে হয়। ৩০ সেমি. গভীর এবং ২০ সেমি. চওড়া গর্ত করতে হবে। সার
প্রয়োগ : প্রতি গর্তে পচা গোবব ২ কেজি, টিএসপি ১০ গ্রাম, এমপি ৫ গ্রাম মাটির সাথে মিশিয়ে ১৫-২০ দিন রাখতে হবে।

চারা রোপণ : এক বছর বয়সের চারা উক্ত গর্তে রোপণ করতে হয়। চারা রোপণ করে গোড়ার মাটি চেপে দিতে হবে। চারা থেকে চারার দূরত্ব ৫-৬ মিটার দিলে ভালো হয়।

বাঁশ চাষের পরিচর্যা
খরা হলে নিয়মিত সেচ দিতে হবে। চারার গোড়ায় মাটি তুলে দিয়ে আলগা করে দিতে হয়। কচুরিপানা দিয়ে চারার গোড়া ঢেকে দিলে মাটি ভেজা থাকে। বাঁশ ঝাড় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। আগাছা পরিষ্কার করতে হবে। কোনো বাঁশ রোগে আক্রান্ত হলে তা মোথাসহ তুলে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। অতিরিক্ত কঞ্চি হলে ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে ছাঁটাই করতে হবে। তিন বছর পর পর বর্ষার পরে ইউরিয়া, টিএসপি ও এমপি সার দিতে হবে। কোনো বাঁশ ঝড়ে ভাঙলে কেটে সরাতে হবে। বাঁশে পোকা আক্রমণ করলে কীটনাশক দিতে হবে।

বাঁশ কাটার সময়
সাধারণত দু’বছর বা তার বেশি বয়সের বাঁশ কাটা উচিত। বনাঞ্চলে সরকারিভাবে সাধারণত তিন বছর অন্তর বাঁশ কাটা হয়। বাঁশ পরিপক্ব হলে বাঁশের কাণ্ডের সবুজ বর্ণ ধূসর হবে। কাণ্ডে টোকা দিলে ধাতব শব্দ হবে। কাটার পর শুকিয়ে কুঁচকে যাবে না।

মুর্তা বা পাটি পাতা
মুর্তা বা পাটি পাতা এ দেশে গ্রামীণ কুটির শিল্পের কাঁচামাল। এটি দেশের সব জেলাতে জন্মে না। শুধু সিলেট, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, ঢাকা, কুমিল্লা, ফেনী, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম অঞ্চলে এর ব্যাপক চাষাবাদ হয়। মুর্তা দিয়ে শীতল পাটি তৈরি হয়। পাটির দাম ৫০ টাকা থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত। পাটি তৈরির ওপর দেশে প্রায় ৪-৫ লাখ লোক জীবিকা নির্বাহ করছে।

চাষ পদ্ধতি
মুর্তা চাষ করা সহজ। তেমন পরিচর্যা করতে হয় না। চাষে খরচও কম। তেমন ভালো জমিরও প্রয়োজন হয় না।

স্থান নির্বাচন : স্যাঁতসেঁতে জায়গা যেমন- পুকুরের ঢাল, ডোবার ধার, বর্ষাকালে যেখানে জলাবদ্ধ হয়, নিচু জায়গা যেখানে অন্য ফসল হয় না এমন জায়গায় মুর্তার চাষ করা যায়। দো-আঁশ, এঁটেল দো-আঁশ মাটিতে মুর্তা ভালো হয়।

রোপণ : মুর্তার রাইজম বা মোথা রোপণ করা যেতে পারে। মে-জুন মাসে রাইজম সংগ্রহ করে রোপণ করতে হয়। সারি থেকে সারি ৬০ সেমি. এবং মোথা থেকে মোথা ৬০ সেমি. দূরত্বে লাগাতে হয়। মুর্তার ডাল রোপণ করেও চাষ করা যেতে পারে। ২০ সেমি. মাটি গভীর করে ১৫ সেমি. চওড়া গর্ত করতে হয়। রাইজম বা ডাল গর্তে রোপণের পর গোড়া ভালোভাবে চেপে দিতে হয়।

সার প্রয়োগ : প্রতি গর্তে ৩ কেজি পচা গোবর, ২০ গ্রাম টিএসপি ও ২০ গ্রাম এমপি সার মাটির সাথে মিশিয়ে ১৫ দিন রাখতে হয়। মোথায় পাতা গজানোর পর প্রতি চারায় ১০ গ্রাম করে ইউরিয়া সার দিতে হয়।

পরিচর্যা : মুর্তা তেমন পরিচর্যা করতে হয় না। শুধু খেয়াল রাখতে হবে জমি যেন স্যাঁতসেঁতে থাকে। প্রতি বছর শীতকালে জৈব সার, ইউরিয়া, টিএসপি ও এমপি সার দিতে হয়। প্রতি বছর গাছের গোড়ায় মাটি কুপিয়ে আলগা করে গোড়ায় মাটি দিলে ভালো হয়।

