ক্যাটেগরিঃ কৃষি

 

অড়হর ডাল প্রোটিন সমৃদ্ধ উৎকৃষ্ট খাদ্য। এর পাতা ও খোসা এক উৎকৃষ্ট পশু খাদ্য। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অড়হরের চাষ করা হয়। অড়হরের চাষকে আরো জনপ্রিয় করে মোট ডাল জাতীয় শস্যের উৎপাদন বাড়ানোর যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে এ দেশে। অড়হরের মূলে বায়ুমণ্ডলের নাইট্রোজেন সঞ্চিত হয়, ফলে এর চাষ করলে জমি উর্বর হয়। অড়হরের জমির ভূমিয় রোধ করার ক্ষমতা আছে। অড়হরের চাষ এককভাবে বা আদা, হলুদ বা অন্য ফসলের সঙ্গে মিশিয়েও করা যায়। এখানে অড়হর চাষের উন্নত পদ্ধতি নিয়ে কিছু আলোচনা করা হলো।

মাটি : পানি নিকাশের সুবিধাযুক্ত দো-আঁশ থেকে এঁটেল দো-আঁশ জমিতে অড়হর চাষ ভালো হয়। এ ছাড়া উঁচু এঁটেল জমি ও টিলা জমিতেও অড়হরের চাষ ভালো হয়।

জাত : অড়হরের উন্নত জাতগুলো হলো টি-২১, ইউপিএস-১২০, আইপিএল-১৫১ ইত্যাদি। এ জাতের গাছ মাঝারি ও ছড়ানো এবং এর শস্যকাল ১৭০-২০০ দিন।

বোনার সময় : অড়হর বোনার সময় হলো, জ্যৈষ্ঠ মাস থেকে শ্রাবণ মাস।

জমি তৈরি : অড়হর গাছের শিকড় মাটির অনেক গভীর স্তর পর্যন্ত প্রবেশ করে। কাজেই জমিতে ৪-৫ বার গভীরভাবে চাষ করে মই দিয়ে ভালোভাবে জমি প্রস্তুত করা দরকার। টিলা জমিতে গর্তে বীজ বোনা যায়।

সার প্রয়োগ : জমি প্রস্তুত করার সময় বিঘাপ্রতি প্রায় ৬ কুইন্টাল গোবর সার অথবা আবর্জনা সার প্রয়োগ করা দরকার। এ ছাড়া শেষ চাষের সময় বিঘাপ্রতি ৫ কিলোগ্রাম ইউরিয়া এবং ৩৫ কিলোগ্রাম সিঙ্গল সুপার ফসফেট সার প্রয়োগ করা ভালো।

বীজের হার : ২ কেজি প্রতি বিঘা।

রোপণের দূরত্ব : সারি থেকে সারি ৭৫ সেন্টিমিটার। গাছ থেকে গাছ ৩০ সেন্টিমিটার।

বীজ রোপণ ও মাধ্যমিক পরিচর্যা : বোনার আগে প্রতি কেজি বীজে ৩ গ্রাম কেপটান বা মিরাম বা ১ গ্রাম বেভিস্টিন বা ২.৫ গ্রাম ইন্দফিল এম ৪৫ ওষুধ মিশিয়ে শোধন করে নেয়া প্রয়োজন এরপর ৭৫ সেন্টিমিটার দূরত্বে সারি করে প্রতি সারিতে ৩০ সেন্টিমিটার দূরত্বে বীজ বোনা দরকার চারা জমি থেকে বের হওয়ার ৩ সপ্তাহ পরে একবার এবং প্রয়োজন মতো ৫-৬ সপ্তাহ পরে আর একবার আগাছা পরিষ্কার করে দিতে হয়।

নানা ধরনের পোকার মধ্যে কুঁড়ি ও শুঁটি ছিদ্রকারী পোকা অড়হরের খুব তি করে। কুঁড়ি ও শুঁটি ছিদ্রকারী পোকা প্রথম অবস্থায় গাছের পাতা খায়, পরে শুঁটি ধরার সময় শুঁটিতে ছিদ্র করে বীজগুলো খেয়ে অড়হরের অনিষ্ট করে। এ দুই পোকা ছাড়াও অন্য পোকা যেমন ফি বিটল, পাতা মোড়ানো পোকা এবং শোষক পোকার উপদ্রব কোনো কোনো সময় অড়হরে দেখা যায়। এ সব পোকা দমনের জন্য ম্যালাথিয়ন ৫০ ইসি বা সুমিথিয়ন ৫০ ইসি ২ মিলি লিটার প্রতি পানিতে মিশিয়ে ফুল আসার সময় একবার ও ১৫ দিন অন্তর আরো দু’বার সেপ্র করতে হবে।

অড়হরের রোগের মধ্যে ঢলে পড়া রোগ এবং পত্রদুষ্টি ব্যাধিই বেশি হতে দেখা যায়। আক্রান্ত গাছের পাতা নেতিয়ে পড়ে এবং ক্রমশ শুকিয়ে যায়। শিকড় ভালোভাবে মাটিতে না বসায় গাছকে সহজে জমি থেকে টেনে তোলা যায়। গাছের কাণ্ড এবং শিকড়ে লম্বা ছোট ছোট কালো কালো দাগ পড়ে। দাগগুলো পরে বিস্তৃত হয়ে পরস্পরের সঙ্গে মিশে যাওয়ায় বেশ মোটা দেখায়। এ রোগ প্রতিকারের জন্য ভৌত ও রাসায়নিক উপায়ে জমি শোধন করা দরকার। এ ছাড়া জমিতে প্রচুর পরিমাণে জৈব সার প্রয়োগ করা উচিত।

অড়হরের পত্রদুষ্টি রোগ এক ধরনের ছত্রাক আক্রমণের ফলে হয়। রোগের ফলে পাতার নিচের দিকে ফিকে বাদামি রঙের ছোট ছোট প্রায় গোলাকার দাগ ফুটে ওঠে। দাগগুলো পরে বহু কোণ বিশিষ্ট হয়ে যায়। পরস্পর সংলগ্ন হওয়ার ফলে দাগগুলোকে আঁচিলের মতো দেখায়। বীজ বপনের এক মাস পর থেকে শুঁটি ধরা পর্যন্ত ১৫ দিন অন্তর অন্তর কেপটাফ ১ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে সেপ্র করা দরকার।

ফসল তোলা : গাছের অধিকাংশ শুঁটি পেকে গেলে অড়হর ফসল তুলে নেয়া উচিত। শুঁটি রৌদ্রে শুকিয়ে লাঠির ধারা পিটিয়ে বীজ বের করে মজুদ করা যায়।

ফলন : ভালোভাবে চাষ করলে বিঘাপ্রতি প্রায় ২ কুইন্টাল অড়হর পাওয়া যায়।

তথ্যসূত্র: আফতাব চৌধুরী, সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ব্লক-এ, শাহজালাল উপশহর, সিলেট