কর্তন : চৈত্র মাসে কাটা হয়। মোথা লাগালে দু’বছরে ২-৪ মিটার লম্বা হলেই কাটার উপযুক্ত হয়। ডাল লাগালে ফলন কম হয়। তিন বছর সময় লাগে। কিন্তু পরবর্তীতে ফলন স্বাভাবিক হয়। মুর্তা মাটি থেকে ২-৭ সেমি. ওপরে ধারালো দা দিয়ে কাটতে হয়। এখান থেকে আবার কুশি গজিয়ে মুর্তা লম্বা হয়। ঠিকভাবে চাষ করলে প্রতি হেক্টরে ৩০ হাজার টাকার মুর্তা হতে পারে।

মুর্তার ব্যবহার : মুর্তার কাণ্ডের ত্বক দিয়ে উন্নত মানের শীতল পাটি তৈরি হয়। ভেতরের অংশ দিয়ে নিম্নমানের পাটি তৈরি হয়। এ ছাড়াও ব্যাগ, পুতুল, ডেকোরেশনসহ বিভিন্ন কুটির শিল্পে মুর্তার ব্যবহার হয়।

বেত
বেত বাংলাদেশের কুটির শিল্পের অন্যতম কাঁচামাল। বিভিন্ন জেলার বনাঞ্চল ও জঙ্গল ছাড়াও চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেটের বনাঞ্চলে প্রচুর বেত জন্মে। বেত দিয়ে আসবাবপত্র ও কুটির শিল্প দ্রব্য তৈরি হয়। সারাদেশে হাজার হাজার লোক বেতের আসবাবপত্র ও কুটির শিল্পের সাথে জড়িত। বাংলাদেশে ৫-৬ জাতের বেত গাছ আছে। যেমন- গোল্লাবেত, জালিবেত, ভূতুম বেত, বরাবেত ও লতা বেত।

বেতের চাষ
বেত দু’ভাবে উৎপাদন করা যায়। মোতা এবং বীজ দ্বারা চাষ করা যায়। অধিকাংশই মোথা দিয়ে চাষ করে। বর্ষাকালে বেতের মূল থেকে প্রচুর সাকার বা শোষক চারা বের হয়। এগুলো কেটে বৃষ্টির সময় জমিতে রোপণ করলেই হয়। বেত ছায়াযুক্ত স্যাঁতসেঁতে স্থানে ভালো হয়।
বীজ থেকে চারা উৎপাদন করে রোপণ করতে হয়। বৈশাখ মাসে বেতের ফল পাকার সাথে সাথে বীজ সংগ্রহ করতে হয়। বীজ সংগ্রহের পর পরই বীজ বপন করতে হয়। কারণ এই বীজের সুপ্তকাল মাত্র কয়েক দিন থাকে। বীজ বপনের আগে বীজের রসালো অংশ ছাড়িয়ে বপন করলে দ্রুত চারা গজায়।

বীজতলা তৈরি করে বীজ বপন করতে হবে। বীজ গজিয়ে চারায় দুটি পাতা হলে পলি ব্যাগে স্থানান্তর করতে হয়। অথবা সরাসরি পলিব্যাগে বীজ বপন করেও চারা উৎপাদন করা যায়। বেতের বীজ গজাতে ৩-১২ সপ্তাহ সময় লাগে। পলিব্যাগে চারা এক বছর রাখার পর জমিতে রোপণ করতে হয়। কোনো বড় গাছের পাশে চারা রোপণ করলে গাছ বেয়ে বেত বেড়ে উঠে

বেতের যত্ন
বেতের জমি আগাছামুক্ত হতে হবে। মাটি শুকিয়ে গেলে সেচ দিতে হবে। মাটি সব সময় স্যাঁতসেঁতে রাখতে হবে। সব সময় ছায়ার ব্যবস্থা রাখতে হবে। প্রতি বছর জানুয়ারি মাসে গোবর, টিএসপি ও এমপি সার দিতে হবে।

বেত কাটার পদ্ধতি
বেত রোপণের পর ৫-৭ বছরের মধ্যে ব্যবহার উপযুক্ত হয়। প্রত্যেক বছরই বেত কাটা যায়। ধারালো দা দিয়ে গোড়া থেকে ৪-৫ সেমি. উপরে প্রতিটি এক কোপে কাটতে হয়।

বেতের ব্যবহার
বেত দিয়ে চেয়ার, টেবিল, মোড়া, সোফোসেট, দোলনা, সেলফ, খাট, ধামাসহ বিভিন্ন কুটির শিল্পজাত দ্রব্যাদি তৈরিতে ব্যবহার হয়।

***
তথ্যসূত্র: কৃষিকথা